সম্পাদকীয়/ সুন্দরবন রক্ষায় অবিলম্বে বন্ধ হোক প্লাস্টিক দূষণ
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন কেবল আমাদের প্রাকৃতিক ঢালই নয়, জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম মজবুত স্তম্ভ। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই বন উপকূলীয় অঞ্চলকে প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে, বায়ুম-লের কার্বন শোষণ করে এবং বছরে প্রায় ৪৬০ কোটি টাকার রাজস্ব যোগায় জাতীয় কোষাগারে। তবে আক্ষেপের বিষয় হলো, বেঙ্গল টাইগার, ইরাবতী ডলফিনসহ বিরল সব বন্যপ্রাণী ও জলজ প্রজাতির এই অনন্য আবাসস্থলটি আজ প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণের ভয়াবহ থাবায় মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
সুন্দরবনের ৫৪টি নদীতে প্রতিদিন গড়ে জমা হচ্ছে প্রায় ৫০ টন প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য। জোয়ার-ভাটার টানে এসব বর্জ্য বনের ১৫ কিলোমিটার গভীরে ছড়িয়ে পড়ছে এবং গাছের শ্বাসমূল পেঁচিয়ে ধরে ম্যানগ্রোভের প্রাণশক্তি নিঃশেষ করে দিচ্ছে। থমকে যাচ্ছে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, বিপন্ন হচ্ছে ২১০ প্রজাতির মাছ, কুমির ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জীবন। পাশাপাশি, যেসব নদীর ওপর ভিত্তি করে ৩০ লাখ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন, সেগুলোর বাস্তুতন্ত্র আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বন কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, পর্যটন মৌসুমে পর্যটকদের ফেলে যাওয়া চিপস-বিস্কুটের প্যাকেট, বোতল ও ওয়ান-টাইম প্লাস্টিক বনের ভেতরে ঢুকে প্রকৃতির অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করছে।
সুন্দরবনকে বাঁচাতে এখনই সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বনের সীমানায় পলিথিন ও সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর জরিমানা নিশ্চিত করা আবশ্যক। প্রতিটি ট্যুরিস্ট ভেসেল ও দর্শনীয় স্থানে সুনির্দিষ্ট ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করা, সংগৃহীত বর্জ্য বনের বাইরে এনে রিসাইক্লিংয়ের আওতায় নেওয়া এবং প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ ও পরিবেশবান্ধব পাত্রের ব্যবহার জোরদার করা দরকার। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ উপকূলীয় ১৭টি উপজেলায় চলমান সরকারের ‘রিডিউস, রিইউজ ও রিসাইকেল’ (৩জ) কৌশলের কার্যকর বাস্তবায়ন প্লাস্টিক দূষণ হ্রাসে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সুন্দরবন আমাদের অস্তিত্বের প্রতীক। স্থানীয় বনজীবী, ট্যুর অপারেটর, পর্যটক ও বন বিভাগের যৌথ প্রচেষ্টায় খাল ও সৈকতগুলোতে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং কঠোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। অবিলম্বে প্লাস্টিক মুক্ত সুন্দরবন নিশ্চিত করতে না পারলে আমরা কেবল একটি বিশ্ব ঐতিহ্যকেই হারাব না, বরং পুরো দেশের পরিবেশগত নিরাপত্তাও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেব।









