সুফী মোতাহার হোসেনের কবিতা ও সাহিত্যমহলে উপেক্ষার নীতি
মুয়িন পারভেজ
বাতিঘরের ওয়েবসাইটে ‘মোতাহার হোসেন সুফী’ পাতায় লেখা আছে কবি সুফী মোতাহার হোসেনের জীবনকথা। বস্তত নামের বানানে সাদৃশ্য থাকিলেও দুজন আলাদা লোক। সংক্ষিপ্ত পরিচিতিটুকু ‘উইকিপিডিয়া’-র পাতা হইতে হুবহু তুলিয়া দেওয়া হইয়াছে। ইহাতে অবশ্য দোষের কিছু দেখি না-‘উইকিপিডিয়া’ মুক্ত বিশ্বকোষ; তবে তথ্যসূত্র উল্লেখ করা যাইত।
‘উইকিপিডিয়া’-তে সুফী মোতাহার হোসেন (১৯০৭-১৯৭৫)-সংক্রান্ত সবিস্তার কোনও তথ্য নাই, ‘বাংলাপিডিয়া’-তেও নাই। মারিয়া সালাম-সম্পাদিত ‘ছাড়পত্র’ ওয়েবজিনে সুফীর পাঁচটি সনেট প্রকাশ করা হয় ২০১৮ সালে, সঙ্গে কবির জীবন সম্পর্কে কৌতূহলোদ্দীপক কিছু কথাও। সেই লেখা হইতে জানা যায়, যৌবনে কবি দুরারোগ্য ব্যাধিতে (‘ফরিদপুরসিটি.কম’ ওয়েবসাইটে এই রোগের নাম লেখা হয়: নিউরেস্থিনিয়া ও ডিসপেপশিয়া) আক্রান্ত হইয়া ডা. নীলরতন সরকার (১৮৬১-১৯৪৩) ও ডা. বিধান রায়ের (১৮৮২-১৯৬২) শরণাপন্ন হন, কিন্তু নিরাময় না হওয়ায় কবি তালতলার পির আরশেদ আলীর দরবারে আসেন। সেখানে পিরের সান্নিধ্যে আধ্যাত্মিক চিকিৎসায় কবির রোগমুক্তি ঘটে এবং তিনি স্থূল সংসার ভুলিয়া মারেফাতের গূঢ় জগতের সন্ধানে আকৃষ্ট হইয়া পড়েন। প্রায় এক যুগ কবি বিভিন্ন দরগা-খানকায় ঘুরিয়া বেড়ান। পরে শুরু হয় কবির শিক্ষকতার জীবন। ঈশান ইনস্টিটিউটে তিনি শিক্ষকতা করেন দীর্ঘকাল। পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত ওই বিদ্যালয়েই সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন।
সুফী মোতাহার হোসেনের জন্ম ফরিদপুর জেলার ভবানন্দপুর গ্রামে, মাতুলালয়ে। তিনি ফরিদপুর জেলা স্কুল হইতে এন্ট্রান্স, জগন্নাথ কলেজ হইতে এফএ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বিএ (১৯৩১) পাশ করেন। বিএ পাশ করার পর কবি ফরিদপুর জেলা জজ আদালতে অফিস সহকারী পদে চাকরি করেন বছর দুয়েক। ‘সূফী মোতাহার হোসেন: জীবন ও কাব্য’ (‘সূফী’ বানানটি লক্ষণীয়) নামে একটি গবেষণাধর্মী বই লিখিয়াছেন ড. মোহাম্মদ আলী খান। সম্ভবত ইহাই কবির প্রথম পূর্ণাঙ্গ জীবনচরিত। জীবনীকার জানান, কবির পৈতৃক নিবাস পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার বীরপাশা গ্রামে, যদিও পরবর্তীকালে কবির পিতা মৌলভি মোহাম্মদ হাশিম ভবানন্দপুর গ্রামেই থিতু হন। তিনি পুলিশের সাব-ইনস্পেক্টর ছিলেন। ‘উইকিপিডিয়া’ জানাইতেছে, কবির মাতা তৈয়বতননেছা খাতুন ছিলেন জমিদার।
বিশের দশকে সুফী মোতাহার হোসেন মুসলিম সাহিত্যসমাজ-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। সেই সময়ে তিনি মোহিতলাল মজুমদার (১৮৮৮-১৯৫২), কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), আবুল হুসেন (১৮৯৬-১৯৩৮), ড. কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩), আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪) প্রমুখ কবিলেখকের সাহচর্য লাভ করেন; বিশেষত কাজী নজরুল ইসলাম ও মোহিতলাল মজুমদারের অনুপ্রেরণায় তিনি কবিতাচর্চায় উদ্বুদ্ধ হন। গবেষক মামুন সিদ্দিকী সম্প্রতি কবিরচিত ‘আবুল হুসেন’ শীর্ষক একটি অগ্রন্থিত নিবন্ধ প্রকাশ করেন ‘প্রথম আলো’-য় (৯ এপ্রিল ২০২৬)।
‘সনেট সংকলন’ (১৯৬৫) সুফী মোতাহার হোসেনের প্রথম কাব্য; পরে তাঁহার ‘সনেট সঞ্চয়ন’ (১৯৬৬) ও ‘সনেটমালা’ (১৯৭০) নামের দুটি কাব্য প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)-সম্পাদিত ‘বাংলা কাব্যপরিচয়’ (১৯৩৮) সংকলনে সুফীর ‘দিনান্তে’ সনেটটি ঠাঁই পায়। ‘বাংলাপিডিয়া’সহ কিছু দৈনিক পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে ‘দিনান্তে’ শিরোনামটি ‘দিগন্ত’ বলিয়া উল্লিখিত। আবদুল কাদির ও রেজাউল করীম (১৯০২-১৯৯৩)-সম্পাদিত ‘কাব্য-মালঞ্চ’ (১৯৪৫) সংকলনে সুফীর দুটি সনেট (‘স্বপ্নাগতা’ ও ‘মায়া-মৃগী’) চয়িত হইয়াছে। নরেন্দ্র দেব (১৮৮৮-১৯৭১) ও রাধারাণী দেবী (১৯০৩-১৯৮৯)-সম্পাদিত ‘কাব্য-দীপালি’ সংকলনের তৃতীয় সংস্করণেও সুফীর সনেট গৃহীত হয় বলিয়া জানা যায় ‘ফেইসবুক’-এ প্রকাশিত এক লেখায়, যদিও সংকলনটির প্রথম সংস্করণ (১৯২৭) ও দ্বিতীয় সংস্করণে (১৯৩১) সুফীর কোনও কবিতা পাওয়া যায় না।
আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৫), প্রেসিডেন্ট পুরস্কার (১৯৭০) ও বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৪)-প্রাপ্ত কবি সুফী মোতাহার হোসেন সনেট-রচয়িতা হিশেবে বিশেষভাবে খ্যাত ছিলেন। ‘দিনান্তে’ সনেটটি এখানে তুলিয়া দিলাম সনেটপিয়াসি পাঠকদের জন্য:
কুলায় প্রত্যাশী এক দীর্ঘপক্ষ পাখির মতন
দিগন্ত প্রসারি দুটি ঘনচ্ছায় ব্যাকুল পাখায়
পশ্চিম সাগর পারে দিন যবে ধীরে চলি যায়
মৌন মূক বেদনায় সকরুণ করিয়া গগন:
যবে তারে সন্ধ্যাবধূ স্মিতহাস্যে টানিয়া গুণ্ঠন,
বাসর-প্রদীপগুলি জ্বালি দিয়া তারায় তারায়,
গোপনে বরণ করে, ঢাকে তারে গভীর মায়ায়:
দিনান্তে পথিক এক আঁখি ভরি নেহারে স্বপন;
অমনি দিনান্ত যবে গাঢ়চ্ছাচ্ছে ঘনাবে জীবনে
সকরুণ, সুগম্ভীর; দিনান্তের যাত্রা-সহচরী
বধূ কি আসিবে তার। সুগভীর স্নিগ্ধ মমতায়
অমনি সুন্দর করে সন্ধ্যাদীপ জ্বালায়ে যতনে
বরণের ডালাখানি কম্প্রহস্তে তুলিবে কি ধরি’।
গভীর আশ্বাস বাণী কহিবে কি অস্ফুট ভাষায় ।
[‘বাংলা কাব্যপরিচয়’, পৃ ৩৩১-৩৩২]
শব্দচয়নে রাবীন্দ্রিক ঘরানার অনুসারী হইলেও খাঁটি পেত্রার্কীয় আদর্শে সনেটরচনায় সুফী বেশ নৈপুণ্য দেখাইয়াছেন। পরিতাপের বিষয় এই যে, সুফীর কাব্যসমূহ আজ আর সুলভ নহে। হয়তো গণগ্রন্থাগারের অন্ধকারাচ্ছন্ন কোনও পুস্তকপ্রকোষ্ঠে তাঁহার জরাজীর্ণ এক-আধখানা কাব্য পড়িয়া থাকিতে পারে। দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতায় কবির জন্মমৃত্যুতিথি-উপলক্ষ্যে বিশেষ আয়োজনও চোখে পড়ে না।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে মাধ্যমিক স্তরে নবম-দশম শ্রেণিতে ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান (১৯৩৬-২০০৮)-সম্পাদিত ‘বাংলা কবিতা’ বইয়ে সুফীর কবিতা পাঠ্য ছিল। ২০১৮ সালে প্রকাশিত একই শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ বইয়ে (সম্পাদনা: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ও ড. মাহবুবুল হক) কামাল চৌধুরীর (জ. ১৯৫৭) কবিতা থাকিলেও সুফীর কবিতা বাদ পড়িয়াছে; ২০২৫ সালে প্রকাশিত সংস্করণেও নাই। না-থাকা কবিদের তালিকায় আরও আছেন: নবীনচন্দ্র সেন (১৮৪৭-১৯০), শাহাদাৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩), খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন (১৯০১-১৯৮১), বন্দে আলী মিয়া (১৯০৬-১৯৭৯), সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২-২০০২), আশরাফ সিদ্দিকী (১৯২৭-২০২০), আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯), মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ (১৯৩৬-২০১৩), ফজল শাহাবুদ্দীন (১৯৩৬-২০১৪), আবু হেনা মোস্তফা কামাল (১৯৩৬-১৯৮৯), আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-২০১০) প্রমুখ; এমনকী কথাসাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২), সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-১৯৭১), প্রাবন্ধিক-গবেষক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (১৮৭১-১৯৫৩), ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯), মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ (১৮৯৮-১৯৭৪), ড. মুহম্মদ এনামুল হক (১৯০২-১৯৮২), ড. মুহম্মদ আবদুল হাই (১৯১৯-১৯৬৯), ড. আহমদ শরীফ (১৯২১-১৯৯৯), মুনীর চৌধুরী (১৯২৫-১৯৭১), আহমদ ছফার (১৯৪৩-২০০১) কোনও লেখা নবম-দশম শ্রেণিতে পাঠযোগ্য বিবেচনা করা হয় নাই।
এভাবেই কি অগ্রজ কবিলেখকেরা রূপান্তরিত হন বিস্মৃতির ফসিলে, ধীরে-ধীরে? কোনও সুবেদী সম্পাদকের হাতে সুসম্পাদিত হইয়া সুফীর কাব্যসমগ্র প্রকাশিত হউক-আপাতত ইহাই প্রার্থনা।






