অবহেলার অন্ধকারে সাতক্ষীরার লোকজ অমৃত
আখলাকুর রহমান
বিকেলের ম্লান রোদটুকু যখন বাঁশবাগানের মাথার ওপর এসে থমকে দাঁড়ায়, তখন গ্রামীণ নিস্তব্ধতার বুক চিরে এক তীব্র উদাসীনতার সুর কানে বাজে। রূপসী বাংলার এই নিভৃত কোণে, যেখানে সুন্দরবনের নোনা বাতাস আর পলিমাটির সুবাস মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, সেই সাতক্ষীরার মেঠোপথের ধারে কতশত অবহেলিত ইতিহাস লুকিয়ে আছে, তার খবর শহরতলির মানুষ কোনোদিন জানতেও পারে না। একসময় আমাদের শৈশবের দিনগুলো জড়িয়ে থাকত গ্রামের ঝোপঝাড়ে, সাপের উপদ্রব উপেক্ষা করে নিবিড় কোনো বাঁশবনের কোণে। সেখানে অযতেœ, অবহেলায় কত বিচিত্র ফলের মেলা বসত। টক-মিষ্টি স্বাদের টুকটুকে লাল বৈঁচি ফল, হলদেটে ডেউয়া, ডালপালার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সুমিষ্ট কাউফল কিংবা উঠোনের কোণের সেই জীর্ণ আতা গাছটি—এরা তো কেবল ফল ছিল না, ছিল বাংলার শ্বাশত রূপের একেকটি চিরচেনা অবয়ব।
আজকের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ইট-পাথরের খাঁচায় বসে ল্যাপটপের পর্দায় কত কী দেখে, কিন্তু বৈঁচি ফলের সেই অম্ল-মধুর স্বাদ কিংবা কাউফলের গন্ধ তাদের চেনা জগতের অনেক বাইরে রয়ে গেল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দেশীয় ফলগুলো ছিল গ্রামীণ মানুষের পুষ্টির এক অফুরন্ত এবং সহজলভ্য উৎস। অথচ বড় বেদনার সাথে লক্ষ্য করতে হয়, প্রকৃতির এই অমূল্য দানগুলোকে পরম যতেœ বাঁচিয়ে রাখার, কিংবা এদের বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করার কোনো সুনির্দিষ্ট সরকারি বা বেসরকারি প্রয়াস আজ চোখে পড়ে না। যেন এক অলিখিত নিয়মে আমরা আমাদের শেকড়কে ভুলে যাওয়ার উৎসবে মেতে উঠেছি।
শুধু কি বুনো ফল? এই জনপদের মানুষের হাতের ছোঁয়ায় কত কী যে অমৃত হয়ে উঠত, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। বর্ষার জলে ভেসে আসা সাতক্ষীরার খাল-বিলের আদি খৈলশা কিংবা পারশে মাছের সেই সোঁদা গন্ধযুক্ত শুঁটকি, সুন্দরবনের গহীন অরণ্য থেকে মৌয়ালদের বুকভাঙা পরিশ্রমে সংগৃহীত খাঁটি পদ্মমধু, কিংবা গোয়াল ঘরের গরুর দুধ জ্বাল দিয়ে পরম যতেœ তৈরি করা খাঁটি গাওয়া ঘি—এসবের স্বাদে ও গুণে যে অনাবিল তৃপ্তি ছিল, তা আজকের নামী-দামী সুপারশপের চকচকে মোড়কের খাবারে মেলা ভার। কিন্তু বড় দুঃখ হয় যখন দেখি, সঠিক বিপণন ও আধুনিক ব্র্যান্ডিংয়ের অভাবে এই অসাধারণ পণ্যগুলো দেশের মূল ধারার বাজারে নিজেদের যোগ্য আসনটি আজও ফিরে পেল না। প্রচারের আলো থেকে বহুদূরে, গ্রামীণ হাটের ধুলোবালি আর অবহেলার অন্ধকারে এরা যেন নিজেদের অস্তিত্বের শেষ স্পন্দনটুকু টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
ঐতিহ্য হারিয়ে গেলে একটা দেশের প্রাণস্পন্দনও স্তিমিত হয়ে আসে। আমাদের মাটির এই সোঁদা গন্ধ, আমাদের এই নিজস্ব ফল আর লোকজ সম্পদগুলোকে যদি আমরা হারিয়ে যেতে দিই, তবে ভবিষ্যৎ এক চরম রিক্ততার মুখোমুখি দাঁড়াবে। এখনো সময় আছে, গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং আমাদের এই সুপ্ত গৌরবকে বাঁচিয়ে রাখতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সাতক্ষীরার এই নিজস্ব সম্পদগুলোর গায়ে আধুনিকতার রঙ চড়িয়ে যদি দেশ ও বিদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তবেই হয়তো প্রকৃতির এই পরম উপহারের সঠিক মূল্যায়ন হবে। মেঠোপথের ধারের ওই নামহীন কাউফল গাছটি কিংবা অবহেলিত শুঁটকির ডালি যেন ফিসফিসিয়ে আমাদের বিবেককে ডেকে বলছে, তোমরা আধুনিক হও, কিন্তু নিজেদের হারিয়ে ফেলে নয়।









