ক্যান্সারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর দিন: সচেতনতা, গবেষণা ও মানবিক সহমর্মিতা
সাকিবুর রহমান বাবলা
ক্যান্সার আজ বিশ্বের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতি সত্ত্বেও প্রতিবছর কোটি কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। তবে আশার কথা হলো, আধুনিক গবেষণা, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ, উন্নত চিকিৎসা এবং সামাজিক সহযোগিতার মাধ্যমে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় প্রতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘ক্যান্সারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর দিন’। ২০২৬ সালে দিবসটি পালিত হচ্ছে ১১ সেপ্টেম্বর।
এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, গবেষণার জন্য তহবিল সংগ্রহ এবং নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবনে বিজ্ঞানীদের সহায়তা করা। ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইকে কেবল চিকিৎসকদের দায়িত্ব হিসেবে না দেখে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
‘স্ট্যান্ড আপ টু ক্যান্সার’ উদ্যোগের যাত্রা শুরু হয় ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে। সাংবাদিক কেটি কুরিক, চলচ্চিত্র নির্বাহী শেরিল ল্যান্সিংসহ বিনোদন জগতের কয়েকজন প্রভাবশালী নারী এই দাতব্য উদ্যোগ প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল গবেষণাগার, হাসপাতাল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলে ক্যান্সার চিকিৎসার নতুন পথ উন্মোচন করা। পরে এটি একটি বৈশ্বিক আন্দোলনে পরিণত হয়। ২০১২ সালে যুক্তরাজ্যেও ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে এবং চ্যানেল ফোর-এর যৌথ উদ্যোগে এই কর্মসূচি বিস্তৃত হয়।
স্ট্যান্ড আপ টু ক্যান্সার’ আন্দোলনের মূল শক্তি হলো এর সহযোগিতামূলক গবেষণা, যা বিজ্ঞানীদের আলাদাভাবে কাজ করার বাধা ভেঙে ল্যাবের আবিষ্কার দ্রুত রোগীদের চিকিৎসায় প্রয়োগের সুযোগ করে দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী ৭৪৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি তহবিল সংগ্রহ এবং এক হাজারের বেশি গবেষককে সহায়তার মাধ্যমে এই উদ্যোগ নতুন ওষুধ, ইমিউনোথেরাপি ও লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন করে অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করছে।
ক্যান্সার মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ধরনের ক্যান্সার শুরুতেই শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার সফলতার হার বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, অকারণে রক্তপাত, শরীরে অস্বাভাবিক গুটি কিংবা দীর্ঘদিনের শারীরিক পরিবর্তনের মতো লক্ষণগুলোকে অবহেলা করা উচিত নয়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্ক্রিনিং এবং চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রোগীর পাশাপাশি পরিবারের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগ নির্ণয়ের পর অনেক রোগী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এ সময় পরিবারের সদস্যদের সহমর্মিতা, সাহস জোগানো এবং নিয়মিত সেবাযতœ রোগীর সুস্থতার পথে বড় সহায়ক হয়ে ওঠে। একইভাবে সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে ক্যান্সারকে ঘিরে প্রচলিত ভুল ধারণা ও সামাজিক কলঙ্ক দূর করা। ক্যান্সার কোনো অভিশাপ বা ছোঁয়াচে রোগ নয়; এটি একটি জটিল শারীরিক অসুস্থতা, যার বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা রয়েছে।
চিকিৎসকদের ভূমিকা ক্যান্সার মোকাবিলায় কেন্দ্রীয়। দ্রুত ও সঠিক রোগ নির্ণয়, রোগীর জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সহানুভূতিশীল মানসিক সমর্থন প্রদান একজন চিকিৎসকের প্রধান দায়িত্ব। একই সঙ্গে ক্যান্সার প্রতিরোধে ধূমপান বর্জন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং এইচপিভি ও হেপাটাইটিস-বি টিকার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও চিকিৎসকদের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যয় এখনও বহু পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। রোগের ধরন ও চিকিৎসার ধাপভেদে একজন রোগীর চিকিৎসায় ‘৫ থেকে ১০ লাখ টাকা’ বা তারও বেশি ব্যয় হতে পারে। সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ এবং আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে যায়। ফলে চিকিৎসার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুরক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে পরিস্থিতি এড়াতে আগে থেকেই ক্রিটিক্যাল ইলনেস ইন্স্যুরেন্স বা বিশেষায়িত ক্যান্সার পলিসি গ্রহণ করা উচিত, যা ক্যান্সারের প্রথম ধাপেই বড় অঙ্কের টাকা প্রদান করে।
এই বাস্তবতায় সরকারি ও সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ক্যান্সারসহ কয়েকটি জটিল রোগে আক্রান্ত অসচ্ছল রোগীদের জন্য এককালীন আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। সরকারি পর্যায়ে এই সহায়তার পরিমাণ এক লাখ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে এবং অন্যান্য উৎস থেকেও প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালসহ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বল্প ব্যয়ে চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে। জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা হেল্পলাইন ১৬২৬৩ থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়।
বেসরকারি সংগঠন, দাতব্য ট্রাস্ট, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচি এবং অনলাইন ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্মও ক্যান্সার রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তার উৎস হতে পারে। যেমনÑ বাংলাদেশ ক্যান্সার সেবা ও গবেষণা ট্রাস্ট, বাংলাদেশ ক্যান্সার সহায়তা ট্রাস্ট এবং আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল তহবিল ক্যান্সার রোগীদের বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়ে থাকে। তবে তহবিল সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে মানুষের আস্থা বজায় থাকে এবং প্রকৃত রোগীরা সহায়তা পান।
‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’ বারবার সতর্ক করে বলছে, ক্যান্সারের একটি বড় অংশ প্রতিরোধযোগ্য। তামাক ব্যবহার কমানো, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা, শারীরিক সক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষকে ক্যান্সারের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা সম্ভব। তবে বাংলাদেশসহ বেশ কিছু দেশে পরিবেশ উন্নয়নে ব্যাপক সচেতন ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
‘স্ট্যান্ড আপ টু ক্যান্সার ডে’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। রোগী, পরিবার, চিকিৎসক, গবেষক, সমাজ, রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টাই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ। সচেতনতা, বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা, মানবিক সহমর্মিতা এবং সবার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই ক্যান্সারমুক্ত ভবিষ্যতের স্বপ্ন আরও বাস্তব হয়ে উঠতে পারে। ক্যান্সারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো তাই শুধু একটি দিবসের আহ্বান নয়; এটি মানবতার সম্মিলিত দায়িত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার।









