শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

মুক্তমত/ দলের ঊর্ধ্বে দেশ: পদ নয় অপরাধের লাইসেন্স

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৩৩ অপরাহ্ণ
মুক্তমত/ দলের ঊর্ধ্বে দেশ: পদ নয় অপরাধের লাইসেন্স

এম.এম হায়দার আলী

রাজনীতিতে ক্ষমতা আসে, ক্ষমতা যায়। পদ আসে, পদও একদিন চলে যায়। কিন্তু মানুষের কাছে একটি রাজনৈতিক দলের যে দায়, তার মেয়াদ কোনো নির্বাচনী সময় সূচিতে বাঁধা নয়। সেই দায়ের নাম জবাবদিহি। আর সেই জবাবদিহি যখন নিজের দলের মানুষটির ক্ষেত্রেও সমান ভাবে কার্যকর হয়, তখন রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থার জায়গাটি কিছুটা হলেও শক্ত হয়।

 

রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিএনপির সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং ঘটনার সঙ্গে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও জানিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে আইনগত তদন্তও চলছে। কিন্তু এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে তাকে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং গত ১ অক্টোবর তার জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগ পত্র জমা দেওয়ার ঘটনা রাজনৈতিকভাবে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা সামনে এনেছে।

 

বার্তাটি হলো, দলের পরিচয় কারও জন্য দায়মুক্তির ঢাল হতে পারে না। এখানেই রাজনীতির আসল পরীক্ষা। কারণ নিজের দলের মানুষকে শাসন করা সহজ নয়। বিরোধী দলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার রাজনৈতিক সুবিধা থাকে, কিন্তু নিজের দলের জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া মানে নিজের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে নিজের ঘরকেই প্রশ্ন করা। সেই জায়গায় নেতৃত্বের দৃঢ়তা শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও একটি পরীক্ষা। রাড্ডার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুধু একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগের বিষয়টিই সামনে আসেনি।

 

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি ও যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জন নেতা-কর্মীকে বহিষ্কারের কথাও এসেছে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আইন। কিন্তু সাংগঠনিক পর্যায়ে যে বার্তা সামনে এসেছে, সেটি স্পষ্ট, পদ-পদবি মানেই অপরাধের লাইসেন্স নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই বার্তাটিই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কারণ ক্ষমতার সঙ্গে মানুষের দূরত্ব তৈরি হয় তখনই, যখন দলের নাম ব্যবহার করে কেউ সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।

 

চাঁদাবাজি, দখল, ভয়ভীতি, নৈরাজ্য কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ যখন রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে চাপা পড়ে যায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন ব্যক্তি নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তি। একজন কর্মীর অন্যায়ের দায় অবশ্যই পুরো দলের ওপর চাপানো যায় না। কিন্তু দলের নাম, পদ কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে কেউ অন্যায় করলে দল যদি দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা যায়, অন্যায় করলে পরিচয় রক্ষা করবে না। এখানে আরেকটি বিষয়ও মনে রাখা জরুরি। অভিযোগ উঠলেই কেউ অপরাধী হয়ে যান না।

 

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রচারণা কিংবা সংবাদে প্রকাশিত কোনো তথ্য, কোনোটিই আদালতের রায়ের বিকল্প নয়। তদন্তের নিরপেক্ষতা, প্রমাণের মূল্য এবং আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই শেষ কথা। কিন্তু একই সঙ্গে অভিযোগ উঠলে তদন্ত না করে বসে থাকাও সমাধান নয়। অভিযোগের তদন্ত হবে, সত্য-মিথ্যা যাচাই হবে, প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা হবে, এই তিনটি ধাপই একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। আজ দেশের মানুষ রাজনীতির কাছে শুধু বড় বড় প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। তারা দেখতে চায় বাস্তব আচরণ। তারা দেখতে চায়, ক্ষমতায় থাকা মানুষটির জন্য যে আইন, সাধারণ মানুষের জন্যও সেই আইন। তারা দেখতে চায়, দলের পতাকা কারও অন্যায়ের আড়াল নয়। রাজনীতির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই, ক্ষমতা মানুষকে বড় করে না; মানুষের প্রতি দায়িত্বই একজন রাজনীতিককে বড় করে।

 

যে নেতা নিজের দলের অন্যায়কে অন্যায় বলতে পারেন, তার কাছেই সাধারণ মানুষ জবাবদিহির আশা করতে পারে। আর যে সংগঠন নিজের ঘরের অনিয়মকে আড়াল না করে তদন্ত ও সাংগঠনিক ব্যবস্থার মুখোমুখি করে, সেই সংগঠনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হয়। আজ যদি দলের নাম ব্যবহার করে কেউ কোনো সাধারণ মানুষের জমি দখল করে, কাল কেউ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদা দাবি করে, অন্য কেউ ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে সরকারি সম্পদে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। কারণ রাজনৈতিক দল জনগণের জন্য, জনগণ কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।

 

ক্ষমতার রাজনীতিতে সবচেয়ে ভয়ংকর শব্দ ছাড়। একবার ছাড় দেওয়া হলে দ্বিতীয়বার অন্যায় করার সাহস বাড়ে। তৃতীয়বার সেটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। আর এক সময় মানুষ ধরে নেয়, রাজনীতির ছায়ায় থাকলে আইনকে পাশ কাটানো যায়। এই ধারণাটিই ভাঙতে হবে। প্রয়োজনে নিজের দলের এমপি, চেয়ারম্যান, নেতা কিংবা কর্মী, যেই হোক, অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত হতে হবে। সত্য প্রমাণিত হলে আইন ও সাংগঠনিক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাকেও সম্মানের সঙ্গে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এটাই ন্যায়বিচারের সৌন্দর্য। একটি রাজনৈতিক দলের শক্তি শুধু তার জনসমর্থনে নয়; তার আত্মশুদ্ধির ক্ষমতার মধ্যেও। ভুল হলে ভুল স্বীকার করা, অন্যায় হলে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নিজের মানুষকেও জবাবদিহির আওতায় আনা, এসবই রাজনৈতিক পরিপক্বতার লক্ষণ।

 

আজ দেশের মানুষ এমন রাজনীতি দেখতে চায়, যেখানে দল ক্ষমতার সিঁড়ি নয়, মানুষের সেবার প্রতিষ্ঠান; যেখানে পদ মর্যাদার অলংকার নয়, দায়িত্বের প্রতীক; যেখানে দলীয় পরিচয় নিরাপত্তার দেয়াল নয়, বরং আরও বড় জবাবদিহির কারণ। তারেক রহমানের নির্দেশে একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগ এবং রাড্ডার ঘটনাকে ঘিরে সাংগঠনিক ব্যবস্থাগুলো সেই বৃহত্তর আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে। এসব পদক্ষেপের আইনগত ও রাজনৈতিক মূল্যায়ন অবশ্যই সময় ও তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে। তবে নীতিগত ভাবে একটি কথা পরিষ্কার, রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থের ওপরে কোনো দল, কোনো পদ, কোনো ব্যক্তি থাকতে পারে না। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার চেয়ারটি কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়।

 

আজ যে চেয়ারকে ঘিরে এত আলো, কাল সেখানে অন্য কেউ বসবেন। কিন্তু মানুষের মনে একজন রাজনীতিকের যে পরিচয়টি থেকে যায়, তা হলো, তিনি ক্ষমতার সময়ে কেমন আচরণ করেছিলেন। তাই সময়ের দাবি একটাই, দলের আগে দেশ, পদের আগে দায়িত্ব, পরিচয়ের আগে আইন। রাজনীতির এই তিনটি শব্দ যদি বাস্তবে প্রতিষ্ঠা পায়, তবে ক্ষমতার চেহারা বদলাবে না শুধু, বদলাবে মানুষের রাজনীতির প্রতি আস্থার ভাষাটাও। সর্বোপরি, প্রধানমন্ত্রীর এমন মহতী ও জনকল্যাণ মুখী উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। মানুষের কল্যাণ, সামাজিক উন্নয়ন ও জনস্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে নেওয়া এ ধরনের উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করে। রাষ্ট্রের নেতৃত্ব যখন মানুষের প্রয়োজন ও প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তখন তা শুধু একটি সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা হয়ে ওঠে পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এমন জনবান্ধব উদ্যোগের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাতেই হয়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

Ads small one

মুক্তমত: সাতক্ষীরায় কিশোর গ্যাংয়ের দাপট: উত্তরণের পথ ও নাগরিক ভাবনা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:০৪ অপরাহ্ণ
মুক্তমত: সাতক্ষীরায় কিশোর গ্যাংয়ের দাপট: উত্তরণের পথ ও নাগরিক ভাবনা

মো. মাসুদ রানা

সাম্প্রতিক সময়ে সাতক্ষীরা জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় একটি বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হয়ে দাঁড়িয়েছেÑতা হলো ‘কিশোর গ্যাং’-এর অপতৎপরতা। জেলার পৌর এলাকা (যেমন: সুলতানপুর, ইটাগাছা, কাটিয়া, কদমতলা) এবং বিভিন্ন উপজেলা সদরগুলোতে এদের উপস্থিতি ও অপরাধপ্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। মূলত ১৪ থেকে ২০ বছর বয়সী কিশোর ও যুবকেরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে স্থানীয় সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করছে। স্কুল-কলেজগামী ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করা, তুচ্ছ ঘটনায় দল বেঁধে মারামারি, পাড়া-মহল্লার দোকানে চাঁদাবাজি, মোটরসাইকেলে বেপরোয়া মহড়া এবং মাদক সেবন ও কারবারের সঙ্গে এরা প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক গ্রুপ, টিকটক কিংবা রিলস ব্যবহার করে নিজেদের গ্যাং কালচার বা দলগত পরিচিতি তৈরি ও আধিপত্য বিস্তারের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে।

সাতক্ষীরায় এই গ্যাং কালচার ছড়িয়ে পড়ার পেছনে বেশ কয়েকটি স্পষ্ট কারণ চিহ্নিত করা যায়:
পারিবারিক সচেতনতার অভাব: সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছেÑএ বিষয়ে অভিভাবকদের পর্যাপ্ত তদারকির অভাব রয়েছে।

মাদক ও প্রযুক্তির অপব্যবহার: সীমান্তঘেঁষা জেলা হওয়ায় সাতক্ষীরায় মাদকের সহজলভ্যতা একটি বড় ফ্যাক্টর। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধভিত্তিক কনটেন্টের অপব্যবহার।

রাজনৈতিক ও স্থানীয় আশ্রয়ের ছত্রচ্ছায়া: স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ও তথাকথিত ‘বড় ভাই’ নিজেদের স্বার্থে এই উদীয়মান তরুণদের ব্যবহার করছেন ও অপরাধ শেষে সুরক্ষা দিচ্ছেন।
বিনোদনের সুযোগের ঘাটতি: সুস্থ সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চার অভাব এবং পর্যাপ্ত খেলার মাঠ না থাকায় তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে কেবল দমনপীড়ন বা আইনি পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও বহুমুখী পরিকল্পনা।

১. প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা:
শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এলাকা, পার্ক ও নির্জন স্থানগুলোতে নিয়মিত পুলিশি টহল ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। সন্ধ্যার পর নির্দিষ্ট কারণ ছাড়া কিশোরদের মোড়ে মোড়ে আড্ডা দেওয়া বন্ধে আইনি তদারকি প্রয়োজন। সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ কর্তৃক এলাকার চিহ্নিত গ্যাংগুলোর ডেটাবেস বা তালিকা তৈরি করা এবং এদের পেছনের নেতৃত্বদাতাদের (তথাকথিত ‘বড় ভাই’) চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে মাদকের রুট বন্ধ করতে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের সমন্বয়ে কঠোর অভিযান জোরদার করা জরুরি।

২. পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিরোধ:
সন্তান রাতে কখন বাড়ি ফিরছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং অতিরিক্ত অর্থের ব্যবহার করছে কি নাÑতা নিয়মিত তদারকি করা পরিবারের মূল দায়িত্ব। সন্তানকে প্রযুক্তিভিত্তিক ভার্চ্যুয়াল জগত থেকে বের করে পরিবারে গুণগত সময় দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে শিক্ষক, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ‘কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে।

৩. প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ:
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত কিশোর অপরাধ ও মাদকের কুফল সংক্রান্ত সচেতনতামূলক কর্মশালা এবং কাউন্সেলিংয়ের আয়োজন করা উচিত। সাতক্ষীরা স্টেডিয়াম, জেলা পরিষদ মাঠসহ স্থানীয় খেলার মাঠগুলোকে খেলাধুলার উপযোগী রাখা এবং কিশোরদের জেলা শিল্পকলা একাডেমি ও স্কাউটিংয়ের মতো সুস্থ ধারার কর্মকা-ে যুক্ত করা প্রয়োজন।

৪. সংশোধনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি:
লঘু বা প্রথমবার অপরাধে জড়িতদের সরাসরি অপরাধী হিসেবে না দেখে প্রবেশন এবং মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর পথ সুগম করা প্রয়োজন।
কিশোর গ্যাং কোনো স্থায়ী বা দূরারোগ্য সমস্যা নয়; এটি মূলত সামাজিক অসচেতনতা ও দিকনির্দেশনাহীনতার ফল। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষক, অভিভাবক ও সুশীল সমাজের ঐক্যবদ্ধ এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপই পারে আমাদের তরুণদের সুপথে ফিরিয়ে এনে একটি নিরাপদ ও শান্তিময় সাতক্ষীরা উপহার দিতে। লেখক: মো. মাসুদ রানা, এমএসসি (পদার্থবিজ্ঞান), সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ

বিশ্ব প্রাণি দিবস: প্রাণের বৈচিত্র্য রক্ষায় মানুষের দায়িত্ব

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:৫৮ অপরাহ্ণ
বিশ্ব প্রাণি দিবস: প্রাণের বৈচিত্র্য রক্ষায় মানুষের দায়িত্ব

সাকিবুর রহমান বাবলা

প্রাণি প্রকৃতির অলংকার নয়, প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বন, নদী, সমুদ্র, পাহাড়, জলাভূমি ও মানুষের জীবনÑসবকিছুর সঙ্গে প্রাণিজগতের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ক, প্রাণির প্রতি মানুষের দায়িত্ব এবং তাদের কল্যাণ ও সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দিতে প্রতি বছর ৪ অক্টোবর বিশ্ব প্রাণি দিবস পালিত হয়। দিনটি প্রাণিদের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির একটি আন্তর্জাতিক উপলক্ষ।

বিশ্ব প্রাণি দিবসের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জার্মান প্রাণি-সুরক্ষা আন্দোলনকর্মী, লেখক ও প্রকাশক হাইনরিখ জিমারম্যানের নাম। তাঁর উদ্যোগে ১৯২৫ সালের ২৪ মার্চ জার্মানির বার্লিনের স্পোর্ট প্যালেসে প্রথম বিশ্ব প্রাণি দিবসের আয়োজন হয়; এতে ৫ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেন। ১৯২৯ সালে দিবসটি প্রথমবারের মতো ৪ অক্টোবর পালিত হয়। পরে ১৯৩১ সালের মে মাসে ইতালির ফ্লোরেন্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রাণি-সুরক্ষা সংগঠনগুলোর কংগ্রেসে ৪ অক্টোবরকে বিশ্ব প্রাণি দিবস হিসেবে সর্বজনীনভাবে পালনের প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। ৪ অক্টোবর ক্যাথলিক ঐতিহ্যে প্রাণি ও পরিবেশের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত সেন্ট ফ্রান্সিস অব আসিসির ভোজোৎসবের দিন।

এই দিবসের মূল লক্ষ্য শুধু প্রাণিপ্রেমের কথা বলা নয়; প্রাণির কল্যাণের মান উন্নত করা, নিষ্ঠুরতা রোধ করা, দায়িত্বশীল আচরণে উৎসাহ দেওয়া এবং প্রাণি সুরক্ষায় ব্যক্তি ও সংগঠনের উদ্যোগকে উৎসাহিত করা। ‘তাদের চোখ দিয়ে বিশ্বকে দেখো’ ২০২৬ এই প্রতিপাদ্য নিয়ে বিশ্ব প্রাণি দিবসের আন্তর্জাতিক আয়োজনগুলোতে সচেতনতা কর্মসূচি, আলোচনা, শিক্ষা, তহবিল সংগ্রহ, প্রাণিকল্যাণ কার্যক্রম এবং স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।

জীববিজ্ঞানে প্রাণীজগৎ অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। কশেরুকী প্রাণির পাশাপাশি পৃথিবীতে রয়েছে বিপুলসংখ্যক অমেরুদ-ী প্রাণিÑকীটপতঙ্গ, মাকড়সা, শামুক, কাঁকড়া, চিংড়ি, কেঁচো, জেলিফিশ, প্রবাল, স্পঞ্জসহ অসংখ্য প্রাণি। ক্যাটালগ অব লাইফ-এর ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর
এক্সটেন্ডেড রিলিজÑঅ্যানিমেলিয়াতে প্রায় ১৭ লাখ ৯৬ হাজার ৯০০ প্রজাতি তালিকাভুক্ত রয়েছে। তবে এটি পৃথিবীর সব প্রাণি প্রজাতির চূড়ান্ত সংখ্যা নয়; ক্যাটালগ অব লাইফ নিজেই জানায় যে বৈশ্বিক প্রজাতির তালিকা এখনও অসম্পূর্ণ এবং এতে সংশোধনের প্রয়োজন থাকতে পারে।

প্রাণির বৈচিত্র্য শুধু সংখ্যার বিষয় নয়। পরাগায়ন, বীজ বিস্তার, খাদ্যশৃঙ্খল, মাটির উর্বরতা, জলজ পরিবেশের ভারসাম্য এবং বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রাণিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটি প্রজাতির বিলুপ্তি অনেক সময় তার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য জীব ও পরিবেশের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রাণি সংরক্ষণ মূলত জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সংরক্ষণেরই অংশ।

বর্তমান পৃথিবীতে প্রাণিজগতের ওপর নানা চাপ রয়েছে। আবাসস্থল ধ্বংস, বন উজাড়, অতিরিক্ত শিকার ও আহরণ, অবৈধ বন্যপ্রাণি বাণিজ্য, দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন অনেক প্রজাতির অস্তিত্বকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। আইইউসিএন-এর ২০২৬-১ সংস্করণে ৪৯,৫০০-এর বেশি প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে; তবে আইইউসিএন একই সঙ্গে সতর্ক করেছে যে সব প্রাণি ও সব শ্রেণির প্রজাতি সমানভাবে মূল্যায়িত হয়নি।

বাংলাদেশের চিত্রও উদ্বেগমুক্ত নয়। আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের জাতীয় প্রাণি লাল তালিকায় সাতটি প্রাণিগোষ্ঠীর ১,৬১৯টি প্রজাতি মূল্যায়ন করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৩৯০টি প্রজাতি হুমকির মুখে এবং ৩১টি প্রজাতি বাংলাদেশ থেকে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়। মূল্যায়িত প্রাণিগুলোর মধ্যে ছিল ১৩৮টি স্তন্যপায়ী, ৫৬৬টি পাখি, ১৬৭টি সরীসৃপ, ৪৯টি উভচর, ২৫৩টি স্বাদুপানির মাছ, ১৪১টি ক্রাস্টেশিয়ান ও ৩০৫টি প্রজাপতি।

বাংলাদেশের বন্যপ্রাণির মধ্যে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে সুন্দরবনে ২০১৫ সালে ১০৬টি, ২০১৮ সালে ১১৪টি এবং ২০২৪ সালে ১২৫টি বাঘ পাওয়া যায়। বাঘের পাশাপাশি হাতি, গাঙ্গেয় শুশুক, হুলক গিবন, কচ্ছপ, ঘড়িয়ালসহ বিভিন্ন প্রাণির আবাসস্থল রক্ষা করাও জরুরি।

প্রাণি রক্ষার দায়িত্ব শুধু বন বিভাগ বা সংরক্ষণ সংস্থার নয়। বন ও জলাভূমি রক্ষা, অবৈধ শিকার ও বন্যপ্রাণি বাণিজ্য প্রতিরোধ, দূষণ কমানো, প্রাণির প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধ করা এবং আহত বা বিপদগ্রস্ত প্রাণিকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়াÑএসব ক্ষেত্রেই নাগরিকের দায়িত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, নিয়মিত প্রজাতি পর্যবেক্ষণ, সংরক্ষিত এলাকার কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ সংরক্ষণকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

প্রাণি সম্পর্কে মানুষের নৈতিক ধারণার সঙ্গে ধর্মীয় মূল্যবোধেরও যোগ রয়েছে। ইসলামী দৃষ্টিতে প্রাণি আল্লাহর সৃষ্টির অংশ। কুরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ সব জীবন্ত প্রাণিকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের চলাচলের বিভিন্ন ধরন উল্লেখ করেছেন। আবার সূরা আল-আনআমের ৩৮ নম্বর আয়াতে প্রাণীদেরও “তোমাদের মতো বিভিন্ন সম্প্রদায়” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামী ঐতিহ্যে প্রাণির প্রতি দয়া ও অকারণে কষ্ট না দেওয়ার শিক্ষা রয়েছে। অন্য ধর্মীয় ও নৈতিক দর্শনেও অহিংসা, করুণা ও জীবের প্রতি সহমর্মিতার মূল্যবোধ দেখা যায়।

বিজ্ঞান প্রাণির গঠন, জীবনপ্রক্রিয়া, বিবর্তন, পরিবেশগত সম্পর্ক ও বিলুপ্তির কারণ অনুসন্ধান করে; ধর্ম ও নৈতিক দর্শন মানুষের দায়িত্ব ও আচরণের প্রশ্ন সামনে আনে। দুটি ক্ষেত্রের আলোচনার ধরন ভিন্ন হলেও প্রাণির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ ও প্রকৃতির প্রতি যতেœর প্রয়োজনীয়তা মানবসমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

বিশ্ব প্রাণি দিবস তাই কেবল প্রাণিদের জন্য একটি বিশেষ দিন নয়; এটি মানুষের নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবার দিন। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণি কোনো না কোনোভাবে জীবনের বৃহৎ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। একটি নিরাপদ আবাসস্থল, নির্মল পানি, খাদ্য ও মানুষের সহনশীল আচরণ অনেক প্রাণির টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণিকে ভালোবাসা মানে শুধু পোষা প্রাণির যতœ নেওয়া নয়Ñবন্যপ্রাণি, পাখি, জলজ প্রাণি, কীটপতঙ্গসহ সমগ্র প্রাণিজগতের অস্তিত্বের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া।

৪ অক্টোবরের এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñপ্রাণি রক্ষা মানে প্রকৃতি রক্ষা, আর প্রকৃতি রক্ষা মানে মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষা। তাই সচেতনতা, বিজ্ঞানভিত্তিক সংরক্ষণ, আইন প্রয়োগ এবং মানবিক আচরণের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে প্রাণি ও মানুষের জন্য আরও নিরাপদ পৃথিবী। ‘প্রাণি বাঁচলে বাঁচবে প্রকৃতি, রক্ষা পাবে বিশ্ব চরাচর। আসুন-বাড়িয়ে দিই ভালোবাসার হাত, নিরাপদ হোক ওদের ঘর।

লবণাক্ত পানিতে সাতক্ষীরার উপকূল: জরায়ুর টিউমারসহ ও নারীদের নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:৪৯ অপরাহ্ণ
লবণাক্ত পানিতে সাতক্ষীরার উপকূল: জরায়ুর টিউমারসহ ও নারীদের নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি

গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

‎সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের তীব্র লবণাক্তত পানির প্রভাবে হাজার হাজার মানুষ এক নীরব স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে। বিশেষ করে মানুষের শরীরের অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গ ‘সুরুল’ বা কুঁচকি অঞ্চল এবং নারীদের জরায়ুতে মারাত্মক সংক্রমণ ও চর্মরোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। গ্রামীণ মানুষের চিরন্তন লজ্জা ও সামাজিক ট্যাবুকে পুঁজি করে এই নীরব ব্যাধি প্রকট আকার ধারণ করলেও, লোকচক্ষুর আড়ালে থাকায় এতদিন সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টির বাইরেই থেকে গেছে এই তীব্র সংকট।

 

সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি উপকূলীয় এলাকায় অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই অঞ্চলের নারীদের একটা বড় অংশ দীর্ঘক্ষণ চিংড়ি ঘের কিংবা নদীর অতিরিক্ত লবণাক্ত পানিতে দাঁড়িয়ে কাজ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে এই লবণাক্ত পানি সংবেদনশীল অঙ্গে লেগে থাকার কারণে সেখানে মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাস বাসা বাঁধছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘পেলভিক ইনফ্লামেটরি ডিজিজ’ এবং তীব্র চর্মরোগ ‘টিনিয়া ক্রুরিস’ বলা হলেও স্থানীয় চিকিৎসকেরা গ্রামীণ মানুষের মুখের ভাষায় একে চিহ্নিত করছেন “সুরুল লাগা”, “সুরুল ফোলা” কিংবা “কুঁচকি নামা” হিসেবে। স্থানীয় নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুঁচকি বা তলপেটের দুই পাশের সংযোগস্থলে প্রচ- চুলকানি, ক্ষত এবং লিম্ফ নোড বা গ্রন্থি ফুলে ওঠার মতো তীব্র যন্ত্রণায় তারা দীর্ঘদিন ভুগছেন।

 

পুরুষদের ক্ষেত্রেও কুঁচকি অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী চর্মরোগ ও টিউমার সদৃশ ফোলা ভাব দেখা দিচ্ছে। কিন্তু রোগটি শরীরের অত্যন্ত গোপন ও সংবেদনশীল অংশে হওয়ায় গ্রামীণ নারীরা লজ্জায় পরিবারের অন্য সদস্য বা পুরুষ চিকিৎসকদের কাছে মুখ খোলেন না। ফলে কোনো ধরনের সুচিকিৎসা না পেয়ে রোগটি ভেতরে ভেতরে আরও জঘন্য রূপ নিচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে জরায়ুর বড় ধরনের ক্ষতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট এবং পানির অতিরিক্ত লবণাক্ততাই এই সংকটের মূল কারণ।

 

এই বিপর্যয় রোধে এখনই উপকূলীয় নারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, সুপেয় পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং বিশেষায়িত মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়া জরুরি। তা না হলে সুন্দরবন সংলগ্ন এই জনপদের নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক চরম অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে। উপকূলীয় জনপদের বাস্তবতায় নারীদের একটি বড় অংশ সংসারের পাশাপাশি চিংড়ি ঘের, কৃষিকাজ, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং নদী-খালের আশপাশের বিভিন্ন কাজে যুক্ত। এসব কাজে দীর্ঘ সময় পানি, কাদা, ভেজা কাপড় ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের সংস্পর্শে থাকতে হয়। বিশেষ করে পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট এবং গোসলের সুবিধা না থাকলে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

‎অনেক নারী জানান, দিনের পর দিন একই ধরনের অস্বস্তি, চুলকানি বা জ্বালাপোড়া থাকলেও তারা বিষয়টি কাউকে বলতে চান না। কেউ কেউ স্থানীয় ফার্মেসি থেকে নিজের মতো করে ওষুধ বা মলম ব্যবহার করেন। সাময়িকভাবে উপসর্গ কমে গেলেও সমস্যার প্রকৃত কারণ নির্ণয় হয় না ফলে আবার ফিরে আসে। এ কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ওষুধ ব্যবহার করে ও নতুন জটিলতা তৈরি হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ এখনো শরীরের গোপন অঙ্গ নিয়ে কথা বলাকে অনেক পরিবার অস্বস্তিকর মনে করে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই সংকোচ আরও বেশি। ফলে অনেকেই ব্যথা, চুলকানি, অস্বাভাবিক গ্রাব, ফোলা, ক্ষত কিংবা প্রগ্রাবের সময় জ্বালাপোড়ার মতো উপসর্গ প্রকাশ করেন না। ‎

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা