বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ: ড. খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে কূটনীতির নতুন সম্ভাবনা
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণ দেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ৮ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে তিনি দায়িত্ব নেন। এর আগে ২ জুনের গোপন ব্যালট ভোটে সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস কাকোরিসকে ৯৯-৯১ ভোটে হারিয়ে তিনি নির্বাচিত হন। প্রায় চার দশক পর আবারও একজন বাংলাদেশি এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তরর্জাতিক দায়িত্বে এলেন।
সাধারণ পরিষদের সভাপতি ১৯৩টি দেশের কোনো একটির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন না, তাঁকে সব সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে সমন্বয় ও সংলাপ এগিয়ে নিতে হয়। তাই এই পদে বসে বাংলাদেশের পক্ষে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্তর আদায় করা সম্ভব নয়। কিন্তু বিশ্বরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে আলোচনার পরিসর তৈরি করা, বিভিন্ন পক্ষকে এক টেবিলে আনা এবং আন্তরর্জাতিক মনোযোগ কোনো নির্দিষ্ট সংকটের দিকে ধরে রাখা এসব ক্ষেত্রে সভাপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগগুলোর একটি হতে পারে রোহিঙ্গা সংকট। বছরের পর বছর ধরে এই সংকটের বোঝা বাংলাদেশ বহন করছে। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে আন্তরর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ধরে রাখা এখনো জরুরি। একইভাবে জলবায়ু পরিবর্তন, জলবায়ু অর্থায়ন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থের প্রশ্নেও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বিশ্বমঞ্চে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে।
জাতিসংঘের এই দায়িত্বকে বাংলাদেশ যদি শুধু গৌরবের বিষয় হিসেবে উদ্যাপন করে থেমে যায়, তাহলে বড় সুযোগটি অপূর্ণ থেকে যাবে। বরং এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক পরিকল্পনা কোন ইস্যুতে বাংলাদেশ কী অবস্থান নেবে, কোন দেশগুলোর সঙ্গে কীভাবে কাজ করবে এবং দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও কীভাবে এই আন্তরর্জাতিক যোগাযোগকে দেশের স্বার্থে কাজে লাগানো যাবে।
ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘকে পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এই ভাবনাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ১৯৪৫ সালের বিশ্ব আর আজকের বিশ্ব এক নয়। জলবায়ু সংকট, যুদ্ধ, শরণার্থী সমস্যা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার আন্তরর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। জাতিসংঘকেও এসব পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। বাংলাদেশের জন্য আরও একটি শিক্ষা এখানে রয়েছে। আন্তরর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশের গ্রহণযোগ্যতা শুধু বড় অর্থনীতি বা সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না। দক্ষ কূটনীতি, দায়িত্বশীল অবস্থান এবং বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতাও একটি দেশের প্রভাব বাড়াতে পারে। ড. খলিলুর রহমানের এই দায়িত্বকে বাংলাদেশের জন্য একটি কূটনৈতিক পুঁজি হিসেবে দেখা যেতে পারে।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের জন্য এখন অভিনন্দনের সময়ের পাশাপাশি কাজের সময়ও। রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ঝুঁকি, অর্থনৈতিক স্বার্থ কিংবা বহুপাক্ষিক সংস্কার প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি কূটনীতি। ড. খলিলুর রহমানের সাফল্য শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য হবে না, তাঁর সভাপতিত্বে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে কতটা দায়িত্বশীল, ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে সেটিই হয়ে উঠবে বড় প্রশ্ন। জাতিসংঘের এই দায়িত্ব বাংলাদেশের জন্য সম্মানের, আর সেই সম্মানকে স্থায়ী অর্জনে পরিণত করাই হবে আসল সাফল্য।






