গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের দেশে ফেরার নির্দেশ যুক্তরাষ্ট্রের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। প্রস্তাবিত নতুন নীতির আওতায়, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত অধিকাংশ অভিবাসীকে স্থায়ী বসবাসের অনুমতির আবেদন সম্পন্ন করতে নিজ নিজ দেশে ফিরে যেতে হতে পারে। ফলে দেশটিতে বৈধভাবে থাকা হাজারো শিক্ষার্থী, কর্মী, পর্যটক এবং ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বেড়েছে।
অভিবাসন বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বহু মানুষের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও আইনি প্রক্রিয়ায় বড় প্রভাব পড়তে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থা (ইউএসসিআইএস) নতুন একটি নির্দেশনা জারি করে। সেখানে বলা হয়, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে থেকেই গ্রিন কার্ডের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করা হবে।
গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন কঠোর করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেওয়া ধারাবাহিক পদক্ষেপগুলোর মধ্যে শুক্রবার (২২ মে)-এর এই নীতি পরিবর্তনটি সর্বশেষ।
ইউএসসিআইএস একটি নীতি স্মারকলিপিতে এই পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে, যেখানে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন আছে কিনা তা নির্ধারণ করার সময় প্রতিটি মামলার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক বিষয় এবং তথ্য বিবেচনা করতে হবে।
“যে বিদেশি যুক্তরাষ্ট্রে সাময়িকভাবে আছেন এবং গ্রিন কার্ড চান, তাকে আবেদন করার জন্য অবশ্যই তার নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে,” বলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি, যা ইউএসসিআইএস-এর তত্ত্বাবধান করে।
এতে আরো বলা হয়, এই নীতিটি আমাদের অভিবাসন ব্যবস্থাকে আইনের উদ্দেশ্য অনুযায়ী কাজ করতে সাহায্য করবে, কোনো ফাঁকফোকরকে উৎসাহিত করবে না।
ইউএসসিআইএস বলেছে যে, নতুন নীতিটি সংস্থার সম্পদকে অন্যান্য মামলা প্রক্রিয়াকরণে মনোনিবেশ করার জন্য মুক্ত করবে।
শরণার্থীসহ অন্যান্য অভিবাসী গোষ্ঠীকে পরিষেবা প্রদানকারী একটি সাহায্য সংস্থা, এইচআইএএস বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি প্রদানকারী গ্রিন কার্ডের জন্য তাদের আবেদন প্রক্রিয়া করার উদ্দেশ্যে ইউএসসিআইএস মানব পাচারের শিকার এবং নির্যাতিত ও অবহেলিত শিশুদেরকে তাদের পালিয়ে আসা বিপজ্জনক দেশগুলিতে ফিরে যেতে বাধ্য করছে।
গত বছর, ট্রাম্প প্রশাসন ছাত্র, সাংস্কৃতিক বিনিময় পরিদর্শক এবং গণমাধ্যমের সদস্যদের জন্য ভিসার মেয়াদ কমানোর পদক্ষেপ নিয়েছিল।
জানুয়ারিতে, স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করে যে, ট্রাম্প আগের বছর ক্ষমতায় আসার পর থেকে তারা এক লাখেরও বেশি ভিসা বাতিল করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বৃহস্পতিবার বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কিউবার গুয়াইয়েসা নামক জঙ্গি সংগঠনের নির্বাহী সভাপতির বোন আদিসলা এস্ত্রেলা মোরেইরাকে গ্রেপ্তার করেছে।
এতদিন অনেক অভিবাসী “অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস” প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেই স্থায়ী বসবাসের অনুমতির আবেদন করতে পারতেন। নতুন নীতির ফলে অধিকাংশ আবেদনকারীকে নিজ দেশে ফিরে মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটের মাধ্যমে অভিবাসী ভিসার আবেদন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে ছাত্র ভিসাধারী, অস্থায়ী কর্মী এবং মার্কিন নাগরিককে বিয়ে করা অভিবাসীদের ওপর। কারণ আবেদন প্রক্রিয়ার জন্য দেশ ছাড়ার পর অনেকেরই পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ জটিল হয়ে যেতে পারে।
বর্তমানে আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে কড়াকড়ি রয়েছে। এছাড়া যেসব ব্যক্তি ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দেশটিতে অবস্থান করেছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্র ছাড়লে অনেক ক্ষেত্রে ১০ বছরের পুনঃপ্রবেশ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারেন।
সাবেক ইউএসসিআইএস কর্মকর্তা মাইকেল ভালভার্দে বলেছেন, এই নীতি প্রতি বছর লাখো পরিবার ও নিয়োগদাতার পরিকল্পনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তার মতে, “যারা নিয়ম মেনে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেছেন, তাদের জন্যও এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।”
বাইডেন প্রশাসনের সময় ইউএসসিআইএসে কর্মরত সাবেক কর্মকর্তা ডগ র্যান্ড বলেন, প্রতি বছর প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে থেকেই “অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস” প্রক্রিয়ায় গ্রিন কার্ড পান। নতুন পরিবর্তনের ফলে এসব আবেদনকারীর বিশাল অংশ সমস্যায় পড়তে পারেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে অভিবাসন ব্যবস্থাকে আইনের মূল কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হবে এবং বিভিন্ন “ফাঁকফোকর” ব্যবহারের সুযোগ কমে আসবে।
ইউএসসিআইএসের মুখপাত্র জ্যাক কাহলার এক বিবৃতিতে বলেন, “অস্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত কেউ যদি গ্রিন কার্ড চান, তবে বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া তাকে নিজ দেশে ফিরে আবেদন করতে হবে।”
তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে প্রশাসন। উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের জন্য এইচ-১বি ভিসাধারী, শরণার্থী এবং রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীরা আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে থেকেই আবেদন করার সুযোগ পেতে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের বৈধ অভিবাসন আরও সীমিত করার বৃহত্তর নীতির অংশ। নতুন নির্দেশনা কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।






