আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধ যোদ্ধা দিবস: প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
সাকিবুর রহমান বাবলা
২৬ অক্টোবর পালিত হয় জাতীয় আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধ যোদ্ধা দিবস। আর্থিক অপরাধ, অর্থপাচার ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন প্রতিরোধে নিয়োজিত পেশাজীবীদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়াই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য। ব্যাংক কর্মকর্তা, আর্থিক গোয়েন্দা, কমপ্লায়েন্স বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এসব অপরাধ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধে ১৯৭০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাংক গোপনীয়তা আইন (ব্যাংকিং সিক্রেসি অ্যাক্ট) প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর অবৈধ অর্থপ্রবাহ ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন বন্ধে উদ্যোগ জোরদার হয়। একই বছরের ২৬ অক্টোবর ইউএসএ প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট স্বাক্ষরিত হয়। এই তারিখকে কেন্দ্র করে দিবসটি পালিত হয়। আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান আব্রিগের উদ্যোগে দিবসটির সূচনা হয়।
আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধে নিয়োজিত পেশাজীবীরা সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত, অবৈধ অর্থের উৎস অনুসন্ধান, কর ফাঁকি, সাইবার জালিয়াতি, পরিচয় চুরি এবং মাদক ও মানব পাচার থেকে অর্জিত অর্থের প্রবাহ চিহ্নিত করতে কাজ করেন। তাঁদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং পেশাজীবী সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) বহুল উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৮০০ বিলিয়ন থেকে ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থপাচার হয়, যা বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২ থেকে ৫ শতাংশ। দুর্বল আইন প্রয়োগ, দুর্নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা অর্থপাচারের ঝুঁকি বাড়ায়।
বাংলাদেশেও অর্থপাচার ও আর্থিক অপরাধ অর্থনীতি ও জনজীবনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আমদানি-রপ্তানিতে পণ্যের মূল্য কম বা বেশি দেখানো, হুন্ডি, ব্যাংকঋণ জালিয়াতি, ঘুষ-দুর্নীতি, কর ফাঁকি, পুঁজিবাজারে কারসাজি এবং প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের অর্থ আত্মসাতের মতো ঘটনা আর্থিক ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অবৈধ অর্থপ্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ব্যাহত এবং সরকারের রাজস্ব আয় কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে বাড়ে সম্পদের বৈষম্য এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার সংকট।
এসব অপরাধ প্রতিরোধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর কার্যকর প্রয়োগ এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। ই-কেওয়াইসি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত, আমদানি-রপ্তানির নথি যাচাই এবং উচ্চঝুঁকির গ্রাহকদের লেনদেনে বাড়তি নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, অপরাধ তদন্ত বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়, নিয়মিত নিরীক্ষা এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ জোরদার করা প্রয়োজন।
জাতীয় আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধ যোদ্ধা দিবসের মূল বার্তা হলো—আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধ রাষ্ট্র, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ কাজে নিয়োজিত পেশাজীবীদের দক্ষতা ও কাজের স্বাধীনতা বাড়াতে হবে। এর মাধ্যমে দেশের সম্পদ সুরক্ষা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন এবং আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব।









