বেকারত্ব: একটি মানসিক ব্যাধি ও উত্তরণ
শিরিন সিদ্দিকী
চাকরি সোনার হরিণ! আর আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তো কোনো বিশেষণেই বিশেষায়িত করার প্রশ্নই আসে না।
চাকরি মানে চাকরি। সরকারি চাকরিই আসল কথা।তা আপনি মাধ্যমিক পাস হোন আর মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনকারী হোন। একটা সরকারি চাকরিই যেন মানবজীবনের আরাধ্য চাওয়া। আর সোনার হরিণ সম এই অতীব মূল্যবান চাকরি জুটাতে গড় আয়ুর প্রায় অর্ধেক অংশ পার করে ফেলি আমরা। এখানে কোনো ভাবেই বিবেচ্য নয় যে আপনি কোন বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করেছেন। সার্টিফিকেট অর্জনের আসল মাকসাদ চাকরি!
সরকারি চাকরি। সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিয়াগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাস্ত অনেক মেধাবী চাকরিপ্রার্থী। উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি যুদ্ধ আর অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে বেকার ট্যাগ ঘুচাতে চাকরি যুদ্ধ সমান গুরুত্ব বহন করে। একমাত্র তারাই বুঝতে পারবেন যারা এই যুদ্ধে পারিবারিকতা ও সামাজিকতা, বন্ধুমহল ও প্রিয়জন ভুলে এই পথের যোদ্ধা হিসেবে সময়,শ্রম ও মেধা দিয়ে যারপরনাই চেষ্টা করে দিনরাত এক করে ফেলে জীবনের পঁচিশ-তিরিশ বসন্ত নির্বাসিত তপস্বীর জীবন যাপন করেছেন।
সমস্যা নেই ফার্মেসি বিভাগের টপার হয়েও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেলেন নাকি ইসলামী ইতিহাসের ছাত্র হয়ে ব্যাংক এর ক্যাশ ইন চার্জ হিসেবে নিয়োগ পেলেন।
ট্যাগ দরকার শুধু আপনি আর বেকার যুবকের তালিকায় নেই। আপনি এখন সরকারি চাকুরীজীবী।
ব্যস্! আপনার যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত সম্মান, মর্যাদা ও ঠিকঠাক গ্রেডিং এর চেয়ারটাতে সমাসীন হয়েছেন কিনা এতো ব্যক্তি সচেতনতা দেখানোর মতো আদিখ্যেতা বাতুলতা মাত্র। দূর্লভ এ চাকরির বাজারে আপনিও সরকারি অনুদানভুক্ত চাকর! এই সংবাদটি নিশ্চিত করতে পারলেই পেটে ভাতে আপনি ছাপোষা কেরানি। একটা মানুষ জীবন আর কী চাই!
হায় আমার সোনার বাংলাদেশ!
আহা! আমরা সোনার দামাল বঙ্গসন্তান!
মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, শরীরের রক্ত পানি করে, মগজের কোষে চাপাচাপি করে চাকরির রেসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও এনএসআই ভেরিফিকেশনের নামে কী ভয়ংকর ছলনাই না করলো! আমি সমব্যথী একজন মানুষ হিসেবে সত্যিই বুকে পাঁজরভাঙা কষ্ট অনুভব করছি।কারণ আমি নিজেও পাবলিকিয়ান হয়েও চাকরির প্রথম জীবন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবেই শুরু করেছিলাম। সে-ই অভিজ্ঞতার আলোকেই হৃদয়ের রক্তক্ষরণে হৃদক্রিয়া বন্ধের শ্বাসকষ্ট অনুভব করছি। অবশ্যই কোমলমতি শিশুদের সাথে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান স্বর্গীয় আনন্দ অনুভব হতো তবে তা বেশিদিনের সুখ অনুভুতি নয়। যখন বুঝতে পারছিলাম আমার অর্জিত জ্ঞান নয় বরং ওদের খোরাকি মেটানোর প্রয়োজন মতো আমাকেই ওদের মতো হয়ে পড়াতে হচ্ছে। দারুন একটা মর্মপীড়ার আহত হতাম নিজের ভবিষ্যৎ বিবেচনায়। তখন আমার অর্জিত সার্টিফিকেটগুলোকে নিষ্প্রয়োজন বলেই বোধ করেছি। বলতে গেলে এতো এতো মেধাবী চাকরিপ্রার্থী নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক সনদের যোগ্য পদ ও পদবির জন্যে নয়; বরং অপেক্ষাকৃত অনেক অনেক নি¤œস্তরের (অবশ্যই ছোট করছি না) বলতে গ্রেড হীন (সদ্য গ্রেডিং ভুক্ত) কিছু অর্থের বিপরীতে লাখ লাখ মেধাবীর সাথে প্রতিযোগিতা করে লিখিত, মৌখিক পরীক্ষা ফেইস করে সুপারিশপ্রাপ্ত হচ্ছেন।
তারপর আবার নিয়োগপত্র বেহাত হয়ে যাচ্ছে। আঙুল তুলছে রাষ্ট্রের দিকে।রাষ্ট্র সে অভিমান বুঝতে পারছে কি? না, পারছে না।আর পারবেও না।
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের যোগ্য শিক্ষক ততদিন পর্যন্তই ঠিকঠাক ছিল যতদিন পর্যন্ত ম্যাট্রিক পাস করেই কাক্সিক্ষত মেধাবী চাকরিপ্রার্থী রাষ্ট্র নিয়োগদান করতে পেরেছে। কারণ ম্যাট্রিকুলেশন পাশ দিয়ে তাঁরা মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবেই সেবাদানের মাধ্যমে এ মহান পেশায় নিয়োজিত থেকেছেন। তখন এক সময় ছিল বটে। কিন্তু যেদিন থেকে একজন অনার্স-মাস্টার্স শেষ করা একজন চাকরিপ্রার্থী প্রাথমিক স্তরে নিয়োগপত্র হাতে নিয়ে বিদ্যালয়ে আসেন তিনি ঠিক কতটুকু ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করতে পারেন অ আ ক খ বর্ণ পরিচয় কিংবা গণিতের ধারাপাত আত্মস্থ করাতে। এসব উচ্চ ডিগ্রিধারী সহকারী শিক্ষক মূলত চাকরিই করতে আসেন মানুষ গড়ার ব্রত নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার মতো সৎ মানসিকতার আদর্শ শিক্ষক হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারেন না।
প্রচুর উদাহরণ আছে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরিতে প্রবেশের ছয় মাস এক বছর না পেরোতেই বীতশ্রদ্ধ হয়ে নামেমাত্র মাসিক বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করে মরছে। আর বড় একটা অংশ আছেন যারা রীতিমতো আফসোস করে হাপিত্যেশ করছেন। ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত হিসেবে চাকরি করে যাচ্ছেন মাত্র। তবে অবশ্যই হাতেগোনা দু’চারজন যাঁরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন না সে ধৃষ্টতা দেখানোর স্পর্ধা আমার নেই। তাঁদের জন্য আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
আর সেই সাথে প্রশ্ন রাখছি রাষ্ট্রের কাছে একজন ফার্মেসি বিভাগের টপার শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে তাঁর ছয় সাত বছরের মগজ গলানো অর্জিত জ্ঞান প্রাক প্রাথমিক শ্রেণি থেকে শুরু করে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া কোমলমতি শিশুদের ঠিক কোন বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জনের পাথেয় হবে? আর ছোট্ট পরামর্শ হলো, যেসব মেধাবী চাকরিপ্রার্থীগণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যালেঞ্জিং সাবজেক্টসমূহে সার্টিফিকেট অর্জনের পর নিজেদের যোগ্যতা বিচারের ভার রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে সিমপ্যাথি কুড়ানোর মতো হালকা ব্যঙ্গর মোচড়ে খবরের শিরোনামে ভাইরাস ছড়াচ্ছেন তাদের ঘিলুটাকে ভাঙরির দোকানে ওজনে তুলে দিয়ে ঝুড়ি ভাজা খেতে পারেন। তবে, ইদানিং একটা আশার আলো দেখতে পাই, যখন দেখি প্রচুর সংখ্যক প্রতিষ্ঠিত চাকরিজীবী লাখ টাকার চাকরি ছেড়ে ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান ফেরি করে আত্মনির্ভরশীল হচ্ছেন। শুধুমাত্র অন্যের অধীনে চাকরি করবেন না বলে।
বেকার থাকবেন না বলে তাঁরা বেকারত্ব “শব্দটিকে কেটে ছিঁড়ে একেবারে যাচ্ছেতাই কান্ড করে বসে আছেন। সরকারি বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা থেকে শুরু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পর্যন্তও আজকাল স্ট্রিট ফুড উদ্যোক্তা! আপনি হতাশবাদী সার্টিফিকেটধারী একজন উচ্চ শিক্ষিত বেকার। আপনার কাছে যদি সাবজেক্ট ম্যাটার না করে এবং চাকরি পাওয়াই শিক্ষাজীবনের আরাধ্য হয় তবে নিজের নামের আগে বেকার ‘বিশেষণটাকে আগে ঝেড়ে ফেলুন।
আমার তো মনে হয় বেকার ‘শব্দটাকেই অভিধান থেকে আগে তুলে দেয়া দরকার। বে কার অর্থ্যাৎ নেই কাজ যার।কাজ নেই এমন মানুষ হয় না কি আবার? প্রচুর সংখ্যক শিক্ষার্থী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করে চাকরি পাচ্ছি না বেকার ইত্যাদি সেøাগানে নিষ্কর্ম অলসভাবে মূল্যবান সময় নষ্ট করে যাচ্ছে। যদি আপনার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জনের সাথে কর্মসংস্থানের খুব বেশি সাজুয্য না থেকে মানে চাকরি পাওয়াই আপনার একমাত্র লক্ষ্য হয় তবে আপনি আপনার বেকারত্বের অভিশপ্ত ট্যাগ থেকে নিজের উত্তরণ ঘটাতে পারেন। নিঃসন্দেহে বেকার ‘শব্দটি একটি মানসিক ব্যাধি। বাস্তবিক পক্ষে এ শব্দটির অস্তিত্ব মেটার করে না।
আজকাল শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েও বহু শিক্ষিত ছেলেমেয়ে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে গেছে। আপনার মেধা-শ্রম-অধ্যবসায় দিয়ে নিজের যোগ্যতা নিজেই বুঝে নিন।রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আঙুল তুলে ধৃষ্টতা প্রদর্শন কিংবা অভিমান দেখানোর মিনিমাম সময়টুকুও আত্মোন্নয়নে ও স্বাবলম্বী হওয়ার দক্ষতা অর্জনে কাজে লাগিয়ে নিজের প্রতি রহম করুন।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক (বাংলা), নাংলা পি এস জে ফাযিল ডিগ্রি মাদ্রাসা, সুজনসাহা, তালা, সাতক্ষীরা









