সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকার; বাস্তুসংস্থান রক্ষার চ্যালেঞ্জ
সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের বড়বস্থা খাল এলাকায় বনরক্ষীদের অভিযানে বিষের বোতল ও মাছ শিকারের সরঞ্জাম জব্দ হওয়ার ঘটনাটি আমাদের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও বনকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে শিকারিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে, তবে এই অভিযান আবারও প্রমাণ করল যে, বিশ্বের এই বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের অভ্যন্তরে অবৈধ ও বিধ্বংসী কর্মকা- এখনো থামেনি। বরং এক শ্রেণির অসাধু মানুষ বনের অমূল্য সম্পদ ধ্বংস করে নিজেদের পকেট ভারী করতে মরিয়া।
বিষ দিয়ে মাছ শিকার কেবল একটি অপরাধ নয়, এটি সুন্দরবনের স্পর্শকাতর বাস্তুতন্ত্রের ওপর এক ধরনের ‘রাসায়নিক সন্ত্রাস’। শিকারিরা যখন খালের পানিতে বিষ ঢালে, তখন কেবল বড় মাছই মারা যায় না; বরং ওই পানির সংস্পর্শে থাকা সমস্ত জলজ প্রাণীÑঅসংখ্য প্রজাতির মাছের পোনা, কাঁকড়া, কচ্ছপ এবং অণুজীব নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যায়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে পুরো খাদ্যশৃঙ্খলে। বনের হরিণ বা বাঘ যখন ওই দূষিত পানি পান করে, তখন তাদের জীবনও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। সুন্দরবনের মতো একটি স্পর্শকাতর বনভূমিতে এই অপূরণীয় ক্ষতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
বন বিভাগ জানিয়েছে, পলাতক শিকারিদের শনাক্ত করে মামলা করার প্রস্তুতি চলছে। আমরা মনে করি, কেবল মামলা বা নথিপত্র ভারি করাই যথেষ্ট নয়। অতীতে দেখা গেছে, মামলার পর যথাযথ তদারকির অভাবে অপরাধীরা পার পেয়ে যায় এবং পুনরায় একই অপরাধে লিপ্ত হয়। তাই অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। আইনের কঠোর প্রয়োগ না থাকলে এই অসাধু চক্র কখনোই পিছু হটবে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়Ñমাছ মারার এই বিষ আসছে কোথা থেকে? স্থানীয় বাজারগুলোতে কি খুব সহজেই এসব রাসায়নিক বা বিষ পাওয়া যাচ্ছে? বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের উচিত বিষের সরবরাহ ব্যবস্থা বা ‘সোর্স’ চিহ্নিত করা। যদি বিষের সহজলভ্যতা বন্ধ করা না যায়, তবে বনের গহীনে অভিযান চালিয়ে এই সংকট পুরোপুরি দূর করা কঠিন হবে।
বন বিভাগ টহল জোরদার ও বিশেষ অভিযান অব্যাহত রাখার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আমরা তার দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন দেখতে চাই। একই সাথে সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার সাধারণ মানুষকেও সচেতন করে তুলতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে যে, সুন্দরবনের জলজ সম্পদ ও বনভূমি ধ্বংস হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়বেন তারাই। সুন্দরবন আমাদের জাতীয় অহংকার এবং প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ; একে বিষমুক্ত রাখা এবং এর জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা কোনো একক দপ্তরের নয়, বরং রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।









