পরিবেশ পর্যটন যেভাবে বদলে দিতে পারে বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেল
মো. মামুন হাসান
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমরা সাধারণত গাছ লাগানো, প্লাস্টিক দূষণ বা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কথা বলি। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন খুব কমই আলোচিত হয়। বাংলাদেশে কি এমন কোনো অর্থনৈতিক খাত আছে, যেখানে একটি বন, একটি নদী, একটি জলাভূমি বা একটি বন্যপ্রাণী জীবিত থাকলে অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি হয়; আর ধ্বংস হয়ে গেলে জাতীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিয়ে যায় পরিবেশ পর্যটনের কাছে।
বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে শিল্প বিপ্লব কয়লা ও ইস্পাতকে সম্পদে পরিণত করেছিল। তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব তথ্যকে সম্পদে রূপান্তর করেছে। একবিংশ শতাব্দীর সবুজ অর্থনীতি প্রকৃতিকেই সম্পদে রূপান্তর করছে। বর্তমানে বৈশ্বিক পর্যটন খাত বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ এবং ৩৫৭ মিলিয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। অর্থাৎ বিশ্বের প্রতি ১০টি চাকরির একটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পর্যটনের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু এই সাফল্যের বিপরীতে একটি অস্বস্তিকর সত্যও রয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে বৈশ্বিক পর্যটন খাত একাই বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৮ থেকে ৯ শতাংশের জন্য দায়ী। পরিবহন, বিশেষ করে বিমান ভ্রমণ, এই নির্গমনের সবচেয়ে বড় উৎস। অর্থাৎ পর্যটন একই সঙ্গে অর্থনীতির বন্ধু এবং পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টিকারী শক্তি।এই দ্বৈত বাস্তবতা থেকেই জন্ম নিয়েছে নতুন ধারণা। পরিবেশ পর্যটন।কিন্তু বাংলাদেশে আমরা এখনও পরিবেশ পর্যটনকে মূলত বনভ্রমণ বা প্রকৃতি ভ্রমণ হিসেবে দেখি। উন্নত দেশগুলো এখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তারা প্রকৃতি অনুকূল পর্যটন ধারণা নিয়ে কাজ করছে। অর্থাৎ একজন পর্যটক চলে যাওয়ার পর প্রকৃতির অবস্থা আগের চেয়ে ভালো হতে হবে।
কোস্টারিকা আজ বিশ্বের সবচেয়ে সফল পরিবেশ পর্যটন অর্থনীতির একটি উদাহরণ। দেশটি তার বন উজাড়ের হার নাটকীয়ভাবে কমিয়ে বনভূমিকে পর্যটন সম্পদে পরিণত করেছে। বর্তমানে সংরক্ষিত বনাঞ্চল, জীববৈচিত্র্য এবং কার্বন সংরক্ষণই দেশটির পর্যটন ব্র্যান্ডের ভিত্তি। রুয়ান্ডা আরও একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। পাহাড়ি গরিলা সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পর্যটন থেকে অর্জিত আয়ের একটি অংশ স্থানীয় জনগণের কাছে সরাসরি পৌঁছে দেওয়া হয়। ফলে স্থানীয় জনগণ বন্যপ্রাণী রক্ষার অংশীদারে পরিণত হয়েছে। নিউজিল্যান্ড তাদের পর্যটন নীতিতে একটি প্রতিশ্রুতি চালু করেছে, যেখানে পর্যটককে শুধু অতিথি নয়, পরিবেশের অভিভাবক হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে। আমরা এখনও পর্যটন উন্নয়ন বলতে নতুন হোটেল, নতুন সড়ক বা নতুন অবকাঠামোকে বুঝি। অথচ ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা অবকাঠামোর নয়; পরিবেশগত সক্ষমতার। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, টাঙ্গুয়ার হাওর, রাতারগুল, হাকালুকি, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং অসংখ্য নদীনির্ভর বাস্তুতন্ত্র বাংলাদেশের হাতে এমন সম্পদ তুলে দিয়েছে যা অনেক দেশের কাছেই নেই। তবুও আমরা পরিবেশ পর্যটনে দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃত্ব দিতে পারিনি। কারণ আমাদের পরিকল্পনার কেন্দ্রে এখনও প্রকৃতি নয়, নির্মাণ। আমি মনে করি বাংলাদেশের জন্য এখন একটি সবুজ পর্যটন মহাপরিকল্পনা ২০৫০ প্রয়োজন। এই পরিকল্পনার পাঁচটি কৌশলগত স্তম্ভ হতে পারে।
প্রথমত, প্রতিটি পরিবেশ সংবেদনশীল পর্যটন এলাকার জন্য বৈজ্ঞানিক ধারণ ক্ষমতা নির্ধারণ করতে হবে। একটি বন, একটি দ্বীপ বা একটি হাওর দিনে কতজন পর্যটক গ্রহণ করতে পারবে তা গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পর্যটন সংরক্ষণ তহবিল গঠন করতে হবে। পর্যটন আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ বাধ্যতামূলকভাবে বন সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করতে হবে।
তৃতীয়ত, কমিউনিটি মালিকানা মডেল চালু করতে হবে। স্থানীয় জনগণকে হোমস্টে, গাইডিং, পরিবেশ শিক্ষা, নৌভ্রমণ এবং সাংস্কৃতিক পর্যটনের সরাসরি অংশীদার করতে হবে।
চতুর্থত, বাংলাদেশের জন্য কার্বন নিরপেক্ষ পর্যটন অঞ্চল কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। সৌরশক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং প্লাস্টিকমুক্ত পর্যটন অঞ্চল গড়ে তুলতে হবে।
পঞ্চমত, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরিবেশ পর্যটন গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা উচিত, যেখানে পর্যটন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্য নিয়ে নিয়মিত গবেষণা হবে।
সুন্দরবন নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে এই বনভিত্তিক পর্যটনের অর্থনৈতিক মূল্য বছরে প্রায় ৫৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ হতে পারে। অর্থাৎ একটি জীবিত বন কেবল পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক সম্পদও। এখানেই ভবিষ্যতের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। অতীতে অর্থনীতি বন কেটেছে। বর্তমান অর্থনীতি বন রক্ষা করছে। আর ভবিষ্যতের অর্থনীতি বনকে বিনিয়োগে পরিণত করবে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তাই বাংলাদেশের সামনে প্রকৃত প্রশ্ন হলো আমরা কি প্রকৃতিকে উন্নয়নের বাধা হিসেবে দেখব, নাকি উন্নয়নের মূলধন হিসেবে দেখব? যদি দ্বিতীয় পথটি বেছে নিতে পারি, তাহলে পরিবেশ পর্যটন শুধু একটি শিল্প নয়; এটি হতে পারে বাংলাদেশের সবুজ অর্থনীতি, জলবায়ু অভিযোজন এবং গ্রামীণ পুনর্জাগরণের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।
মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।










