বেতনের টাকাটা বৌদির হাতে দিও/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির রেখে যাওয়া একটি বাক্য এখন শুধু শোকের নয়, জবাবদিহিরওÑ“বেতনের টাকাটা বৌদির হাতে দিও।” একটি ছোট বাক্য, কিন্তু এর ভেতরে আছে একজন সাংবাদিকের শ্রমের মূল্য, পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা এবং সংবাদমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের বড় প্রশ্ন। পুলক চ্যাটার্জি ছিলেন বরিশালের সাংবাদিকতার পরিচিত মুখ। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক সমকালে কাজ করেছেন। একসময় সমকালের বরিশাল ব্যুরোপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করা এই মানুষটির শেষ সময়ে তাঁর প্রাপ্য অর্থের কথা উঠে আসা তাই নিছক ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ১১ সেপ্টেম্বর বরিশালের পারারা রোডে সমকালের আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর রেখে যাওয়া একাধিক নোটের কথাও সামনে এসেছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়। কোনো একটি ঘটনাকে তাঁর মৃত্যুর নিশ্চিত কারণ হিসেবে তুলে ধরা দায়িত্বশীল হবে না। কিন্তু তাঁর বেতন বা বৈধ পাওনার প্রশ্নটি স্পষ্টভাবে সামনে আনা জরুরি। ঠিক কত টাকা, কোন সময়ের বা কোন খাতে তাঁর পাওনা ছিলÑতা সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক হিসাব থেকেই নির্ধারিত হবে।
অনুমান করে কোনো অঙ্ক বা সময়কাল বলা ঠিক নয়। তবে যদি কোনো বৈধ পাওনা থেকে থাকে, সেটি তাঁর পরিবারের অধিকার। প্রতিষ্ঠানের অনুগ্রহ নয়। এখানেই আসে প্রাতিষ্ঠানিক দায়ের প্রশ্ন। একজন সাংবাদিক যখন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, তখন তাঁর কাছ থেকে সময়, শ্রম, দক্ষতা ও পেশাগত দায়িত্ব প্রত্যাশা করা হয়। সেই শ্রমের বিনিময়ে নির্ধারিত পারিশ্রমিক সময়মতো দেওয়া প্রতিষ্ঠানটির মৌলিক দায়িত্ব। চাকরি শেষ হলে হিসাব চুকিয়ে দেওয়া, কর্মী মারা গেলে তাঁর বৈধ উত্তরাধিকারীর কাছে পাওনা পৌঁছে দেওয়াÑএগুলোও সেই দায়িত্বের অংশ।
অতএব কোনো কর্মীর পাওনা নিয়ে পরিবারকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হবে কেন? কেন একজন কর্মীর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীকে প্রতিষ্ঠানের দরজায় পাওনার হিসাব জানতে দাঁড়াতে হবে? কেন কর্মীর জীবদ্দশায় যে হিসাব পরিষ্কার হওয়ার কথা, তা মৃত্যুর পরও অস্পষ্ট থাকবে? প্রতিষ্ঠান যদি কর্মীর শ্রমের হিসাব রাখে, তবে তাঁর পাওনার হিসাবও রাখতে হবে। এখানে সংবাদমাধ্যমের দায় আরও বেশি। কারণ যে প্রতিষ্ঠান সমাজের কাছে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়ের দাবি তোলে, তার নিজের কর্মীদের ক্ষেত্রেও একই মানদ- প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে কর্মীর ন্যায্য পারিশ্রমিকের অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পুলকের ঘটনায় তাই আবেগের চেয়ে এখন প্রয়োজন স্বচ্ছতা। তাঁর কোনো বৈধ পাওনা থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে হিসাব যাচাই করে তা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। প্রয়োজন হলে পরিবারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করে প্রাপ্য অর্থ ও অন্যান্য সুবিধার বিষয়টি লিখিতভাবে জানাতে হবে। কোনো প্রশাসনিক জটিলতা থাকলে তার সমাধানের দায়িত্বও প্রতিষ্ঠানেরÑপরিবারের নয়।
কর্মীর পাওনা পরিশোধের জন্য পরিবারকে দৌড়াতে হবেÑএমন ব্যবস্থা কোনো দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের হতে পারে না। আর এখানেই বিষয়টি ব্যক্তিগত গ-ি ছাড়িয়ে বৃহত্তর সংবাদমাধ্যমের প্রশ্ন হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের অনেক সাংবাদিক, বিশেষ করে মফস্বলের সাংবাদিক, অনিশ্চিত কর্মপরিবেশে কাজ করেন। কোথাও নিয়োগপত্র নেই, কোথাও নিয়মিত বেতন নেই, কোথাও চাকরি শেষ হওয়ার পর পাওনা নিষ্পত্তির সুস্পষ্ট ব্যবস্থা নেই। অথচ সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে তাঁদের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশা করা হয়।
এই দ্বৈতনীতি বন্ধ করতে হবে।প্রতিটি সংবাদমাধ্যমের উচিত কর্মীদের জন্য লিখিত নিয়োগ, নির্ধারিত বেতন, সময়মতো পারিশ্রমিক, ছুটি ও অন্যান্য বৈধ সুবিধা নিশ্চিত করা। চাকরি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চূড়ান্ত হিসাব নিষ্পত্তির বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা থাকতে হবে। কর্মীর মৃত্যু হলে তাঁর পরিবার কীভাবে পাওনা পাবে, সেটিও প্রতিষ্ঠানের নীতিমালায় স্পষ্ট থাকা দরকার। আর শুধু নীতিমালা করলেই হবে নাÑতার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।পুলকের মৃত্যু নিয়ে তদন্ত তার নিজস্ব গতিতে চলবে।
মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনো অনুমানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা উচিত নয়। কিন্তু তাঁর বৈধ পাওনার প্রশ্নটি তদন্তের ফলের ওপর নির্ভরশীল নয়। পাওনা থাকলে সেটি হিসাব করে পরিশোধ করা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। তাই এখন প্রয়োজন শোকের আনুষ্ঠানিকতা পেরিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ। পুলকের কোনো বেতন বা বৈধ পাওনা থাকলে তা দ্রুত নির্ধারণ ও পরিশোধ করা হোক। পরিবারের সঙ্গে বিষয়টি স্বচ্ছভাবে নিষ্পত্তি করা হোক।
একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা, চাকরির নিশ্চয়তা ও কর্ম-পরবর্তী অধিকার নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা হোক। “বেতনের টাকাটা বৌদির হাতে দিও”Ñএই বাক্যটি যেন শুধু পুলকের শেষ অনুরোধ হয়ে না থাকে। এটি সংবাদমাধ্যমের প্রতি একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্ন হয়ে থাকুক। যে সাংবাদিকের শ্রম প্রতিষ্ঠানের সংবাদকে সমৃদ্ধ করে, তাঁর শ্রমের মূল্য পরিশোধ করা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।
আর সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা কোনো সাধারণ দাপ্তরিক ত্রুটি নয়; এটি কর্মীর অধিকার ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির প্রশ্ন। পুলকের প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা শুধু তাঁকে স্মরণ করা নয়। তাঁর প্রাপ্য যদি থেকে থাকে, তা তাঁর পরিবারের হাতে পৌঁছে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে কোনো সাংবাদিকের পরিবারকে যেন একই প্রশ্ন নিয়ে প্রতিষ্ঠানের দরজায় দাঁড়াতে না হয়Ñসেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হবে তাঁর শেষ কথার প্রকৃত মর্যাদা।
লেখক: সংবাদকর্মী









