সোমবার, ৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বৈশাখ: উৎসবের আড়ালে বাঙালির আত্মপরিচয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১:৩৩ পূর্বাহ্ণ
বৈশাখ: উৎসবের আড়ালে বাঙালির আত্মপরিচয়

 

সচ্চিদানন্দ দে সদয়
বাংলা বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ-শুধু একটি উৎসবের নাম নয়, এটি বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, জীবনযাপন ও সংস্কৃতির সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি। ক্যালেন্ডারের একটি তারিখকে ঘিরে এত গভীর আবেগ, এত ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং এত বহুমাত্রিক অর্থ-বাংলা নববর্ষকে তাই নিছক আনুষ্ঠানিকতার গ-িতে আটকে রাখা যায় না। এটি একদিকে আনন্দ, অন্যদিকে আত্মসমালোচনা; একদিকে ঐতিহ্য, অন্যদিকে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এক চলমান প্রক্রিয়া। পহেলা বৈশাখের শেকড় নিহিত রয়েছে মুঘল আমলে। সম্রাট আকবরের প্রবর্তিত ফসলি সন মূলত রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে চালু হয়েছিল। কৃষকের ফসল তোলার সময়ের সঙ্গে খাজনা আদায়ের সময়কে সমন্বয় করার প্রয়োজনে যে বর্ষপঞ্জির জন্ম, সেটিই আজ বাঙালির সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। এই ইতিহাস আমাদের শেখায়-বৈশাখের জন্ম অর্থনীতির ভেতর, কিন্তু তার বিকাশ সংস্কৃতির ভেতর। অর্থাৎ, জীবিকা ও জীবনবোধের এক অনন্য মেলবন্ধনই পহেলা বৈশাখ। গ্রামবাংলায় বৈশাখ মানে নতুন ফসলের আনন্দ, হালখাতা, মেলা, আর মানুষের আন্তরিক মিলন। কৃষক বছরের হিসাব মেলান, ব্যবসায়ী নতুন খাতা খোলেন, আর সাধারণ মানুষ উৎসবের আমেজে মেতে ওঠেন। পান্তা-ইলিশ, গ্রামীণ মেলা, লোকগান-এসব কেবল বিনোদন নয়; এগুলো একটি সমাজের স্মৃতি, অভ্যাস ও পরিচয়ের অংশ। এখানেই বৈশাখ সবচেয়ে প্রাণবন্ত, সবচেয়ে স্বতঃস্ফূর্ত। শহরে এসে বৈশাখ অনেকটাই বদলে গেছে। এখানে উৎসবের জায়গা নিয়েছে আয়োজন। রঙিন পোশাক, ব্র্যান্ডের প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিতি-সব মিলিয়ে বৈশাখ এখন এক ধরনের “পাবলিক পারফরম্যান্স”। তবে এই রূপান্তরের মধ্যেও কিছু ইতিবাচক দিক আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের মঙ্গল শোভাযাত্রা শহুরে বৈশাখকে নতুন অর্থ দিয়েছে। এটি কেবল আনন্দযাত্রা নয়, বরং একটি প্রতীকী প্রতিবাদ, যেখানে অসাম্প্রদায়িকতা, মানবতা ও সাম্যের বার্তা তুলে ধরা হয়। পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় দিক তার সর্বজনীনতা। ধর্মীয় উৎসবগুলো যেখানে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ, সেখানে বৈশাখ সবার। এই উৎসব মানুষকে একত্রিত করে, বিভাজন ভুলিয়ে দেয়। আজকের বিশ্বে, যেখানে পরিচয়ের সংকট ও বিভাজন ক্রমশ বাড়ছে, সেখানে পহেলা বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দেয়-আমাদের একটি অভিন্ন পরিচয় আছে, আমরা বাঙালি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশাখ ক্রমশ বাণিজ্যিক হয়ে উঠছে। বড় বড় প্রতিষ্ঠান, ফ্যাশন হাউস, রেস্তোরাঁ-সবাই এই উৎসবকে কেন্দ্র করে ব্যবসার সুযোগ নিচ্ছে। এটি একদিকে অর্থনীতির জন্য ভালো, কিন্তু অন্যদিকে প্রশ্ন তোলে-উৎসবের মূল চেতনা কি হারিয়ে যাচ্ছে? বৈশাখ কি এখন শুধুই “ডিসকাউন্ট সিজন”? একসময় যে গ্রাম ছিল বৈশাখের প্রাণকেন্দ্র, আজ সেখানে উৎসবের জৌলুস কমে এসেছে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, সাংস্কৃতিক চর্চার অভাব এবং আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাব-সব মিলিয়ে গ্রামীণ বৈশাখ অনেকটাই নিস্তেজ। অন্যদিকে শহরে আয়োজনের জাঁকজমক বাড়লেও অনেক সময় তা হয়ে উঠছে কৃত্রিম। এই বৈপরীত্য আমাদের ভাবায়। বর্তমানে পহেলা বৈশাখের সামনে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে আছে- নতুন প্রজন্মের মধ্যে ঐতিহ্যচর্চার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। বড় জনসমাগমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। প্লাস্টিক ও বর্জ্যের কারণে উৎসবের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। যদিও নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবুও আশার জায়গা আছে। নতুন প্রজন্ম যদি সচেতন হয়, যদি তারা বৈশাখের প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারে, তবে এই উৎসব তার স্বকীয়তা হারাবে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও গণমাধ্যম এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পহেলা বৈশাখকে টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রেরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ, গ্রামীণ মেলা পুনরুজ্জীবন, শিল্পীদের সহায়তা-এসব উদ্যোগ না নিলে এই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে পারে। পহেলা বৈশাখ আমাদের শেখায়-পুরনোকে ঝেড়ে ফেলে নতুনকে গ্রহণ করতে। এটি কেবল একটি উৎসব নয়, বরং একটি দৃষ্টিভঙ্গি। জীবনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব, নতুন করে শুরু করার সাহস-এসবই বৈশাখের মূল শিক্ষা। বৈশাখকে আমরা কীভাবে দেখব-সেটাই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এটি কি কেবল একটি দিন, নাকি একটি চেতনা? যদি আমরা এর গভীর অর্থ উপলব্ধি করতে পারি, তবে পহেলা বৈশাখ শুধু উৎসব হয়ে থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে আমাদের আত্মপরিচয়ের শক্তিশালী ভিত্তি। বৈশাখ তখনই সত্যিকার অর্থে ‘সবার উৎসব’ হয়ে উঠবে, যখন তা আমাদের জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রতিফলিত হবে। পহেলা বৈশাখ আমাদের কেবল আনন্দ দেয় না; এটি আমাদের চিন্তা করতে শেখায়। এটি আমাদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করে, আবার ভবিষ্যতের পথও দেখায়। এই উৎসব আমাদের শেখায়-
পুরোনোকে ভুলে নয়, বরং তাকে ধারণ করেই নতুনকে গ্রহণ করতে হয়।নতুন বছরের সূর্য তাই শুধু একটি দিন নয়, এটি একটি দর্শন-পুনর্জন্মের, পুনর্গঠনের, পুনরুত্থানের। এসো, আমরা পহেলা বৈশাখকে কেবল উৎসব হিসেবে নয়, একটি দায়িত্ব হিসেবে দেখি। সংস্কৃতি রক্ষা, মানবিকতা চর্চা এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার করি। শুভ নববর্ষ

Ads small one

শার্শায় নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে সাবেক চেয়ারম্যান টিংকু গ্রেপ্তার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ৬:৩৩ অপরাহ্ণ
শার্শায় নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে সাবেক চেয়ারম্যান টিংকু গ্রেপ্তার

বাগআঁচড়া (যশোর) প্রতিনিধি: যশোরের শার্শায় অভিযান চালিয়ে কায়বা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান হাসান ফিরোজ আহম্মেদ টিংকুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল (৭ জুন) রোববার রাতে উপজেলার চালিতাবাড়ী গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃত হাসান ফিরোজ আহম্মেদ টিংকু শার্শা উপজেলার ৭নং কায়বা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কায়বা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন।

থানা সূত্রে জানা গেছে, টিংকুর বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন থানায় ৪ টি মামলা রয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার পরিবর্তনের পর থেকে তিনি পলাতক ছিলেন। দীর্ঘদিন পর এলাকায় ফিরে নাশকতার পরিকল্পনা করছেন এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তার নিজ বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

শার্শা থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) মারুফ হোসেন জানান, টিংকুর বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ চারটি মামলা রয়েছে। আইনিপ্রক্রিয়া শেষে সোমবার দুপুরে তাকে আদালতে সোর্পদ করা হয়েছে।

তথ্যের সত্যতা নিশ্চিতকরণে সচেতনতা ও ফ্যাক্ট-চেকিং শীর্ষক সেমিনার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ৩:৪৫ অপরাহ্ণ
তথ্যের সত্যতা নিশ্চিতকরণে সচেতনতা ও ফ্যাক্ট-চেকিং শীর্ষক সেমিনার

খুলনা আঞ্চলিক তথ্য অফিস পিআইডি’র আয়োজনে ‘তথ্যের সত্যতা নিশ্চিতকরণে সচেতনতা ও ফ্যাক্ট-চেকিং’ শীর্ষক দিনব্যাপী সেমিনার আজ (সোমবার) চুয়াডাঙ্গা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার।

সেমিনারে প্রধান অতিথি বলেন, আমরা তথ্য ভান্ডারের মধ্যে বসবাস করছি, যেখানে সব তথ্যের সত্যতা খালি চোখে যাচাই করা সম্ভব নয়। প্রত্যেক নাগরিক বুঝে হোক না বুঝে হোক প্রতিনিয়ত তথ্য শেয়ার করছেন। এতে অপতথ্যের অনিয়ন্ত্রিত ছড়াছড়ি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্র বৃদ্ধি পাচ্ছে। গুণগত শিক্ষার মতো গুণগত সংবাদ পরিবেশনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যাক্ট চেকিং রাজনৈতিক নেতা, সরকারি দপ্তর ও সাংবাদিকদের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। ফলস্বরূপ প্রত্যেক ঘটনার গ্রহণযোগ্যতা যেমন বৃদ্ধি পায় তেমনি জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত হয়। তিনি সাংবাদিকদের কোন প্রতিবেদন তৈরির পূর্বে গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে এবং সত্য প্রকাশে অবিচল থাকতে অনুরোধ করেন। আঞ্চলিক তথ্য অফিস খুলনার আয়োজনে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিতকরণে সচেতনতা ও ফ্যাক্ট চেকিং সেমিনারটি অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।

সেমিনারে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন খুলনা আঞ্চলিক তথ্য অফিসের সিনিয়র তথ্য অফিসার মো: মেহেদী হাসান। মূলপ্রবন্ধে অপতথ্যরোধে ফ্যাক্ট চেকিং এর গুরুত্ব তুলে ধরা এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় টুলস সম্পর্কে ধারনা দেয়া হয়।

খুলনা আঞ্চলিক তথ্য অফিসের উপপ্রধান তথ্য অফিসার এ এস এম কবীরের সভাপতিত্বে সেমিনারে চুয়াডাঙ্গা জেলা তথ্য অফিসার শিল্পী মন্ডল, চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি নাজমুল হক স্বপন, জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি এ্যাড. মানিক আকবার-সহ অন্যান্য গণমাধ্যমকর্মীরা বক্তব্য রাখেন। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন সহকারী তথ্য অফিসার মোঃ রমজান আলী।

সেমিনারে চুয়াডাঙ্গার ৩৫ জন প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার কর্মীরা অংশ নেন। তথ্যবিবরণী

ওয়েটার তত্ত্বের দেশে ক্যারিয়ারের মৃত্যু

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ৩:৩৯ অপরাহ্ণ
ওয়েটার তত্ত্বের দেশে ক্যারিয়ারের মৃত্যু

মো: মামুন হাসান

বাংলাদেশে একজন শিক্ষার্থী যদি বলে সে ডাক্তার হতে চায়, আমরা তাকে বাহবা দিই। ইঞ্জিনিয়ার হতে চাইলে গর্ব করি। বিসিএসের প্রস্তুতি নিলে আত্মীয়স্বজন পর্যন্ত তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কিন্তু একই শিক্ষার্থী যদি বলে সে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে পড়তে চায়, তখন অনেকের মুখে একটাই প্রশ্ন শোনা যায় “হোটেলে চাকরি করবে নাকি?”

এই প্রশ্নটি শুধু একটি প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের সমাজের দীর্ঘদিনের অজ্ঞতা, সংকীর্ণতা এবং পেশাগত বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি। অবাক লাগে, যে সমাজ বিদেশে গিয়ে পাঁচতারকা হোটেলের সেবা দেখে মুগ্ধ হয়, সেই সমাজ নিজের দেশে হসপিটালিটি পেশাজীবীদের সম্মান দিতে কৃপণতা করে। যে অভিভাবক সন্তানকে বিদেশে পাঠিয়ে আন্তর্জাতিক হোটেলে চাকরি পেলে গর্ব করেন, তিনিই দেশে একই বিষয়ে পড়াশোনা করতে চাইলে নিরুৎসাহিত করেন।এর চেয়ে বড় আত্মবিরোধিতা আর কী হতে পারে?

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অন্যতম অবহেলিত অথচ সম্ভাবনাময় শিক্ষাখাত ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট। এই অবহেলার কারণ দক্ষতার অভাব নয়, সুযোগের অভাবও নয়; মূল সমস্যা আমাদের মানসিকতায়। আমরা এখনো মনে করি সাদা অ্যাপ্রোন পরলে সম্মান আছে, টাই পরে অফিসে বসলে মর্যাদা আছে, কিন্তু অতিথি ব্যবস্থাপনা, হোটেল পরিচালনা বা পর্যটন শিল্পে কাজ করলে সম্মান কমে যায়। অথচ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বহু আগেই এই সংকীর্ণ চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসেছে।

সুইজারল্যান্ডের মতো দেশে হোটেল ম্যানেজমেন্ট একটি এলিট শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রপ্রধান, ব্যবসায়ী এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারাও হসপিটালিটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। কারণ এই শিক্ষা মানুষকে শুধু হোটেল পরিচালনা নয়, নেতৃত্ব, যোগাযোগ, সংকট মোকাবিলা এবং মানুষকে বোঝার দক্ষতা শেখায়। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো অনেক শিক্ষার্থী আত্মীয়স্বজনের কটূক্তির ভয়ে এই বিষয়ে ভর্তি হতে সাহস পায় না। আরেকটি প্রশ্ন আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়া উচিত। দেশের বড় বড় পাঁচতারকা হোটেলগুলোতে বিদেশি শেফ, বিদেশি কনসালট্যান্ট, বিদেশি ম্যানেজার কেন কাজ করেন? তারা কি আমাদের চেয়ে বেশি মেধাবী? অবশ্যই নয়। তাদের বড় শক্তি হলো তারা এমন সমাজ থেকে এসেছে, যেখানে দক্ষতাকে সম্মান করা হয়। আর আমরা এখনো ডিগ্রির নাম দেখে সম্মান দিই, দক্ষতার মূল্য নয়। ফলে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে।

 

যে পদগুলোতে বাংলাদেশের তরুণরা কাজ করতে পারত, সেগুলোতে বিদেশিরা নিয়োগ পাচ্ছে। আমরা একদিকে বেকারত্বের অভিযোগ করছি, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের একটি বিশাল ক্ষেত্রকে অবজ্ঞা করছি। এটা কি আত্মঘাতী নয়? আরও দুঃখজনক হলো, দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ থাকলেও সে বিষয়ে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ খুবই সীমিত। ক্যারিয়ার গাইডেন্সে এই খাতের আলোচনা প্রায় অনুপস্থিত। যেন এটি কোনো গুরুত্বপূর্ণ পেশাই নয়, কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো।

বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটন ও আতিথেয়তা শিল্প এখন অন্যতম বৃহৎ নিয়োগদাতা খাত। দুবাই, সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড কিংবা তুরস্কের অর্থনীতির দিকে তাকালেই বোঝা যায় কীভাবে পর্যটন ও হসপিটালিটি লাখ লাখ মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে।

বাংলাদেশের রয়েছে কক্সবাজার, সুন্দরবন, সেন্ট মার্টিন, পাহাড়ি অঞ্চল, প্রতœতাত্ত্বিক ঐতিহ্য এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ তৈরি করছি? উত্তর খুব সুখকর নয়। আমরা এখনো এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে অনেক মানুষ মনে করেন হোটেল ম্যানেজমেন্ট মানে ট্রে হাতে অতিথির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা। অথচ তারা জানেন না, সেই হোটেলের ব্যবস্থাপক শত কোটি টাকার সম্পদ পরিচালনা করেন, শত শত কর্মীর নেতৃত্ব দেন এবং একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সুনাম রক্ষার দায়িত্ব পালন করেন। সমস্যা আসলে পেশার নয়; সমস্যা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির।

আমরা সন্তানদের শেখাই “মানুষ কী বলবে”। কিন্তু শেখাই না “তুমি কী হতে চাও”। আমরা মর্যাদা খুঁজি পেশার নামে, দক্ষতায় নয়। ফলাফল হলো, অনেক তরুণ নিজের আগ্রহের জায়গা ছেড়ে সামাজিক চাপের কাছে হার মানে। কেউ হয়তো ভালো হসপিটালিটি ম্যানেজার হতে পারত, কেউ আন্তর্জাতিক মানের শেফ, কেউ পর্যটন উদ্যোক্তা। কিন্তু সমাজের ভ্রুকুটির কারণে তারা অন্য পথে চলে যায়।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই দক্ষতা নির্ভর অর্থনীতি গড়তে চায়, তাহলে এই মানসিকতা বদলাতেই হবে। আজ প্রয়োজন একটি সামাজিক আন্দোলনের। এমন একটি আন্দোলন, যা বলবে সব পেশার মর্যাদা সমান নয়, কিন্তু সব সম্মানজনক পেশার মর্যাদা থাকা উচিত। আর হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট নিঃসন্দেহে একটি সম্মানজনক, আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক পেশা।

প্রশ্ন একটাই আর কতদিন আমরা অজ্ঞতার কারণে একটি সম্ভাবনাময় খাতকে অবহেলা করব? আর কতদিন আমরা বিদেশি দক্ষ জনবল আমদানি করব, অথচ নিজের দেশের তরুণদের স্বপ্নকে তুচ্ছজ্ঞান করব? আর কতদিন আমরা পেশাকে নয়, পেশার নামকে সম্মান দেব? সম্ভবত সময় এসেছে আয়নায় নিজেদের দেখার। কারণ হোটেল ম্যানেজমেন্টের সংকট আসলে এই খাতের নয়; সংকট আমাদের সামাজিক মানসিকতার। আর এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে আমরা শুধু একটি শিক্ষাবিষয়কে নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির একটি বড় সম্ভাবনাকেও হারাতে থাকব।

লেখক: মো: মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।