প্রসঙ্গ: উপকূলের বনজীবী ও টিকে থাকার সংগ্রাম
সম্পাদকীয়
সুন্দরবন কেবল বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন বা প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাবেষ্টনীই নয়; এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। অথচ এই বনের ওপর নির্ভর করে জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের দিন কাটে চরম অনিশ্চয়তা, অভাব আর প্রাণঘাতী ঝুঁকির মধ্যে। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাঘ, কুমিরসহ বন্যপ্রাণীর আক্রমণ আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে যাঁরা বনের সম্পদ আহরণ করেন, তাঁদের জীবনের চিত্রটি অত্যন্ত করুণ। সম্প্রতি গণমাধ্যমে উঠে আসা খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলের উপকূলীয় জীবনের চিত্র আমাদের আবার স্মরণ করিয়ে দেয়Ñপ্রকৃতি ও ব্যবস্থার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বনজীবীরা আজ দিশেহারা।
দেশের উপকূলীয় খুলনা অঞ্চলের দাকোপ, কয়রা কিংবা সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগরের মতো এলাকাগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় সাত লাখ পরিবারের জীবন-জীবিকা এই ম্যানগ্রোভ বনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তবে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সীমা বৃদ্ধি ও নির্দিষ্ট প্রজনন মৌসুমে পাস-পারমিট বা বনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার কারণে গত এক দশকে এই জনগোষ্ঠীর আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বন রক্ষার তাগিদে প্রজননকালে সম্পদ আহরণ বন্ধ রাখা পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত জরুরি একটি সিদ্ধান্ত, তবে ওই সময়ে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্যানুসংস্থান বা বিকল্প আয়ের কোনো টেকসই ব্যবস্থা না থাকায় তাঁরা মানবিক সংকটে পড়ছেন।
বনজীবীদের চরম আর্থিক সংকটের সুযোগ নেয় অসাধু মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীরা। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বনে গিয়ে জলদস্যু, প্রগতির অভাব আর ন্যায্যমূল্য বঞ্চনার দরুন উপকূলীয় এই মানুষেরা দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জালে বন্দি হয়ে পড়েন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংগ্রহ করা সম্পদ বিক্রি করে কিস্তির টাকাই শোধ হয় না, পরিবার চালানো তো দূরের কথা। ফলে বাধ্য হয়ে পেশা বদল কিংবা শহরে বাস্তুচ্যুত হওয়ার মতো ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। অনেকে পেটের দায়ে অবৈধভাবে বনে প্রবেশ করে আইনের মুখোমুখি হচ্ছেন, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর এই দীর্ঘদিনের নীরব দুর্ভোগ নিরসনে শুধু আশ্বাস বা সাময়িক ত্রাণ অপর্যাপ্ত। সুন্দরবন সংরক্ষণের স্বার্থেই বনজীবীদের বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা এখন সময়ের বড় দাবি। বন বিভাগের উদ্যোগে প্রশিক্ষণ ও সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় এনে বিকল্প জীবিকার প্রকল্প বাস্তবায়নের যে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, তা দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে হবে। জেলেদের জন্য সরকারের বরাদ্দকৃত সহায়তা যেন প্রকৃত বনজীবীদের হাতে পৌঁছায় এবং দাদন ব্যবসায়ীদের শোষণ বন্ধে ঋণদান প্রক্রিয়া সহজ করা যায়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা যেমন জাতীয় দায়িত্ব, তেমনি বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের টেকসই অর্থনৈতিক সুরক্ষাও সরকারের প্রাথমিক বাধ্যবাধকতা। উপকূলের পরিবেশবান্ধব বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সুপেয় পানির সংকট নিরসন এবং জলবায়ু সহনশীল জীবনমান নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। বন বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে—আর এই বন রক্ষা করতে হলে বনকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা মানুষগুলোকেও বাঁচাতে হবে।









