সারের আকাশছোঁয়া দাম ও সংকট নিরসনে পদক্ষেপ
মো. মাসুদ রানা
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেন আমাদের কৃষক সমাজ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমপিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় রাসায়নিক সারের দাম সাধারণ ও প্রান্তিক কৃষকদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ডিলার পর্যায়ের সিন্ডিকেট, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং স্থানভেদে সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে সার বিক্রির কারণে কৃষকেরা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক চাষাবাদ কমাতে বাধ্য হচ্ছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে যাচ্ছে আগামী মৌসুমের সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদনের ওপর।
সারের দাম বৃদ্ধি ও সংকটের প্রধান কারণসমূহ-
ডিলার ও অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট: সরকার নির্ধারিত দামে সার না দিয়ে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রি করা।
মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য: খুচরা বাজার ও প্রান্তিক পর্যায়ে সারের পৌঁছানোর মাঝখানে একাধিক হাতবদল হওয়া।
দেশীয় উৎপাদনে জ্বালানি সংকট: সার কারখানাগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের অভাবে দেশীয় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা।
তদারকির অভাব: স্থানীয় পর্যায়ে উপজেলা ও ইউনিয়ন কৃষি অফিসের নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের ঘাটতি।
কৃষি ও কৃষকদের রক্ষায় আশু করণীয় পদক্ষেপ-
ক. বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি তদারকি
কঠোর মনিটরিং ও মোবাইল কোর্ট: ডিলার ও খুচরা সার বিক্রেতাদের গুদাম এবং দোকানে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি নিশ্চিত করা। অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা করা।
সার ডিলারশিপ ব্যবস্থা পুনঃমূল্যায়ন: যেসব ডিলার কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেয়, তাদের লাইসেন্স তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা।
খ. ডিজিটাল পদ্ধতিতে সরাসরি ভর্তুকি প্রদান
কৃষক কার্ডের মাধ্যমে প্রণোদনা: সারের ভর্তুকি যেন কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর পকেটে না যায়, সেজন্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ের (বিকাশ/নগদ/রকেট) মাধ্যমে নিবন্ধিত প্রকৃত কৃষকদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি সারের ভর্তুকির টাকা বা ডিজিটাল ভাউচার পাঠানো।
গ. সরবরাহ নিশ্চিতকরণ ও বিকল্প ব্যবস্থা
দেশীয় কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ: দেশীয় সার কারখানাগুলো চালু রেখে উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া, যাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা ও খরচ দুই-ই কমে।
সেচ ও বিদ্যুৎ সুবিধা: সেচ মৌসুমে কৃষি ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভ্রাট কমানো এবং সারের বিকল্প হিসেবে জৈব ও সুষম সার ব্যবহারে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
ঘ. প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিক সুরক্ষা
সহজ শর্তে কৃষি ঋণ: সারের বাড়তি খরচ সামাল দিতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য জামানতহীন ও নামমাত্র সুদে জরুরি কৃষি ঋণের সুবিধা চালু করা।
সারের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি কেবল কৃষকের একার সমস্যা নয়; এটি পুরো দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। সারের দাম অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণে না আনলে চাল, ডাল ও শাকসবজির উৎপাদন ব্যাপক হ্রাস পাবে, যা দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতিকে আরও ভয়াবহ রূপ দেবে। তাই কালক্ষেপণ না করে ডিলার সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলা, বাজারে প্রশাসনিক নজরদারি জোরদার করা এবং কৃষকের হাতে সরাসরি সরকারি সহায়তা পৌঁছানো এখন সময়ের দাবি।
মো. মাসুদ রানা, এমএসসি, পদার্থ বিজ্ঞান, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ









