ইনক্লুসিভ এআই: প্রযুক্তি যখন হয়ে উঠবে প্রকৃত অর্থে সবার জন্য
মো. মামুন হাসান
একজন ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আমি ক্লাসরুমে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি শুনি, তা হলো, প্রযুক্তি কি আমাদের মতো ছোট শহরের শিক্ষার্থী বা প্রান্তিক এলাকার উদ্যোক্তার জন্যও সমান সুযোগ তৈরি করবে, নাকি এটি আরও একটি বিভাজনের দেয়াল হয়ে দাঁড়াবে। বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য “ডিজিটাল এজেন্ডা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে পর্যটন পুনর্গঠন”-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপ-প্রতিপাদ্য হলো “ইনক্লুসিভ এআই”, অর্থাৎ এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যা সবার জন্য, সব জায়গার জন্য সমানভাবে কাজ করে। সাতক্ষীরার মতো একটি জেলা, যেখানে সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার হয়েও পর্যটন খাত এখনও অনেকটাই অবহেলিত, সেখান থেকে দেখলে এই ধারণাটির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আমাদের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে যে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে, তাদের অনেকেই আসে সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রাম বা মৎস্যজীবী পরিবার থেকে। তাদের কাছে ইনক্লুসিভ এআই শুধু একটি প্রযুক্তিগত ধারণা নয়, এটি জীবিকার প্রশ্ন। ধরা যাক, একজন শিক্ষার্থী স্নাতক শেষে সুন্দরবন এলাকায় নিজের একটি ছোট ইকো-টুরিজম উদ্যোগ শুরু করতে চায়। বড় বুকিং প্ল্যাটফর্মে তার প্রতিযোগিতা হবে কক্সবাজার বা কুয়াকাটার প্রতিষ্ঠিত রিসোর্টের সঙ্গে, যাদের হাজার হাজার রিভিউ, প্রফেশনাল ফটোগ্রাফি আর নিয়মিত ডিজিটাল মার্কেটিং টিম আছে। এখানেই ইনক্লুসিভ এআই-এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, এমন একটি প্রযুক্তি যা কেবল অতীতের জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে সুপারিশ না করে, বরং মান, স্থায়িত্ব আর স্থানীয় সত্যতার (authenticity) ভিত্তিতেও নতুন উদ্যোক্তাদের সামনে নিয়ে আসে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রকৃতপক্ষে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠতে পারে কয়েকটি নির্দিষ্ট উপায়ে। প্রথমত, ভাষা অনুবাদ প্রযুক্তি এখন এত উন্নত যে ইংরেজি না জানা একজন স্থানীয় গাইডও বিদেশি পর্যটকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন, যা আগে কেবল শহরের প্রশিক্ষিত গাইডদেরই সুবিধা ছিল। দ্বিতীয়ত, স্বল্প খরচের ছবি ও ভিডিও তৈরির এআই টুল একজন সাধারণ স্মার্টফোন ব্যবহারকারীকেও প্রফেশনাল মানের প্রচার সামগ্রী তৈরির সুযোগ দিচ্ছে, ফলে বড় প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং বাজেটের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা আগের চেয়ে অনেক সহজ। তৃতীয়ত, এআই-চালিত মাইক্রো-ফাইন্যান্স ও ক্রেডিট স্কোরিং মডেল ব্যাংকিং ইতিহাস না থাকা প্রান্তিক উদ্যোক্তাদেরও ছোট ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে, যা একটি নতুন হোমস্টে বা নৌকা-ভ্রমণ ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে বড় সহায়ক হতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে কেবল তখনই, যখন নীতিনির্ধারক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করবে। কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি, পলিটেকনিক ও কারিগরি কলেজগুলোর ট্যুরিজম বিভাগে এখন থেকেই ডিজিটাল মার্কেটিং, এআই টুল ব্যবহার আর অনলাইন উদ্যোক্তা দক্ষতা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে যদি প্রতি বছর এমন কিছু শিক্ষার্থী বেরিয়ে আসে যারা প্রযুক্তি ও পর্যটন দুটোই বোঝে, তাহলে সুন্দরবন ঘিরে যে বিপুল সম্ভাবনা এখনও অব্যবহৃত রয়ে গেছে, তা ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিতে পারে।
শেষ কথা হলো, ইনক্লুসিভ এআই কোনো স্বয়ংক্রিয় সমাধান নয়, এটি একটি লক্ষ্য, যার দিকে সচেতনভাবে এগিয়ে যেতে হবে। প্রযুক্তি নিজে থেকে বৈষম্য দূর করে না, তবে সঠিক নীতি, প্রশিক্ষণ আর স্থানীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করলে এটি সাতক্ষীরার মতো এলাকার তরুণ উদ্যোক্তা, স্থানীয় গাইড আর ছোট পরিবার-চালিত পর্যটন ব্যবসাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে সমান সুযোগে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬ আমাদের সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে যাওয়ার একটি আহ্বান।
লেখক: মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।









