জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগে বাঁচতে পারে লাখো প্রাণ: গবেষণা প্রতিবেদন
ন্যাশনাল ডেস্ক: জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুতিতে আগেভাগে বিনিয়োগ করলে লাখো প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। এমনকি, আগেভাগে বিনিয়োগ করলে প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় বহুগুণ বেশি অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যেতে পারে। এক বৈশ্বিক গবেষণায় উঠে এসেছে এমনি তথ্য। গত ৬ মে গবেষণাটি প্রকাশ করেছে ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট (ডব্লিউআরআই)। এই গবেষণায় সহায়তা করেছে দ্য রকেটফল ফাউন্ডেশন।
গবেষণায় প্রতিবেদনে বলা হয়, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যসেবায় এক মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত মৃত্যু, রোগের চাপ ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কমিয়ে চার থেকে ৬৮ মার্কিন ডলারের সুফল পেতে পারে।
৪০ দেশে চলা ৪৬টি প্রকল্প বিশ্লেষণ করে এই গবেষণা প্রতিবেদন করা হয়েছে। এতে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, রোগ নজরদারি, জলবায়ুভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয়েছে।
গবেষকরা বলেছেন, তাপপ্রবাহ, বন্যা ও রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ায় জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতিতে দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাসম্পন্ন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, কলেরা ও ডায়রিয়ার মতো সংক্রামক রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যসেবার একটি সমন্বিত প্যাকেজ সরকার, হাসপাতাল, জরুরি সেবাদানকারী সংস্থা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে আরও সক্ষম করে তোলে।
ডব্লিউআরআই’র প্রেসিডেন্ট ও সিইও অ্যানি দাসগুপ্তা বলেন, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ ভয়াবহ হয়ে উঠছে। তবে, এগুলো মানব স্বাস্থ্যে যেটুকু প্রভাব ফেলবে, তা এখনও আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রয়েছে। তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যই জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে মানবিক দিক। এটি সবার ওপর প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে শিশুদের ওপর এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর।
গবেষণা প্রতিবেদনে সতর্ক করা বলা হয়, শক্তিশালী পদক্ষেপ না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ুজনিত কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ মৃত্যু পারে। এছাড়া ২০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে অর্ধেকেরও কম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বর্তমানে তাদের জাতীয় রোগ নজরদারি ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় জলবায়ু বিষয়ক তথ্য অন্তর্ভুক্ত করছে।
গবেষণা করার সময় গবেষকরা দেখেছেন, জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ রোগের প্রাদুর্ভাব আগেভাগে শনাক্ত করার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়। এমনকি, জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে এবং ইতোমধ্যেই চাপের মধ্যে থাকা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ কমায়।
দ্য রকফেলার ফাউন্ডেশনের ডা. নাভিন রাও বলেন, জলবায়ু সংকট মূলত একটি স্বাস্থ্য সংকট, যা ইতোমধ্যেই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই গবেষণাটি দেখায়, সামান্য বিনিয়োগও কীভাবে সম্প্রদায়গুলোকে জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির আগে প্রস্তুত হতে সাহায্য করতে পারে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে এবং প্রাণ বাঁচাতে পারে।
ডব্লিইআরআই’র অনুমান, আড়াই কোটি জনসংখ্যার একটি দেশ বছরে আনুমানিক এক কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারে একটি পূর্ণাঙ্গ জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যসেবা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করতে পারলে প্রতি ব্যক্তির জন্য বছরে খরচ হবে মাত্র ৭২ সেন্ট।
বিশ্বজুড়ে চলা বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া গেছে বলে গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্য অবকাঠামো প্রকল্পে জ্যামাইকায় প্রতি এক ডলার বিনিয়োগে ১৬৮ ডলার এবং সেন্ট লুসিয়ায় ৩১৭ ডলারের সুফল পাওয়া গেছে। একই সময়ে ভারতের শহরগুলোতে তাপপ্রবাহ সতর্কতা ব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে প্রতি এক ডলার বিনিয়োগে প্রায় ৫০ ডলার পর্যন্ত সুফল মিলেছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই ফলাফলগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনায় জলবায়ু অভিযোজনকে অন্তর্ভুক্ত করার জরুরি প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করেছে।
সেন্টার ফর পার্টিসিপোটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিপিআরডি) প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা বলেন, বাংলাদেশসহ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জলবায়ু ও স্বাস্থ্যকে আলাদা নীতিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করা ভবিষ্যতে বড় আকারের স্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার তুলনায় অনেক কম ব্যয়বহুল। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত রাখতে এখন আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, কমিউনিটি প্রস্তুতি এবং জলবায়ু–সংবেদনশীল স্বাস্থ্য পরিকল্পনা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বড় ধরনের অর্থায়ন ঘাটতির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক উন্নয়নশীল দেশ এখনও জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্য কর্মসূচির জন্য দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে। আর আবহাওয়াবিষয়ক সংস্থাগুলোও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদের অভাবে রয়েছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) সেক্রেটারি জেনারেল কেলেসতে সাউলো বলেন, জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক উপকরণ ও তথ্য ইতোমধ্যেই সরকারগুলোর হাতে রয়েছে। আমরা যদি পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হই, তবে আমাদের পরিবর্তিত জলবায়ু স্বাস্থ্যঝুঁকিকে এমন গতিতে বদলে দেবে, যা আমাদের ব্যবস্থাগুলো অভিযোজিত হওয়ার চেয়েও দ্রুত।”









