একদিকে ঋণের পাহাড়, অন্যদিকে সচ্ছলতার রঙিন স্বপ্নÑএই দুইয়ের দোলাচলে পড়ে প্রতিবছর হাজার হাজার বাংলাদেশি তরুণ পাড়ি জমান প্রবাসে। সাতক্ষীরার শফিকুল ইসলাম, নাহিদুল ইসলাম এবং শুভ কুমার দাসও সেই মিছিলেই শামিল হয়েছেন। কিন্তু লেবাননের নাবাতিয়েহ ও মাইফাদুন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর ড্রোন হামলায় তাঁদের সেই স্বপ্ন এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যে পরিবারগুলো শেষ সম্বল বসতভিটা বিক্রি করে কিংবা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তাঁদের বিদেশে পাঠিয়েছিল, আজ তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক অনিশ্চিত ও অন্ধকার ভবিষ্যৎ।
এই মৃত্যুগুলো কেবল একেকটি সংখ্যা নয়; বরং আমাদের ভঙ্গুর প্রবাসী সুরক্ষা ব্যবস্থার এক একটি ক্ষত। নিহতদের পারিবারিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জক্ষম ব্যক্তি। শফিকুল ১০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশ গিয়েছিলেন মাত্র তিন মাস আগে। নাহিদুল আড়াই মাস আগে জমি বিক্রি করে গিয়েছিলেন পরিবারের অভাব মুছতে। আর শুভ নিজের বসতভিটাটুকু বেচে দিয়েছিলেন এক টুকরো সুখের আশায়। এখন এই নিঃস্ব পরিবারগুলোর মাথার ওপর কেবল ঋণের বোঝাই পাহাড় সমান নয়, বরং তাদের ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও জীবনযাপনের পথও রুদ্ধ হয়ে গেছে।
লেবাননের মতো সংঘাতময় এলাকায় বাংলাদেশি প্রবাসীরা অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিকতার তোয়াক্কা না করে যেভাবে বেসামরিক আবাসস্থলে ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে, তা কেবল নিন্দনীয়ই নয়, বরং চরম জঘন্য অপরাধ। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং মরদেহ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু কেবল নিন্দা বা লাশ ফিরিয়ে আনা কি এই সর্বস্বান্ত পরিবারগুলোর জন্য যথেষ্ট?
সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা হলোÑকোনো ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই সরকারি খরচে অতি দ্রুত এই তিনজনের মরদেহ পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। পরিবারগুলো যে বিপুল অংকের ঋণের জালে আটকে আছে, তা পরিশোধের জন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা এনজিওর মাধ্যমে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শফিকুলের দুই মেধাবী মেয়ের পড়াশোনা এবং শুভর ভূমিহীন বাবার আশ্রয়ের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। প্রবাসী কল্যাণ তহবিল থেকে তাঁদের জন্য এককালীন বড় অংকের অনুদান ও দীর্ঘমেয়াদী ভাতার ব্যবস্থা করা উচিত। লেবাননে অবস্থানরত অন্যান্য বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বৈরুত দূতাবাসের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মহলে এই হত্যাকা-ের প্রতিবাদ জোরালো করতে হবে।
দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন যে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা, বিদেশের মাটিতে তাঁদের এই অসহায় মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। শফিকুল, নাহিদুল ও শুভর মতো তরুণদের রক্ত যেন কেবল শোকের দলিলে সীমাবদ্ধ না থাকে। রাষ্ট্র যদি আজ এই নিঃস্ব পরিবারগুলোর পাশে না দাঁড়ায়, তবে তা হবে আমাদের সামগ্রিক মানবিক ব্যর্থতা। আমরা আশা করি, সরকার দ্রুততম সময়ে এই পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে প্রবাসীদের প্রতি তার প্রকৃত দায়বদ্ধতার প্রমাণ দেবে।