সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩
সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩

দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ১০:২০ অপরাহ্ণ
দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প

মো. কায়ছার আলী

‘জীবে দয়া করে যে জন, সে জন সে বিছে ঈশ্বর।’ বাঙালি সাধক স্বামী বিবেকানন্দের এ মহান কালজয়ী উক্তি দিনে ২২ ঘন্টা কঠোর পরিশ্রম করে এক বিস্ময়কর প্রশান্তি অর্জন করে ‘সেবাই ধর্ম’ এ মর্মবাণীকে বড় প্রেরণা মনে করে নিজ জীবনকে মানবতার জন্য সারা জীবন উৎসর্গ করে গেছেন তিনি হলেন আধুনিক নার্সিং এর প্রবর্তক মমতাময়ী ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। এক মুহূর্তের জন্যে ও তাঁর স্বভাবের কোন বিরক্তি, কোন ব্যস্ততা, ব্যবহারে কোন বিভ্রান্তি প্রকাশ করত না। খাদ্য, বিশ্রাম বা গরম তাঁর মহান কাজে কখনো বাধার সৃষ্টি করতে পারত না।

 

১৮২০ সালের ১২ই মে জমিদার ধনী, বৃটিশ বাবা মায়ের কণ্যা ইটালির ফ্লোরেন্স শহরে ভ্রমনের সময় জন্মগ্রহণ করেন। জন্মস্থান ফ্লোরেন্স শহরের নামানুসারেই তাঁর নাম রাখা হয়েছিল। ছোটবেলা থেকে পারিবারিক স্বচ্ছলতার কারণে কোন কিছুর চাহিদা অপূর্ণ রাখেননি তাঁর পরিবার। ১৭ বছর বয়সে তিনি যে অন্তর থেকে অনুভব করতে শুরু করলেন মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁকে দিয়ে কিছু করাতে চান। কিন্তু কি বিষয় সেটা উপলব্ধি করতে করতে পেরিয়ে গেল বেশ কয়েক বছর। তাঁর ছোটবেলা ইংল্যান্ডের ডার্বিশায়ার অঞ্চলে তাঁদের পুরনো বাড়িতে কেটেছে।

 

নাইট ক্লাবে যাওয়া বা কেতাদুরস্ত জীবন কখনো কোমল মনের অধিকারী ফ্লো কে ভালো লাগত না, বরং গ্রাম্য পরিবেশ আর দুস্থ-অসহায় মানুষের পাশাপাশি হাঁস, মুরগি,ভেড়া অসুস্থ হলে তিনি সেবা করতেন। অপরিসীম মমতা থাকার কারণে তিনি মানুষের দুর্ভাগ্যকে নিজের দুর্ভাগ্য হিসেবে মনে করতেন। আহত মানুষের কথা শুনলে তাঁর চোখ গভীর মমতায় ছলছল করে উঠত। তাদের জন্য কিছু করার একটা তাগাদা সববসময় অনুভব করতেন।

 

নিজের মহল্লার মধ্যে কোন আহত বা অসুস্থ মানুষের কথা শুনলে কালবিলম্ব না করে ছুটে যেতেন সেই ছোট্ট বয়সেই। চেষ্টা করতেন কিভাবে সেবা করা যায়? ফলে আশেপাশের সামাজিক পরিবেশে তিনি সকললের প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। বাল্যকালেই দেখলেন একদিন এক নির্দয় বালক একটি কুকুরকে পাথর দিয়ে ঢিল মেরে আহত করলেন। তিনি দেখলেন যে আহত কুকুরটি হাঁটতে পারছে না। তিনি কুকুরটিকে তুলে আনলেন এবং সেবা করে সুস্থ করে তুললেন। এ ঘটনা তাঁর মনকে সেবিকা হওয়ার পেছনে অনুপ্রেরণ যোগায়।

 

২০ বছর বয়সেই তিনি সঙ্গীত, ছবি আঁকার পাশাপাশি গ্রীক, ল্যাটিন, জার্মানি, ফ্রেঞ্চ ভাষা আয়ক্ত করে ফেললেন। পিতার পাশাপাশি পড়াশোনা বিষয়ক প্রকৃত গাইড হিসেবে ছিলেন তাঁর বোন প্যানথেনোপ। তাঁদের পিতা অভিজাত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন হওয়ায় বিভিন্ন মন্ত্রী, বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি তাঁদের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। গতানুগতিক শিক্ষার প্রতি তিনি সামান্যতম আকর্ষণ অনুভব করতেন না। বরং তাঁর ইচ্ছা ছিল কিভাবে সেবাকে জীবনের ব্রত হিসেবে পালন করা যায়। সে সময় সেবাকে কোন পেশা হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হত না।

 

হাসপাতালগুলোর অবস্থা ছিল যেমনি ভয়াবহ তেমনি করুন। সেবিকা হওয়ার ইচ্ছার কথা শুনে তাঁর পিতা-মাতা চমকে উঠলেন। আপত্তির ঝড় উঠল সামাজিক ও পরিবারিক পর্যায়ে। মেয়ের ইচ্ছার যেন পরিবর্তন হয় তাই তাঁকে দেশ ভ্রমণে পাঠিয়ে দিলেন। ভ্রমনে গিয়ে তিনি রোমান ক্যাথলিক কনভেন্টে সন্ন্যাসিনীদের সেবামূলক কাজ দেখে উৎসাহিত হলেন। তিনি সেখানে (জার্মানে) তিন মাস প্রশিক্ষণ নিলেন এবং ভাবলেন ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে এ ধরনের একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করবেন।২৮ বছর বয়সে ৩৮ বছরের সম্ভান্ত, সুঠাম চেহারার সিডনি হার্বাটের সাথে ইউরোপ ভ্রমনের সময় প্রগাড় বন্ধুত্ব হয়। তিনি জানতেন বিয়ে করলে সেটা সেবার কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

 

ইউরোপের হাসপাতালের কাজকর্ম কাজের পদ্ধতি তিনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করলেন। হাসপাতাল ছিল রীতিমতো আতঙ্কের জায়গা। সেখানে যেতে লোকেরা ভয় পেত। নোংরা, অস্বাস্থ্যকর, দূষিত পরিবেশ, বিভিন্ন রোগের আক্রান্তদের গাদাগাদি করে একসঙ্গে রাখা স্যাঁতস্যাঁতে ছাতা পরা মেঝে, ভ্যাপসা গন্ধ এগুলো ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরে এলে তাঁর পিতামাতা মনে করলেন তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হবে। কিন্তু তিনি আবার বললেন আমি সেবিকা হতে চাই। পুনরায় মেয়ের কথা শুনে বাবা-মা চমকে উঠলেন। বিভিন্ন ভাবে বাধা দিয়ে ব্যর্থ হলেন এবং পরিশেষে অশ্রুসিক্ত চোখে মেয়ের ইচ্ছার সম্মতি দিলেন।

 

১৮৫৪ সাল। তখন ব্রিটিশ সেনাবাহিনী পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তারা কোন যুদ্ধে হারবে না এটা প্রত্যেক ব্রিটেন বাসী মনে করে। ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং তুর্কির সাথে জোট বেঁধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করল। ঝকমকে ইউনিফর্ম পড়া সৈন্যরা জাহাজে ঊঠেছে, যে জাহাজ তাদের নিয়ে যাবে কৃষ্ণ সাগরের এক উপদ্বীপ ক্রিমিয়ায়। রোদে ঝলমল করছে পতাকা, ব্যান্ড বাজছে, প্যারেডের পুরোভাগে গর্বিত ভঙ্গিত ড্রাম বাজছে। এই দৃশ্যটা ইতিহাসের সোনালি পাতায় আজও লেখা রয়েছে অবরুদ্ধ তুর্কিদের সাহায্য করতে উত্তরের দিকে জাহাজ নিয়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী অগ্রসর হল। তখনও কেউ ভাবতে পারেনি তারা পর্যদুস্ত হবে রোগ, বিশৃঙ্খলা, ঠান্ডার প্রকোপ আর ক্ষুধার কাছে।

 

যুদ্ধ শিবিরে হঠাৎ ভয়ানক কলেরা মহামারীর আকারে রূপ নিল। ব্রিটিশ সেনারা শুনতে লাগল পানিতে মৃতদেহ ছুড়ে ফেলার ঝপাং ঝপাং শব্দ। মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই সমগ্র সেনাবাহিনী প্রায় অকেজো হয়ে পড়ল। ব্রিটিশ সেনাবাহিনী কৃষ্ণ সাগর পেরিয়ে সেবাস্তোপোলের দিকে শুধুমাত্র সৈন্যদের নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। মালবাহী পশু, তাঁবু, উনুন, ঔষধপত্র, হাসপাতাল, বিছানা অন্যান্য জিনিসপত্র সব পরে রইল খোলা মাঠে জন্তু-জানোয়ারের নাদিমাখা খড়ের উপর। চিকিৎসা ব্যবস্থা তছনছ হয়ে গেল।

 

ব্রিটিশ পত্রিকায় এমন খবর প্রকাশ হলে জনগনের চাপে সরকার বাধ্য হয়ে আহত অসুস্থ সৈন্যদের তত্ত্বাবধান করবার মত কেউ না থাকায় আত্মীয় পরিজনের সব বাধা উপেক্ষা করে ফ্লোরেন্স নাইপিঙ্গেল ৩৮জন মহিলার একটি দল তৈরী করে যুদ্ধক্ষেত্রে চিকিৎসার জন্য রওনা হলেন। তিনি সেখানে পৌঁছে দেখলেন খোলা বারান্দা, নোংরা ওয়ার্ড, পাঁক ভর্তি ডোবা আর রাবিশে ভরা চারিদিক। চার মাইল লম্বা বিছানার সারি ফুটাখানেক তফাতে আহতরা শুয়ে আছে। সংক্রমক রোগ আর কীট-পোকা অনায়াসে বিচরণ করছে সেনা নিয়ন্ত্রিত হাসপাতালে। পরিকাঠামো ভেঙ্গে পড়েছে, মূল্যবান খাদ্য সামগ্রী নষ্ট হয়ে পঁচে যাচ্ছে সংরক্ষনের অভাবে। নেই অপারেশন টেবিল, ঔষধপত্রের যোগান, আসবাবপত্র, নার্সদের ঘরে ছিল ইঁদুর আর নীল মাছির উৎপাত কোন স্যসপেন বা কেটলি নেই।

 

যে পাত্রে মাংস ফোটানো হয়েছে। সেই পাত্রেই চা তৈরী হচ্ছে। প্রয়োজনীয় লন্ঠন ও মোমবাতি নেই, রাতে শোনা যেত ইঁদুর চলাফেরার শব্দ। রুগ্ন ও আহতদের এক বিশাল তরঙ্গ আছড়ে পড়ল স্কুতারির উপর। নিকটবর্তী ছাউনিটি পরিবর্তিত হল আবর্জনার একস্তুপে মৃতদেহ, আর কেটে বাদ দেয়া হাত-পা ভাসতে লাগলো সেই তরঙ্গহিন সমুদ্রে। দুর্গন্ধে বাতাস ভারি হয়ে উঠল। প্রচন্ড শীত, গরম খাবারের অভাব, ঠান্ডায় জমে যাওয়া মাটি ছাড়া শোবার কোন জায়গা নেই। চারদিকে অসুখ আর গ্রাংগ্রীণ- সেএক নারকীয় অবস্থা।

 

বাঁধ ভাঙা পানির মত অসুস্থদের ঢেউ আর ঢেউ। মেঝের প্রতিটি ইঞ্চি ভরে গেল মানুষে। বালিশের অভাবে জুতা মাথায় দিয়ে তারা খালি তক্তার ওপরেই শুয়ে পড়ত। কুড়িটি বিষঠা পাত্র থাকলেও অন্তত এক হাজার মানুষ ভুগছিল পেটের রোগে। কথায় আছে ‘মরার উপর খড়ার ঘা’। নভেম্বরের ১৪ তারিখে এল এক প্রবল ঝড়। সৈন্য বাহিনীর সব তাঁবু উড়ে গেল। শুধু লোকগুলো পড়ে রইল একেবারে খোলা আকাশের নীচে। প্রতিটি জাহাজ ডুবে গেল। সদ্য জাহাজে আসা অতি প্রয়োজনীয় গরম কাপড় ও জিনিসপত্র সেটিও বাদ রইল না।

 

সেই আতঙ্কজনক পরিস্থিতিকে ‘বিপর্যয়ের ইতিহাসে তুলনাহীন বিপর্যয়’ বলা হয়। মানুষের অবিশ্বাস্য রকমের ভালোবাসা ফ্লোরেন্সকে প্রেরণা জুগিয়েছিল। তিনি যেমনি দয়ার প্রতিমূর্তি তেমনি কাজের ক্ষেত্রে কঠিন, কঠোর অর্থাৎ সামান্যতম বিশৃঙ্খলা বিচ্যুতি সহ্য করতে পাতেন না। কখনো কখনো আট ঘন্টা এক নাগাড়ে হাটুতে ভর দিয়ে ক্ষতস্থান পরিস্কার করে আহতদের ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছেন।

 

কখনো তাদের পোশাক পড়িয়ে দিয়েছেন। নিজ হাতে রোগীদের জন্য খাবার তৈরী করেছেন এবং সহকর্মীর হাতে হাত লাগিয়ে হাসপাতালের আঙিনা পরিষ্কার করেছেন। যখন কারো অস্ত্রোপচার করতেই হতো তখন তিনি তার পাশে থাকতেন। তাদের মনে আশার সঞ্চর করতেন, তাদের সাথে কথা বলতেন হেসে হেসে। দিনে সম্ভব না হলে তিনি রাতে তুর্কি প্রদীপ হাতে নিয়ে সেই চার মাইল লম্বা বিছানার সারি ধরে ঘুরে দেখতেন। যখন আলো হাতে নিয়ে ঘুরে দেখতেন তখন রোগীরা মুদ্ধ বিষ্ময় চোখে তাঁকে দেখত।

 

তাদের মনে হতো এক মূর্তিময়ী দেবী যেন তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তারা সব দু:খ যন্ত্রণা মুহূর্তে ভুলে যেতেন। একজন সৈনিক চিঠিতে লিখেছিলেন, যখন তিনি আমাদের পাশ দিয়ে হাঁটতেন, এক অনির্বচনীয় আনন্দে আমাদের মন প্রাণ ভরে উঠত, তিনি প্রত্যেকটি বিছানা অতিক্রমের সময় তাঁর ছায়া পড়ত আমাদের শয্যার উপর। সৈনিকরা পরম শ্রদ্ধার সাথে সেই ছায়াকে চুম্বন করত। প্লিজ পাঠকেরা ভাবুনতো এতবড় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পাওয়া কি কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব? এজন্যই তো তিনি মানব ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

 

তখন তারা বলত, “দীপ হাতে রমনী” এই নামেই তিনি সমস্ত পৃথিবীর মাঝে অমর হয়ে রইলেন। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালের দুরত্ব কিন্তু কম ছিল না। তথাপি কোন দায়িত্ব ভার গ্রহণে তিনি অসম্মতি প্রকাশ করতেন না। প্রবল তুষারপাত বৃষ্টির মধ্যেই তিনি বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে বেড়াতেন। সেখানকার কাজের তত্ত্বাবধান করতেন। তাঁর আন্তরিক চেষ্টায় মুত্যুর হার হাজারে থেকে ষাটে এসে দাঁড়াল।

 

যুদ্ধের পরে তাঁর কাজ শেষে ফিরে করে আসার সময় নিজ ডায়েরীতে লিখলেন ‘হায় আমার দুর্ভাগ্য সন্তানেরা, আমি অত্যন্ত দুষ্টু মায়ের মত তোমাদের ক্রিমিয়ার কবরে ফেলে রেখে নিজে ঘরে ফিরলাম। ছ’মাসে আটটা রেজিমেন্টার ৭৩ শতাংশই শুধু অসুখে মারা গেল-কে আর ভাবে এখন সে কথা’। ক্রিমিয়-জ্যোতি হিসেবে সারাদেশে ভরে গেল স্মারক, মগ, প্লেট, মাটির তৈরি আবক্ষ মূর্তি, কবিতা, রেসের ঘোড়ার নাম, লাইফ বোটের নাম আর জীবনীতে। তখন তাঁর মা ফ্যানি আবেগে অভিভূত হয়ে পড়লেন।

 

ফ্লোকে তিনি চিঠিতে লিখলেন, মেয়ের জন্য আজ তার কত গর্ব। অতীতকে এক পাশে সরিয়ে রেখে ফ্লোরেন্স উত্তরে লিখলেন, ‘আমার খ্যাতি আমার কাছে আশীর্বাদ হয়ে আসেনি, তবু যদি তুমি খুশি হয়ে থাক, তাই-ই আমার অনেক।’ ক্রিমিয়া যুদ্ধের (১৮৫৩ থেকে ১৮৫৬) পর নার্সদের জন্য যা যা দরকার তা তাঁর চোখে পড়ল। তিনি উপলব্ধি করলেন, কিভাবে নাসিং কে একটি সম্মানজনক পেশায় পরিনত করা যায়? তার জন্য সংস্কার, নির্দিষ্ট আচরণ বিধি এবং সাফল্যের মাপকাঠি বা ব্যবস্থাপনা এ সম্পর্কে তাঁর চেয়ে আর বেশি কেউ জানত না। আজকের হাসপাতালের ফুলদানিরতে রাখা ফুল আর উজ্জ্বল, পরিচ্ছন্ন ও মনোরম ওয়ার্ড তাঁরই কাজের প্রত্যক্ষ ফল। ১৮৫৯ সালে তিনি ‘নোটস অন হসপিটালস’ নামে একটি বই লিখলেন।

 

এতে তিনি দেখালেন, কেন মানুষ হাসপাতালে যেতে ভয় পায় আর কিভাবে এ অবস্থার উন্নতি ঘটানো যায়? তিনি লিখেছেন জীবনযাত্রার ন্যুনতম মানই সৈনিকদের মুত্যুর কারণ। সুষম খাদ্যের অভাব আর বিভিন্ন রোগে ভোগে অযতœ অবহেলায় প্রতিবছর ১৫০০ জন মারা যায়। যদিও সেনাবাহিনীতে সবচেয়ে শক্ত সামর্থ ছেলেদের ভর্তি নেওয়া হয়। অতিরিক্ত কাজের চাপে বা মন খারাপের ফলে (সাধরণত পারিবারিক কারণে) তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হল। তিনি প্রায় দুর্বলতা, ক্লান্তি আর শ্বাসকষ্টে ভুগতেন। ১৮৭৪ সালে এক কঠিনতম সময়ে তাঁর পিতার মৃত্যু হলে তিনি শোকে মূহ্যমান হয়ে যান।

 

 

ক্রিমীয় থেকে আসার জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁর সম্মানে একটি আলাদা জাহাজ পাঠাতে চাইলেন। কিন্তু সে অনুরোধ তিনি প্রত্যাখ্যান করে সকলের সাথেই দেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। সমস্ত দেশ তাঁকে সম্মান জানানোর জন্য প্রস্তুত কিন্তু নাম নিয়ে হৈ চৈ করা তাঁর অপছন্দ ছিল। শুধুমাত্র মহারানী ভিক্টোরিয়ার দেয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি যোগদান করেছিলেন। ধীরে ধীরে তাঁর দৃষ্টিশক্তি কমতে কমতে প্রায় অন্ধ হয়ে গেলেন। ১৯০৭ সালে নভেম্বর মাসে ইংল্যান্ডের রাজা সপ্তম অ্যাডওয়ার্ড ফ্লোরেন্স নাইটঙ্গেলকে ‘অর্ডার অব মেরিট’ সম্মানে ভূষিত করলেন। ১৯১০ সালে মে মাসে অনুষ্ঠিত হল ‘নাইটিঙ্গেল ট্রেনিং স্কুল ফর নার্সেস’ এর সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব।

 

১৯১০ সালে ১৩ আগস্ট তিনি ৯০বছর বয়সে ঘুমে ঢলে পড়লেন- সে ঘুম আর ভাঙ্গল না। ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ এর নিজস্ব ইচ্ছা অনুযায়ী এম্বলিতে তাঁদের আদি বাড়ির কাছাকাছি শান্ত স্থানে, অনাড়ম্বরভারে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাধিস্থ করা হল। শুধু একটি ছোট্ট ক্রুশ স্মৃতিফলক হিসেবে চিহ্নিত করছে তাঁর সমাধি। এফ.এন. জন্ম ১৮২০, মৃত্যু ১৯১০ এর চেয়ে মহৎ কোন স্মৃতিসৌধ চাননি মহীয়সী মমতাময়ী, কোমলমতি, চির কুমারী এবং শ্রেষ্ঠ এই নারী।

লেখক: শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

 

 

Ads small one

লেবাননে ইসরায়ালি ড্রোন হামলায় সাতক্ষীরার ২ যুবক নিহত

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ১:১৫ পূর্বাহ্ণ
লেবাননে ইসরায়ালি ড্রোন হামলায় সাতক্ষীরার ২ যুবক নিহত

পত্রদূত রিপোর্ট: দক্ষিণ লেবাননের জেবদিন নামের এলাকায় একটি বাড়িতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় দুই বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মী ও একজন সিরীয় নাগরিক নিহত হয়েছেন। সোমবার লেবাননভিত্তিক সংবাদমাধ্যম লরিয়েন্ট টুডে এই তথ্য জানিয়েছে।
নিহতদের একজন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাদপুর গ্রামের আফসার আলী ও আজেয়া খাতুন দম্পতির ছেলে শফিকুল ইসলাম এবং অপরজন আশাশুনির কাদাকাটি গ্রামের মোঃ আব্দুল কাদের ও নুরুন্নাহান খাতুন দম্পত্তির ছেলে নাহিদুল ইসলাম নাহিদ বলে পবিারের সদস্যদের উদ্বৃতি দিয়ে নিশ্চিত করেছেন ভালুকা চাদপুর মডেল হাইস্কালের সহকারী প্রধান শিক্ষক আল কালাম আবু ওয়াহিদ ওরফে বাবলু মাষ্টার।
লেবাননে বাংলাদেশ দুতাবাসের প্রথম সচিব মোঃ আনোয়ার হোসেন স্বাক্ষরিত এক শোকবার্তায় মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে পাওয়া শোকবার্তাটির সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
সামাজি যোগাযোগ মাধ্যমে পাওয়া শোবার্তায় বলা হয়েছে“ অত্যন্ত দুঃখের সহিত জানানো যাচ্ছে যে, লেবানন প্রবাসী দু’জন রেমিট্যান্সযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম পিতা মোঃ আফসার আলী, মাতা: আজেয়া খাতুন, ঠিকানা: ভালুকা চাঁদপুর, সাতক্ষীরা সদর, সাতক্ষীরা এবং মো নাহিদুল ইসলাম নাহিদ পিতা: মো: আব্দুল কাদের, মাতা: নুরুন্নাহার খাতুন, কাদাকাটি, আশাশুনি, সাতক্ষীরা আজ ১১ মে, ২০ ১২ টায় লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়ের যেবদীন এলাকায় তাদের আবাসস্থলে ইসরায়েলে ইন্তেকাল করেছেন। (ইন্না লিল্লাহী ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।)
লেবানন প্রবাসী উপরোক্ত দু’জন রেমিট্যান্সযোদ্ধার মৃত্যুতে বাংলাদেশ দূতাবাস, বৈরুত একই সাথে দু’জন মরহুমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে। বর্তমানে মরদেহ নাখাতিয়ের নাবিহ বেররী হাসপাতালে রাখা হয়েছে।” শোকবার্তায় স্বাক্ষর করেছেন প্রথম সচিব মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন। রাত ১টায় এরিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সাতক্ষীরার কোন সরকারী কর্মকর্তার সাথেও নিহতদের পরিচয় সংক্রান্ত বিষয়টি নিশ্চিত করতে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
জানা গেছে, নিহত তিন ব্যক্তিই ওই এলাকায় কাজ করছিলেন। গতকাল ওই এলাকায় এটি ছিল ইসরায়েলি বাহিনীর দ্বিতীয় দফা হামলা। এর আগে জেবদিন পৌরসভার একটি রুটি বহনকারী ভ্যানে ড্রোন হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েল। এতে স্থানীয় আরও দুজন বাসিন্দা নিহত হন।
চলতি বছরের ২ মার্চ লেবাননে পুনরায় অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। তখন থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২ হাজার ৮৬৯ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া ইসরায়েলি হামলায় আহত হয়েছেন আরও ৮ হাজার ৭৩০ জন মানুষ।
উল্লেখ্য, গত ১৬ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওই যুদ্ধবিরতিতে ইরান-সমর্থিত লেবানিজ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর কোনো উল্লেখ ছিল না। অথচ দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে হিজবুল্লাহরই সরাসরি সংঘর্ষ ও গোলাগুলি চলছে।

পাটকেলঘাটায় ৬ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই ভাইয়ের মৃত্যু

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ
পাটকেলঘাটায় ৬ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই ভাইয়ের মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিনিধি: পাটকেলঘাটায় মাত্র ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে দুই সহোদরের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার পৃথক অসুস্থতায় ভুগে মারা যান যুগিপুকুরিয়া গ্রামের শহর আলী সরদারের দুই ছেলে আছিরদ্দীন (৫৮) ও মোহাম্মদ আলী (৫০)।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শহর আলীর পাঁচ ছেলের মধ্যে বড় ছেলে আছিরদ্দীন গত ২০ দিন ধরে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। সোমবার ভোরে নিজ বাড়িতেই তাঁর মৃত্যু হয়। বড় ভাইয়ের দাফনের প্রস্তুতি চলাকালেই দুপুর ১২টার দিকে মারা যান সেজ ভাই মোহাম্মদ আলী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে ভুগছিলেন। স্বজনদের দাবি, তাঁর শরীরে একটি টিউমার জটিল আকার ধারণ করে পরবর্তীতে ক্যানসারে রূপ নিয়েছিল।
একই দিনে দুই ভাইয়ের এমন মৃত্যুতে পরিবারটিতে চলছে কান্নার রোল। মৃত আছিরদ্দীনের দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। অন্যদিকে মোহাম্মদ আলী রেখে গেছেন এক ছেলে ও পাঁচ মেয়েকে। সোমবার বাদ জোহর বড় ভাই আছিরদ্দীনের এবং বাদ মাগরিব সেজ ভাই মোহাম্মদ আলীর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁদের পাশাপাশি দাফন করা হয়।

প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই ভাইয়ের মৃত্যুতে গ্রামে বিষাদময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। শোকসন্তপ্ত পরিবারটিকে সান্ত¡না দিতে ভিড় করছেন আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসী।

হামে শিশু মৃত্যুর ভয়াবহতা: বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক কঠিন সতর্কবার্তা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ
হামে শিশু মৃত্যুর ভয়াবহতা: বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক কঠিন সতর্কবার্তা

শেখ সিদ্দিকুর রহমান
বাংলাদেশ আবারও এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা এবং চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে হামে আক্রান্ত হয়ে শত শত শিশুর মৃত্যু ঘটছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ৪০০-এর বেশি শিশুমৃত্যুর আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে, আবার অনেকে মনে করছেন প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। দেশের প্রায় সব বিভাগেই হাম ছড়িয়ে পড়েছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক কয়েক লক্ষ ছাড়িয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা আশংকা করছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এই রোগে আক্রান্তদের বড় অংশই পাঁচ বছরের নিচের শিশু।
বাংলাদেশ একসময় হাম নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের সফল দেশগুলোর মধ্যে ধরা হতো। টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে বহু বছর ধরে হাম প্রায় নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে অর্ন্তবর্তীকালিন সরকারের সময়ে টিকাদানে ঘাটতি, ভ্যাকসিন সংকট, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা, সচেতনতার অভাব এবং শিশুদের নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে আবারও ভয়াবহভাবে ফিরে এসেছে এই রোগ। আজকের বাংলাদেশে হামের এই পুনরুত্থান শুধু একটি রোগের বিস্তার নয়, বরং এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি এবং সামাজিক সচেতনতার এক কঠিন পরীক্ষাও।
হাম কী ? অনেকেই একে সাধারণ জ্বর বা শিশুদের চর্মরোগ ভেবে ভুল করেন। কিন্তু বাস্তবে হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি মূলত বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং খুব সহজেই অন্য শিশু বা মানুষ আক্রান্ত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হাম পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সংক্রামক রোগগুলোর একটি। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত অন্য মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। হামের লক্ষণ শুরু হয় সাধারণত জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হওয়া দিয়ে। এরপর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। অনেক পরিবার প্রথমদিকে এটিকে সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু এই অবহেলাই ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কারণ হাম শুধু চামড়ার ফুসকুড়িতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি ফুসফুসে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কে সংক্রমণ, তীব্র ডায়রিয়া, অপুষ্টি এবং শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করতে পারে। দুর্বল ও অপুষ্ট শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষ করে যেসব শিশু টিকা পায়নি বা অসম্পূর্ণ টিকা পেয়েছে, তাদের জন্য হাম প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এত বেশি মৃত্যু এবার কেন ঘটছে? অতীতে তো হাম ছিল, কিন্তু এত ব্যাপক মৃত্যুর খবর পাওয়া যেত না। এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে।
প্রথমত, টিকাদানে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তথ্যে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়মিত হাম-রুবেলা টিকাদানের হার কমে গেছে। এমনকি কিছু সময় ভ্যাকসিন সরবরাহেও সংকট দেখা দেয়। ফলে বিপুল সংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়। দীর্ঘদিন ধরে যেসব শিশু টিকা পায়নি, তাদের মধ্যে একসাথে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয়ত, করোনা মহামারির পর অনেক দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। বহু পরিবার শিশুদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যায়নি, আবার অনেক এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছিল। ফলে “ইমিউনিটি গ্যাপ” বা রোগ প্রতিরোধের ফাঁক তৈরি হয়েছে। এই ফাঁকই এখন বিপজ্জনকভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।
তৃতীয়ত, দেশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, বস্তি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকার বিভিন্ন বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে। যেখানে এক ঘরে অনেক মানুষ থাকে, সেখানে একজন আক্রান্ত হলেই পুরো পরিবার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
চতুর্থত, অপুষ্টি একটি বড় কারণ। বাংলাদেশের বহু শিশু এখনও অপুষ্টিতে ভোগে। অপুষ্ট শিশুর শরীর রোগ প্রতিরোধে দুর্বল থাকে। হাম হলে তাদের নিউমোনিয়া বা মারাত্মক জটিলতা হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি থাকে। বিশেষ করে ভিটামিন ‘এ’-এর অভাব থাকলে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। চিকিৎসকেরা তাই হাম আক্রান্ত শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
পঞ্চমত, অনেক পরিবার এখনও কুসংস্কার বা ভুল তথ্যের কারণে টিকা নিতে অনীহা দেখায়। কেউ কেউ মনে করেন টিকা দিলে সমস্যা হয়, আবার অনেকে গুজবে বিভ্রান্ত হন। অথচ বাস্তবতা হলো হামের টিকা কোটি কোটি শিশুর জীবন বাঁচিয়েছে। বিশ্বজুড়ে দুই ডোজ টিকা গ্রহণই হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা হিসেবে স্বীকৃত।
সরকারের কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল এই প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কখনও দুর্বল হতে দেওয়া উচিত ছিল না। দেশে টিকার পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে ঘরে ঘরে গিয়ে শিশুদের তালিকা তৈরি করে টিকা নিশ্চিত করতে হতো। স্কুল, মসজিদ, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ব্যাপক সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে যেসব এলাকায় শিশুরা টিকা পায়নি, সেখানে আগেভাগে বিশেষ ক্যাম্পেইন চালানো গেলে হয়তো এত বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হতো। তবে ইতোমধ্যে সরকার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও গ্যাভির সহায়তায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লাখ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কর্মসূচি দ্রুত এবং সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। হামের চিকিৎসা নিয়ে একটি ভুল ধারণা সমাজে প্রচলিত আছে। অনেকে মনে করেন হাম হলে “গায়ে বের হতে দিতে হয়”, বেশি ওষুধ খাওয়া যাবে না, বা ঘর অন্ধকার করে রাখতে হবে। এগুলোর অনেকটাই বৈজ্ঞানিক নয়। হাম হলে শিশুকে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে রাখতে হবে। পর্যাপ্ত পানি, পুষ্টিকর খাবার, জ্বর নিয়ন্ত্রণ, শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া এসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, স্থানীয় ওষুধের দোকান থেকে ইচ্ছেমতো ওষুধ না খাইয়ে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো হামের টিকা কি জরুরি? উত্তর হলো, অবশ্যই জরুরি। শুধু জরুরি নয়, এটি শিশুর জীবনের জন্য অপরিহার্য। চিকিৎসাবিজ্ঞান বহু আগেই প্রমাণ করেছে, দুই ডোজ হাম-রুবেলা টিকা একজন শিশুকে মারাত্মক হাম থেকে সুরক্ষা দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, একটি দেশকে নিরাপদ রাখতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হয়। এই হার কমে গেলেই মহামারি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের একটি বড় শিক্ষা দিচ্ছে। একটি রোগকে একবার নিয়ন্ত্রণে আনলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না। টিকাদান বন্ধ হলে বা দুর্বল হলে বহু বছর পরেও সেই রোগ ভয়ংকরভাবে ফিরে আসতে পারে। হাম সেই বাস্তবতার নির্মম উদাহরণ। একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্যও ব্যর্থতার বেদনা। কারণ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগে হাম প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। আজ প্রয়োজন রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে শিশুদের জীবন রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। দরকার নিরবচ্ছিন্ন টিকাদান, দ্রুত চিকিৎসা, গ্রাম পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং মানুষের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সচেতনতা গড়ে তোলা। কারণ প্রতিটি শিশুর জীবন মূল্যবান। একটি টিকা, একটি সচেতনতা, একটি সময়মতো চিকিৎসাই হয়তো বাঁচিয়ে দিতে পারে হাজারো নিষ্পাপ প্রাণ।
তথ্যসুত্র : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও প্রথম আলো।