সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩
সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩

সম্পাদকীয়: প্রসঙ্গ: ভেনামি চিংড়ি চাষ ও উপকূলীয় অর্থনীতির নতুন দিগন্ত

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়: প্রসঙ্গ: ভেনামি চিংড়ি চাষ ও উপকূলীয় অর্থনীতির নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশে রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হিমায়িত মৎস্য খাত দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে বাগদা ও গলদা চিংড়ির চাহিদা থাকলেও উচ্চমূল্যের কারণে ভেনামি চিংড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়ছিলাম। এই প্রেক্ষাপটে গত রবিবার সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা সভাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং আশাব্যঞ্জক। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের মতো উপকূলীয় জেলাগুলোর জন্য ভেনামি চিংড়ি চাষ এক নতুন অর্থনৈতিক বিপ্লবের বার্তা দিচ্ছে।
সাতক্ষীরাকে বলা হয় দেশের সাদা সোনার রাজধানী। এ জেলার অর্থনীতি অনেকাংশেই চিংড়ি চাষের ওপর নির্ভরশীল। তবে গত কয়েক দশকে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এবং সনাতন পদ্ধতির কারণে বাগদা চাষে কৃষকেরা বারবার লোকসানের মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ দেশ এখন ভেনামি চাষের দিকে ঝুঁকেছে। কারণ, বাগদার তুলনায় ভেনামির উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেশি। যেখানে এক হেক্টর জমিতে বাগদা উৎপাদন হয় খুব সামান্য, সেখানে আধুনিক প্রযুক্তিতে ভেনামির ফলন কয়েক গুণ বেশি পাওয়া সম্ভব।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু যথার্থই বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চিংড়ি চাষের বিকল্প নেই। সচিবালয়ের সভায় ‘সেব’-এর খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চলের প্রতিনিধি এবং বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, মাঠ পর্যায়ের চ্যালেঞ্জগুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তবে কেবল সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না, সাতক্ষীরার প্রান্তিক চাষিদের কাছে এই প্রযুক্তি এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পৌঁছানো জরুরি।
সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত পানি ভেনামি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কিন্তু এই চাষের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রোগমুক্ত পোনা এবং মানসম্মত ফিডের সহজলভ্যতা। এছাড়া অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে উচ্চ প্রযুক্তির এই চাষাবাদ ফলপ্রসূ হবে না।
আমরা মনে করি, ভেনামি চিংড়ি চাষ কেবল একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগ নয়, এটি উপকূলীয় অঞ্চলের দারিদ্র্য বিমোচনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। সরকারের উচিত দ্রুত একটি সুনির্দিষ্ট ও সহজতর নীতিমালা প্রণয়ন করা, যাতে সাধারণ চাষিরা হয়রানিমুক্তভাবে এই চাষে যুক্ত হতে পারেন। সাতক্ষীরা তথা উপকূলের এই অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ব চিংড়ি বাজারে আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পাবেÑএমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।

Ads small one

লেবাননে ইসরায়ালি ড্রোন হামলায় সাতক্ষীরার ২ যুবক নিহত

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ১:১৫ পূর্বাহ্ণ
লেবাননে ইসরায়ালি ড্রোন হামলায় সাতক্ষীরার ২ যুবক নিহত

পত্রদূত রিপোর্ট: দক্ষিণ লেবাননের জেবদিন নামের এলাকায় একটি বাড়িতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় দুই বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মী ও একজন সিরীয় নাগরিক নিহত হয়েছেন। সোমবার লেবাননভিত্তিক সংবাদমাধ্যম লরিয়েন্ট টুডে এই তথ্য জানিয়েছে।
নিহতদের একজন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাদপুর গ্রামের আফসার আলী ও আজেয়া খাতুন দম্পতির ছেলে শফিকুল ইসলাম এবং অপরজন আশাশুনির কাদাকাটি গ্রামের মোঃ আব্দুল কাদের ও নুরুন্নাহান খাতুন দম্পত্তির ছেলে নাহিদুল ইসলাম নাহিদ বলে পবিারের সদস্যদের উদ্বৃতি দিয়ে নিশ্চিত করেছেন ভালুকা চাদপুর মডেল হাইস্কালের সহকারী প্রধান শিক্ষক আল কালাম আবু ওয়াহিদ ওরফে বাবলু মাষ্টার।
লেবাননে বাংলাদেশ দুতাবাসের প্রথম সচিব মোঃ আনোয়ার হোসেন স্বাক্ষরিত এক শোকবার্তায় মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে পাওয়া শোকবার্তাটির সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
সামাজি যোগাযোগ মাধ্যমে পাওয়া শোবার্তায় বলা হয়েছে“ অত্যন্ত দুঃখের সহিত জানানো যাচ্ছে যে, লেবানন প্রবাসী দু’জন রেমিট্যান্সযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম পিতা মোঃ আফসার আলী, মাতা: আজেয়া খাতুন, ঠিকানা: ভালুকা চাঁদপুর, সাতক্ষীরা সদর, সাতক্ষীরা এবং মো নাহিদুল ইসলাম নাহিদ পিতা: মো: আব্দুল কাদের, মাতা: নুরুন্নাহার খাতুন, কাদাকাটি, আশাশুনি, সাতক্ষীরা আজ ১১ মে, ২০ ১২ টায় লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়ের যেবদীন এলাকায় তাদের আবাসস্থলে ইসরায়েলে ইন্তেকাল করেছেন। (ইন্না লিল্লাহী ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।)
লেবানন প্রবাসী উপরোক্ত দু’জন রেমিট্যান্সযোদ্ধার মৃত্যুতে বাংলাদেশ দূতাবাস, বৈরুত একই সাথে দু’জন মরহুমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে। বর্তমানে মরদেহ নাখাতিয়ের নাবিহ বেররী হাসপাতালে রাখা হয়েছে।” শোকবার্তায় স্বাক্ষর করেছেন প্রথম সচিব মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন। রাত ১টায় এরিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সাতক্ষীরার কোন সরকারী কর্মকর্তার সাথেও নিহতদের পরিচয় সংক্রান্ত বিষয়টি নিশ্চিত করতে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
জানা গেছে, নিহত তিন ব্যক্তিই ওই এলাকায় কাজ করছিলেন। গতকাল ওই এলাকায় এটি ছিল ইসরায়েলি বাহিনীর দ্বিতীয় দফা হামলা। এর আগে জেবদিন পৌরসভার একটি রুটি বহনকারী ভ্যানে ড্রোন হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েল। এতে স্থানীয় আরও দুজন বাসিন্দা নিহত হন।
চলতি বছরের ২ মার্চ লেবাননে পুনরায় অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। তখন থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২ হাজার ৮৬৯ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া ইসরায়েলি হামলায় আহত হয়েছেন আরও ৮ হাজার ৭৩০ জন মানুষ।
উল্লেখ্য, গত ১৬ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওই যুদ্ধবিরতিতে ইরান-সমর্থিত লেবানিজ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর কোনো উল্লেখ ছিল না। অথচ দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে হিজবুল্লাহরই সরাসরি সংঘর্ষ ও গোলাগুলি চলছে।

পাটকেলঘাটায় ৬ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই ভাইয়ের মৃত্যু

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ
পাটকেলঘাটায় ৬ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই ভাইয়ের মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিনিধি: পাটকেলঘাটায় মাত্র ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে দুই সহোদরের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার পৃথক অসুস্থতায় ভুগে মারা যান যুগিপুকুরিয়া গ্রামের শহর আলী সরদারের দুই ছেলে আছিরদ্দীন (৫৮) ও মোহাম্মদ আলী (৫০)।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শহর আলীর পাঁচ ছেলের মধ্যে বড় ছেলে আছিরদ্দীন গত ২০ দিন ধরে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। সোমবার ভোরে নিজ বাড়িতেই তাঁর মৃত্যু হয়। বড় ভাইয়ের দাফনের প্রস্তুতি চলাকালেই দুপুর ১২টার দিকে মারা যান সেজ ভাই মোহাম্মদ আলী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে ভুগছিলেন। স্বজনদের দাবি, তাঁর শরীরে একটি টিউমার জটিল আকার ধারণ করে পরবর্তীতে ক্যানসারে রূপ নিয়েছিল।
একই দিনে দুই ভাইয়ের এমন মৃত্যুতে পরিবারটিতে চলছে কান্নার রোল। মৃত আছিরদ্দীনের দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। অন্যদিকে মোহাম্মদ আলী রেখে গেছেন এক ছেলে ও পাঁচ মেয়েকে। সোমবার বাদ জোহর বড় ভাই আছিরদ্দীনের এবং বাদ মাগরিব সেজ ভাই মোহাম্মদ আলীর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁদের পাশাপাশি দাফন করা হয়।

প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই ভাইয়ের মৃত্যুতে গ্রামে বিষাদময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। শোকসন্তপ্ত পরিবারটিকে সান্ত¡না দিতে ভিড় করছেন আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসী।

হামে শিশু মৃত্যুর ভয়াবহতা: বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক কঠিন সতর্কবার্তা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ
হামে শিশু মৃত্যুর ভয়াবহতা: বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক কঠিন সতর্কবার্তা

শেখ সিদ্দিকুর রহমান
বাংলাদেশ আবারও এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা এবং চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে হামে আক্রান্ত হয়ে শত শত শিশুর মৃত্যু ঘটছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ৪০০-এর বেশি শিশুমৃত্যুর আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে, আবার অনেকে মনে করছেন প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। দেশের প্রায় সব বিভাগেই হাম ছড়িয়ে পড়েছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক কয়েক লক্ষ ছাড়িয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা আশংকা করছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এই রোগে আক্রান্তদের বড় অংশই পাঁচ বছরের নিচের শিশু।
বাংলাদেশ একসময় হাম নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের সফল দেশগুলোর মধ্যে ধরা হতো। টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে বহু বছর ধরে হাম প্রায় নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে অর্ন্তবর্তীকালিন সরকারের সময়ে টিকাদানে ঘাটতি, ভ্যাকসিন সংকট, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা, সচেতনতার অভাব এবং শিশুদের নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে আবারও ভয়াবহভাবে ফিরে এসেছে এই রোগ। আজকের বাংলাদেশে হামের এই পুনরুত্থান শুধু একটি রোগের বিস্তার নয়, বরং এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি এবং সামাজিক সচেতনতার এক কঠিন পরীক্ষাও।
হাম কী ? অনেকেই একে সাধারণ জ্বর বা শিশুদের চর্মরোগ ভেবে ভুল করেন। কিন্তু বাস্তবে হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি মূলত বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং খুব সহজেই অন্য শিশু বা মানুষ আক্রান্ত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হাম পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সংক্রামক রোগগুলোর একটি। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত অন্য মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। হামের লক্ষণ শুরু হয় সাধারণত জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হওয়া দিয়ে। এরপর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। অনেক পরিবার প্রথমদিকে এটিকে সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু এই অবহেলাই ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কারণ হাম শুধু চামড়ার ফুসকুড়িতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি ফুসফুসে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কে সংক্রমণ, তীব্র ডায়রিয়া, অপুষ্টি এবং শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করতে পারে। দুর্বল ও অপুষ্ট শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষ করে যেসব শিশু টিকা পায়নি বা অসম্পূর্ণ টিকা পেয়েছে, তাদের জন্য হাম প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এত বেশি মৃত্যু এবার কেন ঘটছে? অতীতে তো হাম ছিল, কিন্তু এত ব্যাপক মৃত্যুর খবর পাওয়া যেত না। এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে।
প্রথমত, টিকাদানে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তথ্যে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়মিত হাম-রুবেলা টিকাদানের হার কমে গেছে। এমনকি কিছু সময় ভ্যাকসিন সরবরাহেও সংকট দেখা দেয়। ফলে বিপুল সংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়। দীর্ঘদিন ধরে যেসব শিশু টিকা পায়নি, তাদের মধ্যে একসাথে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয়ত, করোনা মহামারির পর অনেক দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। বহু পরিবার শিশুদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যায়নি, আবার অনেক এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছিল। ফলে “ইমিউনিটি গ্যাপ” বা রোগ প্রতিরোধের ফাঁক তৈরি হয়েছে। এই ফাঁকই এখন বিপজ্জনকভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।
তৃতীয়ত, দেশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, বস্তি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকার বিভিন্ন বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে। যেখানে এক ঘরে অনেক মানুষ থাকে, সেখানে একজন আক্রান্ত হলেই পুরো পরিবার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
চতুর্থত, অপুষ্টি একটি বড় কারণ। বাংলাদেশের বহু শিশু এখনও অপুষ্টিতে ভোগে। অপুষ্ট শিশুর শরীর রোগ প্রতিরোধে দুর্বল থাকে। হাম হলে তাদের নিউমোনিয়া বা মারাত্মক জটিলতা হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি থাকে। বিশেষ করে ভিটামিন ‘এ’-এর অভাব থাকলে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। চিকিৎসকেরা তাই হাম আক্রান্ত শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
পঞ্চমত, অনেক পরিবার এখনও কুসংস্কার বা ভুল তথ্যের কারণে টিকা নিতে অনীহা দেখায়। কেউ কেউ মনে করেন টিকা দিলে সমস্যা হয়, আবার অনেকে গুজবে বিভ্রান্ত হন। অথচ বাস্তবতা হলো হামের টিকা কোটি কোটি শিশুর জীবন বাঁচিয়েছে। বিশ্বজুড়ে দুই ডোজ টিকা গ্রহণই হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা হিসেবে স্বীকৃত।
সরকারের কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল এই প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কখনও দুর্বল হতে দেওয়া উচিত ছিল না। দেশে টিকার পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে ঘরে ঘরে গিয়ে শিশুদের তালিকা তৈরি করে টিকা নিশ্চিত করতে হতো। স্কুল, মসজিদ, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ব্যাপক সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে যেসব এলাকায় শিশুরা টিকা পায়নি, সেখানে আগেভাগে বিশেষ ক্যাম্পেইন চালানো গেলে হয়তো এত বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হতো। তবে ইতোমধ্যে সরকার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও গ্যাভির সহায়তায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লাখ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কর্মসূচি দ্রুত এবং সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। হামের চিকিৎসা নিয়ে একটি ভুল ধারণা সমাজে প্রচলিত আছে। অনেকে মনে করেন হাম হলে “গায়ে বের হতে দিতে হয়”, বেশি ওষুধ খাওয়া যাবে না, বা ঘর অন্ধকার করে রাখতে হবে। এগুলোর অনেকটাই বৈজ্ঞানিক নয়। হাম হলে শিশুকে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে রাখতে হবে। পর্যাপ্ত পানি, পুষ্টিকর খাবার, জ্বর নিয়ন্ত্রণ, শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া এসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, স্থানীয় ওষুধের দোকান থেকে ইচ্ছেমতো ওষুধ না খাইয়ে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো হামের টিকা কি জরুরি? উত্তর হলো, অবশ্যই জরুরি। শুধু জরুরি নয়, এটি শিশুর জীবনের জন্য অপরিহার্য। চিকিৎসাবিজ্ঞান বহু আগেই প্রমাণ করেছে, দুই ডোজ হাম-রুবেলা টিকা একজন শিশুকে মারাত্মক হাম থেকে সুরক্ষা দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, একটি দেশকে নিরাপদ রাখতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হয়। এই হার কমে গেলেই মহামারি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের একটি বড় শিক্ষা দিচ্ছে। একটি রোগকে একবার নিয়ন্ত্রণে আনলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না। টিকাদান বন্ধ হলে বা দুর্বল হলে বহু বছর পরেও সেই রোগ ভয়ংকরভাবে ফিরে আসতে পারে। হাম সেই বাস্তবতার নির্মম উদাহরণ। একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্যও ব্যর্থতার বেদনা। কারণ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগে হাম প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। আজ প্রয়োজন রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে শিশুদের জীবন রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। দরকার নিরবচ্ছিন্ন টিকাদান, দ্রুত চিকিৎসা, গ্রাম পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং মানুষের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সচেতনতা গড়ে তোলা। কারণ প্রতিটি শিশুর জীবন মূল্যবান। একটি টিকা, একটি সচেতনতা, একটি সময়মতো চিকিৎসাই হয়তো বাঁচিয়ে দিতে পারে হাজারো নিষ্পাপ প্রাণ।
তথ্যসুত্র : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও প্রথম আলো।