ইরানে হামলা স্থগিত করলেন ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর অনুরোধে তিনি মঙ্গলবারের জন্য ইরানে নতুন সামরিক হামলা স্থগিত রেখেছেন, কারণ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে’।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতারা তাকে এ অনুরোধ করেছিলেন।
তিনি বলেন, তাকে জানানো হয়েছে যে এমন একটি চুক্তি হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘খুবই গ্রহণযোগ্য’ হবে। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের কাছে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না!’
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, গ্রহণযোগ্য কোনো চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্র মুহূর্তের নোটিশে পূর্ণমাত্রার বৃহৎ হামলা চালাতে প্রস্তুত থাকবে।’
ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছেন, তারা যেন আবার কৌশলগত ভুল ও ভুল হিসাব’ না করে।
ট্রাম্পের এই নতুন ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন তার জনপ্রিয়তা কমছে এবং জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধটি দেশে ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
সোমবার প্রকাশিত নিউ ইয়র্ক টাইমস/সিয়েনা জরিপ অনুযায়ী, ৬৪ শতাংশ ভোটার মনে করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল।
জরিপে আরও বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের কাজের অনুমোদন হার মাত্র ৩৭ শতাংশ। এই ফলাফল ইঙ্গিত করছে যে, যুদ্ধ, অর্থনীতি ও অভিবাসনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে জনগণের বাড়তে থাকা অসন্তোষের মধ্যে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি ও মার্কিন বাহিনী ইরানের ওপর ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে। এর জবাবে তেহরান উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে অবস্থিত ইসরায়েলি ও মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
এক্ষেত্রে একটি বড় উদ্বেগ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার পর ইরান কীভাবে প্রতিশোধ নিতে পারে—তা নিয়ে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর আশঙ্কা।
ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের কাছে এখনো বিপুল সংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা দিয়ে তারা প্রতিবেশী দেশগুলো, তাদের বিমানবন্দর, পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনা এবং এমনকি গ্রীষ্মের তীব্র তাপে পানীয় জলের প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহৃত লবণমুক্তকরণ কেন্দ্রগুলোতেও হামলা চালাতে পারে।
পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, এটি খুবই ইতিবাচক একটি অগ্রগতি, তবে দেখা যাক এর বাস্তব কোনো ফল হয় কি না।’
তিনি বলেন, আগেও এমন সময় এসেছে যখন আমরা ভেবেছিলাম চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, কিন্তু তা সফল হয়নি। তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন।’
ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতার খুব ভালো সম্ভাবনা’ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘তাদের ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ না করেই যদি আমরা এটি করতে পারি, তাহলে আমি খুবই খুশি হব।’
এপ্রিল মাসে আলোচনার সুবিধার্থে যে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, তা মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্ন গোলাগুলি সত্ত্বেও মোটামুটি বহাল ছিল।
ইরান এখনো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। ফলে কার্যত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ রয়েছে। বিশ্বে পরিবাহিত মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এ পথ দিয়ে যায়।
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।
অন্যদিকে, তেহরানকে নিজেদের শর্ত মেনে নিতে চাপ দিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ কার্যকর করেছে।
সোমবার গভীর রাতে ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থা সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির বক্তব্য বলে যে মন্তব্য প্রকাশ করে, তাতে সতর্ক করা হয় যে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র খুলে দেওয়া হবে, যেখানে শত্রুর অভিজ্ঞতা খুব কম এবং তারা অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় থাকবে।
তাসনিমের প্রকাশিত মন্তব্যগুলো ১২ মার্চের বক্তব্য থেকে পুনঃপ্রচার করা হয়েছে বলে মনে হয়। ইরানের কিছু সংবাদমাধ্যম আগের লিখিত বার্তাগুলো পুনরায় প্রকাশ করছে।
এর আগে সোমবার ইরান জানায়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাবের জবাব দিয়েছে এবং পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
ইরানের গণমাধ্যম এর আগে জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র তেহরানকে কোনো সুস্পষ্ট ছাড় দেয়নি।
রোববার ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ‘ইরানের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। তাদের দ্রুত এগোতে হবে, নইলে তাদের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’
কয়েক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, তেহরানের দাবিগুলোকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করার পর যুদ্ধবিরতি ‘অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায়’ রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জোর দিয়ে বলেন, তাদের দাবিগুলো ছিল ‘দায়িত্বশীল’ এবং ‘উদার’।
ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থার তথ্যমতে, তেহরানের দাবির মধ্যে ছিল—সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করা, যা লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চলমান ইসরায়েলি হামলার প্রতি ইঙ্গিত করে; ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার; এবং ইরানের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে আর কোনো হামলা না চালানোর নিশ্চয়তা।
এ ছাড়া যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকার স্বীকারের দাবিও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে জানা গেছে।
ইরানের আধা-সরকারি ফারস সংবাদ সংস্থা রোববার জানায়, তেহরানের প্রস্তাবের জবাবে ওয়াশিংটন পাঁচটি শর্ত দিয়েছে।
এসব শর্তের মধ্যে ছিল—ইরান কেবল একটি পারমাণবিক স্থাপনা চালু রাখতে পারবে এবং তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখে, তবে তিনি তা মেনে নিতে পারেন। দুই দেশের মধ্যে এটি ছিল অন্যতম প্রধান বিরোধের বিষয়, এবং এ বক্তব্যে কর্মসূচির সম্পূর্ণ সমাপ্তির দাবি থেকে তার অবস্থানের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা দাবি করে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। তবে তেহরান বারবার বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি।












