প্লাস্টিক ও পলিথিনে বিপন্ন সুন্দরবন: এখনই লাগাম টানা জরুরি
সম্পাদকীয়
বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন ও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন আজ এক অভূতপূর্ব পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি। আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলা প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্যের কবলে পড়ে বিপন্ন হতে বসেছে এই বনের জটিল বাস্তুতন্ত্র। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে তীব্র বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পানির টানে রূপসা, পশুর, শিবসা ও কপোতাক্ষ নদ-নদী হয়ে শহর ও লোকালয়ের টন টন অপচনশীল বর্জ্য সরাসরি বনের ভেতরে প্রবেশ করছে। এক গবেষণার তথ্যমতে, এ সময়ে মোহনা অঞ্চলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঘনত্ব প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, যা ম্যানগ্রোভ পরিবেশের ওপর চরম আঘাত।
সুন্দরবনের এই প্লাস্টিক দূষণের পরিণতি কেবল উদ্ভিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, তা মারাত্মক প্রভাব ফেলছে সমগ্র প্রাণিকুলের ওপর। জোয়ারের পানিতে ভেসে আসা পলিথিন সুন্দরীসহ বিভিন্ন গাছের শ্বাসমূলে আটকে গিয়ে উদ্ভিদ ও বৃক্ষের অক্সিজেন গ্রহণ ব্যাহত করছে এবং স্বাভাবিক পুনরুৎপাদন ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, নদীর তলদেশে জমা হওয়া প্লাস্টিকের আস্তরণ স্বাভাবিক পানি প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। ডাঙ্গার হরিণ ও বানর থেকে শুরু করে নদ-নদীর কচ্ছপের মতো প্রাণীরা ভুলবশত এসব প্লাস্টিক খেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, প্লাস্টিক ভেঙে তৈরি হওয়া সূক্ষ্ম কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক হরিণা চিংড়িসহ অন্তত ১৭ প্রজাতির মাছের শরীরে শনাক্ত হয়েছে। খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এই বিষাক্ত কণা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ক্যানসার ও লিভারের মতো মারাত্মক ব্যাধির ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
সুন্দরবনকে বাঁচাতে বন বিভাগ থেকে ‘সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক’ নিষিদ্ধসহ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও মাঠপর্যায়ে সেটির কার্যকর প্রয়োগ এখনো সুদূরপরাহত। পর্যটকবাহী জাহাজ, যাত্রীবাহী ট্রলার ও লোকালয়ের হাট-বাজার থেকে নির্গত বর্জ্য বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপের বিকল্প নেই। কেবল জরিমানা বা আইন করেই এই বিপর্যয় রোখা সম্ভব নয়; সুন্দরবন সংলগ্ন শহরের ড্রেন ও নদীগুলোতে আধুনিক ফিল্টার নেট বসানো এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করা জরুরি। সেই সঙ্গে পর্যটক ও স্থানীয়দের মাঝে বিকল্প হিসেবে চটের ব্যাগ ও মাটির পাত্র ব্যবহারে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সুন্দরবন আমাদের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যুহ; এই বন বিনষ্ট হলে আমাদের অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়বে। তাই প্লাস্টিক দূষণ মুক্ত সুন্দরবন গড়তে দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।











