নিজস্ব প্রতিনিধি: এক রাতের রেকর্ড বৃষ্টিতে তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে সাতক্ষীরায়। পৌরসভাসহ বিভিন্ন উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। সরকারি দপ্তর, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক কার্যক্রম। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রাতে জেলায় ১৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই বৃষ্টিপাত আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানানো হয়েছে, যা পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
রাতভর টানা বর্ষণে পৌর সদরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানসহ বিভিন্ন এলাকা এখন পানিতে থইথই করছে। সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ, কলেজ মাঠ, হাসপাতাল চত্বর, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ একাধিক সরকারি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনায় পানি জমে গেছে। বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ রোড থেকে শুরু করে মাছখোলা এলাকার বাসিন্দারা। এই এলাকার রাস্তাঘাটে এখন হাঁটুসমান পানি। ডুবে গেছে ঘরবাড়ি, রান্নাঘর ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা। স্থানীয়দের অভিযোগ—অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব ও নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার না করায় এই ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ রোডের বাসিন্দা সবুর গাজী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বছরের পর বছর ধরে সাতক্ষীরার মানুষ একই দুর্ভোগে পড়ে আছে। পৌর কর্তৃপক্ষ কোনো কাজই ঠিকমতো করে না, সব কাজে তারা অনিয়ম করে থাকে। আমরা ২০ বছর এখানে বসবাস করছি; আগে হালকা বৃষ্টিতে তলিয়ে যেত, আর এখনো তাই যায়। তাহলে উন্নতিটা হলো কী? এখন বলছেন, নতুন সরকার এসেছে কাজ হবে। আল্লাহ জানেন আদৌ কাজ হবে কি না।”
একই এলাকার মাছখোলা গ্রামের গৃহবধূ শাহানারা বেগম বলেন, “১০ বছর ধরে এমন হয়, কিন্তু কোনো সমাধান নেই। রান্নাঘরে পানি ঢুকে হাঁড়ি-পাতিল নষ্ট, বন্ধ হয়ে গেছে খাওয়া-দাওয়া। সাপ-মাকড় ঢুকে পড়েছে, ঘুমাতে পারছি না। সন্তানদের নিয়ে নিরাপদ জায়গায় থাকতে হচ্ছে।”
শিক্ষা কার্যকলাপেও স্থবিরতা নেমে এসেছে। বৃষ্টিতে ‘দক্ষিণবঙ্গের অক্সফোর্ড’ খ্যাত সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ টু মাছখোলা সড়ক এবং কলেজের খেলার মাঠ পানিতে তলিয়ে গেছে। কলেজের শিক্ষার্থী সবুজ বলেন, “পানির কারণে কলেজে যেতে পারি না। হাঁটু পানি পার হয়ে যেতে আমাদের পোশাক নষ্ট হয়ে যায়। ফলে এই সময়টা খুব দুর্ভোগে থাকতে হয়। টিউবওয়েল ডুবে গেছে, পানি কিনে ব্যবহার করতে হচ্ছে।”
একই অবস্থা কলারোয়া পৌর সদরের ঐতিহ্যবাহী বেত্রবতী আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ের বিস্তীর্ণ এলাকা, কার্যালয় ও শ্রেণিকক্ষ হাঁটুপানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় সাড়ে ৩০০ শিক্ষার্থীর শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য জেলা পরিষদ ও পৌর প্রশাসকসহ জনপ্রতিনিধিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাশেদুল ইসলাম কামরুলসহ কর্তৃপক্ষ।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশুরা। প্যান্ট গুটিয়ে, বই-খাতা ও স্কুলব্যাগ বাঁচিয়ে কোনোমতে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে তাদের। এতে যেমন পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার দক্ষিণ দেবনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠটি নিছু হওয়ায় প্রতি বছর বর্ষায় চারপাশ থেকে পানি এসে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এবার মাঠ ছাড়িয়ে শৌচাগারে যাওয়ার পথটিও পানির নিচে চলে গেছে। বিদ্যালয় প্রশাসন জানায়, মাঠ ভরাট ও স্থায়ী পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত আবেদন করা হলেও দীর্ঘ দিনেও কার্যকর সমাধান মেলেনি।
বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আবু সাঈদ বলেন, “সরকার যেখানে শিশুদের শিক্ষা ও খেলাধুলার পরিবেশ উন্নয়নে জোর দিচ্ছে, সেখানে জলাবদ্ধতার কারণে এই বিদ্যালয়ের শিশুরা স্বাভাবিকভাবে ক্লাসে অংশ নিতে পারছে না। বাধ্য হয়ে অনেক অভিভাবক নিজেরাই সন্তানদের বিদ্যালয়ে পৌঁছে দিচ্ছেন।” বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক জোছনা আরা বলেন, “শিশুদের এই সীমাহীন কষ্ট দেখে চুপ থাকা যায় না। তাই জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত ও স্থায়ী সমাধানের জন্য জোর দাবি জানিয়েছি।”
অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ১৪৯ নম্বর শ্রীফলকাটি পশ্চিমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। সেখানে মাঠের পানি উপচে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সমস্যার স্থায়ী সমাধান ও মাঠ ভরাটের জন্য গত ৮ জুলাই জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শহিদুল ইসলাম।
এদিকে বৃষ্টির কারণে কাজ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন দিনমজুর ও ভ্যানচালকের মতো খেটে খাওয়া মানুষ। ভ্যানচালক ভোলা জানান, “বৃষ্টির জন্য ভ্যান নিয়ে বের হতে পারছি না, ভাড়াও নেই। প্রতিদিনের চাল-ডাল কেনা বন্ধ। এনজিওর কিস্তি কীভাবে দেবো, সেই চিন্তায় আছি।” একইভাবে দিনমজুর আখতারুল ইসলাম বলেন, “দুই দিন ধরে ঘরে বসে আছি। কোনো কাজ নেই। পরিবার নিয়ে খুব সমস্যায় পড়ে গেছি।”
সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্নব দত্ত বলেন, “নতুন সরকারের নেতৃত্বে জেলার বিভিন্ন খাল ও নদী খনন করা হচ্ছে। ফলে আমি মনে করি এবার হয়তো শহরের জলাবদ্ধতা দূর হবে। পাশাপাশি শহরের স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হবে এবং প্রাণসায়ের খালে পানি নিয়ে যাওয়ার জন্য সব ড্রেন সচল করে প্রাণসায়ের খালের সাথে যুক্ত করা হবে। তখন আশা করি পরিস্থিতির উন্নতি হবে।”