অদৃশ্য কষ্টের স্বীকৃতি: বিশ্ব অ্যাটোপিক একজিমা দিবস ২০২৬
সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রতিবছর ১৪ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব অ্যাটোপিক একজিমা দিবস। ত্বকের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত রোগ অ্যাটোপিক একজিমা বা অ্যাটোপিক ডার্মাটাইটিস সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, রোগীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের নীরব শারীরিক-মানসিক কষ্টকে সামনে নিয়ে আসাই এ দিবসের মূল লক্ষ্য। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘অদৃশ্য বোঝা ভাঙুন’। এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী একজিমা রোগীদের সেই সব অদৃশ্য যন্ত্রণা তুলে ধরা হচ্ছে, যা বাইরে থেকে সহজে দেখা যায় নাÑযেমন দীর্ঘস্থায়ী চুলকানি, ঘুমের ব্যাঘাত, মানসিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং অর্থনৈতিক সংকট।
অ্যাটোপিক একজিমা কোনো সাধারণ ত্বকের র্যাশ নয়। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী, অসংক্রামক এবং জটিল প্রদাহজনিত চর্মরোগ, যা জিনগত প্রবণতা, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং পরিবেশগত নানা উপাদানের প্রভাবে দেখা দেয়। এ রোগে ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ত্বক আর্দ্রতা হারায়, অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে যায় এবং সহজেই অ্যালার্জেন ও জীবাণুর আক্রমণের শিকার হয়।
একজিমার সবচেয়ে কষ্টদায়ক লক্ষণ হলো তীব্র চুলকানি। অনেক ক্ষেত্রে এই চুলকানি রাতের বেলা বেড়ে যায়, ফলে রোগীরা স্বাভাবিক ঘুম থেকে বঞ্চিত হন। আক্রান্ত স্থানে লালচে ভাব, প্রদাহ, খসখসে ত্বক, ফেটে যাওয়া, এমনকি ক্ষত ও সংক্রমণও দেখা দিতে পারে। তবে একজিমার প্রকৃত বোঝা শুধু ত্বকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব বিস্তৃত হয় মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক জীবন এবং অর্থনৈতিক অবস্থার ওপরও।
বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একজিমা রোগীদের সবচেয়ে বড় সংকট হলো এর ‘অদৃশ্য বোঝা’। সার্বক্ষণিক চুলকানি, ব্যথা এবং অস্বস্তির কারণে অনেক রোগী উদ্বেগ, হতাশা ও বিষণ্ণতায় ভোগেন। দীর্ঘদিন ঘুমের ব্যাঘাতের ফলে কর্মক্ষমতা কমে যায়, মনোযোগ নষ্ট হয় এবং জীবনযাত্রার মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দৃশ্যমান ক্ষত বা ত্বকের পরিবর্তনের কারণে অনেক রোগী আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন এবং সামাজিক যোগাযোগ এড়িয়ে চলেন। গুরুতর ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণার ফলে আত্মহত্যার চিন্তাও দেখা দিতে পারে, যা এ রোগের গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের একটি উদ্বেগজনক দিক।
সামাজিক ক্ষেত্রেও একজিমা আক্রান্ত ব্যক্তিদের নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক মানুষ এখনও ভুলভাবে মনে করেন এটি একটি ছোঁয়াচে রোগ অথবা অপরিচ্ছন্নতার ফল। এই ভ্রান্ত ধারণা রোগীদের সামাজিক দূরত্ব, বৈষম্য ও একাকীত্বের দিকে ঠেলে দেয়। শিশুদের ক্ষেত্রে স্কুলে বুলিং ও উপহাসের ঘটনা ঘটে, যা তাদের শিক্ষা ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। প্রাপ্তবয়স্কদের অনেকেই কর্মক্ষেত্রে অস্বস্তি, বৈষম্য কিংবা সীমাবদ্ধতার শিকার হন। ফলে একজিমা কেবল একজন ব্যক্তির নয়, তার পরিবার এবং আশপাশের মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলে।
বিশ্ব অ্যাটোপিক একজিমা দিবসের গুরুত্ব এখানেই যে, এটি রোগটিকে শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় হিসেবে নয়, একটি জনস্বাস্থ্য, মানবিক এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ইস্যু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। ২০১৮ সালে ইউরোপিয়ান ফেডারেশন অব অ্যালার্জি অ্যান্ড এয়ারওয়েজ ডিজিজেস পেশেন্টস অ্যাসোসিয়েশনস এবং ইন্টারন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব ডার্মাটোলজি পেশেন্ট অর্গানাইজেশনস (গ্লোবালস্ক্রিন)-এর উদ্যোগে এ দিবস চালু হয়। এরপর থেকে এটি বিশ্বব্যাপী রোগীদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। এটি ৭৮তম বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদে গৃহীত ‘বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনীতিতে ত্বকের রোগকে অগ্রাধিকার প্রদান’ প্রস্তাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ওই প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে ত্বকের রোগসমূহের প্রকৃত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব প্রায়ই অবমূল্যায়িত হয়। তাই ‘অদৃশ্য কষ্টের বোঝা ভাঙুন’ প্রতিপাদ্যটি কেবল একটি সচেতনতামূলক স্লোগান নয়; এটি স্বাস্থ্যনীতি, গবেষণা, চিকিৎসা সুবিধা এবং রোগীদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি বৈশ্বিক আহ্বান।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দেশে এখনও অনেক মানুষ একজিমাকে সাধারণ চর্মরোগ হিসেবে দেখেন। গ্রামীণ ও শহরাঞ্চল উভয় ক্ষেত্রেই রোগটি সম্পর্কে ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেক রোগী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে দীর্ঘদিন স্টেরয়েডজাতীয় ক্রিম ব্যবহার করেন, যা পরবর্তীতে গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞ চর্মরোগ চিকিৎসক মূলত শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নত চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও একজিমা একটি বড় বোঝা। দীর্ঘমেয়াদে ময়েশ্চারাইজার, বিশেষ সাবান, ওষুধ এবং আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণের খরচ নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য কষ্টসাধ্য। স্বাস্থ্যবীমা কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে অধিকাংশ ব্যয় রোগীকেই বহন করতে হয়। একই সঙ্গে রোগীদের জন্য কার্যকর সহায়ক গোষ্ঠী, পরামর্শসেবা বা অধিকারভিত্তিক প্ল্যাটফর্মেরও ঘাটতি রয়েছে।
এই বাস্তবতায় কিছু বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। যেমন: গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে একজিমা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। রোগীদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসা ব্যবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তাকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। রোগীদের অধিকার রক্ষায় সহায়ক সংগঠন ও নীতিগত উদ্যোগ শক্তিশালী করতে হবে।
বিশ্বজুড়ে একজিমাসহ বিভিন্ন চর্মরোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চর্মরোগকে জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সদস্য দেশগুলোকে সচেতনতা, চিকিৎসা ও নীতিগত সহায়তা প্রদান করছে। তারা প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্যকর্মীরা যাতে সহজে রোগ শনাক্ত করতে পারেন, সে জন্য ডব্লিউএইচও ছবিসহ প্রশিক্ষণ নির্দেশিকা ও ডায়াগনস্টিক চার্ট তৈরি করেছে। একই সঙ্গে একজিমার সঙ্গে সম্পর্কিত অ্যাজমা, অনিদ্রা, উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার মতো সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এছাড়া রোগটির বিস্তার, ঝুঁকির কারণ এবং পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ডব্লিউএইচও সহযোগিতা করছে।
একজিমা কেবল ত্বকের সমস্যা নয়; এটি মানুষের জীবনমান, আত্মমর্যাদা, মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক অংশগ্রহণের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি বাস্তবতা। তাই রোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি, বৈজ্ঞানিক সচেতনতা এবং কার্যকর স্বাস্থ্যনীতি গড়ে তোলার মাধ্যমেই এই অদৃশ্য কষ্টের বোঝা লাঘব করা সম্ভব। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়Ñঅদৃশ্য কষ্টকে দৃশ্যমান করা এবং একটি আরও মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ নির্মাণ করা।









