সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

ব্যালট পেপারে ফিঙ্গারপ্রিন্ট: আগামী স্থানীয় নির্বাচনে আস্থা ফেরাতে নতুন ভাবনার সময়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬, ৫:২০ অপরাহ্ণ
ব্যালট পেপারে ফিঙ্গারপ্রিন্ট: আগামী স্থানীয় নির্বাচনে আস্থা ফেরাতে নতুন ভাবনার সময়

শেখ ফরিদ হোসেন

একটি গণতান্ত্রিক দেশের প্রাণভোমরা হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। তবে স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ ২’শতাধিক নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এরমধ্যে বেশি সনাতন ব্যালট পেপারে এবং কিছু ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ হয়েছে। প্রত্যেকটি নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বিগত কয়েক দশকে বিভিন্ন নির্বাচনকে ঘিরে জাল ভোট, ব্যালট ছিনতাই, একাধিক ব্যালটে সিল মারা, কেন্দ্র দখল এবং ফলাফল নিয়ে বিতর্কের মতো অভিযোগ বারবার জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট-নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তাই আগামী স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে মানুষের আস্থা পুনর্গঠনে নতুন ভাবনার সময় এখন সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রযুক্তি আজ বিশ্বের নানা ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করছে। নির্বাচন ব্যবস্থাও এর বাইরে নয়। এই নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নমুক্ত রাখতে বছরের পর বছর ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এর মধ্যে অনেক দেশ ইলেকট্রনিক ভোটিং, বায়োমেট্রিক ভোটার শনাক্তকরণ কিংবা ডিজিটাল যাচাই ব্যবস্থার মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যালট পেপারের সঙ্গে ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি চমৎকার সুরক্ষা ব্যবস্থা মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর দার্শনিক ও ব্যবহারিক বিতর্ক। পরিচয়ের নিশ্চয়তা ও জালিয়াতি রোধ-এই পদ্ধতির প্রধান ইতিবাচক দিক হলো ভোটারের শতভাগ পরিচয় নিশ্চিত করা।

অতীতে ‘জাল ভোট’ বা মৃত ব্যক্তির ভোট দেওয়ার মতো যে অভিযোগগুলো উঠত, আঙুলের ছাপের আধুনিক প্রযুক্তির কারণে তা অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব। যখন একজন ভোটার নিজের পছন্দের প্রার্থীকে সিল মেরে নির্দিষ্ট রেজিস্টারে নিজের আঙুলের ছাপ প্রদান করেন, তখন এটি অকাট্য প্রমাণ হিসেবে কাজ করে যে, সঠিক ব্যক্তিটিই ভোট দিয়েছেন এবং পুনরায় একই ব্যক্তির ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকে না। ফলে ভোট দেওয়ার সময় ব্যালট পেপারের নির্ধারিত স্থানে ভোটারের আঙুলের ছাপ গ্রহণ বা প্রযুক্তিগতভাবে তা সংযুক্ত করার ব্যবস্থা থাকলে প্রতিটি ব্যালটের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি হতে পারে। এর উদ্দেশ্য ভোটারকে শনাক্ত করা নয়; ভোটের গোপনীয়তা নষ্ট করা নয়; বরং ভোট গ্রহণ-পরবর্তী কোনো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে তদন্তের জন্য একটি প্রযুক্তিগত যাচাইয়ের সুযোগ রাখা।

যদি কোনো কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়েছে অথবা একাধিক ব্যালটে একই ব্যক্তির সিল মারার অভিযোগ উঠেছে। বর্তমান ব্যবস্থায় এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু যদি ব্যালটে নিরাপদভাবে সংরক্ষিত ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশ্লেষণের সুযোগ থাকে, তাহলে আদালতের নির্দেশ বা আইনসম্মত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন সহজ হতে পারে। এতে দোষী ব্যক্তি, দায়িত্বে অবহেলাকারী কর্মকর্তা কিংবা সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং ভবিষ্যতে অনিয়মের প্রবণতা কমানোর ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে এই ধারণার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও কম নয়। গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মৌলিক ভিত্তি হলো গোপন ব্যালট। কোনো অবস্থাতেই এমন প্রযুক্তি গ্রহণ করা যাবে না, যাতে একজন ভোটার কাকে ভোট দিয়েছেন, তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, তথ্য সংরক্ষণের নীতিমালা, প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা, বাস্তবায়নের ব্যয়, সাংবিধানিক বৈধতা এবং বিদ্যমান নির্বাচনী আইনের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য-সবকিছু গভীরভাবে পর্যালোচনা অপরিহার্য। ফলে প্রযুক্তি যেন স্বচ্ছতা বাড়ানোর পরিবর্তে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি না করে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। এবং নির্বাচন কমিশন, প্রযুক্তিবিদ, আইনজ্ঞ, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদেরঅংশগ্রহণে এ বিষয়ে উন্মুক্ত আলোচনা বা একটি বিস্তৃত জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে এর সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হবে। প্রয়োজনে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে এর কার্যকারিতা যাচাই করে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

গণতন্ত্রের শক্তি কেবল ভোট গ্রহণে নয়, সেই ভোটের প্রতি মানুষের বিশ্বাসে। সেই বিশ্বাস আরও সুদৃঢ় করতে নতুন প্রযুক্তি, নতুন ধারণা এবং নতুন সংস্কার নিয়ে প্রযুক্তি, আইন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয় অপরিহার্য। নতুন কোনো ধারণা গ্রহণের আগে তা নিয়ে মুক্ত আলোচনা, সমালোচনামূলক মূল্যায়ন এবং বাস্তবসম্মত পরীক্ষা-নিরীক্ষা হওয়া উচিত। কারণ একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন কেবল একটি সরকারের বৈধতা নিশ্চিত করে না; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও আরও শক্তিশালী করে। তাই বাংলাদেশে এমন একটি নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ফলাফল নয়, পুরো প্রক্রিয়াটিই জনগণের কাছে প্রশ্নাতীতভাবে গ্রহণযোগ্য হবে।

লেখক: শেখ ফরিদ হোসেন, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সূর্যের আলো, সাতক্ষীরা।

Ads small one

সম্পাদকীয়/প্রসঙ্গ: নদী-খাল দখলমুক্ত করার উদ্যোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬, ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়/প্রসঙ্গ: নদী-খাল দখলমুক্ত করার উদ্যোগ

সাতক্ষীরা জেলার দীর্ঘস্থায়ী ও অভিশাপতুল্য জলাবদ্ধতা সংকটের মূল উৎস নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ হওয়া। কপোতাক্ষ, ইছামতি ও বেতনার মতো প্রবাহমান নদীসহ অসংখ্য সরকারি খাল বছরের পর বছর ধরে প্রভাবশালী দখলদারদের পেটে চলে গেছে। নদী ও খালের জমি গিলে খেয়ে গড়ে তোলা হয়েছে ইটভাটা, শিল্পকারখানা, মাছের ঘের এবং পাকা বসতবাড়ি। এর মাশুল গুণতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে—সামান্য বৃষ্টিতেই জলজটে অচল হয়ে পড়ে জীবনযাত্রা, দেখা দেয় তীব্র মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়। এই বাস্তবতায় জেলা প্রশাসন কর্তৃক ৩০২ জন অবৈধ দখলদারের চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত এবং ৫০ দিনের বিশেষ ‘ক্র্যাশ’ অভিযানের পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, সদর উপজেলার বাবুলিয়া মৌজায় নদী দখল করে গড়ে ওঠা ইটভাটা কিংবা বিনেরপোতায় বেতনা নদীর সীমানার ভেতরে নির্মাণাধীন বিনোদন ও প্রক্রিয়াজাত অবকাঠামো স্পষ্ট করে দেয়, কী পরিমাণ বেপরোয়াভাবে নদীকে লুণ্ঠন করা হয়েছে। কোথাও কোথাও সরকারি খালের অস্তিত্বই মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার উপক্রম। সাতক্ষীরাবাসীর বহুদিনের দাবি ছিলÑপানির প্রবাহ সুগম করতে এই ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
তবে আশঙ্কার জায়গাটি হলো অতীতেও এমন বহু তালিকা প্রণয়ন ও অভিযানের উদ্যোগ আমরা দেখেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ছত্রছায়া, আইনি জটিলতা কিংবা অদৃশ্য প্রভাবে সেই অভিযানগুলো ছোটখাটো দখলদারদের ওপর দিয়ে গিয়েই শেষ হয়ে গেছে; ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে প্রভাবশালী শ্রেণি। ফলে এবার জেলা প্রশাসনের এই অভিযান যেন আর ১০টি ‘লোকদেখানো’ উদ্যোগের মতো মুখ থুবড়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। আইনের প্রয়োগ হতে হবে সার্বজনীন ও বৈষম্যহীন।
অভিযানের পাশাপাশি কিছু বাস্তবভিত্তিক চ্যালেঞ্জও সামনে আসবে। বিশেষ করে লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং খাসের জমিতে বাস করা প্রকৃত ভূমিহীন পরিবারগুলোর টেকসই পুনর্বাসনের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে হবে। ভূমিহীনদের অজুহাতে যেন কোনো শিল্পপতি বা প্রভাবশালী পার না পায়, আবার অভিযান চালাতে গিয়ে যেন কোনো হতদরিদ্র পরিবারকে আশ্রয়হীন করা না হয়Ñএই ভারসাম্যের প্রতি সংবেদনশীল থাকা প্রয়োজন।
নদী ও খাল বাঁচলে সাতক্ষীরা বাঁচবে। তাই নদী রক্ষা কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ক্র্যাশ অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করার মাধ্যমে কপোতাক্ষ, বেতনা ও ইছামতিকে মুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগে শুধু সাময়িক উচ্ছেদ নয়, উচ্ছেদকৃত জমি যাতে পুনরায় হাতছাড়া না হয়, তার জন্য স্থায়ী তদারকি ও সীমানা নির্ধারণ প্রয়োজন। সাতক্ষীরার লাখ লাখ মানুষ জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছেন; জেলা প্রশাসন এবার তাদের প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়নে দৃঢ় ও আপসহীন থাকবেÑএটাই আমাদের প্রত্যাশা।

 

পরাজিত হলেও প্রতিশ্রুতির ১২ অঙ্গীকার পূরণে কাজ করার ঘোষণা বিএনপি প্রার্থীর

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ১১:৩০ অপরাহ্ণ
পরাজিত হলেও প্রতিশ্রুতির ১২ অঙ্গীকার পূরণে কাজ করার ঘোষণা বিএনপি প্রার্থীর

শ্যামনগর প্রতিনিধি: নির্বাচনে জয়ী হতে না পারলেও উপকূলীয় এলাকার উন্নয়নে দেওয়া প্রাক্-নির্বাচনী ১২টি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ড. মো. মনিরুজ্জামান। সোমবার বেলা ১১টায় শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাব কার্যালয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে ‘উপকূলীয় জনপদ, হতে হবে নিরাপদ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এই কথা বলেন তিনি।
সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান অভিযোগ করে বলেন, সরকারের এক প্রভাবশালী আমলার হস্তক্ষেপের কারণেই নিশ্চিত জয় হাতছাড়া করে তাঁকে আইনসভায় যাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে। ভোটাররা প্রতিপক্ষকে তাঁর চেয়ে যোগ্য মনে করেছেন বলেই জয়ী হয়েছেন—এমন মন্তব্য করলেও তিনি জানান, এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রতিশ্রুতি পূরণে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মনিরুজ্জামান উল্লেখ করেন, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার স্থবিরতা কাটাতে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নতুন ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এই জনপদের যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নে কাজ চলছে। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্প বিকাশ, ফিশ প্রসেসিং সেন্টার ও পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার ব্যাপারেও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় মধু শিল্পের সম্প্রসারণ এবং এলাকার একমাত্র উচ্চমাধ্যমিক নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
প্রেসক্লাবের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক সামিউল মনিরের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা কামালের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সোলায়মান কবির, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক আশেক-ই এলাহী মুন্না ও ডাকসুর সাবেক নেতা অধ্যাপক আবু সাঈদ।

 

সাপ্তাহিক ‘বেগম’: বাঙালি নারীর কণ্ঠস্বর ও জাগরণের প্রতীক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ১১:২৬ অপরাহ্ণ
সাপ্তাহিক ‘বেগম’: বাঙালি নারীর কণ্ঠস্বর ও জাগরণের প্রতীক

সাকিবুর রহমান বাবলা
২০ জুলাই বাংলা সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও নারী জাগরণের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। ১৯৪৭ সালের এই দিনে কলকাতার ওয়েলেসলি স্ট্রিট থেকে প্রকাশিত হয় বাংলা ভাষার প্রথম সচিত্র নারী সাপ্তাহিক ‘বেগম’। দেশভাগের প্রাক্কালে যখন নারীদের শিক্ষা, সাহিত্যচর্চা ও জনজীবনে অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত সীমিত, তখন ‘সওগাত’-এর সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের দূরদর্শী উদ্যোগে প্রকাশিত এই পত্রিকা নারী সমাজের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। তৎকালীন প্রতিকূল সামাজিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মুসলিম নারীদের শিক্ষার আলোয় আনার লক্ষ্যেই ছিল। পত্রিকার প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদে স্থান পেয়েছিল নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ছবি। মাত্র ৫০০ কপি মুদ্রিত চার আনা মূল্যের সেই সংখ্যাই পরবর্তীকালে একটি ঐতিহাসিক আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করে।
পত্রিকাটির প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি ও সমাজনেত্রী বেগম সুফিয়া কামাল। তিনি প্রথম চার মাস সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তখন বিএ শ্রেণির ছাত্রী নূরজাহান বেগম শুরু থেকেই ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল ও লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের একদল তরুণী শিক্ষার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণে গড়ে ওঠে ‘বেগম’-এর প্রাথমিক কর্মপরিসর। পরবর্তীকালে নূরজাহান বেগম সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রায় ছয় দশক ধরে পত্রিকাটিকে সফলভাবে পরিচালনা করেন। সম্পাদকীয় বিভাগে ফজলে লোহানীরও গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা ছিল।
দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে ‘বেগম’-এর কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। সে সময় নারীদের ছবি প্রকাশ করা অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। রক্ষণশীল সমাজে অনেক নারী ছদ্মনামে লিখতেন, কিন্তু ‘বেগম’ তাঁদের নিজস্ব নাম ও ছবিসহ লেখা প্রকাশের জন্য উৎসাহিত করত। এটি ছিল তৎকালীন সময়ে এক বৈপ্লবিক ঘটনা। এর ফলে অসংখ্য নারী প্রথমবারের মতো জনপরিসরে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরার সুযোগ পান।
নারী সাংবাদিকতার বিকাশে ‘বেগম’-এর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৮ ও ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যাগুলোও পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং নারীদের লেখালেখির পরিসর সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখে। এটি শুধু সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রই তৈরি করেনি, বরং নারী সাংবাদিক, সম্পাদক ও সাহিত্যিক তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবেও গড়ে উঠেছিল। সুফিয়া কামাল, শামসুন্নাহার মাহমুদ, জাহানারা আরজু, নীলিমা ইব্রাহিম, রাজিয়া খাতুন, প্রতিভা গাঙ্গুলী, সেলিনা পান্নি এবং পরবর্তীকালে সেলিনা হোসেনসহ বহু বিশিষ্ট লেখকের সাহিত্যজীবনের সঙ্গে ‘বেগম’-এর নিবিড় সম্পর্ক ছিল।
বেগম’ কেবল একটি পত্রিকা ছিল না, বরং তা তৎকালীন পাঠিকাদের কাছে একটি ‘পরিবার’-এর মতো হয়ে উঠেছিল। ডাকযোগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পত্রিকা পৌঁছানো এবং পাঠিকাদের চিঠি ও লেখা প্রকাশের মাধ্যমে এটি শহর ও গ্রামের নারীদের মধ্যে একটি শক্তিশালী যোগাযোগসূত্র গড়ে তোলে, যা ‘বেগম-পাঠিকা সভা’ নামেও পরিচিতি পায়। এই সংযোগ নারীদের একাকীত্ব দূর করে তাঁদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। সাহিত্য ও সামাজিক বিষয়ের পাশাপাশি পরিবার ও জীবনযাপনভিত্তিক নানা বিষয়ও নিয়মিত প্রকাশিত হতো।
১৯৫৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বেগম ক্লাব’। শামসুন্নাহার মাহমুদ ছিলেন এর সভাপতি, নূরজাহান বেগম সেক্রেটারি এবং সুফিয়া কামাল অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন। এটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম নারী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ক্লাব হিসেবে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। ষাট ও সত্তরের দশকে ‘বেগম’ জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে। নারী শিক্ষা, আইনি অধিকার, সামাজিক বৈষম্য, কুসংস্কার দূরীকরণ ও আত্মনির্ভরতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়মিত স্থান পেত এর পাতায়।
বর্তমানে ‘বেগম’ মাসিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে এবং এর প্রচ্ছদমূল্য ৫০ টাকা। নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা ফ্লোরা নাসরিন খান পত্রিকাটির দায়িত্ব পালন করছেন। ডিজিটাল যুগে মুদ্রিত পত্রিকার নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ‘বেগম’ তার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। একই সঙ্গে, সাত দশকের সমৃদ্ধ আর্কাইভ ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা সময়ের দাবি, যা নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা যোগাবে। বাংলা সাংবাদিকতা ও নারী জাগরণের ইতিহাসে ‘বেগম’ কেবল একটি পত্রিকা নয়; এটি নারী আত্মপ্রকাশ, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক অগ্রগতির এক ঐতিহাসিক প্রতীক।