গণতন্ত্রের শক্তি জনগণের কণ্ঠে : ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস
সাকিবুর রহমান বাবলা
গণতন্ত্র শুধু ভোট দেওয়ার নাম নয়; এটি মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা, মর্যাদা, সমতা, মতপ্রকাশ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণের অধিকার। যেখানে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা, আইনের শাসন ও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত থাকে, সেখানেই গণতন্ত্র অর্থবহ হয়। তাই গণতন্ত্র কোনো এক দিনের বিষয় নয়; এটি প্রতিদিন চর্চা ও শক্তিশালী করার একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রতি বছর ১৫ সেপ্টেম্বর পালিত হয় আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস। গণতন্ত্রের নীতি ও মূল্যবোধ তুলে ধরা এবং বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের অবস্থা পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি করতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০০৭ সালে এ/আরইএস/৬২/৭ প্রস্তাবের মাধ্যমে দিনটি ঘোষণা করে।
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে আলোচনাভিত্তিক গণতন্ত্র ও নাগরিক অংশগ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেসের ভাষায়-বিভেদ ও সংঘাতের বদলে সংলাপ ও সহযোগিতাই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার মূল ভিত্তি। যদিও জাতিসংঘ সনদে সরাসরি ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি নেই, তবু মানবাধিকার, উন্নয়ন এবং শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে এর সম্পর্ক গভীর। ফলে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের কার্যকর কণ্ঠস্বর এবং বিশ্বজুড়ে ‘নাগরিক পরিষদ’-এর সফল অভিজ্ঞতা যুক্ত করাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে জাতিসংঘ প্রতি বছর প্রায় ৬০টি দেশকে অবাধ নির্বাচন পরিচালনা, নির্বাচনী আইন সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে সহায়তা প্রদান করে। পাশাপাশি সংকট-পরবর্তী সংবিধান প্রণয়ন ও সুশাসন পুনর্গঠনে ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘জাতিসংঘ গণতন্ত্র তহবিল’ নাগরিক সংগঠনগুলোর গণতান্ত্রিক উদ্যোগে অর্থায়ন করছে এবং ‘জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি’ বিশ্বের ১৭০টিরও বেশি দেশে আইনের শাসন, জবাবদিহি ও নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে।
গণতন্ত্রের ইতিহাসের শিকড় প্রাচীন গ্রিসে। এথেন্সের রাজনীতিবিদ ও আইনপ্রণেতা ক্লেইস্থিনিসকে প্রাচীন বা প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের অন্যতম জনক বলা হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৫০৮-৫০৭ অব্দে তাঁর সংস্কারের মাধ্যমে এথেন্সে জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নতুন ভিত্তি তৈরি হয়। তিনি বংশ ও গোত্রভিত্তিক পুরোনো ক্ষমতার কাঠামো দুর্বল করে এথেন্সকে ১০টি ভৌগোলিক উপজাতিতে ভাগ করেন। পাঁচশ সদস্যের পরিষদ (বুলে)-এর মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। কোনো নেতা অতিরিক্ত শক্তিশালী হয়ে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারেন, সে জন্য নির্বাসন প্রথা চালু করা হয়। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে যুক্ত ‘আইসোনোমিয়া’ ধারণায় আইনের চোখে সমতার গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়।
আধুনিক প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের দার্শনিক ভিত্তি নির্মাণে জন লক-এর অবদানও অসামান্য। তাঁর সামাজিক চুক্তি মতবাদে মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির প্রাকৃতিক অধিকার, জনগণের সম্মতি এবং সীমিত ও জবাবদিহিমূলক সরকারের ধারণা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থাৎ, ক্লেইস্থিনিস জনগণের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথকে শক্তিশালী করেছিলেন, আর জন লক আধুনিক গণতন্ত্রের দার্শনিক কাঠামোকে আরও সুসংহত করেছিলেন।
ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ডেমোক্রেসি ইনডেক্স বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের স্থিতি মূল্যায়নে দেশগুলোকে পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্র, ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র, মিশ্র শাসনব্যবস্থা এবং স্বৈরতান্ত্রিক-এই চারটি শ্রেণিতে ভাগ করে। নাগরিক অংশগ্রহণ, স্বাধীন গণমাধ্যম, আইনি কাঠামো, দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার সুবাদে এই সূচকে নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড ও ডেনমার্ক শীর্ষ স্থানে রয়েছে; বিপরীতে ২০২১ সালের নির্বাচিত সরকারের পতন, সামরিক অভ্যুত্থান ও দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতন্ত্রের কারণে আফগানিস্তান, মিয়ানমার ও উত্তর কোরিয়া সর্বনিম্ন সারিতে অবস্থান করছে।
ঞ্জতবে গণতন্ত্র পরিমাপের ক্ষেত্রে কেবল ইআইইউ-ই একমাত্র মানদন্ড নয়; উদাহরণস্বরূপ, ‘ভি-ডেম ডেমোক্রেসি রিপোর্ট’-এর পরিমাপ অনুযায়ী ডেনমার্ক শীর্ষে থাকলেও তলানিতে রয়েছে ইরিত্রিয়া। তাই কোনো রাষ্ট্রের প্রকৃত গণতান্ত্রিক বাস্তবতা ও গতিপ্রকৃতি মূল্যায়নে একটি একক সূচকের ওপর নির্ভর না করে একাধিক বৈশ্বিক সূচক, প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতিকে সার্বিকভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস বাংলাদেশের জন্য আত্মপর্যালোচনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
ইআইইউ-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অবস্থান ১০০তম, স্কোর ১০-এর মধ্যে ৪.৪৪ এবং দেশটি মিশ্র শাসনব্যবস্থা শ্রেণিতে রয়েছে। আগের ৭৫তম অবস্থান থেকে ২৫ ধাপ পতনের কথাও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। যা নির্বাচন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। এই পরিসংখ্যান হতাশার নয়; বরং গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী ও অংশগ্রহণমূলক করার পথ খুঁজে বের করার একটি গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান।
গণতন্ত্রের ইতিহাসে কোনো একজন নেতাকে এককভাবে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা কঠিন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নেতা গণতন্ত্রের সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছর কারাবাসের পরও প্রতিশোধের বদলে ক্ষমা ও পুনর্মিলনের পথে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী অ্যাপারথাইড-এর অবসান ও বহুবর্ণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন। আব্রাহাম লিংকন গৃহযুদ্ধের সংকটে ইউনিয়ন রক্ষা ও দাসপ্রথা বিলোপের মাধ্যমে সমঅধিকারকে গণতন্ত্রের কেন্দ্রে আনেন। মহাত্মা গান্ধী অহিংসা ও সত্যাগ্রহের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনের শক্তি দেখান। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উইনস্টন চার্চিল নাৎসি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ব্রিটেনের নেতৃত্ব দিয়ে ইউরোপের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
গণতন্ত্রের অবক্ষয়ের জন্য কোনো একক নেতাকে সর্বত্র দায়ী করা যায় না। তবে বৈশ্বিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ভøাদিমির পুতিন, ভিক্টর অরবান, রেজেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও নিকোলাস মাদুরোর নাম প্রায়ই উঠে আসে। রাশিয়ায় বিরোধী রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল করার অভিযোগে পুতিন, হাঙ্গেরিতে গণমাধ্যম ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অরবান এবং তুরস্কে ২০১৬ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার অভিযোগে এরদোয়ান সমালোচিত। অন্যদিকে, নির্বাচন, বিরোধী রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে দীর্ঘ সংকটের কারণে মাদুরোর সরকারও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছে।
তবে গণতন্ত্রের অবক্ষয় কেবল কোনো ব্যক্তির কারণে হয় না। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, অপতথ্য, সামাজিক বিভাজন এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থও গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। অন্যদিকে, গণতন্ত্রের মূল চালিকাশক্তি জনগণ। তাই গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকার, রাজনৈতিক দল বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নয়-প্রত্যেক নাগরিকের।
সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়া, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, আইন ও সংবিধান মেনে চলা, সরকারের কর্মকান্ড সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজন হলে শান্তিপূর্ণ ও গঠনমূলকভাবে জবাবদিহি দাবি করা নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পাশাপাশি মানবাধিকার, সুশাসন ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সমর্থন, সামাজিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করা এবং গুজব ও অপতথ্য থেকে দূরে থাকাও জরুরি। কারণ গণতন্ত্র শুধু ব্যালট বাক্সে জন্ম নেয় না। পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে এর চর্চা করতে হয়।
১৫ সেপ্টেম্বর তাই শুধু একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়; এটি নিজেদের কাছে ফিরে তাকানোর দিন। আমরা কি ভিন্নমতের মানুষের কথা শুনি? আমরা কি সত্য তথ্য যাচাই করি? আমরা কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে কথা বলি? আমরা কি রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাবদিহি চাই? মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র কোনো ব্যক্তি, দল বা সরকারের সম্পত্তি নয়-গণতন্ত্র জনগণের। বিভেদের পরিবর্তে সংলাপ, সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা এবং নীরবতার পরিবর্তে দায়িত্বশীল নাগরিক অংশগ্রহণই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে।
আজকের বিশ্বে যখন অপতথ্য, সামাজিক বিভাজন, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও কর্তৃত্ববাদ গণতন্ত্রের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, তখন প্রয়োজন আরও বেশি সংলাপ, আরও বেশি অংশগ্রহণ, আরও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং আরও সচেতন নাগরিক। শেষ পর্যন্ত জনগণের সচেতন কণ্ঠস্বরই গণতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রহরী।













