শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩

মুক্তমত: জলাবদ্ধতার নগরীতে পরিণত হচ্ছে সাতক্ষীরা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ১১:০৭ অপরাহ্ণ
মুক্তমত: জলাবদ্ধতার নগরীতে পরিণত হচ্ছে সাতক্ষীরা

গাজী হাবিব

শেষ আষাঢ়ে বৃষ্টিপাত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে শুরু। কখনও মুষলধারে, কখনও টিপটিপ, আবার কখনও ইলিশেগুঁড়ি বৃষ্টিতে টানা প্রায় দেড় দিনের বেশি সময় ভিজেছে সাতক্ষীরা। প্রকৃতির এই বর্ষণ নতুন কিছু নয়। বর্ষাকালে বৃষ্টি হবেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো- প্রতিবার বৃষ্টির পর কেন সাতক্ষীরা শহর যেন ছোট ছোট জলাশয়ে পরিণত হয়? কেন সরকারি অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক এমনকি মানুষের বসতবাড়িও পানির নিচে চলে যায়?

শুক্রবার বেলা ১১টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় সাতক্ষীরায় ২২৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে স্থানীয় আবহাওয়া অফিস। এটি নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টি। কিন্তু শুধুমাত্র বৃষ্টিপাতকে দায়ী করলে বাস্তবতার বড় অংশ আড়াল করা হবে। কারণ প্রকৃত সমস্যা হচ্ছে- পানি দ্রুত নিষ্কাশনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ মাঠ, সদর হাসপাতাল চত্বর, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনা পানিতে ডুবে গেছে। সরকারি কলেজ-মাছখোলা সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে থাকায় শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, রোগী ও সাধারণ মানুষের চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে। বহু বাড়ির উঠান, টয়লেট ও নলকূপ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও রান্নাঘর পর্যন্ত পানিতে ডুবে যাওয়ায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নি¤œ আয়ের মানুষ। বৃষ্টির কারণে মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। ফলে শ্রমজীবী মানুষের আয় প্রায় বন্ধ। অনেকেই বলছেন, “আজ কাজ নেই, আয় নেই; সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।”

অন্যদিকে কৃষকদের অবস্থাও সুখকর নয়। নি¤œাঞ্চলের ফসলের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক ক্ষেতেই সবজি ও আমনের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হলে কৃষির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে।

শুধু ব্যক্তিগত ভোগান্তিই নয়, জনস্বাস্থ্যও এখন বড় ঝুঁকির মুখে। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল চত্বরে পানি জমে থাকায় রোগীদের যাতায়াত কষ্টকর হয়ে উঠেছে। নোংরা পানি জমে থাকায় ডেঙ্গু, ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে রসুলপুর, কাটিয়া, সুলতানপুর, ইটাগাছা, গদাইবিল, রাজারবাগান, ডাইয়ের বিল, কামালনগর, মাছখোলা এবং শহরের আরও কয়েকটি নি¤œাঞ্চল। এসব এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। স্থানীয়দের ভাষায়, বর্ষা এলেই মনে হয় আমরা শহরে নয়, জলাবদ্ধতার মধ্যে বসবাস করছি।
প্রশ্ন উঠছে- প্রতিবছর একই চিত্র কেন?

স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পৌর এলাকার ভেতরে ও আশপাশে গড়ে ওঠা অপরিকল্পিত মাছের ঘের, সংকুচিত ও দখল হয়ে যাওয়া খাল, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার না করার কারণেই পানি নামতে পারছে না। বছরের পর বছর ধরে খাল-নালা ভরাট হয়েছে, কোথাও অবৈধ স্থাপনা হয়েছে, কোথাও ময়লা-আবর্জনায় পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য অতিবৃষ্টিতেই পুরো শহর অচল হয়ে পড়ে।

বাস্তবতা হলো, সাতক্ষীরা একটি নি¤œভূমির জেলা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখানকার বৃষ্টিপাতের ধরনও বদলাচ্ছে। স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। তাই পুরোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। অথচ শহর সম্প্রসারণ হয়েছে, নতুন নতুন ভবন তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে ড্রেন, খাল কিংবা পানি নিষ্কাশনের অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।

দুঃখজনক হলেও সত্য, জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি সুফল খুব একটা চোখে পড়ে না। বরং পৌরবাসীদের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজের মান, তদারকি এবং রক্ষণাবেক্ষণে নানা ধরনের অনিয়ম রয়েছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি প্রতিবছর একই দুর্ভোগে মানুষকে পড়তে হয়, তাহলে প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

সাতক্ষীরা আবহাওয়া কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন জানিয়েছেন, শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ২২৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী কয়েকদিনও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।

অন্যদিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্নব দত্ত জানিয়েছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল খননের কাজ চলছে। পাশাপাশি শহরের স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হবে এবং বিভিন্ন ড্রেন সচল করে প্রাণসায়ের খালের সঙ্গে সংযুক্ত করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রম শেষ হলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

এই উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। তবে প্রশ্ন হলো- এগুলো কি কেবল সাময়িক সমাধান, নাকি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ? কারণ নাগরিকরা প্রতি বর্ষায় একই আশ্বাস শুনতে শুনতে ক্লান্ত।

জলাবদ্ধতা এখন সাতক্ষীরায় পৌর ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার একটি পরীক্ষাও বটে। প্রয়োজন একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান। শহরের সব খাল উদ্ধার, ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণ, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যৎ নগরায়ণকে পরিকল্পনার আওতায় আনা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

প্রকৃতিকে দোষ দিয়ে দায় এড়ানো সহজ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রকৃতি তার নিয়মেই চলছে; আমাদের নগর ব্যবস্থাপনাই সেই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হচ্ছে। সাতক্ষীরার মানুষ আর আশ্বাস নয়, টেকসই সমাধান চায়। তারা এমন একটি পরিচ্ছন্ন শহর চায়, যেখানে বর্ষা আনন্দের বার্তা বয়ে আনবে- দুর্ভোগের নয়। লেখক: সাংবাদিক, সমাজকর্মী

 

Ads small one

সম্পাদকীয়/ কপোতাক্ষের খালে পাট পচন: জলাশয় রক্ষা ও মৎস্যজীবীদের বাঁচাতে দরকার টেকসই সমাধান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ কপোতাক্ষের খালে পাট পচন: জলাশয় রক্ষা ও মৎস্যজীবীদের বাঁচাতে দরকার টেকসই সমাধান

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার কৃষ্ণনগর-সেনেরগাঁতী খালের সুুইসগেট বন্ধ রেখে দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিমভাবে পানি আটকে পাট পচানো হচ্ছে। এতে খালের পানি বিষাক্ত ও দূষিত হয়ে যেমন ব্যাপক হারে মাছ মারা যাচ্ছে, তেমনি তীব্র দুর্গন্ধে হুমকির মুখে পড়েছে স্থানীয় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য। সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে স্থানীয় মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের ওপর—যাঁরা জীবন-জীবিকার জন্য বহু বছর ধরে এই জলাশয়ের মাছের ওপর নির্ভরশীল। খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ রুদ্ধ হওয়ায় আজ তাঁরা কর্মহীন, ফলে বাধ্য হয়ে এনজিওর ঋণ ও দেনার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে বহু পরিবার।
কৃষিপ্রধান আমাদের এই অঞ্চলে পাট উৎপাদন ও পাট পচানো কৃষকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক কর্মকা-, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কৃষির একটি খাতকে রক্ষা করতে গিয়ে যদি কপোতাক্ষ নদসংলগ্ন খালের স্বাভাবিক ইকোসিস্টেম বা পরিবেশ ধ্বংস করা হয় এবং অন্য একটি পেশাজীবী সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ নিস্ব ও উপবাসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়, তবে তা কোনোভাবেই টেকসই বা গ্রহণযোগ্য উন্নয়ন হতে পারে না।
প্রভাবশালী মহলের সুবিধার্থে খালের ওপর নির্মিত কপোতাক্ষের পানির কপাট বা সুইচগেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত কেবল ব্যক্তিস্বার্থই চরিতার্থ করে, অথচ তা সামগ্রিক জনস্বার্থ ও সরকারি জলাশয় ব্যবস্থাপনার মূলনীতির পরিপন্থী। উন্মুক্ত জলাধারে এভাবে পানিপ্রবাহ আটকে রাখা এবং পরিবেশদূষণ ঘটানো পরিবেশ আইন ও মৎস্য সুরক্ষা আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
এই সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। কৃষ্ণনগর খালের সুইচগেটটি খুলে দিয়ে দ্রুত কপোতাক্ষের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ চালু করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে দূষিত পানি সরে গিয়ে পরিবেশ তার স্বাভাবিক ভারসাম্য ফিরে পায়। পাশাপাশি, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক পদ্ধতিতে পাট পচানোর ব্যবস্থা জোরদার করতে কৃষি বিভাগকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু তা-ই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত ও দেনাগ্রস্ত জেলে পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনে জরুরি সহায়তা প্রদান করা সরকারের দায়িত্ব। জলাশয় সবার, একে ব্যক্তিস্বার্থে জিম্মি করে পরিবেশ ও জনজীবন বিপন্ন করার সংস্কৃতি এখনই বন্ধ করতে হবে।

 

 

 

শ্যামনগরে সালিসে হত্যার হুমকির অভিযোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ
শ্যামনগরে সালিসে হত্যার হুমকির অভিযোগ

শ্যামনগর প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জমিজমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আয়োজিত সালিস বৈঠকে পুলিশের উপস্থিতিতেই অভিযোগকারীকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মো. মোকসেদ আলী নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ২৬ আগস্ট বিকেলে শ্যামনগর সদরে এ ঘটনা ঘটে।
অভিযোগকারী নকিপুর গ্রামের বাসিন্দা সুজা মাহমুদ জানান, তাঁদের কেনা ও দীর্ঘদিনের ভোগদখলীয় জমিতে গত ২৫ আগস্ট চাষাবাদ করতে গেলে মোকসেদ আলীসহ কয়েকজন বাধা দেন এবং মারধরের হুমকি দেন। এ নিয়ে স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তি ও দুই পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে সালিস বৈঠক বসে। অভিযোগকারীর দাবি, সালিসে মোকসেদ আলী জমির কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। উল্টো সালিস চলাকালেই তিনি সুজা মাহমুদকে জমিতে গেলে প্রাণনাশের হুমকি দেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মো. মোকসেদ আলী নিজেকে ‘ভূমিহীন নেতা’ দাবি করে বলেন, জমিটি সরকারি খাসজমি এবং তা ভূমিহীনদের বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
আইনজীবী এসএম বিপ্লব হোসেন বলেন, জমিটি খাস নাকি বন্দোবস্ত দেওয়াÑতা সরকারি খতিয়ান ও নথি দেখে নির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা হুমকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সাতক্ষীরায় রেল লাইন ও সম্ভাবনা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ
সাতক্ষীরায় রেল লাইন ও সম্ভাবনা

 

শ্যামল শীল
১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর দর্শনা-জগতি রেললাইন নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথম রেলওয়ের সূচনা হয়। সেন্ট্রাল রেলওয়ে নামে পরিচিত বনগাঁ-যশোর-খুলনা ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণ করা হয় ১৮৮২-৮৪ সালে । এ সময় নাভারনে রেলওয়ে স্টেশনও নির্মাণ করা হয়। ১৯১৪ সালে ভাইসরয় অব বৃটিশ ইন্ডিয়া কলকাতা থেকে নাভারণ হয়ে সাতক্ষীরার মধ্য দিয়ে সুন্দরবন পর্যন্ত রেল লিংক স্থাপনের নির্দেশ দেন এবং সেটি অনুমোদনও করেন। ১৯৫৮ সালে সাতক্ষীরা ভেটখালী সড়ক নির্মাণের সময়েও রেলের জায়গা রেখে জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা নেওয়ার কথা শোনা যায়। কালেক্রমে দেশে ২ হাজার ৮৭৭ কি. মি. রেল লাইন নির্মাণ করা হয়। রেল নেটওয়ার্কে দেশের ৪৪টি জেলা সংযুক্ত হয়। কিন্তু সাতক্ষীরা থেকে যায় অবহেলিত।
দেশের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এবং বাণিজ্য নির্ভর ও অর্থনীতির সুতিকাগার হিসেবে সাতক্ষীরা বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত করেছে। জেলার বিশলক্ষাধীক মানুষের যাতায়াত এবং যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম সড়ক পথ আর তাই জেলাবাসির দীর্ঘদিনের দাবী প্রত্যাশা আর বাস্তবতার নিরিখে যথাযথ প্রত্যাশা রেলপথ, রেল যোগাযোগ। এই মাধ্যমটি যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে খরচ অনেকাংশে কম, সাতক্ষীরা বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘনিষ্ট ভাবে সম্পৃক্ত। এবং অভ্যন্তরীন বানিজ্য নির্ভর। এই জেলায় উৎপাদিত চিংড়ী বিশ্ব বাজারে রপ্তানীর মাধ্যমে দেশ প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করে, এই চিংড়ী পণ্য পরিবহনে রেল যোগাযোগ, রেলপথ কাঙ্খিত ভূমিকা পালন করতে পারে বিশেষত পণ্য পরিবহনে খরচ কম সহ হিমায়িত বিষয় গুলোতে সুবিধা পাবে। দেশের অন্যতম স্থল বন্দর সাতক্ষীরার ভোমরায় অবস্থিত। দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা ভোমরা বন্দর ব্যবহারে বিশেষ উৎসাহিত হতো যদি জেলায় রেলপথ থাকতো। আর এ ক্ষেত্রে আমদানী ও রপ্তানী কৃত পণ্য সামগ্রী ট্রাকের পরিবর্তে রেলে নিলে পণ্য পরিবহন খরচ অনেকাংশে হ্রাস পাবে। বেনাপোল সহ দেশের অপরাপর বন্দর গুলো রেলযোগাযোগ সুবিধা পেয়ে আসছে। সাতক্ষীরা কৃষি প্রধান এলাকা এই জেলাকে শস্য ভান্ডার বলা হয়। কৃষক তার ক্ষেতে উৎপাদিত পণ্য ট্রাকের পরিবর্তে রেলে আনা নেওয়া করলে পণ্য পরিবহন খরচ অনেকাংশে কমবে। অন্যদিকে সাধারন ব্যবসায়ীরা আড়ৎদার ও পাইকারী ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন যাবৎ রাজধানী ঢাকা বা অন্যান্য শহর হতে পণ্য সামগ্রী ট্রান্সপোর্টের মাধ্যমে আনা নেওয়া করে থাকে যা অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়। সাম্প্রতিক সময় গুলোতে ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ীরা পণ্য সামগ্রী আনা নেওয়া ক্ষেত্রে কোন কোন ক্ষেত্রে নিজেদের খেয়াল খুশি মত মূল্য নির্ধারন করে গ্রাহকদের অস্বস্তিতে ফেলছে। রেলগাড়ী দৃশ্যতঃ বিপুল সংখ্যক যাত্রী এবং ব্যাপক ভিত্তিক পণ্য সামগ্রী বহনে ও পরিবহনে প্রস্তুত বিধায় যাতায়াত যোগাযোগের ক্ষেত্রে রেল গাড়ীর বিকল্প কেবলই রেলগাড়ী। সাতক্ষীরা মুন্সিগঞ্জ টু বেনাপোল, যশোর, খুলনা রেল যোগাযোগের বিষয়টি যেমন সময়ের দাবী অনুরুপ ভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দাবীর যৌক্তিকতার সাথে সহমত ও পোষন করেছে। সরকারের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ সহ একনেকের বৈঠকেও রেল যোগাযোগ তথা সাতক্ষীরা রেলপথে আনার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিন্তু এখনও পর্যন্ত দৃশ্যতঃ কোন কাজ শুরু হইনি। জেলাবাসি আশা অবিলম্বে রেললাইন নির্মান কাজ শুরু হোক। সাতক্ষীরার অর্থনীতি এবং ব্যবসা বানিজ্যের নবদিগন্তের ক্ষেত্র নিশ্চিত করবে রেলপথ অন্যদিকে রেলপথের অভাব হেতু সাতক্ষীরার কাঙ্খিত উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়েছে। রেলযোগাযোগ কেবল যাতায়াত যোগাযোগ এবং অর্থনীতির গতিশীলতা বিনির্মান করবে তা নয় নগরায়ন, সভ্যতা, নতুন নতুন হাট বাজার ও মোকাম সৃষ্টি করবে, গ্রামের মেঠো পথ নগরায়নের ছোয়া পাবে, আলোকিত হবে গ্রামীন জনপথ সব মিলে রেলপথ সংযুক্ত সাতক্ষীরা হবে আধুনিক, উন্নয়ন নির্ভর ব্যবসা সফল আর অর্থনীতির আলোকিত সাতক্ষীরা। কিন্তু সেই সুসময় সম্ভব কেবল মাত্র রেল পথের মাধ্যমেই। সাতক্ষীরার বিশলক্ষাধীক মানুষের আশার প্রতীক রেল পথ কতদূর?
১১১ বছর পূর্ব থেকে সাতক্ষীরার মানুষ রেলের স্বপ্ন দেখছে। কৃষি উৎপাদন, মৎস্য চাষ, সুন্দরবন ও পর্যটন, ভারতের সাথে ব্যবসা—বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সাতক্ষীরার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এখানকার মোট কৃষি জমির এক—তৃতীয়াংশের বেশি জমিতে বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষ হয়। জেলায় মাছের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত প্রায় ৯০ হাজার মেট্রিক টন মাছের এর একাংশ বিদেশে রপ্তানি এবং অবশিষ্ট মাছ দেশের অন্যান্য এলাকায় সরবরাহ হয়। সাতক্ষীরার আম এখন বিশ্ববাজারে জনপ্রিয়, কুল, ধানসহ শাক সবজির ক্ষেত্রেও সাতক্ষীরা জেলা উদ্বৃত্ত খাদ্য শস্য উৎপাদন করে। এই উদ্বৃত্ত খাদ্য শস্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা হয়। যার একটা বড় অংশ দেশের বিভিন্নস্থান ছাড়াও দেশের বাইরে রপ্তানী হয়। সড়ক পথে সুন্দরবন ভ্রমনের একমাত্র সুযোগ রয়েছে সাতক্ষীরা জেলায়। ঢাকা বা দেশের অন্যান্য স্থান থেকে যে কোন যানবাহনে সাতক্ষীরা শহরের উপর দিয়ে শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ পৌছালেই চুনকড়ি নদীর ওপারে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। পর্যটনে কক্সবাজারের পরেই সুন্দরবন হতে পারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্পট। বাংলাদেশ—ভারতের মধ্যকার ২৭২কি.মি. সীমান্ত রয়েছে সাতক্ষীরা জেলায়। এখানকার ভোমরা স্থল বন্দর থেকে মাত্র ৮০কি.মি. দূরত্বে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতা শহর অবস্থিত। কোলকাতা সমুদ্র বন্দরের সবচেয়ে নিকটে রয়েছে অধুনালুপ্ত সাতক্ষীরার বসন্তপুর নৌবন্দর। এটিই বাংলাদেশ ভারতের মধ্যকার ব্যবসা—বানিজ্যের সেতুবন্ধনকারী একমাত্র নৌবন্দর। এবছর সাতক্ষীরায় উৎপাদিত আম কুরিয়ারে ঢাকায় পাঠাতে কেজি প্রতি খরচ হয়েছে ১২ থেকে ১৫ টাকা। প্যাকিংসহ অন্যান্য খরচ যোগ করলে প্রতি কেজির খরচ ২০ টাকার কম নয়। একই আম চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে রেলওয়ের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠাতে প্রতি কেজির খরচ হয়েছে ১টাকা ৩১ পয়সা। রেলে ঝুক্কি—ঝাকি কম হওয়ায় প্যাকিংসহ অন্যান্য খরচ কম। ফলে রেলে আম পরিবহনে প্যাকিংসহ খরচ গড়ে ৫টাকার বেশি নয়। সাতক্ষীরা এবং চাপাইনবাবগঞ্জের এই আম পরিবহনের খরচের পার্থক্য গড়ে প্রায় ১৫ টাকা। সেক্ষেত্রে সাতক্ষীরার আম তুলনামূলক সুস্বাদু হওয়া সত্বেও পরিবহন ব্যয়ের এই পার্থক্যের কারনে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পিছিয়ে পড়ছে।
আশির দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সাতক্ষীরার যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ করে পন্য পরিবহনের সিংহভাগ ছিল নদী কেন্দ্রীক। তখন সড়ক পথে খুলনায় যেতে হতো যশোর হয়ে এবং সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় যেতে সময় লাগতো ১৫/২০ ঘন্টা। নৌপথ বন্ধ হওয়ার পর সারাদেশের সাথে সাতক্ষীরার যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এখন সড়ক পথ। সারাদেশে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগন্তরকারী উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে সাতক্ষীরায় সড়ক উন্নয়ন হয়েছে কম। এর অন্যতম প্রধান কারন মনে করা হয় সাতক্ষীরা বাংলাদেশের দক্ষিণ—পশ্চিমাঞ্চলের সর্বশেষ জেলা।
প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানারেইল কোম্পানি লিমিটেড সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কার্যক্রম সম্পন্ন করে এবং এ সম্পর্কিত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেয়। নাভারণ—সাতক্ষীরা—মুন্সিগঞ্জ রেললাইনের সম্ভাব্যতা ম্যাপে নাভারণ থেকে সাতক্ষীরা হয়ে শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জ গ্যারেজ পর্যন্ত ৯৮ দশমিক ৪২ কিলোমিটার এলাকায় মোট আটটি স্টেশনের কথা বলা হয়। স্টেশনগুলোর সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করা হয় নাভারণ, বাগআচড়া, কলারোয়া, সাতক্ষীরা, পারুলিয়া, কালিগঞ্জ, শ্যামনগর ও মুন্সীগঞ্জে। এছাড়া ম্যাপে বাঁকাল, লাবণ্যবতী, সাপমারা খাল ও কাকশিয়ালী নদীর ওপর রেল সেতু নির্মাণের স্থান নির্ধারণ করা হয়। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, নাভারন থেকে বাগআচড়া স্টেশনের দূরত্ব ১২ দশমিক ৪ কিলোমিটার, বাগআচড়া থেকে কলারোয়া ১২ দশমিক ৬৮, কলারোয়া থেকে সাতক্ষীরা ১৪ দশমিক ২৩, সাতক্ষীরা থেকে পারুলিয়া ১৫ দশমিক ১১, পারুলিয়া থেকে কালিগঞ্জ ১৮ দশমিক ৩৭, কালিগঞ্জ থেকে শ্যামনগর ১৩ দশমিক ৮২ ও শ্যামনগর থেকে মুন্সীগঞ্জ স্টেশনের দূরত্ব হবে ১১ দশমিক ৮১ কিলোমিটার। প্রকল্পটি মুন্সিগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের পরিবর্তে আরও ১০ কি.মি. বাদ দিয়ে শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ গ্যারেজ বাজার পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয় এবং সেটিরই পিডিপিপি প্রণয়ন করা হয়।
এর আগে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ‘কন্সট্রাকশন অব নিউ বিজি ট্র্যাক ফর্ম নাভারন টু সাতক্ষীরা’ প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৩২৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা চীনের কাছে থেকে ঋণ সহায়তা চাওয়া হয়। প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৬৬২ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৩৩২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। পাকিস্তান শাসন আমলে ১৯৫৮ সালে সাতক্ষীরা—ভেটখালী সড়ক নির্মাণের সময়ও রেললাইনের জায়গা ধরে জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়। তখনও রেলের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। কিন্তু সে প্রক্রিয়া বেশিদুর যায়নি।
এই পরিস্থিতির অবসানে জরুরিভাবে নাভারন—সাতক্ষীরা—মুন্সিগঞ্জ রেল লাইন নির্মাণ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সরকারের আশু হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। আর সেজন্য প্রয়োজন সাতক্ষীরার রাজনীতিবীদ, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজসহ সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ। লেখক: সাবেক জবি শিক্ষার্থী ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা