সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: কাঁচা রাস্তা ও ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো
উন্নয়নের নানা পরিসংখ্যান ও মহাসড়ক সম্প্রসারণের ভিড়ে দেশের প্রান্তিক উপকূলীয় অঞ্চলের গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার চিত্র যে কতটা করুণ, তা সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার সাম্প্রতিক দুটি চিত্র দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়। একদিকে আশাশুনির শ্রীউলা ইউনিয়নে বাঁশতলা ব্রিজ থেকে কাকড়াবুনিয়া পর্যন্ত দীর্ঘ ১২ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা বছরের পর বছর সংস্কারের মুখ দেখেনি; অন্যদিকে শ্যামনগরের রমজাননগরে মাদার নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতুর অভাবে তিনটি ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন একটি জরাজীর্ণ বাঁশের সাঁকো দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন। আধুনিক যুগে এসেও অবহেলিত এই জনপদগুলোর বাসিন্দাদের কেন এমন মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকতে হবে, সে প্রশ্ন তোলা সংগত।
আশাশুনির শ্রীউলা ইউনিয়নের ওই কাঁচা সড়কটি কেবল একটি রাস্তা নয়; এটি স্থানীয় কৃষিপণ্য পরিবহন, অর্ধশতাধিক পোলট্রি খামার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও খেয়াঘাটের যাতায়াতের একমাত্র পথ। বর্ষা মৌসুমে কাদা-পানিতে সড়কটি যান চলাচলের একদম অনুপযোগী হয়ে পড়ে, ফলে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে পাঁচ গ্রামের বিপুল জনগোষ্ঠী। কোনো জরুরি রোগী বা প্রসূতি নারীকে যথাসময়ে হাসপাতালে নেওয়া কিংবা উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছানো সেখানে এক কঠিন চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধি ও জনপ্রতিনিধিরা সড়কটি পাকা করার আকুতি জানালেও প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট ও দ্রুত কোনো পদক্ষেপ এখনো দৃশ্যমান নয়।
একইভাবে, শ্যামনগরের মাদার নদীর ওপর বাঁশের সাঁকোটি হাজারও শিক্ষার্থীর জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে চলেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শত শত শিশু প্রতিদিন এই নড়বড়ে সাঁকো পার হয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে বাধ্য হয়। তার ওপর ওই এলাকার সাধারণ মানুষকে সুপেয় খাবার পানির জন্য এই সাঁকো পার হয়ে পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের দিঘি থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। জীবনযাত্রা ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় চাহিদার সংযোগস্থল যেখানে একটি ভঙ্গুর বাঁশের সাঁকো, সেখানে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই প্রশাসনের টনক নড়া উচিত ছিল। অথচ যুগের পর যুগ ধরে স্থানীয় বাসিন্দারা সেতুর দাবি জানিয়ে আসলেও তাঁদের আকুতি মানববন্ধনের ব্যানারেই আটকে থাকছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার এই দৈন্যদশা কেবল জনগণের যাতায়াতকেই কষ্টকর করছে না, বরং স্থানীয় অর্থনীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বিকাশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। জাতীয় পর্যায়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাফল্য নিশ্চিত করতে হলে অবহেলিত উপকূলীয় অঞ্চলকেও অগ্রাধিকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা শ্রীউলা ইউনিয়নের ১২ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তাটি দ্রুত পাকা করার উদ্যোগ নেবেন এবং শ্যামনগরের মাদার নদীর ওপর একটি টেকসই ও স্থায়ী সেতু নির্মাণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। প্রান্তিক জনগণের এই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের স্থায়ী অবসান ঘটানো এখন সময়ের দাবি।









