শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

লিচুর সঙ্গে ভুলেও খাবেন না যে ধরনের ওষুধ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ১:২৫ পূর্বাহ্ণ
লিচুর সঙ্গে ভুলেও খাবেন না যে ধরনের ওষুধ

 

লিচু একটি সুস্বাদু ও জনপ্রিয় ফল হলেও কিছু নির্দিষ্ট ধরনের ওষুধের সঙ্গে এটি খাওয়া স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লিচুর সঙ্গে কিছু খাবার ও ওষুধ একসঙ্গে গ্রহণ করলে পুষ্টি শোষণে সমস্যা, হজমের গোলমাল বা ওষুধের কার্যকারিতায় প্রভাব পড়তে পারে। তাই লিচু খাওয়ার আগে এর কিছু সংযম মেনে চলা জরুরি।

সাধারণভাবে লিচু খাওয়ার দুই ঘণ্টা আগে এবং পরে কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ এড়িয়ে চলা ভালো বলে জানাচ্ছে বিভিন্ন গবেষণা।

যেসব ওষুধের সঙ্গে লিচু খাওয়া উচিত নয়
কিছু ওষুধের সঙ্গে লিচু খেলে ওষুধের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে বা শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

প্যারাসিটামল ট্যাবলেট: এই ওষুধ জ্বর ও ব্যথা কমাতে ব্যবহৃত হয়। লিচুর উচ্চ চিনি উপাদান ওষুধের শোষণ ও বিপাক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে, ফলে কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।

মেটফরমিন (সাস্টেইন্ড রিলিজ ট্যাবলেট): এটি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত একটি সাধারণ ওষুধ। লিচুতে প্রাকৃতিক চিনি বেশি থাকায় রক্তে শর্করা বাড়তে পারে। ফলে ওষুধের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে এবং রক্তে শর্করার ওঠানামা দেখা দিতে পারে।

ডমপেরিডোন ট্যাবলেট: এটি হজম ও পাকস্থলীর কার্যকারিতা বাড়াতে ব্যবহৃত হয়। লিচুর মিষ্টতা ওষুধের তিক্ত স্বাদ কমিয়ে দিতে পারে, যার ফলে এর স্বাভাবিক প্রভাব কমে যেতে পারে।

ভিটামিন কে১ ইনজেকশন: এটি রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যায় ব্যবহৃত হয়। লিচুর ভিটামিন সি কিছু ক্ষেত্রে রক্ত পাতলা করার প্রভাব ফেলতে পারে, যা ওষুধের কার্যকারিতার সঙ্গে বিরোধ তৈরি করতে পারে।

অ্যাসপিরিন ট্যাবলেট: এই ওষুধ ব্যথা, জ্বর এবং রক্ত জমাট বাঁধা রোধে ব্যবহৃত হয়। লিচুর অ্যাসিড পাকস্থলীর অম্লতা বাড়াতে পারে, যার ফলে ওষুধ দ্রুত শোষিত হয়ে পেটের অস্বস্তি বা রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
লিচু খাওয়ার ক্ষেত্রে ওষুধের এই পারস্পরিক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে যারা নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করেন, তাদের জন্য লিচু খাওয়ার আগে সময় ও পরিমাণ সম্পর্কে সতর্ক হওয়া জরুরি।

যদি নির্দিষ্ট ওষুধ চলাকালীন লিচু খেতেই হয়, তবে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এতে খাদ্য ও ওষুধের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হয় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে।

অবশ্যই যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন।

লিচু পুষ্টিকর এবং উপকারী ফল হলেও কিছু খাবার ও ওষুধের সঙ্গে এটি একসঙ্গে গ্রহণ করা উচিত নয়। সঠিক নিয়ম মেনে খেলে লিচুর উপকারিতা পাওয়া যায়, আর অপ্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়িয়ে চলা সম্ভব হয়।

সূত্র: কাইনিয়াও হেল্থ

Ads small one

শারদীয় দুর্গোৎসব: মহাসপ্তমীতে সাতক্ষীরার মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তদের আরাধনা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ
শারদীয় দুর্গোৎসব: মহাসপ্তমীতে সাতক্ষীরার মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তদের আরাধনা

নিজস্ব প্রতিনিধি: ঢাকে কাঠি পড়ার পর মায়ের নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপনের মধ্য দিয়ে আজ শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল পূজার আনুষ্ঠানিকতা। শুভ মহাসপ্তমীর ভোর থেকেই সাতক্ষীরার ৬১২টি পূজা মণ্ডপে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের আগমন ঘটতে থাকে। ষষ্ঠীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের পর থেকেই ঢাকের বাদ্য, উলুধ্বনি আর শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত রূপসী মণ্ডপগুলোতে মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখ পড়ার মতো। বিশেষ করে বুড়িয়ার আকর্ষণীয় প্রতিমা দর্শনে ভক্তদের মধ্যে প্রবল আগ্রহ দেখা গেছে।

 

সাতক্ষীরার কাটিয়া সরকারপাড়া শ্রী শ্রী সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরে মহাসপ্তমীর প্রাতে ভক্তদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। মন্দির প্রাঙ্গণে উপস্থিত মাধব দত্ত মহাসপ্তমীর বিশেষ মাহাত্ম্য তুলে ধরে বলেন, “আজকের এই তিথি ভক্তদের মাঝে এক নতুন ভক্তি ও চেতনার সঞ্চার করে।” মণ্ডপটির পূজার আনুষ্ঠানিকতা পরিচালনাকারী পুরোহিত হরিদাস ব্যানার্জি সবাইকে শান্তিতে ও শৃঙ্খলায় বসবাসের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের ধৈর্য ও সহনশীলতার পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

 

মণ্ডপে আগত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাগরিকা সাহা নারীর নিরাপত্তা, জানমালের সুরক্ষা ও বিশ্বশান্তি কামনা করেন। একই সাথে সার্বিক নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়ে স্থানীয় দর্শনার্থী উৎপল সাহা বলেন, “পূজার শুরু থেকে যে সুন্দর শৃঙ্খলা গড়ে উঠেছে, তা যেন শেষ পর্যন্ত অটুট থাকে।”

 

শিক্ষিকা মানসী মজুমদার বিরাজমান অস্থিরতা দূর হওয়ার আকুতি জানিয়ে বলেন, “সর্বত্র যে অস্থিরতা চলছে, তা দূর হয়ে মানুষের মধ্যে স্থিরতা আসুক। প্রভুর প্রতি ভক্তের ভালোবাসার পাশাপাশি ভক্তদের জন্য জ্ঞানচর্চার সুযোগ তৈরি হোক।” অন্যদিকে, শিক্ষক উত্তম মণ্ডল শিক্ষা ও জ্ঞান বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, “জীবন আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। শান্তির সমাজ বিনির্মাণে সকলকে একত্রিত হয়ে মায়ের আশীর্বাদ ও করুণা প্রার্থনা করতে হবে।”

 

পূজা উপলক্ষে বিভিন্ন মণ্ডপে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি নানা লোকজ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, যা উৎসবের আবহকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলেছে।

অর্থনীতির তৃতীয় শক্তি হতে পারে পর্যটন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ
অর্থনীতির তৃতীয় শক্তি হতে পারে পর্যটন

মো: মামুন হাসান

একটি অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নির্ভর করে তার আয়ের উৎসের বৈচিত্র্যের ওপর। বাংলাদেশের বহির্খাত দীর্ঘদিন দুটি স্তম্ভে দাঁড়িয়ে আছে, তৈরি পোশাক রপ্তানি আর প্রবাসী আয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অস্থিরতা এখন দুটিকেই একসঙ্গে চাপে ফেলেছে। জ্বালানি ও জাহাজভাড়া বেড়েছে, পশ্চিমা ক্রেতারা ক্রয়াদেশ ধরে রাখছেন, আর শ্রমিকদের বিদেশযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এই সংকটে একটি প্রশ্ন গুরুত্ব পাচ্ছে: যে খাত আমাদের নদী, সমুদ্র, বন আর আতিথেয়তাকে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর করতে পারে, সেই পর্যটন কি হতে পারে পরবর্তী অর্থনৈতিক শক্তি?

 

বিশ্ব অর্থনীতির হিসাব এ প্রশ্নের পক্ষে জোরালো যুক্তি দেয়। ডব্লিউটিটিসির তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে ভ্রমণ ও পর্যটন খাত বিশ্ব অর্থনীতিতে রেকর্ড ১১.৬ ট্রিলিয়ন ডলার যোগ করেছে, যা বৈশ্বিক জিডিপির ৯.৮ শতাংশ। খাতটির প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.১ শতাংশ, যেখানে বিশ্ব অর্থনীতি বেড়েছে ২.৮ শতাংশ হারে। এই খাত বিশ্বজুড়ে ৩৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জুগিয়েছে এবং নতুন সৃষ্ট প্রতি তিনটি চাকরির একটি এসেছে এখান থেকে। ইউএন ট্যুরিজমের হিসাবে ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটক ছিলেন প্রায় ১৫২ কোটি, পর্যটকদের খরচ ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পরিবহন যোগ করলে পর্যটনের মোট রপ্তানি আয় ২.২ ট্রিলিয়ন ডলার। দৃষ্টান্ত হিসেবে স্পেনে পর্যটন জাতীয় জিডিপির ১৫.৩ শতাংশ, আর সেখানে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ব্যয় ১৩০ বিলিয়ন ডলার। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে খাতটির প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.১ শতাংশ, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ বিশ্ববাজার শুধু বড় নয়, আমাদের অঞ্চলেই সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে।

 

এই বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো বিনয়ী। সরকারি ভাষ্যে জিডিপিতে পর্যটনের অবদান প্রায় ৩ শতাংশ, যা ৬ থেকে ৭ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য ঘোষিত হয়েছে। ডব্লিউটিটিসির হিসাবে ২০২৩ সালে খাতটির অর্থনৈতিক অবদান ছিল প্রায় ৯.৫ বিলিয়ন ডলার এবং কর্মসংস্থান ছিল প্রায় ২১ লাখ ৪০ হাজার, যা মোট কর্মসংস্থানের ৩ শতাংশ। অবদান জিডিপির ৬ শতাংশে পৌঁছালে, বর্তমান ভিত্তি ধরে মোটা দাগে বছরে আরও ৯ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম তৈরি হয়। এটি একটি সরল প্রক্ষেপণ মাত্র, পূর্বাভাস নয়। তবে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দিকটি আরও লক্ষণীয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্যে ২০১৯ সালে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পর্যটন আয় ছিল মাত্র ৩৯১ মিলিয়ন ডলার, আর ২০২০ সালে তা নেমে আসে ২১৮ মিলিয়নে। এর বিপরীতে ২০২৫ সালে প্রবাসী আয় এসেছে রেকর্ড ৩২.৮ বিলিয়ন ডলার। পর্যটনের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক আয় এখনো প্রবাসী আয়ের ২ শতাংশেরও কম। এই ব্যবধানই সম্ভাবনার পরিমাপ। একটি সহজ হিসাব ধরা যাক: বছরে যদি আরও ১০ লাখ বিদেশি পর্যটক এসে গড়ে হাজার ডলার করে খরচ করেন, তবে অতিরিক্ত ১ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আসে, যা ২০১৯ সালের মোট পর্যটন আয়ের আড়াই গুণেরও বেশি।

 

পর্যটনকে “অদৃশ্য রপ্তানি” বলা হয়, কারণ এখানে ভোক্তা পণ্যের কাছে যান না, পণ্যই ভোক্তার কাছে আসে। এতে বন্দরজট, জাহাজভাড়া বা সামুদ্রিক পথের ঝুঁকি নেই। বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপটে এই বৈশিষ্ট্য মূল্যবান। দেশের রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি এখনো তৈরি পোশাকনির্ভর, আর সেই খাতই এখন চাপে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে পোশাক রপ্তানি কমেছে ৫.৫১ শতাংশ, মার্চে মোট রপ্তানি আয় আগের বছরের মার্চের চেয়ে কমেছে ১৮.০৭ শতাংশ। বিজিএমইএর হিসাবে জুলাই থেকে মে পর্যন্ত পোশাক রপ্তানি ৩৫.৩১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৩.৪১ শতাংশ কম। পোশাক শিল্পের মুনাফার হারও ৪ শতাংশের নিচে, ফলে খরচ বাড়লে তা শোষণের সক্ষমতা সীমিত। প্রবাসী আয়েও ঝুঁকি আছে। ২০২৪- ২৫ অর্থবছরে মোট প্রবাসী আয়ের ৪৫.৪ শতাংশ, অর্থাৎ ১৩.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এডিবি সতর্ক করেছে, সংঘাতে অঞ্চলটির শ্রমবাজার দুর্বল হলে এই আয় চাপে পড়তে পারে। তুলনায় পর্যটনে আমদানিনির্ভর কাঁচামালের প্রয়োজন কম, ফলে আয়ের বড় অংশ দেশের ভেতরেই থাকে। হোটেলের খাবার, পরিবহন, হস্তশিল্প, নৌযান, গাইড ও স্থানীয় বাজারে এই অর্থ ঘুরে গুণক প্রভাব তৈরি করে। এভাবে এক ডলারের বৈদেশিক ব্যয় অর্থনীতিতে একাধিকবার হাত বদলায় এবং কারখানাহীন উপকূল, হাওর ও পাহাড়ি জনপদে আয় ও কর্মসংস্থান ছড়িয়ে দেয়।

 

তবে বিপুল সম্ভাবনাকে আয়ে রূপ দিতে হলে কয়েকটি কাঠামোগত বাধা সরাতে হবে। পর্যটনের প্রথম শর্ত আস্থা, আর বিদেশি পর্যটকের কাছে নিরাপত্তার অর্থ শুধু অপরাধ না থাকা নয়। হয়রানি, প্রতারণা, অস্বচ্ছ ভাড়া, ভাষাগত বাধা ও জরুরি সহায়তার নিশ্চয়তাও এর অংশ। এর সঙ্গে আছে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি, জটিল ভিসা প্রক্রিয়া, উচ্চ বিমানভাড়া ও কর, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের অভাব। সবচেয়ে অবহেলিত সমস্যা দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি। ভালো হোটেল গড়া সহজ, ভালো আতিথেয়তা গড়া কঠিন। শিক্ষক হিসেবে দেখি, শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগসূত্র এখনো দুর্বল।

 

এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন প্রচলিত পথের বাইরের ভাবনা। প্রথমত, নিরাপত্তাকে প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে একটি ডিজিটাল ট্যুরিস্ট পাস চালু করা যায়। এক কিউআর কোডে নিবন্ধন, সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা, বহুভাষিক সহায়তা এবং জরুরি নাম্বারের মাধ্যমে ট্যুরিস্ট পুলিশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ থাকবে। এতে পর্যটকের ঝুঁকিবোধ কমবে, আর সরকার পাবে রিয়েল টাইম পর্যটন তথ্য, যা পর্যটন স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট তৈরির ভিত্তি হবে। দ্বিতীয়ত, বিপণনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাজে লাগানো যায়। বিদেশে থাকা পরিবারগুলো ইতিমধ্যে দেশের সঙ্গে আবেগে যুক্ত, তাই তাঁদের জন্য “দেশে ছুটি” প্যাকেজ এবং বিদেশি বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে আসার প্রণোদনা কম খরচে বড় বাজার তৈরি করতে পারে। প্রবাসী আয়ের একটি অংশ পর্যটন অবকাঠামোয় টানতে একটি ডায়াসপোরা ট্যুরিজম বন্ডও ভাবা যায়। তৃতীয়ত, ঋতুভিত্তিক চাহিদার ঢেউ সামলাতে গতিশীল মূল্যনির্ধারণ ও অফ সিজন প্রণোদনা দরকার। কক্সবাজারে বর্ষায় ও হাওরে শুষ্ক মৌসুমে আবাসন ফাঁকা থাকে। সম্মেলন পর্যটন ও ইভেন্ট আয়োজনে সারা বছরের আয়ের ধারা তৈরি করা যায়, যা বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশিত প্রতিদান বাড়ায়।

 

চতুর্থত, পর্যটককে ভোক্তা থেকে স্থানীয় শিল্পের ক্রেতায় রূপান্তর করা জরুরি। জামদানি, নকশিকাঁথা, শীতলপাটি, চা ও মৎস্যজাত পণ্যকে বাংলাদেশ ব্র্যান্ডের অধীনে আনলে পর্যটকের ব্যয়ের বড় অংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনে যাবে। বিদেশি পর্যটকদের কেনাকাটায় আগমনকালীন কর ফেরত চালু করলে হস্তশিল্পের বিক্রি বাড়বে। হোটেল ও রিসোর্টে স্থানীয় কৃষিপণ্য কেনা বাধ্যতামূলক বা প্রণোদনার আওতায় আনলে কৃষির সঙ্গে পর্যটনের পশ্চাৎ সংযোগ শক্ত হবে। পঞ্চমত, সুন্দরবন, হাওর ও পাহাড়ের মতো পরিবেশগতভাবে মূল্যবান এলাকায় কমিউনিটি মালিকানাধীন হোমস্টে ও ইকো লজ গড়া যায়, যেখানে আয়ের একটি অংশ স্থানীয় সমবায়ের হাতে যাবে। পরিবেশ সংরক্ষণে একটি সবুজ উপকর বসিয়ে তার পুরো অর্থ ওই এলাকার সংরক্ষণেই ব্যয় করলে পরিবেশ ও অর্থনীতির মধ্যে টেকসই ভারসাম্য থাকবে। ম্যানগ্রোভ ও বনভিত্তিক কার্বন ক্রেডিটের আয় এই তহবিলের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব।

 

ষষ্ঠত, আকাশপথ ও ভিসা নীতি বিনিয়োগের নিয়ামক। নির্বাচিত বাজারের জন্য অনলাইন ও আগমনকালীন ভিসা, মৌসুমি চার্টার ফ্লাইটে প্রণোদনা এবং বিমান জ্বালানির ওপর করের যৌক্তিকীকরণ আনলে আসনপ্রতি খরচ কমবে। ডিজিটাল নোম্যাড ভিসার মতো দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের সুযোগ দিলে অবস্থানকালভিত্তিক মাথাপিছু আয় বাড়বে, কারণ পর্যটন অর্থনীতিতে পর্যটকের সংখ্যার চেয়ে মাথাপিছু ব্যয় ও থাকার মেয়াদ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তমত, বিনিয়োগে সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্ব ও আমদানি শুল্ক সুবিধার মাধ্যমে ঝুঁকি ভাগাভাগি করা যায়। সবশেষে মানবসম্পদে বিনিয়োগ, অর্থাৎ পলিটেকনিক ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে আতিথেয়তা শিক্ষা সম্প্রসারণ, হোটেল ও ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে সরাসরি শিক্ষানবিশি চুক্তি এবং ভাষাশিক্ষার ওপর জোর। মানসম্মত সেবা দিতে পারলে একই গন্তব্য থেকে বেশি মূল্য আদায় করা যায়, যা সরাসরি লাভজনকতা বাড়ায়।

 

সরকার জাতীয় পর্যটন পরিষদ গঠন করেছে, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মহাপরিকল্পনার কাজ চলছে। কাঠামো তৈরি হয়েছে, এখন চাই ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। পর্যটন রাতারাতি পোশাক খাতের বিকল্প হবে না, হওয়ার প্রয়োজনও নেই। কিন্তু আজকের অনিশ্চিত বিশ্বে অর্থনীতির শক্তি নিহিত তার বৈচিত্র্যে। যে দেশ শুধু কারখানা আর প্রবাসী শ্রমের ওপর নির্ভর করে, সে প্রতিটি আন্তর্জাতিক সংকটে কাঁপে। সুপরিকল্পিত পর্যটন নীতি, নিরাপদ পরিবেশ ও স্থানীয় মূল্য সংযোজনের সমন্বয়ে পর্যটন হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য অদৃশ্য রপ্তানি খাত।

 

লেখক: মো: মামুন হাসান, বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ।

অন্ধ উন্মাদনা : গণপিটুনির আড়ালে আমরা কোথায় যাচ্ছি?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ
অন্ধ উন্মাদনা : গণপিটুনির আড়ালে আমরা কোথায় যাচ্ছি?

‎তারিক ইসলাম

‎

‎সম্প্রতি সাতক্ষীরায় পর পর দুটি নৃশংস ঘটনা দেশের সচেতন বিবেককে স্তব্ধ করে দিয়েছে।সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে বাড়ি ঘেরাউ করে গণপিটুনিদিয়ে ১ম দফায় আহত করারপর হাসপাতাল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে এক যুবককে দুই দফায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিহতের পরিবার ও স্থানীয় ও জাতীয় প্র‍ত্র‍িকার খবর—তিনি কিছুটা মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন।

 

অপরদিকে, সাতক্ষীরার তালায় মাছ চুরির সন্দেহে এক ঘের ব্যবসায়ীকে গাছে বেঁধে, নির্দয়ভাবে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। দুটি ঘটনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও অন্তর্দাহ ও পরিণতি একই—আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং মানুষ হিসেবে মৌলিক মানবিক অনুভূতির চরম অবক্ষয়।

‎

‎এই নৃশংসতা কেবল দুটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্ব, অনুভূতির অন্ধ চরমপন্থা এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার চরম দুর্বলতার একটি করুণ প্রতিফলন।

‎

‎১. সামাজিক মনস্তত্ত্ব : গুজবের জয় ও মানবিক অবক্ষয়

‎

‎বর্তমানে আমাদের সমাজে যেকোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই ‘জনতা’ হিংস্র হয়ে ওঠার এক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিও, ভিডিও বা গুজব মুহূর্তেই গণ-উন্মাদনায় রূপ নিচ্ছে। যুক্তি, সহমর্মিতা ও আইনি বিচারকে পাশ কাটিয়ে একশ্রেণির মানুষ নিজেদের বিচারক ও জল্লাদ হিসেবে ঘোষণা করছে। ক্ষোভ উসকে দিয়ে দলবদ্ধ হিংসার সুযোগ নেওয়া—যাকে আমরা ‘মব কালচার’ বলছি—তা সমাজকে এক অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যের প্রাণ কেড়ে নিয়ে বিচারিক তৃপ্তি খোঁজার এই মনস্তত্ত্ব একটি অসুস্থ সমাজব্যবস্থার লক্ষণ।

‎

‎২. ধর্মীয় চেতনা: বিশ্বাসের অবক্ষয় নাকি অপব্যবহার?

‎

‎ধর্ম প্রতিটি মানুষকে ক্ষমা, সহনশীলতা, শান্তি ও ন্যায়ের শিক্ষা দেয়। যেকোনো ধর্মে অন্যায় বা অপপ্রচারের বিচারের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে প্রতিষ্ঠিত আইনি ও বিচার কাঠামোর ওপর। কিন্তু যখন ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বা হাসপাতালের ভেতরে ঢুকেও মুমূর্ষু মানুষকে পিটিয়ে মারা হয়, তখন কি সত্যিই ধর্মের মর্যাদা রক্ষা পায়? উগ্রতার আড়ালে হিংসা চরিতার্থ করা ধর্মীয় অনুভূতির মূল চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কোনো গুজবের ভিত্তিতে একজন মানুষকে বিচার ছাড়া হত্যা করা কোনো সুস্থ বিশ্বাস বা ধর্মের নির্দেশ হতে পারে না।

‎

‎৩. আইনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা

‎

‎আইনশৃঙ্খলার অবস্থা এই ঘটনাগুলোতে অত্যন্ত করুণভাবে উন্মোচিত হয়েছে। পুলিশ প্রথম দফায় দেবহাটায় যুবকটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করলেও তাণ্ডবকারীরা হাসপাতাল থেকে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় এবং হত্যা করে। হাসপাতালের মতো একটি স্পর্শকাতর ও নিরাপদ স্থানে গিয়ে তাণ্ডব চালানোর সাহস গণ-উত্তেজিত জনতা কীভাবে পায়, সেই প্রশ্ন আজ এড়ানো অসম্ভব। আইনের প্রতি ভয় ও শ্রদ্ধা কমে যাওয়ার ফলেই বারবার এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে চলেছে। কোনো দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হলে ও অপরাধীরা পার পেয়ে গেলে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বলতে আর কিছু থাকে না।

‎

‎উত্তরণের পথ কি?

‎

‎এই পরিস্থিতির থেকে রেহাই পেতে হলে আমাদের তিনটি প্রধান বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে:

‎

‎আইনের কঠোর প্রয়োগ: দেবহাটা ও তালার প্রতিটি অপরাধীকে দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কেবল ‘উদ্ধারকারী’ নয়, বরং প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রস্তুত ও সক্ষম হতে হবে।

‎

‎গুজব প্রতিরোধ ও সোশ্যাল মিডিয়া সচেতনতা: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো তথ্য না যাচাই করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যে মারাত্মক অপরাধ হতে পারে, সে ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।

‎

‎সামাজিক ও সামাজিক-ধর্মীয় সচেতনতা: আলেম-ওলামা, শিক্ষক, এবং সমাজনেতাদের এগিয়ে এসে এটি স্পষ্ট করতে হবে যে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ধর্ম ও সমাজ—উভয়ের দৃষ্টিতেই মারাত্মক অপরাধ।

‎

‎একটি সভ্য সমাজে অপরাধীর বিচার করার একমাত্র অধিকার দেশের আদালতের। যদি চুরির সন্দেহ বা কোনো মন্তব্যের জেরে মানুষ নিজেই আইন ও বিচারব্যবস্থার স্থান দখল করে নেয়, তবে রাষ্ট্রের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে। সাতক্ষীরার এই দুটি রক্তক্ষরণী ঘটনা আমাদের জন্য শেষ সতর্কবার্তা। এখনো যদি আমরা সচেতন না হই এবং আইনি শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা না করি, তবে এই অন্ধ উন্মাদনার আগুন কাল আমাদের প্রত্যেকের দরজায় এসে পৌঁছাবে।

‎

‎লেখক : তারিক ইসলাম

‎সভাপতি,সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।

‎