সুন্দরবনে বাঘের সঙ্গে লড়ে যেভাবে ফিরলেন মৌয়াল বাবলু গাজী
ইব্রাহিম খলিল: সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে তখন নিস্তব্ধ দুপুর। চারদিকে কেওড়া-গরান আর গোলপাতার ঘন বন। কয়েকজন মৌয়াল মধু সংগ্রহে ব্যস্ত। ঠিক সেই সময় আচমকা পেছন দিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার। মুহূর্তেই বাঘটির ধারালো দাঁত বসে যায় মৌয়াল বাবলু গাজীর ডান কাঁধে। এরপর শুরু হয় জীবন আর মৃত্যুর ভয়ঙ্কর লড়াই।
প্রায় ১০ মিনিট ধরে বাঘের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের এই মৌয়াল। একসময় রক্তাক্ত শরীর নিয়েই বাঘের মুখ থেকে ফিরে আসেন তিনি।
বর্তমানে তিনি সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন।
ঘটনাটি ঘটে গত ১০ মে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায়। বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে বাবলুসহ কয়েকজন মৌয়াল মধু সংগ্রহে গিয়েছিলেন। জঙ্গলের ভেতরে কাজ করার সময় হঠাৎ করেই বাঘটি তার ওপর হামলা চালায়।
হাসপাতালের বেডে শুয়ে সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে বাবলু গাজী বলেন, হঠাৎ পেছন থেকে একটা আঘাত পাই। পরে দেখি বাঘ আমার কাঁধ কামড়ে ধরেছে। তখন মনে হয়েছিল আর বাঁচবো না। কিন্তু সাহস হারাইনি। বাঁচার জন্য লড়াই করেছি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে গিয়ে বাবলু বাঘটির দাড়ি শক্ত করে ধরে পাশে থাকা একটি ড্রামের মধ্যে তার মাথা ঢুকিয়ে দেন। এতে বাঘটি ড্রামের ভেতরে আটকা পড়ে বিকট শব্দ করতে থাকে। একপর্যায়ে আতঙ্কিত হয়ে বাবলুকে ছেড়ে দেয় প্রাণীটি।
সুযোগ বুঝে গুরুতর আহত অবস্থাতেই নিজে হেঁটে সঙ্গীদের কাছে পৌঁছান বাবলু। পরে সহযাত্রীরা তাকে নৌকায় করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উপকূলে নিয়ে আসেন। এরপর দ্রুত ভর্তি করা হয় হাসপাতালে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বাঘের কামড়ে তার ডান কাঁধের দুটি হাড় ভেঙে গেছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে গভীর ক্ষত রয়েছে। তবে বর্তমানে তার অবস্থা স্থিতিশীল।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জন ডা. পি. কে. মন্ডল বলেন, রোগীর অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। তার মানসিক শক্তি অনেক বেশি, যা দ্রুত সুস্থ হতে সহায়তা করবে।
বাবলুর এই বেঁচে ফেরা এখন উপকূলজুড়ে আলোচনার বিষয়। স্থানীয়দের দাবি, সাধারণত বাঘের হামলায় কেউ আক্রান্ত হলে ফিরে আসার সম্ভাবনা খুব কম থাকে। সেখানে বাবলুর ফিরে আসা অলৌকিক ঘটনা বলেই মনে করছেন তারা।
স্থানীয় জেলে মোহাম্মদ আলী বলেন, বাঘের আক্রমণ মানেই মৃত্যু। বাবলু যেভাবে ফিরে এসেছে, এটা অবিশ্বাস্য। তবে এই ঘটনা আবারও সামনে এনেছে সুন্দরবনপাড়ের মানুষের কঠিন বাস্তবতা। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন জীবন বাজি রেখে বনে যেতে হয় হাজারো বনজীবীকে। বিকল্প আয়ের পথ না থাকায় ঝুঁকি জেনেও তাদের থামার সুযোগ নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা নুর আহমেদ বলেন, পেটের দায়ে মানুষ বনে যায়। বিকল্প কাজের সুযোগ তৈরি না হলে মানুষ-বাঘ সংঘাত কমবে না।
এদিকে বন বিভাগ জানিয়েছে, মানুষ-বাঘ সংঘাত কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মশিউর রহমান বলেন, বৈধভাবে বনে গিয়ে কেউ আক্রান্ত হলে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও রয়েছে। বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা কাজ করছি।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সুন্দরবন খুলনা অঞ্চলে বাঘের আক্রমণে ২২৪ জন বনজীবীর মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৫২ জন।
হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে থাকা বাবলু গাজীর শরীরে এখনো স্পষ্ট বাঘের থাবার দাগ। তবে সেই দাগ যেন শুধু ভয় নয়, সুন্দরবনের মানুষের বেঁচে থাকার অদম্য সংগ্রামের কথাই বলে।









