জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে পর্যটনকে
মো: মামুন হাসান
সুন্দরবনের পুরোনো মাঝিরা আকাশ পড়তে জানেন। বাতাস হঠাৎ থমকে গেলে, পশ্চিম দিগন্তে ঘোলাটে আভা জমলে কিংবা নদীতে অকারণ অস্থিরতা দেখা দিলে তাঁরা বুঝে ফেলেন, প্রকৃতি কিছু একটা বলছে। এই লোকজ জ্ঞানই বহু প্রজন্ম ধরে বনজীবীদের বাঁচিয়েছে। কিন্তু আজ তাঁদেরই ট্রলারে যে পর্যটক বসে আছেন, তিনি আকাশের ভাষা জানেন না। তাঁর ভরসা শুধু একটি সতর্কসংকেত, আর সেই সংকেত তাঁর কাছে সময়মতো, বোধগম্য ভাষায় পৌঁছাবে কি না, সেটাই আজকের প্রশ্ন।
প্রতিবছর ১৩ অক্টোবর আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত হয়। জাতিসংঘ এই দিবসটি ঘোষণা করেছিল ১৯৮৯ সালে, আর ২০১৫ সালে গৃহীত সেনদাই কাঠামোয় ২০৩০ সালের মধ্যে দুর্যোগজনিত ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর অঙ্গীকার করা হয়েছে। এই অঙ্গীকারের আলোয় আমাদের পর্যটন খাতের দিকে তাকালে বোঝা যায়, ঝুঁকি যতটা বড়, প্রস্তুতি ততটা নয়।
যে শিল্পের কাঁচামাল আকাশ, জল আর মাটি
পর্যটন পৃথিবীর বিরল শিল্প, যার পুঁজি প্রকৃতি নিজেই। মহামারির আগে বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ এবং প্রতি দশটি কর্মসংস্থানের একটি আসত এই খাত থেকে। কিন্তু প্রকৃতি যে পুঁজি জোগায়, জলবায়ু পরিবর্তন সেই পুঁজিতেই হাত বাড়াচ্ছে। সমুদ্রসৈকত ক্ষয় হচ্ছে, বন লবণাক্ত হচ্ছে, হিমবাহ গলছে, ঋতুর হিসাব এলোমেলো হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি আরও তীব্র, কারণ আমাদের সেরা গন্তব্যগুলোই ঝুঁকির মানচিত্রের গাঢ়তম দাগে আঁকা।
সুন্দরবন: পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীর পানিতে লবণাক্ততার আগ্রাসন আর ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়ে এই সবুজ প্রাচীরটি ক্রমশ চাপের মুখে।
কক্সবাজার ও কুয়াকাটা: বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতগুলোর একটির অধিকারী কক্সবাজার, আর সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের মিলনভূমি কুয়াকাটা। দুটিই উপকূলীয় ভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের সরাসরি সামনে দাঁড়িয়ে।
সিলেট ও হাওর: পাহাড়ি ঢল আর আকস্মিক বন্যা এখন আর ব্যতিক্রম নয়। ২০২২ সালের জুনের বন্যায় সিলেট অঞ্চলের লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়েছিলেন, থমকে গিয়েছিল যোগাযোগ, থমকে গিয়েছিল পর্যটনও।
পার্বত্য চট্টগ্রাম: অনিয়মিত ও তীব্র বৃষ্টিতে ভূমিধসের শঙ্কা বাড়ছে। বর্ষায় যে পাহাড় মেঘের সঙ্গে খেলা করে, সেই পাহাড়ই হয়ে ওঠে প্রাণঝুঁকির উৎস।
প্রাণ বাঁচানোর সাফল্য, জীবিকা বাঁচানোর চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের দুর্যোগ-ব্যবস্থাপনার গল্প বিশ্বের জন্য এক অনুপ্রেরণা। ১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন কয়েক লাখ মানুষ। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যু ছিল প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার। ২০০৭ সালের সিডরে তা নেমে আসে কয়েক হাজারে। ২০২০ সালের আম্ফানের সময় প্রায় ২৪ লাখ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া সম্ভব হয়, আর প্রাণহানি ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এই রূপান্তরের নেপথ্যে আছে আগাম সতর্কবার্তা, আশ্রয়কেন্দ্র আর ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) স্বেচ্ছাসেবকেরা।
কিন্তু প্রাণ বাঁচানো আর জীবিকা বাঁচানো এক কথা নয়। ২০০৯ সালের আইলার পর সাতক্ষীরার শ্যামনগরসহ উপকূলের বহু জনপদে বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা মানুষের জীবনধারা বদলে দিয়েছে। পর্যটনে এর প্রতিফলন আরও নীরব। সুন্দরবনের মাঝি, সৈকতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হাওরের নৌকাশ্রমিক বা হোমস্টের মালিকের না আছে নিয়োগপত্র, না বিমা। ঝড় থামলে প্রাণ বাঁচে, কিন্তু আয়ের পথ বন্ধ থাকে মাসের পর মাস। জিডিপির হিসাবে এই ক্ষতি দেখা যায় না, দেখা যায় একটি পরিবারের শূন্য হাঁড়িতে।
নকশার একটি অদৃশ্য ফাঁক
প্রায় প্রতিটি হোটেলের কক্ষের দরজার পেছনে অগ্নি-নির্গমনের নকশা ঝোলানো থাকে। অথচ উপকূলীয় হোটেলের কক্ষে ঘূর্ণিঝড়ের সময় কোথায় যেতে হবে, সেই নকশা প্রায় থাকে না। অগ্নিকান্ডের ঝুঁকি আমরা নিয়মে বেঁধেছি, জলবায়ুর ঝুঁকিকে বাঁধিনি।
আরও গভীর প্রশ্ন আছে। ঝড়ের আগের ২৪ ঘণ্টায় একটি দ্বীপে বা সৈকতে ঠিক কত জন পর্যটক আছেন, তা কি কেউ জানে? সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করতে হলে প্রথমে জানা দরকার, কাকে সরাতে হবে। মৌসুমে হাজার হাজার অতিথির বিপরীতে আশ্রয়কেন্দ্রের ধারণক্ষমতা, বহুভাষিক সতর্কবার্তা আর মাঝিদের কাছে সংকেত পৌঁছানোর পথ, এসব হিসাব আমাদের পর্যটন-পরিকল্পনায় প্রায় অনুপস্থিত।
পর্যটন: ভুক্তভোগী এবং অংশীদার
একটি অস্বস্তিকর সত্য মেনে নেওয়া ভালো। পর্যটন শুধু জলবায়ু সংকটের শিকার নয়, কিছুটা অংশীদারও। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৮ শতাংশ এই খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। সৈকতঘেঁষা অপরিকল্পিত স্থাপনা, বন ও জলাভূমি ভরাট, প্লাস্টিক-দূষণ আর শব্দ-দূষণ প্রকৃতির নিজস্ব সুরক্ষা-ব্যবস্থাকে দুর্বল করে। অর্থাৎ সহনশীল পর্যটন শুধু বাঁচার কৌশল নয়, নৈতিক দায়ও।
সেনদাইয়ের চার অগ্রাধিকার: পর্যটনের জন্য একটি রূপরেখা
সেনদাই কাঠামো চারটি অগ্রাধিকারে দাঁড়িয়ে আছে: ঝুঁকি বোঝা, শাসন জোরদার করা, সহনশীলতায় বিনিয়োগ এবং প্রস্তুতি ও আরও ভালো করে পুনর্গঠন। এই চার স্তম্ভে বাংলাদেশের পর্যটনের জন্য আমি এমন একটি রূপরেখা প্রস্তাব করি।
১. ঝুঁকি বুঝি। প্রতিটি প্রধান পর্যটন অঞ্চলের জন্য আলাদা ঝুঁকি-মানচিত্র তৈরি হোক, যেখানে জোয়ার-ভাটা, জলোচ্ছ্বাসের সম্ভাব্য উচ্চতা, ভূমিধসপ্রবণ এলাকা আর নিরাপদ আশ্রয়ের অবস্থান থাকবে। ট্যুর বোট, হোটেল ও ঘাটে পর্যটকের নিবন্ধন ডিজিটাল করা হলে দুর্যোগের আগে কতজন কোথায় আছেন, তা জানা যাবে।
২. শাসন জোরদার করি। হোটেল, রিসোর্ট ও ট্যুর অপারেটরের লাইসেন্স নবায়নে দুর্যোগ-প্রস্তুতি পরিকল্পনা ও নিয়মিত মহড়ার প্রমাণ থাকা শর্ত হোক। ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ ও জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার সঙ্গে পর্যটন নীতির সমন্বয় আবশ্যক। কারণ জলবায়ু অভিযোজন এখন আর পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের একার বিষয় নয়, পর্যটনেরও কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।
৩. সহনশীলতায় বিনিয়োগ করি। প্রকৃতির নিজস্ব ঢালই সবচেয়ে সাশ্রয়ী। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১০০ মিটার ম্যানগ্রোভ ঢেউয়ের উচ্চতা ১৩ থেকে ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। তাই পর্যটন আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ, যেমন প্রবেশ ফি বা পরিবেশ উপকরের একাংশ, স্বচ্ছভাবে বনায়ন ও উপকূল সুরক্ষায় ফিরে যাক। পাশাপাশি দরকার উঁচু ভিত্তির কটেজ, ঝড়-সহনশীল কাঠামো, সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ক্ষুদ্রবিমা, সবুজ ঋণ ও কর-প্রণোদনা। বৈশ্বিক অভিযোজন কমিশনের হিসাবে অভিযোজনে বিনিয়োগ করা প্রতি এক ডলারে দুই থেকে দশ ডলার পর্যন্ত সুফল মেলে। ঝুঁকি-প্রতিরোধ খরচ নয়, লাভজনক বিনিয়োগ।
৪. প্রস্তুত থাকি, আর আরও ভালো করে গড়ি। দুর্যোগের প্রথম ঘণ্টায় পর্যটকের পাশে দাঁড়ান মাঝি, গাইড ও হোমস্টের মালিকেরা। তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা, উদ্ধার ও সংকট-যোগাযোগে প্রশিক্ষণ দিলে পুরো জনপদ হয়ে ওঠে এক জীবন্ত নিরাপত্তা-জাল। এখানে পলিটেকনিক ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলো হতে পারে স্থানীয় প্রশিক্ষণকেন্দ্র। সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা মাঝিদের সঙ্গে মিলে ঝুঁকি-মানচিত্র আঁকতে, মহড়া চালাতে আর বহুভাষিক নির্দেশিকা বানাতে পারে। আর দুর্যোগের পর যেন গন্তব্য দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সে জন্য আগেই তৈরি রাখতে হবে পুনরুদ্ধার ও যোগাযোগ-পরিকল্পনা, কারণ ঝড়ের পর “পর্যটন নিরাপদ” বার্তা পৌঁছাতে দেরি হলে ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী হয়।
ঋতুর নতুন মানচিত্র
আমরা পর্যটনকে বড় বেশি শীতের উৎসব ভেবেছি। অথচ শীতের স্থায়িত্ব নিয়েই এখন অনিশ্চয়তা। হাওরের বর্ষা, সুন্দরবনের সবুজ শ্রাবণ, চা-বাগানের ভেজা সকাল, প্রতিটি ঋতুর আছে নিজস্ব সৌন্দর্য। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, আবহাওয়াভিত্তিক নমনীয় বুকিং, বিনা জরিমানায় তারিখ বদল আর ঘরের ভেতরের বিকল্প কর্মসূচি থাকলে এই রূপগুলোকেই আকর্ষণে বদলে দেওয়া সম্ভব। এতে একদিকে শীতনির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে ঝুঁকিও ছড়িয়ে পড়বে।
পর্যটকের দায়
গন্তব্য শুধু আয়োজকের নয়, অতিথিরও। সতর্কসংকেত উপেক্ষা করে উত্তাল সাগরে নামা, নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ, সৈকতে প্লাস্টিক ফেলা, এসব আচরণ নিজের ও অন্যের জীবনকে বিপন্ন করে। যাত্রার আগে আবহাওয়ার খবর রাখা, পতাকা-সংকেতের অর্থ জানা আর স্থানীয় নির্দেশনা মানাই দায়িত্বশীল পর্যটকের ন্যূনতম পরিচয়।
শেষ কথা
জাতিসংঘের উদ্যোগে ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্বের সব মানুষের কাছে আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। এই সবার তালিকায় যেন সুন্দরবনের গহিনে থাকা অচেনা অতিথি আর কক্সবাজারের ভিড়ে মিশে যাওয়া বিদেশি পর্যটকও থাকেন।
সুন্দরবনের মাঝির আকাশ-পড়ার বিদ্যা আর আবহাওয়া অধিদপ্তরের স্যাটেলাইট-তথ্য, এই দুই জ্ঞান যেদিন এক নৌকায় উঠবে, সেদিনই আমাদের পর্যটন সত্যিকারের সহনশীল হবে। দুর্যোগ-ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ বিশ্বকে একবার পথ দেখিয়েছে। এবার সেই আলো পর্যটনের পথেও ফেলার সময়, কারণ অতিথিকে আমরা ডেকে আনি ভালোবেসে, আর ভালোবাসার প্রথম প্রমাণ তাঁকে নিরাপদে ফিরিয়ে দেওয়া।
লেখক: শিক্ষক ও কলাম লেখক।









