গুড়পুকুর মেলা: ঐতিহ্যের টান আছে, বদলে গেছে আয়োজন
মিলন বিশ্বাস: শরতের নরম রোদ, বাতাসে হালকা শীতের পরশ, সামনে শারদীয় দুর্গাপূজা এমন উৎসবমুখর সময়ে সাতক্ষীরা শহরের শহীদ আবদুর রাজ্জাক পার্কে জমে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুর মেলা। নাগরদোলা, খেলনা, প্রসাধনী, গৃহস্থালির সামগ্রী আর নানা পণ্যের দোকানে মুখর মেলা প্রাঙ্গণ। দর্শনার্থীদের আনাগোনায় উৎসবের আমেজ থাকলেও সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে মেলার আয়োজন ও ব্যবসার ধরন।
প্রবীণদের স্মৃতিতে থাকা নৌকায় আসা দোকানি, কবিগান, জারিগান ও বাউলগানের আসর এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না। ঐতিহ্যের টান থাকলেও মেলার সেই পুরোনো রূপ অনেকটাই বদলে গেছে। শনিবার (১১ অক্টোবর) মেলার একাদশ দিনে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল বেশ ভালো। দুই বছর বিরতির পর ফিরে আসা প্রায় ৩০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই মেলায় কেনাকাটা, ঘোরাঘুরি ও বিনোদনে সময় কাটাচ্ছেন নানা বয়সী মানুষ। তবে মেলার বর্তমান চিত্রের সঙ্গে অতীতের তুলনা করতে গিয়ে প্রবীণদের স্মৃতিতে উঠে আসছে ভিন্ন এক আয়োজনের কথা।
সাতক্ষীরা শহরের কামালনগরের ৭৩ বছর বয়সী ফজলুর রহমানের স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল গুড়পুকুর মেলার পুরোনো দিনগুলো। তার ভাষ্য, আগে দূরদূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা নৌকায় করে মেলায় আসতেন। মেলায় বসত নানা ধরনের গৃহস্থালির সামগ্রীর পসরা। কেনাকাটার পাশাপাশি মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্র ছিল লোকজ সংস্কৃতির আয়োজন।
ফজলুর রহমান বলেন, “আগে দূরদূরান্ত থেকে দোকানিরা নৌকায় করে মেলায় আসতেন। তখন মেলায় বিভিন্ন ধরনের গৃহস্থালির জিনিসপত্র পাওয়া যেত। কবিগান, জারিগান ও বাউলগানের আসর বসত। মানুষ কেনাকাটার পাশাপাশি এসব গান শুনতেও মেলায় আসতেন। এখন সেই আয়োজন আর তেমন দেখা যায় না। মেলায় এখন দোকানপাটই বেশি চোখে পড়ে।”
তার মতে, পুরোনো দিনের সাংস্কৃতিক আয়োজন ফিরিয়ে আনা গেলে মেলার ঐতিহ্য আরও সমৃদ্ধ হবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মও স্থানীয় লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
মেলার পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতাতেও। ঢাকা থেকে আসা ৫৬ বছর বয়সী প্রসাধনী ব্যবসায়ী সৈকত দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মেলায় দোকান দিয়ে আসছেন। তার অভিজ্ঞতায়, আগে মেলায় গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় সামগ্রীর চাহিদা বেশি ছিল। সময়ের সঙ্গে ক্রেতাদের পছন্দ বদলেছে; বেড়েছে প্রসাধনী ও ফ্যাশনপণ্যের চাহিদা।
সৈকত বলেন, “আগে বিভিন্ন মেলায় দোকান দিয়েছি। তখন এসব প্রসাধনসামগ্রী এত বিক্রি হতো না। সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের চাহিদা বেশি ছিল। এখন কসমেটিকস, কানের দুল, হারসহ বিভিন্ন ফ্যাশনপণ্যের চাহিদা অনেক বেড়েছে। এসব পণ্যের ব্যবসাও মোটামুটি লাভজনক। তাই আমরাও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসার ধরন পাল্টেছি।”
তার কথায়, ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এখন ব্যবসায়ীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসার ধরন বদলানোও তাদের প্রয়োজন হয়ে দাড়িয়েছে।
প্রবীণদের কাছে গুড়পুকুর মেলা পুরোনো দিনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনার উপলক্ষ। অন্যদিকে তরুণদের কাছে মেলার আকর্ষণ অনেকটাই বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি, আড্ডা ও কেনাকাটাকে ঘিরে। মেলায় ঘুরতে আসা তরুণ দর্শনার্থী মৌমিতা বলেন, “আমাদের কাছে মেলা মানে বান্ধবীদের নিয়ে একসঙ্গে ঘোরাঘুরি, আড্ডা দেওয়া আর কেনাকাটা করা। তিন বান্ধবী মিলে নৌকায় উঠেছি, কেনাকাটাও করছি। বেশ ভালো লাগছে। তবে গুড়পুকুর মেলায় পুরোনো দিনের কিছু ঐতিহ্য থাকলে আরও ভালো লাগত। একটু জায়গা রেখে শিক্ষামূলক ও বিনোদনমূলক আয়োজন করা হলে মেলাটি আরও প্রাণবন্ত হতো।”
মৌমিতার প্রত্যাশায় উঠে এসেছে নতুন প্রজন্মের চাওয়া। আধুনিক বিনোদনের পাশাপাশি মেলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লোকজ পরিবেশনা ও শিশু-কিশোরদের উপযোগী শিক্ষামূলক আয়োজন থাকলে দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা আরও বৈচিত্র্যময় হতে পারে।
মেলার একাদশ দিনে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। সার্বিক পরিবেশও ছিল স্বাভাবিক। মেলার বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যদের টহল দিতে দেখা যায়। পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থাও রয়েছে। নিরাপত্তাব্যবস্থা ভালো থাকায় পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীরা স্বস্তিতে মেলা ঘুরে দেখছেন।
মেলা কমিটির সদস্য হাসান শিকদার জানান, দর্শনার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে মেলার সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। এখন প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মেলা চলছে। বর্ধিত সময়ে দর্শনার্থীরা আরও বেশি সময় নিয়ে মেলা ঘুরে দেখা ও কেনাকাটার সুযোগ পাচ্ছেন।
জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার আয়োজনে সাতক্ষীরা শহরের শহীদ আবদুর রাজ্জাক পার্কে গত ১ অক্টোবর শুরু হয়েছে গুড়পুকুর মেলা। চলবে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত। দুই বছর বিরতির পর মেলা ফিরে আসায় স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি দূরদূরান্তের দর্শনার্থীদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
গুড়পুকুর মেলার পরিবর্তন একদিকে মানুষের রুচি ও ব্যবসার ধরন বদলে যাওয়ার চিত্র তুলে ধরে, অন্যদিকে সামনে আনে ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রশ্ন। আধুনিক পণ্য ও নতুন বিনোদনের আয়োজন মেলার স্বাভাবিক বিবর্তনের অংশ। তবে এর পাশাপাশি কবিগান, জারিগান, বাউলগানসহ স্থানীয় লোকজ সংস্কৃতির আয়োজন ফিরিয়ে আনা গেলে মেলা আরও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।
প্রবীণদের স্মৃতি, ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতা আর তরুণদের প্রত্যাশা সব মিলিয়ে গুড়পুকুর মেলার সামনে রয়েছে নতুন সম্ভাবনা। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পুরোনো ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখতে পারলেই সাতক্ষীরার এই প্রাচীন মেলা আগামী প্রজন্মের কাছেও হয়ে উঠবে আরও আকর্ষণীয় ও অর্থবহ।





