সাতক্ষীরায় লিগ্যাল এইডের সাফল্যে কমেছে মামলা দায়েরের হার
মধ্যস্থতায় ১,৪৬৫ বিরোধ নিষ্পত্তি, বাড়ছে আদালতের বাইরে বিরোধ মীমাংসার প্রবণতা
বদিউজ্জামান : সাতক্ষীরায় সরকারি আইনগত সহায়তা কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বিনামূল্যে আইনগত পরামর্শ, মামলা পরিচালনা এবং বিশেষ করে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যক্রম জোরদার হওয়ায় আদালতে নতুন মামলা দায়েরের হার কমেছে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক বিরোধ আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি হওয়ায় সময়, অর্থ ও বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমানোর পাশাপাশি আদালতের ওপর মামলার চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস।
সাতক্ষীরা জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ সময়ে মোট ২ হাজার ১৯৯টি আবেদন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৩৮০টি মামলা দায়ের, ৬১টি মামলা নিষ্পত্তি এবং ১ হাজার ৭৯৭টি আবেদন মধ্যস্থতার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে। মধ্যস্থতার মাধ্যমে সফলভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে ১ হাজার ৪৬৫টি বিরোধ। এছাড়া আইনগত পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে নারী-পুরুষসহ বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীকে। মধ্যস্থতার মাধ্যমে অর্থ আদায় করে সংশ্লিষ্ট উপকারভোগীদের পরিশোধের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিভিন্ন আদালতে মামলা দায়েরের হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফৌজদারি মামলায় ৫৯ দশমিক ৮০ শতাংশ, পারিবারিক মামলায় ৩৫ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং দেওয়ানি মামলায় প্রায় ৬৬ দশমিক ৯ শতাংশ মামলা দায়ের কমেছে।
ফৌজদারি মামলায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য: লিগ্যাল এইড অফিসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট আদালতে ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়েছিল ১৯৯টি। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮০টিতে। অর্থাৎ মামলা দায়েরের হার কমেছে প্রায় ৫৯ দশমিক ৮০ শতাংশ।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ফৌজদারি বিরোধ মধ্যস্থতার জন্য ১৪৯টি আবেদন গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে সফল মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে ৮৬টি, যা মোট আবেদনের প্রায় ৫৭ দশমিক ৭২ শতাংশ।
মাসভিত্তিক তথ্যেও মধ্যস্থতা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়। জানুয়ারিতে ২৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ৯টি, মার্চে ১০টি, এপ্রিলে ৯টি, মে মাসে ১২টি এবং জুনে ১৬টিÑমোট ৮০টি ফৌজদারি মামলা সংশ্লিষ্ট আদালতে দায়ের হয়েছে। বিপরীতে সফল মধ্যস্থতার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৬টি।
পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে লিগ্যাল এইডের বড় ভূমিকা: পারিবারিক আদালতেও লিগ্যাল এইডের মধ্যস্থতা কার্যক্রমের প্রভাব স্পষ্ট। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট আদালতে পারিবারিক মামলা দায়ের হয়েছিল ৩২৯টি। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে হয়েছে ২১৩টি। অর্থাৎ মামলা দায়েরের হার কমেছে ৩৫ দশমিক ২৬ শতাংশ।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ২৭৮টি আবেদন গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ১৬২টি বিরোধ সফল মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে। সফলতার হার প্রায় ৫৮ দশমিক ২৮ শতাংশ।
মাসভিত্তিক হিসাবেও পারিবারিক মামলা দায়েরের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় কমেছে। জানুয়ারিতে ৫৬টি, ফেব্রুয়ারিতে ৪৩টি, মার্চে ২৭টি, এপ্রিলে ৪৩টি, মে মাসে ২৪টি এবং জুনে ২০টিÑমোট ২১৩টি মামলা দায়ের হয়েছে।
দেওয়ানি মামলায় মামলা দায়ের কমেছে প্রায় ৬৭ শতাংশ: দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রেও লিগ্যাল এইডের কার্যক্রমের ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট আদালতে ১৬৬টি দেওয়ানি মামলা দায়ের হয়েছিল। ২০২৬ সালের একই সময়ে মামলা দায়ের হয়েছে মাত্র ৫৫টি। এতে মামলা দায়েরের হার কমেছে প্রায় ৬৬ দশমিক ৯ শতাংশ।
এ সময়ে মধ্যস্থতার জন্য ৮২টি আবেদন গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ৪টি বিরোধ সফলভাবে মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে।
লিগ্যাল এইড অফিসের নথিতে বলা হয়েছে, দেওয়ানি মামলায় মধ্যস্থতার সফলতার হার তুলনামূলকভাবে কম হলেও আবেদনপত্র গ্রহণের সময় দাখিলকৃত দলিল, খতিয়ানসহ অন্যান্য কাগজপত্র পর্যালোচনা করে অনেক আবেদনকারীকে প্রতিকার পাওয়ার উপযুক্ত পথ সম্পর্কে আইনগত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
মামলা না করে বিকল্প আইনি প্রতিকারের পরামর্শ: জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অনেক আবেদনকারী বিরোধ নিয়ে সরাসরি দেওয়ানি মামলা করতে আগ্রহী হলেও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র ও বিষয়বস্তু পর্যালোচনার পর দেখা যায়, মামলা দায়ের না করে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩সহ অন্যান্য আইনে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এ ধরনের ক্ষেত্রে লিগ্যাল এইড অফিস থেকে আবেদনকারীকে যথাযথ আইনগত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় দেওয়ানি মামলা দায়ের থেকে আবেদনকারীরা বিরত থাকছেন। এর ফলে একদিকে বিচারপ্রার্থীর অর্থ ও সময় সাশ্রয় হচ্ছে, অন্যদিকে আদালতে নতুন মামলার চাপও কমছে।
নারী-পুরুষ উভয়েই পাচ্ছেন আইনগত পরামর্শ: ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে ২ হাজার ১৯৯টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ৩৮০টি মামলা দায়ের, ৬১টি মামলা নিষ্পত্তি এবং ১ হাজার ৭৯৭টি আবেদন মধ্যস্থতার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে।
এছাড়া নারী ও পুরুষ মিলিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষকে আইনগত পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নথিতে উল্লেখিত হিসাব অনুযায়ী, নারী আবেদনকারীদের ১ হাজার ৩৮২টি এবং পুরুষ আবেদনকারীদের ৪২৬টি ক্ষেত্রে পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। উপকারভোগীর সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ২ হাজার ৫০৮ জন।
মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির পাশাপাশি আদায় করা অর্থের পরিমাণ ১ কোটি টাকারও বেশি। নথিতে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মধ্যস্থতার মাধ্যমে অর্থ আদায়ের পরিমাণ ১ কোটি ৩৮ হাজার ৮০০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
মধ্যস্থতায় বিশেষ ভূমিকা বিশেষ মধ্যস্থতাকারীদের: জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের কার্যক্রমে বিশেষ মধ্যস্থতাকারীদের সম্পৃক্ততা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করেছে। অফিসের তথ্য অনুযায়ী, দুইজন স্পেশাল মিডিয়েটর প্রয়োজন রয়েছে। মধ্যস্থতার মাধ্যমে দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির ফলে আদালতে মামলা দায়েরের আগেই অনেক বিরোধের সমাধান সম্ভব হচ্ছে।
আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, আদালতে মামলা দায়েরের পর দীর্ঘ সময় ধরে বিচার প্রক্রিয়ায় থাকার পরিবর্তে উপযুক্ত বিরোধগুলো মধ্যস্থতার মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি হলে বিচারপ্রার্থীর সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হয়। একই সঙ্গে আদালতের মামলাজট কমাতেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
জনবল ও অবকাঠামো সংকটেও চলছে কার্যক্রম: সাফল্যের পাশাপাশি সাতক্ষীরা জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে রয়েছে জনবল ও অবকাঠামোগত সংকট। অফিসের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে স্টাফ সংখ্যা ৬ জন, অথচ আরও জনবল প্রয়োজন।
প্রয়োজনীয় জনবলের তালিকায় রয়েছেÑ স্টেনো টাইপিস্ট কাম-কম্পিউটার অপারেটরÑ৩ জন, বেঞ্চ সহকারীÑ২ জন, হিসাব রক্ষকÑ১ জন, প্রসেস সার্ভারÑ২ জন, অফিস সহায়কÑ৩ জন। অর্থাৎ মোট ১১টি পদে জনবল প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া অফিসের কম্পিউটার সংকটও রয়েছে। প্রয়োজন ৩টি ডেস্কটপ কম্পিউটার ও প্রিন্টারসহ। একই সঙ্গে মধ্যস্থতা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ২ জন স্পেশাল মিডিয়েটর।
নিজস্ব ভবনের জন্য জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ: জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের নিজস্ব ভবন না থাকাও একটি বড় সমস্যা। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, নতুন ভবন নির্মাণের স্থান সংক্রান্ত বিষয়ে বিজ্ঞ সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ কর্তৃক প্রেরিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জমি অধিগ্রহণের ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
তবে নিজস্ব ভবন নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবনের প্রথম তলায় লিগ্যাল এইড অফিসের জন্য জায়গা বরাদ্দ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তিতে নতুন সম্ভাবনা: সাতক্ষীরা জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সামগ্রিক পরিসংখ্যান বলছে, আইনগত সহায়তা এখন শুধু দরিদ্র মানুষের মামলা পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। আইনগত পরামর্শ, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি এবং মধ্যস্থতার মাধ্যমে মামলা হওয়ার আগেই বিরোধ নিষ্পত্তির একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে লিগ্যাল এইড অফিস ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে ২০২৬ সালে ফৌজদারি, পারিবারিক ও দেওয়ানি মামলায় মামলা দায়েরের হার কমে যাওয়ার পাশাপাশি মধ্যস্থতার মাধ্যমে শত শত বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় সাতক্ষীরায় ‘মামলা নয়, সমঝোতার মাধ্যমে ন্যায়বিচার’ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের কার্যক্রম নতুন মাত্রা পেয়েছে।









