বিজয় এসেছে, কিন্তু ফেরেনি আসিফ
এসএম বিপ্লব হোসেন
বাড়ির উঠানে এখনও বিকেলের রোদ পড়ে। সন্ধ্যা নামলেই আজও দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন একজন মা। কোনো শব্দ হলেই বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে আশা। মনে হয়, এই বুঝি ছেলেটা ফিরে এল। কিন্তু পরমুহূর্তেই বাস্তবতা তাকে মনে করিয়ে দেয়, সেই অপেক্ষার আর কোনো শেষ নেই।
ধীরে ধীরে তিনি বলেন, “ও বাবা, তুমি যাইওনা… কত বলেছিলাম, বাবা যাস না। তাও গেলে। আমার আসিফ আর ফিরল না…” এরপর আর কথা বলতে পারেন না শিরীন সুলতানা। কান্নায় ভেঙে পড়েন। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ছেলেকে হারানোর সেই বিকেলটি যেন আজও থমকে আছে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার আস্কারপুর গ্রামের ছোট্ট সেই বাড়িতে।
দেশ বদলেছে। ইতিহাস বদলেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। শহীদদের স্মরণে দেশের বিভিন্ন স্থানে হয়েছে নানা আয়োজন। কোথাও নির্মিত হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ, কোথাও পাঠাগার, কোথাও বা চত্বর। কিন্তু একজন মায়ের কাছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার সন্তানের খালি বিছানা, অপূর্ণ অপেক্ষা আর না-ফেরা একটি মুখ।
মাত্র ২১ বছর বয়সে আহত এক সহযোদ্ধাকে বাঁচাতে ছুটে যাওয়া সেই তরুণের নাম আজ শহীদ আসিফ হাসান। নর্দান ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থী নিজের জীবন নয়, অন্য একজনের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়েই প্রাণ হারিয়েছিলেন।
১৮ জুলাই ২০২৪: রাজধানীর উত্তরা তখন ধোঁয়া, আতঙ্ক আর গুলির শব্দে ভারী। আন্দোলনের মিছিল ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চলছে। ঠিক সেই সময় বড় বোনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন আসিফ।
“আপা, আমি ভালো আছি। ভয় পেয়ো না। পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুড়ছে। আমাদের এক ভাই গুলিবিদ্ধ হয়েছে। ওকে পানি খাওয়াতে যাচ্ছি…”Ñএটাই ছিল তার শেষ কথা।
ফোনের অপর প্রান্তে বড় বোন বারবার ডাকছিলেন, “হ্যালো… হ্যালো… আসিফ…” কিন্তু আর কোনো উত্তর আসেনি। আহত সহযোদ্ধাকে পানি খাওয়ানোর আগেই গুলিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন আসিফ। পরে সহযোদ্ধারা তাকে কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বাড়িতে তখনও কেউ জানত না, পরিবারের সবচেয়ে ছোট স্বপ্নবাজ ছেলেটি আর কোনোদিন ফিরবে না।
কয়েকদিন পর বাড়ি ফেরার জন্য বাসের টিকিট কাটা ছিল। মা ভেবেছিলেন, ছেলেটা এলে তার প্রিয় ভেটকি মাছ, চিংড়ি আর গরুর মাংস রান্না করবেন। কিন্তু বাস থেকে নামল না আসিফ। ফিরল সাদা কাফনে মোড়ানো নিথর দেহ হয়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবি দেখে পরিবার প্রথম নিশ্চিত হয়, তাদের আসিফ আর নেই। সেই থেকে এই বাড়ির সময় যেন থেমে আছে।
শিরীন সুলতানা আজও বলেন, “আমার মনে হয়, দরজায় কড়া নাড়বে। বলবে, মা খেতে দাও। এখনও রান্না করলে মনে হয়, আমার আসিফ এসে বলবে, মা গরম গরম দাও।”
পাশেই বসে থাকেন বাবা মাহমুদ আলম। খুব বেশি কথা বলেন না। শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। চোখের ভাষাতেই যেন লুকিয়ে থাকে সব বেদনা।
জমজ ভাই রাকিব হাসানের কাছে এই শূন্যতা আরও গভীর। একই দিনে জন্ম, একই সঙ্গে বড় হওয়া, একই স্বপ্নে পথচলা। ভাইকে হারানোর পর যেন নিজেরই একটি অংশ হারিয়ে ফেলেছেন তিনি।
রাকিব বলেন, “আমাদের মধ্যে কোনো কিছুই আলাদা ছিল না। যা করতাম, একসঙ্গে করতাম। এখন মনে হয়, আমার অর্ধেকটাই যেন হারিয়ে গেছে।”
দুই বছর পরও পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই, বিচার কবে হবে?
মামলার তদন্ত চলছে বলে জানানো হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতির খবর পরিবার জানে না। দীর্ঘ এই অপেক্ষা তাদের বেদনা আরও গভীর করেছে।
তবে সাতক্ষীরা তার এই সন্তানকে ভুলে যায়নি। সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের পাঠাগারের নামকরণ করা হয়েছে ‘শহীদ আসিফ পাঠাগার’। জেলার কেন্দ্রস্থল খুলনা রোড মোড় এখন পরিচিত ‘আসিফ চত্বর’ নামে। দেবহাটায় উদ্বোধন হয়েছে ‘শহীদ আসিফ হাসান মিনি স্টেডিয়াম’। এসব শুধু স্থাপনার নাম নয়, একটি প্রজন্মের আত্মত্যাগের নীরব সাক্ষী।
তবু দিনের শেষে যখন সন্ধ্যা নামে আস্কারপুরের সেই বাড়িতে, তখন একজন মা এখনও নিঃশব্দে ছেলের ঘরে ঢোকেন। বালিশে হাত রাখেন। আলমারি খুলে কাপড় গুছিয়ে রাখেন। কখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলেন, “বাবা, আর একবার যদি ফিরে আসতে…”
হয়তো কোনোদিন সেই ডাকের উত্তর মিলবে না।
জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিন পেরিয়ে সময় এগিয়েছে। বদলে গেছে রাষ্ট্র, বদলে গেছে রাজনীতির অনেক হিসাব। কিন্তু দেবহাটার আস্কারপুর গ্রামের একটি বাড়িতে সময় যেন এখনও আটকে আছে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাইয়ে। একজন মা এখনও সন্তানের জন্য অপেক্ষা করেন, একজন বাবা নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, আর একজন যমজ ভাই প্রতিদিন নিজের অর্ধেক শূন্যতা বয়ে বেড়ান।
রাষ্ট্র আজ নানা আয়োজনে শহীদ আসিফ হাসানকে স্মরণ করছে। তার নামে হয়েছে পাঠাগার, চত্বর ও মিনি স্টেডিয়াম। কিন্তু পরিবারের কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা একটাই, যে আত্মত্যাগ নতুন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্য অধ্যায় হয়ে আছে, সেই আত্মত্যাগের ন্যায়বিচার একদিন নিশ্চিত হবে।
ইতিহাসের পাতায়, জুলাইয়ের লাল-সবুজ স্মৃতিতে, আর লাখো মানুষের হৃদয়ে, আহত সহযোদ্ধাকে এক গ্লাস পানি খাওয়াতে ছুটে যাওয়া সেই তরুণের নাম চিরকাল লেখা থাকবে-শহীদ আসিফ হাসান। লেখক: সংবাদকর্মী







