প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে প্রশান্তির ঠিকানা দেবহাটার রূপসী ম্যানগ্রোভ
Oplus_131072
কে এম রেজাউল করিম, দেবহাটা: সবুজের গভীরতা, নদীর নির্মল বাতাস, পাখির কলকাকলি আর চোখজুড়ানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যÑসব মিলিয়ে যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক ছবি। একদিকে বাংলাদেশ, অন্যদিকে ভারত; মাঝখানে সীমান্ত নদী ইছামতি। তারই কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা ‘রূপসী দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্র’ এখন সাতক্ষীরার অন্যতম আকর্ষণীয় বিনোদনকেন্দ্র। ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি ভুলে মনের প্রশান্তি পেতে প্রতিদিনই এখানে ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ।
দেবহাটা উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ পর্যটন কেন্দ্রটি বর্তমানে নতুন সাজে সেজেছে। শীতের ছুটি, বিভিন্ন উৎসব ও সরকারি ছুটিকে কেন্দ্র করে দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠছে ‘মিনি সুন্দরবন’খ্যাত রূপসী ম্যানগ্রোভ।
সবুজের রাজ্যে বিনোদনের নানা আয়োজন: উপজেলা সদর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে সদর ইউনিয়নের শিবনগর এলাকায় তিন নদীর মোহনায় প্রায় ১৫০ বিঘা জমিতে গড়ে উঠেছে ম্যানগ্রোভ বনটি। এর বুক চিরে প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে রয়েছে অনামিকা লেক। পাশাপাশি রয়েছে পিকনিক স্পট, শিশুপার্ক, কনফারেন্স রুম, পাকা ট্রেইল, সেলফি পয়েন্ট ও প্যাডেল বোট।
কেওড়া, গোল, বাইন, কাঁকড়া, নিম, সুন্দরীসহ নানা প্রজাতির গাছ-গাছালিতে ভরে উঠেছে বনটি। সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও প্রাণী। লাভ বার্ড, কোকাটেল, বাজরিগার, টিয়া, কালিম, তোতামুখি ও ইমুসহ নানা পাখির উপস্থিতি শিশুদের আনন্দ বাড়িয়ে দিয়েছে। রয়েছে হাঁস, মুরগি, খরগোশ ও বানরও।
নদী ভ্রমণের জন্য নৌকা, স্থলে ঘোরার জন্য ঘোড়া এবং শিশুদের জন্য বিভিন্ন বিনোদন ব্যবস্থা রয়েছে। ফুলের বাগান, নানা সাজসজ্জা, কার্টুন ও ফেস্টুন পুরো এলাকাকে দিয়েছে উৎসবের আমেজ।
ইছামতির পাড়ে সূর্যাস্তের মুগ্ধতা: রূপসী ম্যানগ্রোভের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ইছামতি নদী। নদীর একপাশে বাংলাদেশ, অপরপাশে ভারত। বিকেলের মিষ্টি আলোয় নদীর পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখার দৃশ্য মন কেড়ে নেয় দর্শনার্থীদের।
দর্শনার্থীরা জানান, দূরে কোথাও না গিয়েও দেবহাটায় এসে সুন্দরবনের আবহ পাওয়া যায়। নিরিবিলি পরিবেশ, নদীর বাতাস ও সবুজ প্রকৃতি সব বয়সী মানুষের জন্যই আকর্ষণীয়। নারী ও শিশুদের জন্যও স্থানটি নিরাপদ বলে জানান তারা।
পর্যটনকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান: পর্যটন কেন্দ্রটিকে ঘিরে স্থানীয় অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য রয়েছে গেস্ট হাউস, সুপেয় পানির ব্যবস্থা ও নামাজের স্থান। নারীদের নামাজ আদায়ের জন্য রয়েছে পৃথক ব্যবস্থা। রাত্রিযাপনের সুবিধার্থে নতুন করে কটেজ নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ছুটির দিন ও উৎসবের সময় এখানে প্রতিদিন কয়েক হাজার দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। শীতের মৌসুমে সেই সংখ্যা আরও বেড়ে যায়।
যেভাবে গড়ে উঠল রূপসী ম্যানগ্রোভ: ২০১২ সালের পর তৎকালীন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনম তরিকুল ইসলামের উদ্যোগে সরকারি খাস জমিতে সুন্দরবনের আদলে গড়ে তোলা হয় এ ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্র।
তবে শুধু ম্যানগ্রোভ নয়, পাশের ঐতিহাসিক টাউনশ্রীপুর এলাকাও বহন করছে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। একসময় এ এলাকায় জমিদার ও খ্যাতিমান ব্যক্তিদের বসবাস ছিল। তাদের বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনার ঐতিহাসিক নিদর্শন এখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।
আরও আকর্ষণীয় করার উদ্যোগ: দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিলন সাহা বলেন, রূপসী ম্যানগ্রোভ জেলার মধ্যে সকল শ্রেণির মানুষের কাছে আকর্ষণীয় একটি বিনোদনকেন্দ্র। জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় পর্যটন কেন্দ্রটিকে আরও সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, সীমান্তসংলগ্ন হওয়ায় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এখানে এসে মুগ্ধ হন। সাধারণ মানুষও এসে প্রশান্তি অনুভব করেন। সবদিক বিবেচনায় ভ্রমণপিপাসুদের কাছে রূপসী ম্যানগ্রোভের আকর্ষণ দিন দিন বাড়ছে।
পর্যটন কেন্দ্রের ম্যানেজার সোহেল বলেন, দর্শনার্থীরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে স্টাফরা সতর্ক রয়েছেন। তাদের বিনোদনের জন্য নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে, ইছামতির পাড়ে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মাঝে কয়েক ঘণ্টা হারিয়ে যেতে চাইলে দেবহাটার রূপসী ম্যানগ্রোভ হতে পারে আপনার পরবর্তী গন্তব্য।









