বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩

বাঁধ কেটে চিংড়িঘের, ঝুঁকিতে উপকূল, এ দায় কার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬, ৩:২৯ অপরাহ্ণ
বাঁধ কেটে চিংড়িঘের, ঝুঁকিতে উপকূল, এ দায় কার

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

বাংলাদেশের উপকূল মানেই প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিরন্তর লড়াইয়ের এক কঠিন বাস্তবতা। এখানে মানুষ শুধু জীবনযাপন করে না, প্রতিদিন প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে থাকে। নদী, সাগর, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার সঙ্গে লড়াই করে গড়ে ওঠা এই জনপদের মানুষের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তার নাম উপকূল রক্ষা বাঁধ। এই বাঁধ তাদের কাছে শুধু মাটি, বালু আর ব্লকের সমষ্টি নয়; এটি জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।

 

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা সেই উপকূলীয় বাস্তবতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। চারদিকে নদী ও জলরাশির ঘেরাটোপে থাকা এই জনপদের মানুষের প্রতিটি দিন নির্ভর করে বাঁধের স্থায়িত্বের ওপর। একটি বাঁধ শক্ত থাকলে মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে, জমিতে চাষ করতে পারে, ঘরবাড়ি গড়তে পারে। আর বাঁধ দুর্বল হলে একটি জোয়ারের পানিই মুহূর্তে বদলে দিতে পারে হাজারো মানুষের জীবন।

 

এই বাস্তবতার মধ্যেই গাবুরার ১৫ নম্বর পোল্ডারের আওতাধীন উপকূল রক্ষা বাঁধ থেকে অবৈধভাবে স্থাপন করা ‘নাইনটি’ অপসারণের ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রশাসনের অভিযানে চকবারা, ডুমুরিয়া, চাঁদনীমুখা ও ৯ নম্বর সোরা এলাকার বাঁধ থেকে ১২টি অবৈধ পানি উত্তোলন পাইপ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জাহান কনকের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে সহকারী কমিশনার (ভূমি), পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অংশ নেন।

 

প্রশাসনের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কারণ দীর্ঘদিন ধরে উপকূলবাসীর অন্যতম অভিযোগ ছিলÑকিছু ব্যক্তি নিজেদের চিংড়িঘেরে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করানোর সুবিধার জন্য বাঁধের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করে পাইপ স্থাপন করছে। অবশেষে সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই অভিযান একই সঙ্গে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

 

যে বাঁধ হাজার হাজার মানুষের জীবন রক্ষার জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে, সেই বাঁধের বুক চিরে কীভাবে ব্যক্তিগত স্বার্থে পাইপ বসানো সম্ভব হলো? কারা এতটা সাহস পেল যে নির্মাণাধীন বাঁধের ওপরের ব্লক সরিয়ে, মাটি কেটে, ছিদ্র করে নিজেদের সুবিধার ব্যবস্থা করতে পারল? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার দিকে ইঙ্গিত করে না; এটি উপকূল ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতার কথাও বলে।

 

অনেকের কাছে ‘নাইনটি’ হয়তো একটি ছোট পাইপ। কিন্তু উপকূলীয় বাঁধের ক্ষেত্রে এই ছোট পাইপই বড় বিপদের কারণ হতে পারে। কারণ একটি বাঁধের প্রধান শক্তি হলো তার অখ-তা। বাঁধের কোথাও যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছিদ্র তৈরি হয়, তাহলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ সেই দুর্বল অংশকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাঁধের ভেতরের মাটি পানির চাপে সরে যেতে থাকে। তৈরি হয় ফাঁপা অংশ। বাইরে থেকে বাঁধ ঠিকঠাক দেখা গেলেও ভেতরে ভেতরে সেটি দুর্বল হয়ে পড়ে।

 

স্বাভাবিক সময়ে হয়তো এর প্রভাব বোঝা যায় না। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা অতিরিক্ত জোয়ারের সময় সেই দুর্বল অংশই ভাঙনের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। উপকূলবাসী এই অভিজ্ঞতা বহুবার পেয়েছে। বাঁধ ভাঙার পর শুধু পানি আসে না; সঙ্গে আসে দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ। লবণাক্ত পানি ঢুকে কৃষিজমি নষ্ট হয়, মিঠাপানির উৎস নষ্ট হয়, গবাদিপশু মারা যায়, ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক পরিবার বছরের পর বছর সেই ক্ষতির ধকল সামলাতে পারে না।

 

তাই বাঁধ কেটে বা ছিদ্র করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়াকে কোনোভাবেই ছোটখাটো অনিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সরাসরি জননিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুতর অপরাধ। উপকূলীয় অর্থনীতিতে চিংড়ি চাষের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সাতক্ষীরার বহু মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। চিংড়ি রপ্তানি দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখে। কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকা- পরিচালনার নামে যদি এমন কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়, যা পুরো এলাকার নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে, তাহলে সেই ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই হবে।

 

গাবুরার ঘটনায় মূল দ্বন্দ্বটি এখানেইÑএকদিকে কয়েকজনের তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সুবিধা, অন্যদিকে হাজারো মানুষের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা। একজন ঘের মালিকের কাছে নদীর লবণাক্ত পানি প্রবেশ করানো হয়তো ব্যবসার সুবিধা। কিন্তু সেই পানি প্রবেশের পথ যদি উপকূল রক্ষা বাঁধকে দুর্বল করে, তাহলে ক্ষতির শিকার হবে পুরো সমাজ। রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য ব্যবহার করার প্রবণতা বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপদ তৈরি হতে পারে।

 

গাবুরার চারপাশে টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও পুনর্বাসনের জন্য সরকার প্রায় ১ হাজার ২০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্প শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি উপকূলবাসীর অস্তিত্ব রক্ষার একটি বড় উদ্যোগ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং অস্বাভাবিক জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলায় শক্তিশালী বাঁধ এখন সময়ের দাবি। কিন্তু শুধু কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে বাঁধ নির্মাণ করলেই হবে না। নির্মিত বাঁধকে রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

একদিকে সরকার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে নিরাপদ বাঁধ নির্মাণে, অন্যদিকে কিছু ব্যক্তি সেই বাঁধ দুর্বল করার চেষ্টা করছেÑএই বাস্তবতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শত্রু কখনো কখনো অর্থের অভাব নয়, বরং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও দায়িত্বহীনতা। গাবুরার ঘটনা আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে এমন একটি বাঁধ, যার নির্মাণ ও পুনর্বাসন কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ইমরান সরদারের বক্তব্য অনুযায়ী, গাবুরার চারপাশে টেকসই বাঁধ নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যেই কিছু ব্যক্তি সদ্য নির্মিত বাঁধের ওপরের ব্লক সরিয়ে মাটি কেটে পাইপ স্থাপন করেছে। একটি নির্মাণাধীন বাঁধে এমন কর্মকা- শুধু আইন ভঙ্গ নয়, এটি ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। কারণ একটি বাঁধ নির্মাণের প্রতিটি ধাপের পেছনে থাকে দীর্ঘ পরিকল্পনা, প্রকৌশল বিশ্লেষণ ও বিপুল অর্থের বিনিয়োগ। সেই কাঠামোকে কেউ যদি নিজের সুবিধার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহলে তা রাষ্ট্রের উন্নয়ন কর্মকা-কে বাধাগ্রস্ত করার শামিল।

 

প্রশ্ন হলোÑএমন দুঃসাহস কেউ কীভাবে দেখাতে পারে? এর পেছনে কি দীর্ঘদিনের নজরদারির অভাব কাজ করেছে? নাকি স্থানীয় প্রভাব ও স্বার্থের কারণে অনেকে মনে করেছে, আইন তাদের স্পর্শ করবে না? উপকূলীয় এলাকায় এমন একটি প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে দেখা যাচ্ছেÑসরকারি সম্পদকে অনেক সময় ব্যক্তিগত সুবিধার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়। কোথাও বাঁধ কেটে ঘেরে পানি ঢোকানো হয়, কোথাও বাঁধের ওপর অবৈধ স্থাপনা তৈরি হয়, কোথাও আবার নৌযান চলাচলের অজুহাতে বাঁধ দুর্বল করা হয়।

 

এসব কর্মকা-ের পেছনে একটি সাধারণ মানসিকতা কাজ করেÑস্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিকে উপেক্ষা করা। গাবুরায় প্রশাসনের অভিযান একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে, কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে অবৈধ কর্মকা- বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু উপকূল রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়। কারণ উপকূলের সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি। একটি বাঁধ আজ ভালো থাকলেও আগামীকাল সেখানে নতুন করে ক্ষতির চেষ্টা হতে পারে।

 

তাই প্রয়োজন একটি স্থায়ী ব্যবস্থাপনা কাঠামো। পানি উন্নয়ন বোর্ড, উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনগণের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। বাঁধের কোথায় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, কোথায় অবৈধ হস্তক্ষেপ হচ্ছে, কোথায় সংস্কার প্রয়োজনÑএসব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। প্রশাসনের বর্তমান অভিযানকে তাই একটি শুরু হিসেবে দেখতে হবে, শেষ হিসেবে নয়। যারা বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শুধু পাইপ খুলে ফেললে সমস্যার সমাধান হবে না।

 

কারণ শাস্তি না থাকলে একই ধরনের ঘটনা আবার ঘটার আশঙ্কা থেকেই যাবে। উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন ও নিরাপত্তায় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কোথায় কী সমস্যা হচ্ছে, কারা কী করছেÑএসব বিষয়ে তাদের ধারণা থাকার কথা। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, স্থানীয় স্বার্থের কারণে কিছু অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয় না। রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের কারণে কেউ কেউ নীরব থাকেন। এই সংস্কৃতি পরিবর্তন করা জরুরি। একজন জনপ্রতিনিধির প্রথম দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

 

কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুবিধার জন্য যদি হাজারো মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে, তাহলে সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াই প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়। বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশের বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি। ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বিস্তার এবং অনিয়মিত আবহাওয়ার কারণে উপকূলের মানুষ আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে একটি শক্তিশালী ও নিরাপদ বাঁধের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলোÑপ্রাকৃতিক ঝুঁকির পাশাপাশি মানুষের তৈরি ঝুঁকিও উপকূলকে দুর্বল করছে।

 

অবৈধ পাইপ স্থাপন, বাঁধ কাটা, মাটি অপসারণ, অপরিকল্পিত ঘের ব্যবস্থাপনাÑএসব কর্মকা- প্রকৃতির আঘাতকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। অর্থাৎ উপকূলের মানুষকে শুধু প্রকৃতির সঙ্গে নয়, মানুষের তৈরি অব্যবস্থার সঙ্গেও লড়াই করতে হচ্ছে। সাতক্ষীরার অর্থনীতিতে চিংড়ি চাষ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখন সময় এসেছে চিংড়ি চাষের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবার। যে চাষব্যবস্থা উপকূলের পরিবেশ, বাঁধ ও মানুষের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে, সেটিকে টেকসই বলা যায় না। প্রয়োজন পরিবেশবান্ধব ও পরিকল্পিত চিংড়ি চাষ।

 

পানি প্রবেশ ও নিষ্কাশনের জন্য বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনোভাবেই বাঁধ কেটে বা ক্ষতিগ্রস্ত করে ব্যক্তিগত ঘের পরিচালনার সুযোগ রাখা যাবে না। অর্থনীতি ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। গাবুরায় ১২টি অবৈধ ‘নাইনটি’ অপসারণ হয়তো একটি ছোট ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু এর গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ এটি দেখিয়ে দিয়েছেÑউপকূল রক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, মানুষের অসচেতনতাও। একটি বাঁধ নির্মাণে বহু মানুষের শ্রম, প্রকৌশল জ্ঞান ও সরকারি অর্থ ব্যয় হয়।

 

সেই বাঁধ রক্ষা করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব। গাবুরার ঘটনা তাই একটি সতর্ক সংকেতÑএখনই যদি ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, ভবিষ্যতে আরও বড় ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে। গাবুরার ঘটনা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরেছেÑআমরা কি শুধু দুর্যোগের পর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা করব, নাকি দুর্যোগের আগেই ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা নেব? বাস্তবতা হলো, উপকূলীয় অঞ্চলে টিকে থাকতে হলে এখন আর কেবল বাঁধ নির্মাণ করলেই হবে না; বাঁধকে সুরক্ষিত রাখার জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

 

দীর্ঘদিন ধরে উপকূল উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বাঁধ নির্মাণ হয়েছে, সংস্কার হয়েছে, পুনর্বাসন প্রকল্প হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই রক্ষণাবেক্ষণ, নজরদারি এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহির অভাব থেকে গেছে। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোও অনেক সময় অল্প কিছু মানুষের অনিয়মের কারণে ঝুঁকিতে পড়েছে। গাবুরার শিক্ষা এখানেইÑউন্নয়নের অর্থ শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, সেই অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ। উপকূল রক্ষার সবচেয়ে বড় বাধা অনেক সময় অর্থ বা প্রযুক্তির অভাব নয়; বরং মানুষের আচরণ ও মানসিকতা।

 

কেউ যখন নিজের সাময়িক লাভের জন্য বাঁধ কাটে, তখন সে আসলে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করে।এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। একজন ঘের মালিকের মনে রাখতে হবে, তার ঘেরের পানি ব্যবস্থাপনার জন্য এমন কোনো পথ বেছে নেওয়া যাবে না, যা প্রতিবেশী কৃষক, জেলে, শ্রমজীবী মানুষ কিংবা পুরো এলাকার অস্তিত্বকে ঝুঁকিতে ফেলে। জনগণের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি করতে হবে যে, বাঁধ কোনো সরকারি স্থাপনা মাত্র নয়; এটি তাদের নিজেদের জীবন রক্ষার অবলম্বন। যে মানুষ নিজের ঘরের দরজা-জানালা রক্ষা করে, তাকে একইভাবে নিজের এলাকার বাঁধ রক্ষায়ও ভূমিকা নিতে হবে।

 

গাবুরায় প্রশাসনের অভিযান একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। কিন্তু এই বার্তা তখনই কার্যকর হবে, যখন আইনের প্রয়োগ হবে ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ। বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত করার ঘটনা কোনো সাধারণ অনিয়ম নয়। এটি এমন একটি অপরাধ, যার প্রভাব একটি পরিবার বা একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ক্ষতি ছড়িয়ে পড়ে পুরো সমাজে। তাই যারা বাঁধ কেটে, ছিদ্র করে বা অবৈধ স্থাপনা তৈরি করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু জরিমানা বা সতর্কতা নয়, প্রয়োজনে আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শাস্তির অভাব অনিয়মকে উৎসাহিত করে।

 

আর কঠোর ব্যবস্থা ভবিষ্যতের অপরাধ ঠেকাতে সহায়তা করে। বর্তমান সময়ে উপকূল রক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বাঁধের দুর্বল অংশ চিহ্নিত করতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল ম্যাপিং, স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে। প্রতিটি পোল্ডারের জন্য একটি কার্যকর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকা দরকার। কোথাও বাঁধে পরিবর্তন দেখা গেলে তা দ্রুত শনাক্ত ও সমাধান করতে হবে।শুধু দুর্যোগের সময় বাঁধের কথা মনে করলে চলবে না। বর্ষা বা ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুমের আগেই প্রস্তুতি নিতে হবে।

 

উপকূল রক্ষার কাজে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যারা প্রতিদিন বাঁধের পাশে বসবাস করেন, তারাই প্রথম বুঝতে পারেন কোথায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তাই স্থানীয় পর্যায়ে বাঁধ রক্ষা কমিটি বা সামাজিক নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও বাঁধ রক্ষার কাজে যুক্ত হবে। জনগণকে প্রতিপক্ষ নয়, অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। গাবুরার ঘটনা শুধু একটি ইউনিয়নের সমস্যা নয়; এটি পুরো বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য একটি সতর্কবার্তা।

 

সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাটসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ উপকূল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এসব অঞ্চলের মানুষের জীবন ও অর্থনীতি অনেকাংশে নির্ভর করছে বাঁধের নিরাপত্তার ওপর। আজ গাবুরায় ‘নাইনটি’ অপসারণ হয়েছে, আগামীকাল অন্য কোনো উপকূলীয় এলাকায় একই সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই এখনই একটি সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা জরুরি। একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু বড় প্রকল্পের সংখ্যায় পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় সেই প্রকল্প কতটা মানুষের জীবনকে নিরাপদ করতে পারছে তার ওপর।

 

গাবুরার চারপাশে ১ হাজার ২০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এই বিনিয়োগ সফল হবে তখনই, যখন নির্মিত বাঁধ দীর্ঘদিন কার্যকর থাকবে। অতএব, উন্নয়নের অর্থ শুধু বাঁধ নির্মাণ নয়; বাঁধ রক্ষার সংস্কৃতি তৈরি করাও উন্নয়নের অংশ। গাবুরার ঘটনা আমাদের একটি কঠিন সত্য মনে করিয়ে দেয়Ñপ্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করা উপকূলের মানুষকে শুধু ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে নয়, মানুষের তৈরি ঝুঁকির সঙ্গেও লড়তে হচ্ছে।

 

একটি বাঁধ ভেঙে গেলে শুধু পানি প্রবেশ করে না; ভেসে যায় মানুষের ঘর, জমি, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ। তাই বাঁধের ওপর একটি ছোট আঘাতও উপকূলের জন্য বড় বিপদের সংকেত। প্রশাসনের সাম্প্রতিক অভিযান আশার আলো দেখিয়েছে। কিন্তু এই আলোকে স্থায়ী করতে হবে। অবৈধ দখল, বাঁধ কাটা, নাইনটি স্থাপনÑএসবের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করতে হবে। গাবুরার শিক্ষা খুব পরিষ্কারÑউপকূল বাঁচাতে হলে আগে বাঁধ বাঁচাতে হবে।

 

আর বাঁধ বাঁচাতে হলে শুধু প্রশাসনের অভিযান নয়, দরকার জনগণের সচেতনতা, জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বশীলতা এবং রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান। কারণ উপকূলের বাঁধ শুধু মাটি দিয়ে তৈরি নয়; এর সঙ্গে মিশে আছে হাজারো মানুষের জীবন, কান্না, সংগ্রাম এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার।

লেখক: সংবাদকর্মী

 

 

Ads small one

সাতক্ষীরায় সামান্য বৃষ্টিতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জলাবদ্ধতা, বিপাকে শিশু শিক্ষার্থীরা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬, ৫:৪২ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় সামান্য বৃষ্টিতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জলাবদ্ধতা, বিপাকে শিশু শিক্ষার্থীরা

পত্রদূত রিপোর্ট: সাতক্ষীরায় গত কয়েকদিনের বৃষ্টিপাতে বিভিন্নস্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠজুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থীরা এই জলাবদ্ধতায় সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। মাঠে হাঁটুসমান পানি জমে থাকায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্যান্ট গুটিয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। অনেক সময় বই-খাতাসহ স্কুলব্যাগ পানিতে ভিজে যাচ্ছে। এতে পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।

সাতক্ষীরার সদর উপজেলার দক্ষিণ দেবনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সূত্রে জানাগেছে, বিদ্যালয়ের মাঠটি নিচু হওয়ায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে চারপাশে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। চলতি বছরও একই পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের টয়লেটে যাওয়ার পথও পানির নিচে তলিয়ে থাকায় শিশুদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

 

এ অবস্থায় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জোছনা আরা এ প্রতিবেদককে বলেন কয়েক মাস হলো সাতক্ষীরা বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করেছেন। আবেদনে তিনি বিদ্যালয়ের পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মাঠ ভরাট এবং স্কুলের প্রাচীন এর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানান। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দপ্তরে বিষয়টি জানানো হলেও কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি। ফলে প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের।

 

বিদ্যালয়ের অভিভাবক আবু সাঈদ বলেন, বর্তমান সরকার শিশুদের শিক্ষা ও খেলাধুলার পরিবেশ উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু জলাবদ্ধতার কারণে এই বিদ্যালয়ের শিশুরা স্বাভাবিকভাবে ক্লাসে অংশ নিতে পারছে না। অনেক অভিভাবক বাধ্য হয়ে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পৌঁছে দিচ্ছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, মাঠটি ভরাট ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হলে শুধু শিক্ষার পরিবেশই উন্নত হবে না, শিশুদের খেলাধুলার সুযোগও নিশ্চিত হবে। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক জোছনা আরা বলেন, “শিশুদের কষ্ট দেখে আর চুপ করে থাকা সম্ভব হয়নি। তাই জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের কাছে আশু সুদৃষ্টি কামনা করেছি।

একই চিত্র দেখা গেছে, শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ১৪৯ নং শ্রীফলকাটি পশ্চিমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শহিদুল ইসলাম গত ৮ জুলাই সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন। আবেদনে তিনি বিদ্যালয়ের পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মাঠ ভরাটের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানান। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দপ্তরে বিষয়টি জানানো হলেও কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি। ফলে প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের।

 

শ্যামনগরে আমন ধানের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬, ৫:২৬ অপরাহ্ণ
শ্যামনগরে আমন ধানের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ

সুন্দরবনাঞ্চল (শ্যামনগর) প্রতিনিধি: আমন ধানের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে উপকূলীয় সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আয়োজনে নিজস্ব চত্তরে বুধবার (৮ জুলাই) সকালে বিনামূল্যে আমন ধানের বীজ ও সার বিতরণ করা হয়।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রনোদনা কর্মসূচির আওতায় খরিপ-২ মৌসুমে আমন ধানের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে উপজেলার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ২ হাজার ৮০০ জন কৃষক ও কৃষাণীর মাঝে মাথাপিছু ৫ কেজি ধানের বীজ ও ১০ কেজি ডিএপি ও ১০ কেজি পটাশ সার বিতরণ করা হয়। বিতরণকৃত আমন ধানের জাতের মধ্যে ছিল ব্রি-৮৭ ,ব্রি-১০৩, বিনা-১৭, বিনা-২৬।

বিনামূল্যে ধানের বীজ ও সার বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠানের সভাপতি শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামসুজ্জাহান কনক। স্বাগত বক্তব্য রাখেন উপজেলা কৃষি অফিসার ওয়ালিউল ইসলাম।

 

এ সময় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মিরাজ হোসেন খান, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মোঃ আব্দুল ওয়াহেদ, উপজেলা জাময়োতের আমীর মাওলানা আব্দুর রহমান, উপজেলা বিএনপির সাবেক আহবায়ক সোলায়মান কবীর, শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাব সভাপতি সামিউল আযম মনির, কৃষকবৃন্দ, উপজেলা জামায়াত ও বিএনপি নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিকবৃন্দ প্রমুখ।

আইএইচআর মাল্টিসেক্টরাল স্টেকহোল্ডার শীর্ষক বিভাগীয় অ্যাডভোকেসি সভা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬, ৫:১৯ অপরাহ্ণ
আইএইচআর মাল্টিসেক্টরাল স্টেকহোল্ডার শীর্ষক বিভাগীয় অ্যাডভোকেসি সভা

আইএইচআর (২০০৫) মাল্টিসেক্টরাল স্টেকহোল্ডার শীর্ষক বিভাগীয় অ্যাডভোকেসি সভা আজ (বুধবার) বিভাগীয় কমিশনারের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো: আবদুল্লাহ হারুন।

প্রধান অতিথি বলেন, আর্ন্তজাতিক স্বাস্থ্যবিধি ২০০৫ সালের একটি চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও আজ ২১ বছর পর ২০২৬ সালে এসে আমরা এখনো অবহিতকরণ পর্যায়ে আছি যা অত্যন্ত দু:খজনক। করোনা মহামারীর সময়ে এ ধরণের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছে। আমরা অনেক পিছিয়ে আছি, যার অন্যতম কারণ জনস্বাস্থ্য সমস্যাকে আমরা মনে করি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয়। অথচ মহামারীর পর্যায়ে যেতে পারে এ ধরণের রোগগুলোকে প্রতিরোধ করতে সব পক্ষকেই সচেতন হয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের আইনি এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আছে কিন্তু বাস্তবায়ন পর্যায়ে অগ্রগতি কম। বিভিন্ন অংশীজন ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তাদের সাথে সমন্বিতভাবে কার্যক্রম গ্রহণ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ না হলে আমরা এই আন্ত:সীমান্ত সংক্রামক রোগগুলো মোকাবেলা করতে পারবো না। আবার বিশ^ায়নের যুগে আমরা আইসোলেটেড হয়েও থাকতে পারবো না। তাই সকল ফোকাল পয়েন্ট গুলোকে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ ও মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং সহযোগিতা করার অঙ্গীকার করেছে। তিনি বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ও তার দলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

সভায় জানানো হয়, যে কোন ধরণের মহামারী প্রতিরোধ করা আর্ন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধির একমাত্র উদ্দেশ্য। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি (আইএইচআর) এর অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ। আইএইচআর, ২০০৫ একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি যার মাধ্যমে বাংলাদেশসহ ১৯৬টি সদস্য রাষ্ট্র জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ ও মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং বজায় রাখার অঙ্গীকার করছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশসহ প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের নৌ, স্থল ও বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, ডাক্তার ও সুনির্দিষ্ট হাসপাতাল থাকা বাধ্যতামূলক। যেকোন কেস সনাক্ত হওয়ার দুই ঘন্টার মধ্যে ফোকাল পয়েন্টে অবহিত করতে হবে। এক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য, সীমান্তরক্ষা, নিরাপত্তা ও খাদ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগের তৎপরতা এবং ঝুঁকি মোকাবেলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

 

অ্যাডভোকেসি সভায় বিজিবি খুলনা সেক্টরের পরিচালক লে. কর্নেল অনুপ কুমার বিশ^াস, অতিরিক্ত রেঞ্জ ডিআইজি শেখ জয়নুদ্দীন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. আশনাফুন্নাহার, খুলনা পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের পরিচালক মো: মোজাম্মেল হক, আনসার ও ভিডিপির উপপরিচালক এএসএম আজিম উদ্দিন বক্তব্য রাখেন। সভাপতিত্ব করেন খুলনা স্বাস্থ্য দপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. অপর্ণা বিশ^াস। সভায় প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার কারিগরি কর্মকর্তা ডা. ইনিন ইসিবোর।

অ্যাডভোকেসি সভায় বিভাগের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা ও এনজিও প্রতিনিধিরা অংশ নেন। খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের সহযোগিতায় ডিজিএইচএস অ্যাডভোকেসি সভার আয়োজন করে। তথ্যবিবরণী