সুন্দরবনই আমাদের রেইনফরেস্ট : উপকূল বাঁচানোর লড়াই
তারিক ইসলাম
২২ জুন, বিশ্ব রেইনফরেস্ট দিবস। বিশ্বজুড়ে যখন জলবায়ু পরিবর্তনের চরম অভিঘাত আর উষ্ণায়নের তাপদাহে মানবসভ্যতা থমকে দাঁড়ানোর উপক্রম, তখন এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম। পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত আমাজন বা কঙ্গোর মতো রেইনফরেস্ট বা চিরহরিৎ বনগুলো আজ মানুষেরই সৃষ্টি করা লোভ আর অসচেতনতার বলি হচ্ছে।
প্রতি মিনিটে ধ্বংস হচ্ছে এক একটি বিশাল বনাঞ্চল। তবে দূরবর্তী রেইনফরেস্টের এই ক্ষত কেবল দূর দেশের সংকট নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের মতো জলবাযয় ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর ওপর।
আমরা যারা সাতক্ষীরা তথা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে বাস করি, আমাদের জন্য বনের গুরুত্ব বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের অঞ্চলে সরাসরি আমাজনের মতো রেইনফরেস্ট বা বৃষ্টিপ্রচুর বন না থাকলেও, আমাদের মাথার ওপর পরম মমতায় ছায়া দিয়ে চলেছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন ‘সুন্দরবন’।
রেইনফরেস্ট যেমন বৈশ্বিক কার্বন শোষণ করে পৃথিবীকে শীতল রাখে, আমাদের সুন্দরবনও ঠিক একইভাবে বছরের পর বছর কোটি কোটি টন কার্বন বুকে ধারণ করে বাংলাদেশকে রক্ষা করে আসছে। সিডর, আইলা, আম্পান থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের রেমাল—প্রতিটি প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে এই সুন্দরবন নিজের বুক পেতে আমাদের উপকূলের লাখ লাখ মানুষকে বাঁচিয়েছে।
দুর্ভাগ্যবশত, আমরা কি এই পরম বন্ধুর প্রতি সঠিক বিচার করছি? বিশ্বজুড়ে রেইনফরেস্ট ধ্বংসের যে চিত্র, আমাদের সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। বিষ দিয়ে মাছ শিকার, বন্যপ্রাণী নিধন, নির্বিচারে গাছ কাটা এবং প্লাস্টিক দূষণের কারণে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র আজ চরম হুমকির মুখে। সুন্দরবন যদি তার কার্যক্ষমতা হারায়, তবে সাতক্ষীরাসহ পুরো উপকূলীয় অঞ্চল সমুদ্রের নোনা জলে তলিয়ে যাবে, বাস্তুচ্যুত হবে লাখ লাখ মানুষ।
সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটির পক্ষ থেকে আমরা প্রতিনিয়ত স্থানীয় উদ্ভিদবৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রকৃতি সুরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছি। আজকের এই বিশেষ দিবসে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, বন রক্ষা করা কোনো বিলাসী উদ্যোগ নয়, এটি আমাদের বেঁচে থাকার লড়াই।
আমাদের এখনই কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
১. সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।
২. উপকূল জুড়ে ব্যাপক হারে স্থানীয় ও নোনা জল সহনশীল বৃক্ষরোপণ সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া।
৩. জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
রেইনফরেস্ট দিবসের বৈশ্বিক ডাক হলো—প্রকৃতিকে তার নিজের মতো করে বাঁচতে দেওয়া। আসুন, এই দিবসে আমরা শুধু দূর দেশের বনের জন্য আফসোস না করে, আমাদের ঘরের কাছের সুন্দরবনকে বাঁচাতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই। সুন্দরবন বাঁচলে, বাঁচবে উপকূল; আর উপকূল বাঁচলেই বাঁচবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।
লেখক: তারিক ইসলাম, সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।












