আন্তর্জাতিক বিচারিক সুস্থতা দিবস : সুস্থতা থেকেই ন্যায়বিচারের সূচনা
সাকিবুর রহমান বাবলা
আইনের শাসন, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি হলো একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও দক্ষ বিচারব্যবস্থা। আর সেই বিচারব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থান করেন বিচারক, ম্যাজিস্ট্রেট, সালিশকারী এবং বিচার বিভাগের অন্যান্য কর্মকর্তারা। সমাজে ন্যায় ও অন্যায়ের সীমারেখা নির্ধারণ, নাগরিকের অধিকার রক্ষা এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখার গুরুদায়িত্ব তাঁদের ওপর ন্যস্ত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলনামূলকভাবে আড়ালে রয়ে গেছে-যারা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেন, তাঁদের নিজেদের শারীরিক, মানসিক ও আবেগগত সুস্থতা। এই উপলব্ধি থেকেই প্রতি বছর ২৫ জুলাই পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বিচারিক সুস্থতা দিবস। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০২৫ সালের মার্চে গৃহীত অ/জঊঝ/৭৯/২৬৬ প্রস্তাবের মাধ্যমে দিবসটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়, যার লক্ষ্য বিচারকদের সুস্থতা, কর্মপরিবেশ ও মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
বিচারিক সুস্থতা বিষয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন দিগন্তের সূচনা হয় ২০২৪ সালের ২৫ জুলাই। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র নাউরুতে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় এবং নাউরুর বিচার বিভাগের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গৃহীত হয় “নাউরু ঘোষণা”। নাউরু ঘোষণায় বিচারিক সুস্থতাকে একটি স্বাধীন, কার্যকর ও জনআস্থাভিত্তিক বিচারব্যবস্থার অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এতে বিচারকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিদ্যমান সংকোচ দূর করা, বিচারক, আদালত ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানের যৌথ দায়িত্ব নিশ্চিত করা, সহায়ক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্কৃতি গড়ে তোলা, সচেতনতা, প্রতিরোধ, সহায়তা ও পুনরুদ্ধারমূলক উদ্যোগের সমন্বিত বাস্তবায়ন, স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বিচারিক সুস্থতাকে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
গ্লোবাল জুডিশিয়াল ইন্টেগ্রিটি নেটওয়ার্কের ২০২১ সালের এক জরিপে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশের বিচারকদের অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। জরিপে ৯২ শতাংশ বিচারক জানান, তাঁরা নিয়মিত মানসিক চাপের মুখোমুখি হন এবং ৭৬ শতাংশ বিচারক মনে করেন, নিজেদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য তাঁদের পর্যাপ্ত সময় নেই। এছাড়া ৮৯ শতাংশ বিচারক সহকর্মীদের মধ্যে মানসিক চাপ বা উদ্বেগের উপস্থিতি সম্পর্কে অবগত, ৬৯ শতাংশের মতে বিচার বিভাগে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা এখনও একটি ট্যাবু এবং ৮৩ শতাংশ বিচারক মনে করেন, তাঁদের আদালত ব্যবস্থা বিচারকদের সুস্থতা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত সহায়তা দিতে পারছে না। একই সঙ্গে ৯৭ শতাংশ বিচারক একমত যে বিচারিক সুস্থতার বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব ও দৃশ্যমানতা পাওয়া উচিত। জরিপে আরও দেখা যায়, বিচারিক সুস্থতার ঘাটতি আদালত পরিচালনা ও প্রশাসনিক দক্ষতা ৮০ শতাংশ, রায় ও সিদ্ধান্তের গুণগত মান ৬৮ শতাংশ, বিচার বিভাগের প্রতি জনসাধারণের আস্থা ৪৭ শতাংশ, ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সুযোগ ৪০ শতাংশ, বিচারিক সততা ও নৈতিকতা ৩৫ শতাংশ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার ন্যায্যতাকে ৩১ শতাংশ নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এসব তথ্য স্পষ্ট করে যে বিচারিক সুস্থতা কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা, ন্যায়নিষ্ঠা এবং জনআস্থা গভীরভাবে সম্পর্কিত।
ধর্মীয় ঐতিহ্য, নৈতিক দর্শন, আধুনিক বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞান-সব ক্ষেত্রেই একজন বিচারকের শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক সুস্থতাকে সুষ্ঠু বিচারকার্যের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় বিচারকের প্রজ্ঞা, আত্মসংযম, ধৈর্য, সততা এবং রাগ, ক্লান্তি বা মানসিক অস্থিরতা থেকে মুক্ত থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে; পাশাপাশি তাঁকে ভয়, প্রলোভন ও বাহ্যিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশে কাজ করার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে মনোবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত কর্মচাপ, ঘুমের অভাব, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং ‘ডিসিশন ফ্যাটিগ’ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও বিচারবোধকে দুর্বল করতে পারে। তাই একজন বিচারকের জন্য নিরাপদ, শান্ত, পরিচ্ছন্ন ও সহায়ক কর্মপরিবেশ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, পর্যাপ্ত জনবল এবং বিচারিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের বিচারকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও কর্মপরিবেশ অতিরিক্ত মামলার জট, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপত্তা-সংকটের কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। বিচারাধীন মামলার চাপ, সহায়ক জনবলের দক্ষতার ঘাটতি এবং কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের ভারসাম্যহীনতা তাঁদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। তাই নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল, উন্নত অবকাঠামো, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও পেশাগত কাউন্সেলিং নিশ্চিত করা আজ সময়ের দাবি। কারণ বিচারকদের সুস্থতা নিশ্চিত করা মানেই বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা ও জনআস্থা সুদৃঢ় করা।
আন্তর্জাতিক বিচারিক সুস্থতা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ন্যায়বিচারের শক্তি শুধু আইন, বিধি বা আদালতের কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত ভিত্তি হলো বিচারকার্যে নিয়োজিত মানুষের সুস্থতা, প্রজ্ঞা ও নৈতিক দৃঢ়তা। একজন বিচারকের শারীরিক, মানসিক ও আবেগগত সুস্থতা যত বেশি সুরক্ষিত হবে, বিচারব্যবস্থাও তত বেশি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও জনআস্থাসম্পন্ন হয়ে উঠবে। এই দিবসের মূল বার্তা একটাই-সুস্থ বিচারকই সুস্থ বিচারব্যবস্থার ভিত্তি, আর একটি সুস্থ বিচারব্যবস্থাই পারে ন্যায়, আস্থা ও মানবিক মর্যাদার ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি উন্নত সমাজ গড়ে তুলতে। সত্যিই, সুস্থতা থেকেই ন্যায়বিচারের সূচনা।









