সুন্দরবনকে ঘিরে বৈশ্বিক পর্যটনের নতুন স্বপ্ন
মো. মামুন হাসান
ভোরের কুয়াশা ভেদ করে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে একটি নৌযান। দুপাশে ঘন সবুজ গাছপালা, কেওড়া আর গরানের শ্বাসমূল পানির ভেতর দাঁড়িয়ে আছে যেন প্রকৃতির নীরব প্রহরী হয়ে। দূরে কোথাও হরিণের ছুটে চলা, আকাশে সাদা বকের ঝাঁক, নদীর ঢেউয়ে লাল সূর্যের প্রতিফলন। এমন দৃশ্য পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়। এই অপরূপ সৌন্দর্যের নাম সুন্দরবন। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন কেবল বাংলাদেশের গর্ব নয়, এটি হতে পারে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রকৃতি নির্ভর পর্যটন কেন্দ্র। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে এখনই সময় আধুনিক, সৃজনশীল ও আন্তর্জাতিক মানের পরিকল্পনা গ্রহণের।
বর্তমান বিশ্বে পর্যটন আর শুধু ভ্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মানুষ এখন অভিজ্ঞতা খোঁজে, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার অনুভূতি খোঁজে, নতুন সংস্কৃতি জানতে চায়। সেই দিক থেকে সুন্দরবনের সম্ভাবনা অসীম। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে এটিকে আকর্ষণীয় করতে হলে শুধু প্রচলিত পর্যটন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেভাবে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদকে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করেছে, বাংলাদেশকেও সেই পথেই এগোতে হবে।
মালদ্বীপ তাদের সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনকে ভার্চুয়াল ভ্রমণ ও অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করেছে। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম তাদের দ্বীপ ও নদীভিত্তিক সৌন্দর্যকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে তুলে ধরেছে যে পর্যটকেরা সেখানে যাওয়ার আগেই মুগ্ধ হয়ে যায়। সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও আধুনিক ভিডিও প্রযুক্তি, ত্রিমাত্রিক অনলাইন ভ্রমণ এবং ড্রোনচিত্র ব্যবহার করে এমন এক ডিজিটাল উপস্থাপনা তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে বিদেশি পর্যটক ঘরে বসেই বনের গভীর রহস্য অনুভব করতে পারবেন। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, নদীর আঁকাবাঁকা পথ, জেলেদের জীবন, মধু সংগ্রহ কিংবা সূর্যাস্তের দৃশ্য যদি আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রচারণায় সঠিকভাবে তুলে ধরা যায়, তবে সুন্দরবনের প্রতি বিশ্ববাসীর আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
সুন্দরবনের পর্যটনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনা যেতে পারে নদীকেন্দ্রিক বিলাসবহুল ভ্রমণের মাধ্যমে। নরওয়ে তাদের ফিয়র্ড অঞ্চল এবং ভিয়েতনাম তাদের হা লং উপসাগরকে আধুনিক নৌভ্রমণের মাধ্যমে বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও মংলা, শ্যামনগর কিংবা মুন্সিগঞ্জ থেকে আধুনিক পরিবেশবান্ধব নৌযান চালু করা যেতে পারে। সেই নৌযানে থাকবে আরামদায়ক কক্ষ, কাচঘেরা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, স্থানীয় খাবার, প্রশিক্ষিত গাইড এবং বনের ইতিহাস জানার সুযোগ। নদীর বুকের ওপর ভাসমান কটেজ কিংবা কাঠের নান্দনিক বিশ্রামকেন্দ্র তৈরি করা গেলে বিদেশি পর্যটকেরা প্রকৃতির একেবারে কাছাকাছি থাকার অভিজ্ঞতা পাবেন।
একই সঙ্গে সুন্দরবনের মানুষের জীবনকেও পর্যটনের অংশ করতে হবে। ব্রাজিলের আমাজন অঞ্চলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী পর্যটনের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছে। সুন্দরবনেও মৌয়াল, বাওয়ালি ও জেলেদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটক গাইড হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। পর্যটকেরা তখন শুধু বন দেখবেন না, তারা জানবেন এই বনের মানুষের জীবনসংগ্রাম, নদীর গল্প, মধু সংগ্রহের অভিজ্ঞতা এবং লোকসংস্কৃতির কথা। এতে স্থানীয় মানুষের আয় বাড়বে এবং পর্যটকরাও প্রকৃত সুন্দরবনকে অনুভব করতে পারবেন।
নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে যেমন স্থানীয় বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা বিদেশি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে, তেমনি সাতক্ষীরা ও শ্যামনগর এলাকায় গ্রামীণ আবাসনভিত্তিক পর্যটনের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। কাঁকড়া, চিংড়ি, খেজুরের রস, গ্রামীণ খাবার, লোকগান কিংবা নদীপাড়ের সন্ধ্যা বিদেশি পর্যটকদের কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে।
সুন্দরবনকে গবেষণা ও শিক্ষাভিত্তিক পর্যটনের কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রবালপ্রাচীর এলাকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা করতে যান। সুন্দরবনেও জলবায়ু পরিবর্তন, বাঘ সংরক্ষণ, নদী ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখানে এসে গবেষণা ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমে অংশ নিলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিকভাবে আরও উজ্জ্বল হবে।
পর্যটকদের নিরাপত্তা ও যাতায়াত ব্যবস্থাও আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার জঙ্গলভিত্তিক পর্যটন এলাকাগুলোতে দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থা, বিশেষ নিরাপত্তা দল এবং আকাশপথে যোগাযোগের সুবিধা রয়েছে। সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতেও দ্রুত চিকিৎসাসেবা, নিরাপদ নৌযান, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং পর্যটক সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি। বিদেশি পর্যটকদের জন্য সহজ অনলাইন অনুমতির ব্যবস্থা চালু করা গেলে তারা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করতে পারবেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরেছে। নিউজিল্যান্ডের পাহাড় ও বনভূমি যেমন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আকর্ষণ করেছে, তেমনি সুন্দরবনের রহস্যময় সৌন্দর্যও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও আলোকচিত্র প্রদর্শনীর অন্যতম কেন্দ্র হতে পারে। আন্তর্জাতিক নৌ প্রতিযোগিতা, বন্যপ্রাণী আলোকচিত্র উৎসব কিংবা প্রকৃতি বিষয়ক সম্মেলনের আয়োজন করা গেলে সুন্দরবনের পরিচিতি দ্রুত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবেশ রক্ষা। কোস্টারিকা ও আইসল্যান্ড পরিবেশবান্ধব পর্যটনের মাধ্যমে বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। সুন্দরবনেও প্লাস্টিকমুক্ত ভ্রমণ, সৌরশক্তিচালিত নৌযান এবং সীমিত পর্যটক প্রবেশের মতো উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ সুন্দরবনের প্রকৃতি রক্ষা করেই এর পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে। প্রকৃতি ধ্বংস করে কখনো প্রকৃতির সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখা যায় না।
সুন্দরবন বাংলাদেশের শুধু একটি বন নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং ভবিষ্যতের প্রতীক। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক প্রচারণা এবং টেকসই উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে সুন্দরবন একদিন এশিয়ার অন্যতম সেরা প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে। তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকেরা শুধু একটি বন দেখতে বাংলাদেশে আসবেন না, তারা আসবেন এক বিস্ময়কর জীবন্ত পৃথিবীকে অনুভব করতে। লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান,ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট








