বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

ক্যান্সারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর দিন: সচেতনতা, গবেষণা ও মানবিক সহমর্মিতা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:২৯ অপরাহ্ণ
ক্যান্সারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর দিন: সচেতনতা, গবেষণা ও মানবিক সহমর্মিতা

সাকিবুর রহমান বাবলা

ক্যান্সার আজ বিশ্বের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতি সত্ত্বেও প্রতিবছর কোটি কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। তবে আশার কথা হলো, আধুনিক গবেষণা, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ, উন্নত চিকিৎসা এবং সামাজিক সহযোগিতার মাধ্যমে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় প্রতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘ক্যান্সারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর দিন’। ২০২৬ সালে দিবসটি পালিত হচ্ছে ১১ সেপ্টেম্বর।
এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, গবেষণার জন্য তহবিল সংগ্রহ এবং নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবনে বিজ্ঞানীদের সহায়তা করা। ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইকে কেবল চিকিৎসকদের দায়িত্ব হিসেবে না দেখে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

‘স্ট্যান্ড আপ টু ক্যান্সার’ উদ্যোগের যাত্রা শুরু হয় ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে। সাংবাদিক কেটি কুরিক, চলচ্চিত্র নির্বাহী শেরিল ল্যান্সিংসহ বিনোদন জগতের কয়েকজন প্রভাবশালী নারী এই দাতব্য উদ্যোগ প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল গবেষণাগার, হাসপাতাল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলে ক্যান্সার চিকিৎসার নতুন পথ উন্মোচন করা। পরে এটি একটি বৈশ্বিক আন্দোলনে পরিণত হয়। ২০১২ সালে যুক্তরাজ্যেও ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে এবং চ্যানেল ফোর-এর যৌথ উদ্যোগে এই কর্মসূচি বিস্তৃত হয়।

স্ট্যান্ড আপ টু ক্যান্সার’ আন্দোলনের মূল শক্তি হলো এর সহযোগিতামূলক গবেষণা, যা বিজ্ঞানীদের আলাদাভাবে কাজ করার বাধা ভেঙে ল্যাবের আবিষ্কার দ্রুত রোগীদের চিকিৎসায় প্রয়োগের সুযোগ করে দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী ৭৪৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি তহবিল সংগ্রহ এবং এক হাজারের বেশি গবেষককে সহায়তার মাধ্যমে এই উদ্যোগ নতুন ওষুধ, ইমিউনোথেরাপি ও লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন করে অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করছে।

ক্যান্সার মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ধরনের ক্যান্সার শুরুতেই শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার সফলতার হার বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, অকারণে রক্তপাত, শরীরে অস্বাভাবিক গুটি কিংবা দীর্ঘদিনের শারীরিক পরিবর্তনের মতো লক্ষণগুলোকে অবহেলা করা উচিত নয়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্ক্রিনিং এবং চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রোগীর পাশাপাশি পরিবারের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগ নির্ণয়ের পর অনেক রোগী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এ সময় পরিবারের সদস্যদের সহমর্মিতা, সাহস জোগানো এবং নিয়মিত সেবাযতœ রোগীর সুস্থতার পথে বড় সহায়ক হয়ে ওঠে। একইভাবে সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে ক্যান্সারকে ঘিরে প্রচলিত ভুল ধারণা ও সামাজিক কলঙ্ক দূর করা। ক্যান্সার কোনো অভিশাপ বা ছোঁয়াচে রোগ নয়; এটি একটি জটিল শারীরিক অসুস্থতা, যার বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা রয়েছে।

চিকিৎসকদের ভূমিকা ক্যান্সার মোকাবিলায় কেন্দ্রীয়। দ্রুত ও সঠিক রোগ নির্ণয়, রোগীর জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সহানুভূতিশীল মানসিক সমর্থন প্রদান একজন চিকিৎসকের প্রধান দায়িত্ব। একই সঙ্গে ক্যান্সার প্রতিরোধে ধূমপান বর্জন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং এইচপিভি ও হেপাটাইটিস-বি টিকার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও চিকিৎসকদের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যয় এখনও বহু পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। রোগের ধরন ও চিকিৎসার ধাপভেদে একজন রোগীর চিকিৎসায় ‘৫ থেকে ১০ লাখ টাকা’ বা তারও বেশি ব্যয় হতে পারে। সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ এবং আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে যায়। ফলে চিকিৎসার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুরক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে পরিস্থিতি এড়াতে আগে থেকেই ক্রিটিক্যাল ইলনেস ইন্স্যুরেন্স বা বিশেষায়িত ক্যান্সার পলিসি গ্রহণ করা উচিত, যা ক্যান্সারের প্রথম ধাপেই বড় অঙ্কের টাকা প্রদান করে।

এই বাস্তবতায় সরকারি ও সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ক্যান্সারসহ কয়েকটি জটিল রোগে আক্রান্ত অসচ্ছল রোগীদের জন্য এককালীন আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। সরকারি পর্যায়ে এই সহায়তার পরিমাণ এক লাখ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে এবং অন্যান্য উৎস থেকেও প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালসহ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বল্প ব্যয়ে চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে। জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা হেল্পলাইন ১৬২৬৩ থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়।

বেসরকারি সংগঠন, দাতব্য ট্রাস্ট, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচি এবং অনলাইন ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্মও ক্যান্সার রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তার উৎস হতে পারে। যেমনÑ বাংলাদেশ ক্যান্সার সেবা ও গবেষণা ট্রাস্ট, বাংলাদেশ ক্যান্সার সহায়তা ট্রাস্ট এবং আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল তহবিল ক্যান্সার রোগীদের বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়ে থাকে। তবে তহবিল সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে মানুষের আস্থা বজায় থাকে এবং প্রকৃত রোগীরা সহায়তা পান।

‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’ বারবার সতর্ক করে বলছে, ক্যান্সারের একটি বড় অংশ প্রতিরোধযোগ্য। তামাক ব্যবহার কমানো, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা, শারীরিক সক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষকে ক্যান্সারের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা সম্ভব। তবে বাংলাদেশসহ বেশ কিছু দেশে পরিবেশ উন্নয়নে ব্যাপক সচেতন ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

‘স্ট্যান্ড আপ টু ক্যান্সার ডে’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। রোগী, পরিবার, চিকিৎসক, গবেষক, সমাজ, রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টাই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ। সচেতনতা, বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা, মানবিক সহমর্মিতা এবং সবার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই ক্যান্সারমুক্ত ভবিষ্যতের স্বপ্ন আরও বাস্তব হয়ে উঠতে পারে। ক্যান্সারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো তাই শুধু একটি দিবসের আহ্বান নয়; এটি মানবতার সম্মিলিত দায়িত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার।

Ads small one

যাচিত জীবন: স্বপ্ন, মানবিকতা ও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ৫:২১ অপরাহ্ণ
যাচিত জীবন: স্বপ্ন, মানবিকতা ও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

মানুষের জীবনে কিছু চাওয়া প্রকাশ্য, কিছু একান্ত ব্যক্তিগত। কিছু স্বপ্ন মানুষ অন্যের কাছে প্রকাশ করে, আবার কিছু স্বপ্ন মনের গভীরে লুকিয়ে রাখে। সেই স্বপ্ন, প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার সমষ্টিতেই গড়ে ওঠে মানুষের যাচিত জীবনের ধারণা। মানুষ যে জীবন পেতে চায়, নিজের ইচ্ছা, অনুভূতি ও বিশ্বাস দিয়ে যেভাবে জীবন সাজাতে চায়, সেটিই তার যাচিত জীবন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষ কি কখনো সত্যিকার অর্থে তার কাঙ্ক্ষিত জীবন পায়?

জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের পথচলা মূলত চাওয়া ও পাওয়ার এক নিরন্তর হিসাব। শৈশবে থাকে ছোট ছোট আবদার, কৈশোরে স্বপ্নের বিস্তার, আর যৌবনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার আকাঙ্ক্ষা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাওয়ার ধরনও বদলে যায়। একসময় যে মানুষ অনেক বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখত, পরিণত বয়সে সে হয়তো একটু শান্তি, নির্ভরতা ও আপনজনের সান্নিধ্য চায়। অথচ জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে বাস্তবতা তার সামনে নতুন নতুন শর্ত হাজির করে।

যাচিত জীবন বলতে শুধু অর্থবিত্ত, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠা বোঝায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আত্মমর্যাদা, ভালোবাসা, স্বাধীনতা, মানসিক প্রশান্তি এবং নিজের মতো করে বেঁচে থাকার অধিকার। কারও কাছে একটি সুন্দর পরিবারই কাঙ্ক্ষিত জীবন, কারও কাছে সৎভাবে জীবিকা নির্বাহ করে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকা। কেউ চান মানুষের ভালোবাসা, কেউ চান নিঃসঙ্গতার মধ্যে নিজের মতো করে সময় কাটাতে। প্রত্যেকের চাওয়া আলাদা হলেও প্রত্যাশার কেন্দ্রে থাকে একটু ভালো থাকার আকাঙ্ক্ষা।

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, মানুষের ইচ্ছা আর জীবনের বাস্তবতা সব সময় একই পথে চলে না। পরিবার, সমাজ, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও নানা দায়িত্বের কারণে মানুষকে অনেক সময় নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কখনো পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয়, কখনো সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা করতে গিয়ে মনের কথা চেপে রাখতে হয়। আবার কখনো জীবিকার তাগিদে এমন পথে হাঁটতে হয়, যে পথে যাওয়ার স্বপ্ন কোনো দিনই ছিল না।

এভাবেই মানুষ ধীরে ধীরে নিজের কাঙ্ক্ষিত জীবন থেকে দূরে সরে যায়। বাইরে থেকে তাকে সফল মনে হলেও ভেতরে জমে থাকে অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাস। তার অর্জন, পরিচিতি ও সামাজিক অবস্থান আছে; কিন্তু কোথাও যেন নিজের সঙ্গে নিজের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এই দূরত্বের কথা সবাই বুঝতে পারে না। কারণ মানুষের বাহ্যিক হাসি সব সময় তার মনের সুখের পরিচয় বহন করে না।

আমাদের সমাজে জীবনের সাফল্যকে প্রায়ই অর্থ, সম্পদ, পদ-পদবি ও সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠিতে বিচার করা হয়। অথচ একজন মানুষ কতটা মানসিক শান্তিতে আছেন, নিজের সিদ্ধান্তে কতটা সন্তুষ্ট এবং তাঁর সম্পর্কগুলো কতটা আন্তরিক—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ দিয়ে প্রয়োজন মেটানো যায়, কিন্তু সব অভাব পূরণ করা যায় না। সামাজিক পরিচিতি পাওয়া যায়, কিন্তু শুধু পরিচয়ের জোরে আন্তরিক ভালোবাসা অর্জন করা যায় না। তাই যাচিত জীবনের সঙ্গে বস্তুগত প্রাপ্তির পাশাপাশি মানসিক তৃপ্তির সম্পর্ক গভীর।

জীবনের একটি পর্যায়ে এসে মানুষ পেছন ফিরে তাকায়। মনে পড়ে শৈশবের দিন, পুরোনো বন্ধুত্ব, হারিয়ে যাওয়া মানুষ, অসমাপ্ত স্বপ্ন আর না-বলা কথাগুলো। তখন মনে হয়, কত কিছু চেয়েছিলাম, কত কিছু করার পরিকল্পনা ছিল। সময়ের অভাবে, পরিস্থিতির চাপে কিংবা নিজের সিদ্ধান্তের কারণে অনেক কিছুই আর হয়ে ওঠেনি। যে সময়টুকু একদিন নিজের জন্য তুলে রাখার কথা ভেবেছিলাম, সেই সময়ও কখন যে পার হয়ে গেছে, তা বোঝা যায়নি।

তবে অপ্রাপ্তিই জীবনের একমাত্র সত্য নয়। মানুষ যা পেয়েছে, তার মূল্যও উপলব্ধি করা প্রয়োজন। একটি সুস্থ সম্পর্ক, পরিবারের মানুষের ভালোবাসা, বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো একজন বন্ধু কিংবা নিজের শ্রমে অর্জিত সামান্য সাফল্য—এসবও জীবনের বড় সম্পদ। অনেক সময় আমরা যা পাইনি, তার জন্য এত বেশি আক্ষেপ করি যে যা পেয়েছি, তার আনন্দটুকুও উপভোগ করতে ভুলে যাই।

জীবনে বড় হওয়ার চেয়ে ভালো মানুষ হওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ, সম্পদ কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠা একসময় মানুষের পরিচয় তৈরি করতে পারে, কিন্তু মানুষের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় তার আচরণে, মানবিকতায় এবং অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধে। একজন ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, অসহায় মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, কারও দুঃখ মন দিয়ে শোনা কিংবা বিপন্ন মানুষকে একটু সাহস দেওয়া—এসব কাজের মূল্য কোনো সম্পদের মাপকাঠিতে নির্ধারণ করা যায় না।

আমরা অনেক সময় নিজের প্রাপ্তি নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকি যে পাশের মানুষটির কষ্ট দেখতে পাই না। অথচ জীবন শুধু নিজের জন্য নয়। পরিবার, সমাজ ও মানুষের প্রতি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। কারও মনে কষ্ট দিয়ে, কাউকে ছোট করে কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করে যে সাফল্য অর্জিত হয়, তা কখনো প্রকৃত সার্থকতা হতে পারে না। মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে হলে আগে মানুষকে ভালোবাসতে শিখতে হয়।

জীবনের পথে অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। কেউ পাশে থাকে দীর্ঘদিন, কেউ আবার সময়ের ব্যবধানে দূরে চলে যায়। কিন্তু প্রতিটি সম্পর্কেরই একটি মানবিক মূল্য রয়েছে। অহংকার, অভিমান কিংবা সামান্য ভুল বোঝাবুঝির কারণে অনেক সুন্দর সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। অথচ সময় একবার চলে গেলে সব সম্পর্ক ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। তাই প্রয়োজন হলে ক্ষমা করতে শেখা, নিজের ভুল স্বীকার করা এবং প্রিয়জনের প্রতি আন্তরিক হওয়া জরুরি। মনে রাখতে হবে, মানুষের জীবনে অর্থের অভাব পূরণ করা সম্ভব, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সময় এবং কিছু মানুষের শূন্যতা কখনো পূরণ হয় না।

যাচিত জীবন অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা কখনো কখনো আমাদের নিজেদের অতিরিক্ত প্রত্যাশা। আমরা অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করি। অন্যের সাফল্য, সুখ কিংবা প্রাপ্তি দেখে মনে করি, আমাদের জীবন বুঝি পিছিয়ে আছে। অথচ প্রত্যেক মানুষের জীবনপরিস্থিতি আলাদা। অন্যের জীবনের বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে নিজের জীবনের মূল্য নির্ধারণ করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। নিজের সামর্থ্য, প্রয়োজন ও মূল্যবোধ অনুযায়ী জীবনকে সাজাতে পারাই প্রকৃত প্রজ্ঞা।

এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রাখাও জরুরি। পরিবার ও সমাজের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু সেই দায়বদ্ধতা পালনের নামে নিজের অস্তিত্ব, আত্মসম্মান ও ব্যক্তিগত স্বপ্নকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা উচিত নয়। মানুষ অন্যের জন্য বাঁচবে, ভালোবাসবে, দায়িত্ব পালন করবে; একই সঙ্গে নিজের মনের কথাকেও গুরুত্ব দেবে। কারণ নিজের ভেতরের মানুষটিকে হারিয়ে ফেলে বাইরে যত পরিচয়ই তৈরি হোক, তাতে জীবনের পূর্ণতা আসে না।

জীবনকে সুন্দর করার জন্য সব সময় বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না। কখনো নিজের পছন্দের কাজটি করার সময় বের করা, প্রিয় মানুষের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো, পুরোনো বন্ধুর খোঁজ নেওয়া কিংবা কারও বিপদে পাশে দাঁড়ানোই মনে প্রশান্তি এনে দিতে পারে। সুখকে ভবিষ্যতের কোনো অনিশ্চিত প্রাপ্তির জন্য তুলে না রেখে বর্তমানের ছোট ছোট মুহূর্তের মধ্যেও খুঁজে নিতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, জীবন একবারই আসে। তাই শুধু আগামী দিনের প্রত্যাশায় বর্তমানকে অবহেলা করা উচিত নয়। আমরা অনেক সময় ভাবি, আরও কিছু অর্জন করতে পারলে সুখী হব, আরও কিছু সম্পদ হলে নিশ্চিন্ত হব, আরও প্রতিষ্ঠিত হলে নিজের জন্য সময় বের করব। কিন্তু আরও কিছু পাওয়ার অপেক্ষা কখনো শেষ হয় না। একসময় দেখা যায়, জীবনই ফুরিয়ে এসেছে, অথচ নিজের মতো করে বাঁচার সময়টুকু আর পাওয়া গেল না।

পরিশেষে বলা যায়, যাচিত জীবন কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নয়; এটি মানুষের স্বপ্ন, সাধনা, মানবিকতা ও আত্মোপলব্ধির চলমান যাত্রা। সব চাওয়া পূরণ হবে না, সব স্বপ্ন বাস্তব হবে না, সব সম্পর্কও শেষ পর্যন্ত একই রকম থাকবে না। তবু জীবনকে ভালোবাসতে হবে, নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকতে হবে এবং প্রাপ্তির আনন্দকে স্বীকার করতে হবে।

জীবনের শেষ হিসাব যেন শুধু কতটা পেলাম, কতটা হারালাম—এতেই সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং কতটা ভালোবাসতে পেরেছি, কতটা মানুষের উপকারে এসেছি, কতটা আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচেছি এবং নিজের জীবনকে কতটা অর্থবহ করতে পেরেছি, সেই প্রশ্নের উত্তরই হোক আমাদের জীবনের প্রকৃত মূল্যায়ন। যাচিত জীবন মানে শুধু নিজের স্বপ্ন পূরণ করা নয়; অন্যের স্বপ্নের প্রতি সম্মান দেখানো, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, মানুষের দুঃখ বোঝা এবং ভালোবাসা দিয়ে পৃথিবীকে একটু সুন্দর করে তোলাও। আমরা কতটা পেয়েছি, তার চেয়ে বড় হয়ে থাকুক—আমাদের কারণে কতজন মানুষ একটু ভালো থাকতে পেরেছে।

লেখক: সংবাদকর্মী

সাতক্ষীরা সীমান্তে সাড়ে ৩ লাখ টাকার চোরাচালানি পণ্য জব্দ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ৫:১০ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরা সীমান্তে সাড়ে ৩ লাখ টাকার চোরাচালানি পণ্য জব্দ

পত্রদূত ডেস্ক: সাতক্ষীরা ও কলারোয়া সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানবিরোধী বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় ওষুধ ও একটি হারকিউলিস বাইসাইকেল জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

গত ৩ ও ৪ নভেম্বর সাতক্ষীরা ব্যাটালিয়ন (৩৩ বিজিবি) অধীন কাকডাঙ্গা, ঝাউডাঙ্গা ও গাজীপুর বিওপির টহল দল দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় এসব অভিযান পরিচালনা করে।

বিজিবি জানায়, কাকডাঙ্গা বিওপির বিশেষ আভিযানিক দল সীমান্ত পিলার ১৩/৩ এস-এর ৬ আরবি থেকে প্রায় ২০০ মিটার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভাদিয়ালি এলাকা থেকে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় ওষুধ জব্দ করে। ঝাউডাঙ্গা বিশেষ ক্যাম্পের দল বোয়ালিয়া মোড় এলাকা থেকে ১ লাখ ৫ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় ওষুধ আটক করে। এ ছাড়া গাজীপুর বিওপির দল সীমান্ত পিলার ৪-এর ৬ এস থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সুরিঘাটা এলাকা থেকে ২৫ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় ওষুধ ও একটি হারকিউলিস বাইসাইকেল জব্দ করে।

বিজিবির দাবি, শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে ভারত থেকে এসব পণ্য বাংলাদেশে পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছিল। এ ধরনের চোরাচালানের কারণে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বিজিবির এ অভিযানের প্রশংসা করেছেন এবং এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিশ্ব সুনামি সচেতনতা দিবস: ভয় নয়, প্রস্তুতিই হোক মূল জয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ৫:০১ অপরাহ্ণ
বিশ্ব সুনামি সচেতনতা দিবস: ভয় নয়, প্রস্তুতিই হোক মূল জয়

সাকিবুর রহমান বাবলা

প্রকৃতির কিছু দুর্যোগ এতটাই আকস্মিক ও ভয়াবহ যে, মানুষকে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগটুকুও দেয় না। সুনামি তেমনই এক বিধ্বংসী প্রাকৃতিক বিপর্যয়। সমুদ্রের গভীরে সৃষ্ট ভূমিকম্প কিংবা অন্যান্য ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলে মুহূর্তের মধ্যে উত্তাল হয়ে ওঠে বিশাল জলরাশি। সেই ঢেউ উপকূলে আছড়ে পড়ে জনপদ, ঘরবাড়ি, অবকাঠামো ও জীবিকা ধ্বংস করে দিতে পারে। প্রাণহানির পাশাপাশি সৃষ্টি হয় দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট। সুনামির ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা, আগাম সতর্কবার্তা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি বাড়াতে প্রতিবছর ৫ নভেম্বর পালিত হয় বিশ্ব সুনামি সচেতনতা দিবস।

‘সুনামি’ শব্দটি জাপানি ভাষার ‘সু’ ও ‘নামি’ শব্দ থেকে এসেছে। এর অর্থ যথাক্রমে বন্দর ও ঢেউ। সমুদ্রের তলদেশে আকস্মিক ভূমিকম্পের ফলে বিপুল পরিমাণ পানি স্থানচ্যুত হয়ে যে বিশাল ঢেউয়ের ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করে, তাকে সুনামি বলে। এ ছাড়া আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, সমুদ্রতলের ভূমিধস, উপকূলীয় পাহাড় বা পাথরের বিশাল অংশ ধসে পড়া এবং সমুদ্রে বড় গ্রহাণুর আঘাত থেকেও সুনামি সৃষ্টি হতে পারে। গভীর সমুদ্রে এসব ঢেউ তুলনামূলক কম উচ্চতার হলেও অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। উপকূলের অগভীর পানিতে পৌঁছালে ঢেউয়ের উচ্চতা বেড়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।

সুনামির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, প্রথম ঢেউটিই সব সময় সবচেয়ে বড় বা শক্তিশালী হয় না। দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা পরবর্তী ঢেউ আরও বিধ্বংসী হতে পারে। একটি ঢেউ আঘাত হানার পর সমুদ্রের পানি হঠাৎ অনেক দূর পর্যন্ত সরে গিয়ে সমুদ্রতল দৃশ্যমান হতে পারে। এটি নিরাপদ হওয়ার লক্ষণ নয়; বরং পরবর্তী ঢেউ আসার পূর্বসংকেত হতে পারে। কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত সুনামির ঢেউ আঘাত হানতে পারে। আগের ঢেউয়ে ধ্বংস হওয়া স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ পরবর্তী ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে এসে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়ায়। তাই একটি ঢেউ চলে যাওয়ার পরও সরকারি সতর্কবার্তা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত নিরাপদ উঁচু স্থানে অবস্থান করা জরুরি।

২০১৫ সালের ২২ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৭০/২০৩ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে ৫ নভেম্বরকে বিশ্ব সুনামি সচেতনতা দিবস ঘোষণা করে। জাপানের উদ্যোগে দিবসটি পালনের ধারণা সামনে আসে। এর পেছনে রয়েছে ১৮৫৪ সালের ৫ নভেম্বরের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। জাপানের ওয়াকায়ামা অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর সুনামির আশঙ্কা দেখা দিলে হামাগুচি গোরিও নামের এক ব্যক্তি গ্রামবাসীকে সতর্ক করতে নিজের সদ্য কাটা ধানের স্তূপে আগুন ধরিয়ে দেন। আগুনের আলো দেখে গ্রামবাসীরা উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়ে প্রাণে বেঁচে যান। ‘ইনামুরা-নো-হি’ নামে পরিচিত এই ঘটনা দুর্যোগের পূর্বলক্ষণ শনাক্ত করা ও দ্রুত সতর্ক করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো সুনামির ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর আগাম প্রস্তুতি জোরদার করা এবং কার্যকর সতর্কীকরণ ও নিরাপদ স্থানান্তরব্যবস্থা গড়ে তোলা। ২০১৫–২০৩০ মেয়াদি সেনদাই দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কাঠামো বাস্তবায়নেও দিবসটি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘সুনামির জন্য প্রস্তুত থাকুন: সহনশীলতা শুরু হোক আপনার থেকেই’। এর বার্তা হলো, দুর্যোগ মোকাবিলার দায়িত্ব শুধু সরকার বা প্রতিষ্ঠানের নয়; ব্যক্তি, পরিবার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

সমুদ্রের কাছাকাছি অবস্থানকালে তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকম্প অনুভূত হলে, সমুদ্রের পানি অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত সরে গেলে কিংবা সমুদ্রের দিক থেকে অস্বাভাবিক গর্জন শোনা গেলে সরকারি ঘোষণার অপেক্ষা না করে দ্রুত উঁচু স্থানে চলে যেতে হবে। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে ২০২২ সালে জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক দপ্তর ‘গেট টু হাই গ্রাউন্ড’ প্রচারাভিযান শুরু করে। এর আওতায় নিরাপদ স্থানে যাওয়ার নির্ধারিত পথে হাঁটা, দৌড়, স্থানান্তর মহড়া ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও পর্যটকসহ সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে সম্পৃক্ত করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

গত এক শতকে ৫৮টি সুনামিতে ২ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ভারত মহাসাগরে সংঘটিত সুনামিটি ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী। ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের কাছে ৯.১ মাত্রার ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট ঢেউ ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারত ও থাইল্যান্ডসহ ১৪টি দেশে আঘাত হানে। কোথাও কোথাও ঢেউয়ের উচ্চতা প্রায় ৩০ মিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। এতে ২ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান এবং অসংখ্য মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।

এই বিপর্যয়ের পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলার উদ্যোগ জোরদার হয়। ২০০৫ সালে জাপানের কোবে শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব সম্মেলনে গৃহীত হয় ‘হিয়োগো কর্মপরিকল্পনা কাঠামো’। একই সময়ে ভারত মহাসাগরীয় সুনামি সতর্কীকরণ ও প্রশমন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভূকম্পন পরিমাপক ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে দ্রুত সতর্ক করার ব্যবস্থা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালে গৃহীত সেনদাই কাঠামো দুর্যোগের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি কমানোর বৈশ্বিক অঙ্গীকারকে আরও সুসংহত করে। জাতিসংঘের ‘আর্লি ওয়ার্নিংস ফর অল’ উদ্যোগের লক্ষ্যও হলো ঝুঁকিপূর্ণ প্রত্যেক মানুষের কাছে কার্যকর আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া।

বাংলাদেশের জন্যও সুনামির ঝুঁকি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বঙ্গোপসাগরীয় উপকূল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পাশাপাশি ভূমিকম্পজনিত সামুদ্রিক বিপর্যয়ের ঝুঁকিও বহন করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৭৬২ সালের ২ এপ্রিল সংঘটিত মহান আরাকান ভূমিকম্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চট্টগ্রাম থেকে মিয়ানমারের আরাকান উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে আঘাত হানা এ ভূমিকম্পের মাত্রা আনুমানিক ৮.৫ থেকে ৮.৮ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এতে উপকূলীয় ভূপ্রকৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। সেন্ট মার্টিন দ্বীপে প্রায় দুই মিটার ভূমি উত্থানের প্রমাণও ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় পাওয়া গেছে।

২০০৪ সালের ভারত মহাসাগরের সুনামির প্রভাব বাংলাদেশ উপকূলেও কিছুটা পড়েছিল বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। তবে ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের মতো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ বাংলাদেশে হয়নি। বঙ্গোপসাগরের মহীসোপের গঠন, উৎপত্তিস্থল থেকে দূরত্ব এবং ভূমিকম্পের ফাটলের অভিমুখসহ বিভিন্ন ভৌগোলিক কারণ এতে ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে, জাপান প্রশান্ত মহাসাগরের ভূমিকম্পপ্রবণ ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় বিশ্বের অন্যতম সুনামিপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত।

সুনামি প্রতিরোধ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে সচেতনতা, বিজ্ঞানভিত্তিক আগাম সতর্কবার্তা ও পরিকল্পিত প্রস্তুতির মাধ্যমে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঝুঁকি মূল্যায়ন, আধুনিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থা, নিরাপদ আশ্রয়স্থল, স্থানান্তরের পথ নির্ধারণ এবং নিয়মিত মহড়ার আয়োজন জরুরি। মনে রাখতে হবে, সুনামির বিপদে কয়েক মিনিটের সচেতনতা ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। তাই সুনামি মোকাবিলার প্রস্তুতি কোনো এক দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ধারাবাহিক দায়িত্ব।