ধর্ষক, ধর্ষণ ও আমাদের বিবেক/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
একটি সমাজ তখনই সভ্য বলে বিবেচিত হয়, যখন সেই সমাজে নারী, শিশু ও দুর্বল মানুষ নিরাপদে বাঁচতে পারে। কিন্তু আজ আমাদের চারপাশের বাস্তবতা বড় নির্মম। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, শিশু নির্যাতন কিংবা নারীর প্রতি সহিংসতার খবর আসছে। কখনো স্কুল পড়–য়া শিশু, কখনো গৃহবধূ, কখনো প্রতিবন্ধী নারীÑকেউই যেন নিরাপদ নয়। আরও ভয়াবহ হলো, এসব ঘটনা এখন মানুষের অনুভূতিকে আগের মতো নাড়া দেয় না।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু সময়ের জন্য ক্ষোভ তৈরি হয়, কয়েকটি মানববন্ধন হয়, তারপর আবার সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। অথচ প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনা একটি রাষ্ট্র, একটি সমাজ এবং আমাদের সম্মিলিত বিবেকের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। ধর্ষণ কেবল একটি অপরাধ নয়; এটি ক্ষমতার নগ্ন প্রদর্শন, নৈতিকতার চরম পতন এবং মানবিকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। একজন ধর্ষক যখন একটি মেয়ের শরীর ও আত্মমর্যাদার ওপর আঘাত করে, তখন সে শুধু একজন মানুষকে নয়, পুরো সমাজের নিরাপত্তা বোধকে ধ্বংস করে দেয়। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলোÑআমরা ধীরে ধীরে এই ভয়াবহতা কে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে শিখছি। এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ।
আমাদের সমাজে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে মেয়েটির পোশাক নিয়ে, চলাফেরা নিয়ে, সময় নিয়ে। যেন অপরাধীর চেয়ে ভুক্তভোগীকেই বেশি জবাবদিহি করতে হয়। অথচ ধর্ষণের দায় কখনোই ভুক্তভোগীর নয়। একটি শিশু, একটি বৃদ্ধা কিংবা ঘরের ভেতরে থাকা নারীও যখন ধর্ষণের শিকার হন, তখন স্পষ্ট হয়ে যায়Ñএই অপরাধের পেছনে পোশাক নয়, কাজ করে বিকৃত মানসিকতা ও ক্ষমতার দম্ভ। কিন্তু সমাজ এখনও অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষকের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চেয়ে ভুক্ত ভোগীকেই চুপ করিয়ে দিতে বেশি আগ্রহী।
এই মানসিকতা না বদলালে আইন দিয়েও অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ধর্ষণের পেছনে সামাজিক অবক্ষয়ের বড় ভূমিকা রয়েছে। পরিবার একসময় ছিল মূল্যবোধ শিক্ষার প্রথম বিদ্যালয়। সেখানে সন্তান শিখত সম্মান, শিষ্টাচার, মানবিকতা ও সংযম। কিন্তু আজ অনেক পরিবারে সেই শিক্ষা অনুপস্থিত। বাবা-মা সন্তানের হাতে দামি স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছেন, কিন্তু সে কী দেখছে, কী শিখছে, কার সঙ্গে মিশছেÑসেসব বিষয়ে তেমন খোঁজ রাখছেন না।
প্রযুক্তি আজ আশীর্বাদ যেমন, তেমনি অপব্যবহারে ভয়াবহ অভিশাপও হতে পারে। অল্প বয়সে পর্নোগ্রাফি, অশ্লীল কনটেন্ট ও সহিংস ভিডিওর সহজলভ্যতা তরুণদের মানসিক বিকৃতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। নারীকে মানুষ নয়, ভোগের বস্তু হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। এতে সহিংসতা ও যৌন অপরাধ বাড়ছে। মাদকের বিস্তারও এই সংকটকে আরও গভীর করছে। ইয়াবা, গাঁজা, মাদকজাত ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন নেশাজাতীয় দ্রব্য তরুণদের একাংশকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। মাদক মানুষের বিবেক, নিয়ন্ত্রণবোধ ও নৈতিকতা কেড়ে নেয়।
একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি খুব সহজেই সহিংস হয়ে উঠতে পারে। ফলে ধর্ষণ, ছিনতাই, খুনসহ নানা অপরাধ বেড়ে যায়। দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া বহু ধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে মাদকাসক্তির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অথচ মাদক নিয়ন্ত্রণে এখনও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। শিক্ষাব্যবস্থার দিকেও প্রশ্ন ওঠে। আমরা সন্তানদের পরীক্ষায় ভালো ফল করতে শেখাচ্ছি, কিন্তু মানুষ হতে শেখাতে পারছি কি? নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গা দিন দিন সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেই। নারী সহপাঠী বা সহকর্মীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা বাস্তব জীবনে কতটা কার্যকর ভাবে দেওয়া হচ্ছে, সেটিও ভাবনার বিষয়। শুধু পাঠ্যবইয়ের কিছু নীতিকথা দিয়ে মানবিক সমাজ তৈরি হয় না; প্রয়োজন বাস্তবচর্চা ও সামাজিক অনুশীলন। ধর্ষণের ঘটনায় বিচারহীনতার সংস্কৃতিও ভয়াবহ ভাবে দায়ী। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রভাবশালী অপরাধীরা রাজনৈতিক বা সামাজিক ক্ষমতার জোরে পার পেয়ে যায়। মামলার তদন্ত দীর্ঘ হয়, সাক্ষী ভয় পায়, ভুক্তভোগী পরিবার হুমকির মুখে পড়ে। ফলে অনেক পরিবার ন্যায়বিচারের আশাই ছেড়ে দেয়।
এই বিচারহীনতা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে। যখন একজন ধর্ষক দেখে তার শাস্তি হচ্ছে না, তখন অন্য অপরাধীরাও সাহস পায়। আইন কঠোর হলেই হবে না; তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের সমাজে আরেকটি ভয়াবহ প্রবণতা হলো ঘটনাকে রাজনৈতিক দৃষ্টিতে দেখা। কোনো ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় সামনে এলে অনেকেই দলীয় অবস্থান রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। অথচ ধর্ষকের কোনো দল থাকতে পারে না।
একজন ধর্ষকের পরিচয় একটাইÑসে অপরাধী। সমাজ যদি দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারে, তাহলে এই সংকট কখনো কমবে না। গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা জনসচেতনতা তৈরি করতে পারে, অপরাধের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু কখনো কখনো কিছু সংবাদ মাধ্যম ধর্ষণের ঘটনাকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যা ভুক্তভোগীর মানসিক কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়।
ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা, সংবেদনশীল ভাষা ব্যবহার এবং অপরাধের সামাজিক কারণ বিশ্লেষণ করাÑএসব বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও দ্বৈত চিত্র দেখা যায়। একদিকে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রুত সোচ্চার হতে পারছে, অন্যদিকে অনেকেই ভুয়া তথ্য, গুজব ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। কখনো ভুক্তভোগীকেই অপমান করা হয়, কখনো ঘটনাকে হাস্যরসের বিষয় বানানো হয়। এটি একটি অসুস্থ মানসিকতার প্রতিফলন।
ধর্ষণ রোধে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্বÑসবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে নারীকে সম্মান করতে। ছেলেশিশুকে বলতে হবে, শক্তি মানে দখল নয়; শক্তি মানে সংযম ও দায়িত্ববোধ। মেয়ে শিশুকেও আত্মবিশ্বাস ও আত্মরক্ষার শিক্ষা দিতে হবে।
একই সঙ্গে সমাজকে বুঝতে হবে, নারীর স্বাধীন চলাফেরা কোনো অপরাধ নয়; নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে মানবিকতা, নৈতিকতা ও আত্মসংযমের শিক্ষা জোরালো ভাবে প্রচার করা দরকার। কারণ ধর্ম কখনো নারী অবমাননা শেখায় না; বরং সম্মান ও মর্যাদার শিক্ষা দেয়। কিন্তু বাস্তবে ধর্মের শিক্ষাকে আমরা কতটা ধারণ করছি, সেটাই বড় প্রশ্ন। রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নয়।
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল, নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা এবং মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষণের মামলায় দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনকে আরও সংবেদনশীল ও মানবিক হতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে থানায় অভিযোগ করতে গিয়েও ভুক্তভোগীরা হয়রানির শিকার হন। এই পরিস্থিতি বদলাতে হবে। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑআমরা সন্তানদের সামনে কেমন সমাজ উপস্থাপন করছি। শিশুরা যা দেখে, তাই শেখে। পরিবারে যদি নারীকে অসম্মান করা হয়, সামাজিক পরিসরে যদি নারীর প্রতি কটূক্তি স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও সেই সংস্কৃতি ধারণ করবে। তাই পরিবর্তন শুরু করতে হবে নিজেদের ঘর থেকেই।
আজকের বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন খুব গুরুত্বপূর্ণÑআমরা কি সত্যিই মানবিক মানুষ তৈরি করতে পারছি? আমরা হয়তো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কর্মকর্তা তৈরি করছি; কিন্তু ভালো মানুষ তৈরি করছি কতটা? একটি সমাজ তখনই নিরাপদ হয়, যখন সেখানে আইনের পাশাপাশি বিবেকও জাগ্রত থাকে। কিন্তু আজ সেই বিবেক যেন ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। ধর্ষণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি সমাজের গভীর অসুস্থতার লক্ষণ। তাই এর সমাধানও কেবল আইনি ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
প্রয়োজন সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, নৈতিক জাগরণ এবং মানবিক শিক্ষা। আমাদের বুঝতে হবেÑএকজন ধর্ষক জন্ম গত ভাবে অপরাধী নয়; সমাজের নানা বিকৃতি তাকে সেই পথে ঠেলে দেয়। তাই অপরাধ ঘটার পর শুধু শাস্তি দিলেই হবে না, অপরাধের সামাজিক কারণ গুলোও দূর করতে হবে। সবশেষে মনে রাখতে হবে, একটি ধর্ষণের ঘটনা কেবল একজন নারীর ক্ষতি নয়; এটি পুরো সমাজের পরাজয়। যখন একটি মেয়ে ভয়ে সন্ধ্যার পর বাইরে বের হতে পারে না, যখন একজন মা সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকেন, তখন সেই সমাজকে নিরাপদ বলা যায় না।
তাই সময় এসেছে নীরবতা ভাঙার। শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ নয়, বাস্তব প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পরিবারকে সচেতন হতে হবে, রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে, সমাজকে মানবিক হতে হবে। কারণ ধর্ষক শুধু একজন অপরাধী নয়; সে আমাদের বিবেকের আয়নায় জমে থাকা অন্ধকারের প্রতিচ্ছবি। সেই অন্ধকার দূর করতে হলে আলো জ্বালাতে হবে আমাদের নিজেদের মধ্যেই।
লেখক: সংবাদকর্মী









