মুক্তমত/ জুয়া কি এক অনিরাময়যোগ্য মায়া
সুজন হোসেন
খেলাধুলা মনকে সতেজ এবং প্রফুল্ল করে। খেলাধুলা করলে দেহ মন ভালো থাকে। তবে সে খেলা যদি হয় জীবনকে নিয়ে খেলা, সেটা কখনই ভালো কিছু বয়ে আনতে পারে না। তখন সেটা মানুষের কাছে অত্যাধিক প্রশান্তির হলেও তা হয়ে যায় মরণব্যাধির মতো। তেমনই এক ভয়ঙ্কর ব্যাধির কথা বলছিলাম যেটা হচ্ছে অনলাইন জুয়া। মস্তিষ্ক নিয়ে যে কয়টা জিনিস খেলতে পারে তার মধ্যে অন্যতম জুয়া। জুয়ার ধর্মই সুখের সংসার ভেঙে তৈরি করা হাহাকারে ভরা সমাজ।
মানুষ বর্তমানে এতই আসক্ত হয়েছে যে, ইসলাম ধর্মের মানুষ ভালো করেই জানে জুয়া হারাম, তবে তারা ভুলে গেছে এ কথা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি পূজা ও ভাগ্য নির্ধারণের তীর-এসব শয়তানের কাজের অন্তর্ভুক্ত। অতএব, এগুলো থেকে বিরত থাকো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।” (সূরা আল-মায়েদা: ৯০) স্পষ্টত জুয়া হারাম, তবে কে মানে সে কথা? নিজের ভাগ্য তো পরিবর্তন করতে চাই সকলেই! তাইতো নামাজ পড়েও অনেকে জুয়া খেলতে শুরু করে। মূল্যবোধের অবক্ষয় চরম পর্যায়ে।
একজন ব্যক্তি যখন জুয়া খেলে, সে প্রতি বারে টাকা জমা দেয় আল্লাহর নামে। আবার যখন গেম খেলে তখনও তার মুখে থাকে আল্লাহর নাম। সে খেলার মাঝে মাঝে বলে, আল্লাহ দয়া করো আমার উপর, এই একটা বার আমাকে দাও ইত্যাদি ইত্যাদি। জুয়া যে সৃষ্টিকর্তা হারাম করেছে, তার কাছেই অনুগ্রহ প্রার্থনা করে এই সমস্ত জুয়ারিরা।
ক্যান্সার অপেক্ষা জুয়ায় আসক্ত হওয়া বেশি ভয়ংকর। যেখানে ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে, সেখানে জুয়ায় আসক্ত হওয়া মানে নিজেকে জীবিত রেখে আত্মহত্যা করা। নিজেকে দেউলিয়া করা ছাড়া কিছুই না। কতো সুন্দর সংসার ভাঙতে দেখেছি, কতো স্বামী-স্ত্রীর তালাক দেখেছি, আরও দেখেছি কতো মহাপাপ আত্মহত্যা। ফুলের মতো একটা সংসার নিমিষেই শেষ করার জন্য আসক্তিই যথেষ্ট। অথবা গৃহস্থের সকল সুখ কাড়তে সক্ষম, দোকানির সমৃদ্ধ ব্যবসাও শেষ করতে পারে মুহূর্তেই।
সাতক্ষীরা জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রাম ভাদড়া; মানুষ জুয়ায় এতটাই আসক্ত যে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা হারছে এখানকার মানুষজন। তাতে তাদের বিন্দুপরিমান অনুশোচনা নেই, না আছে বিবেকের দংশন। একজন অন্যজনকে জুয়ার প্রলোভন দেখাতে ব্যস্ত। নিজে কতো টাকা পেয়েছে সেটা সবাইকে উচ্চস্বরে বলে, তবে যে অর্থ হারিয়েছে জুয়ার পিছনে তার হিসেব সে নিজেও রাখে না, লোককেও বলেনা। যেখানেই দেখি সেখানেই অনলাইন জুয়ার আসর বসে। মানুষ এত অর্থ নষ্ট করার পরও জুয়া ছাড়তে পারছে না। অথবা ছাড়ার চেষ্টাও করছে না।
যখনই মানুষের বিবেক আর ঠিকঠাক কাজ করে না, অন্যায়কে অন্যায় মনে করে না, তখনই প্রয়োগ করতে হয় আইন। ভালো মানুষের জন্য নিশ্চিত আইন না? জেল জরিমানা না? আমার মনে হয় কর্তৃপক্ষের খুব দ্রুত অনলাইন জুয়া নিয়ে একটা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক। এখনো পানি গলার নিচেই আছে, এখনো বেশি কিছু হয়নি। কর্তৃপক্ষ চাইলেই এর একটা সুরাহা হতে পারে। পরবর্তী প্রজন্ম একটা সুস্থ সমাজ পেতে পারে।
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২০ অনুযায়ী অনলাইন জুয়া খেলা, জুয়া সংক্রান্ত অ্যাপ বা পোর্টাল তৈরি ও প্রচারণা চালানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই অপরাধের জন্য ২ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড, ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দন্ড প্রযোজ্য। আইনের সুষ্ঠ প্রয়োগই পারে এই ক্যান্সার ব্যাধি প্রতিরোধ করতে। নতুবা আমরা আমাদের জনগণের জীবন তিলে তিলে শেষ হওয়া দেখবো, তখন কিছুই করতে পারব না।
লেখক: সুজন হোসেন, ইংরেজি বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ









