বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রবন্ধ/বাংলা সাহিত্যে মহররম ও কারবালা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ
প্রবন্ধ/বাংলা সাহিত্যে মহররম ও কারবালা

নূরুজ্জামান দিশারী
হিজরি সনের সূচনা-মাস মুহাররম। এটি ইসলামের চারটি মহিমান্বিত ও সম্মানিত মাসের অন্যতম। ইতিহাসের দীর্ঘ পরিসরে এ মাস এক গভীর তাৎপর্য ও মর্মস্পর্শী স্মৃতির ভার বহন করে চলেছে। এর বুকে অঙ্কিত হয়েছে সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন সংঘাতের এক জাজ্বল্যমান দলিল। ৬১ হিজরি সনের ১০ মহররম (১০ অক্টোবর ৬৮০ খ্রি.) ফোরাতের তীরে কারবালার প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি। ক্ষমতার মোহে অন্ধ, নিষ্ঠুর ইয়াযীদ বাহিনীর নির্মম আঘাতে শাহাদাত বরণ করেন প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আদরের নাতি, জান্নাতের যুবকদের নেতা ইমাম হোসাইন (রা.)। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর নিষ্ঠাবান ৭২ জন সঙ্গী- যারা অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে, সত্যের পতাকা সমুন্নত রাখতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। এ বিয়োগান্ত ঘটনায় শোককাতর হয় না এমন মুসলমান নেই বললেই চলে। দল-মত, দেশ-ভাষা, বর্ণ, গোত্র, মাযহাব, তরিকা নির্বিশেষে সকল ঈমানদার মুসলমান- যাদের হৃদয়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের প্রতি বিন্দুমাত্র ভালোবাসা রয়েছে, তার পক্ষে কারবালার এই বিয়োগান্ত দৃশ্য উপেক্ষা করা অসম্ভব।
কারবালার প্রান্তরে সংঘটিত সেই হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি শুধু ইতিহাসের পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা রূপ নিয়েছে কবিতায়, কাব্যে, পুঁথিতে, গদ্যে, সংগীতে- এক বিস্তৃত সাহিত্যধারায়। এই ঘটনাই পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে, আর বাংলাও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলায় মহররম বিষয়ক সাহিত্যচর্চার সূচনা মূলত মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের মধ্য দিয়ে যে নতুন সাংস্কৃতিক ধারা সূচিত হয়, তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল ছিল বাংলা ভাষার বিকাশ। মুসলিম শাসকরা বাংলা ভাষাকে রাজদরবারে মর্যাদা দেওয়ার ফলে এটি ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক কাহিনীর ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এই প্রেক্ষাপটেই কারবালার ঘটনা বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ কওে এবং ধীরে ধীরে একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যধারার জন্ম দেয়।
মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে মহররমের প্রভাব সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে পুঁথি সাহিত্যে। এই পুঁথিগুলোতে কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে জঙ্গনামা ও মর্সিয়া- যেখানে যুদ্ধ, বীরত্ব, শোক ও বিলাপ একত্রে মিশে এক অনন্য রস সৃষ্টি করেছে। ষোলো শতকের কবি শেখ ফয়জুল্লাহ হোসাইন (রা.)-এর স্ত্রী জয়নবের শোক ও বিলাপকে আশ্রয় করে লিখেন ‘জয়নবের চৌতিশা’। এটিকেই ধরা হয় ‘মহররমের’ ওপর রচিত প্রথম মর্সিয়া। কবি ফয়জুল্লাহর পথ ধরে কবি দৌলত উজির বাহরাম খান রচনা করেন ‘জঙ্গনামা’। কবি ‘লায়লী-মজনু’ কাব্যের জন্য খ্যাতি অর্জন করলেও তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ হলো ‘ইমাম বিজয়’-যা রচিত হয়েছিল মহররমের বিষাদময় কাহিনীকে উপজীব্য করে।
মধ্যযুগের অন্যতম শক্তিশালী কবি সৈয়দ সুলতানও (আনু. ১৫৫০-১৬৪৮) মহররমের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘মকতুল হোসেন’ লিখতে শুরু করেছিলেন। বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি উক্ত কাজ সম্পন্ন করতে না পারলেও তার প্রিয় শিষ্য মুহাম্মদ খান (১৫৮০-১৬৫০) তা সম্পন্ন করেন। কবি মুহম্মদ খান জঙ্গনামার শ্রেষ্ঠ কবি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন । তিনি ১১ পর্বে কারবালার যুদ্ধ, ঈমাম হোসাইনের শাহাদত, হোসাইন- পুত্র কাসেমের বীরত্ব, সখিনার বিলাপ প্রভৃতি বিষয়কে উপজীব্য করে রচনা করেন
‘মকতুল হোসেন’ । গ্রন্থটি মহররম মাসে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সুর করে অধিক পরিমাণে পঠিত হতো। কাব্যরস সিক্ত গ্রন্থটি কোমল হৃদয় বাঙালি পাঠককে মুগ্ধ করেছিল। আঠারো শতকের আরেক পরিচিত কবি ফকীর গরীবুল্লাহও ‘মহররম সাহিত্য’ রচনা করেছিলেন। ফোরাত তীরের পানি সংকটের করুণ দৃশ্য তুলে ধরতে তিনি লিখেন, ‘ঘিরিয়া রাখিল কুফার পানি বন্ধ করে পানি পানি করে যত সব গেলো মরে।’
আঠারো শতকে কবি হায়াত মাহমুদ ‘জঙ্গনামা’ বা ‘মহরম’ পর্বে হযরত জিব্রাইলের জবানিতে রাসূল (সা.)-এর প্রিয় নাতির মৃত্যু দৃশ্য, বিষের পেয়ালা পানে হাসানের মৃত্যু, নববধূ সখিনার অকাল বৈধব্য, বিলাপ, হোসাইন (রা.)-এর নির্মম শিরচ্ছেদ করুণভাবে উপস্থাপন করেছেন। মূলত কাশেমের লড়াই নিয়ে রচিত তার ‘জঙ্গনামা’ মর্সিয়া সাহিত্যের এক সমৃদ্ধ রচনা। একই ধারায় আব্দুল হাকিম (১৬২০-১৬৯০) ‘কারবালা’, ইয়াকুব আলী (১৮শ শতক) ‘জঙ্গনামা’, জাফর (১৮শ শতক) ‘শহীদ-ই-কারবালা’ ও ‘সখিনার বিলাপ’, কবি হামিদ (১৮শ শতক) ‘সংগ্রাম হুসেন’, শেরবাজ চৌধুরি (১৮শ শতক) ‘কাশিমের লড়াই’ ও ‘ফাতিমার সুরতনামা’, মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ খান (১৯শ শতকের প্রথমার্ধ) গুলজার-ই- শাহাদৎ’, ওয়াহিদ আলী (১৯শ শতকের প্রথমার্ধ) ‘বড় জঙ্গনামা’, জনাব আলী (১৯শ শতক) ‘শহিদ-ই-কারবালা’, মুহাম্মদ মুনসি (১৯শ শতক) ‘শহীদ-ই-কারবালা’, মুহাম্মদ ইসহাক উদ্দীন (২০শ শতক) ‘দাস্তান শহিদ-ই-কারবালা’ রচনা করেন। এসব গ্রন্থাবলি মহররম মাসে পঠিত হতো এবং তা পাঠক-শ্রোতাদের মনে গভীর শোকাচ্ছ্বাস ও বেদনার সৃষ্টি করত। মহররমের সাহিত্যিক প্রভাব শুধু লিখিত কাব্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি প্রবলভাবে প্রভাব ফেলে লোকসংস্কৃতিতেও। জারি গান, মর্সিয়া, পাঁচালি- এসবের মাধ্যমে গ্রামবাংলার মানুষ কারবালার শোককে নিজের জীবনের অংশ করে নেয়। জারি গানের সুরে, করুণ বিলাপে, নাটকীয় উপস্থাপনায় কারবালার কাহিনী এমনভাবে পরিবেশিত হতো যে, শ্রোতারা অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ত।
ইংরেজ আমলে বাংলা সাহিত্য প্রবেশ করে আধুনিক ধারায়। এ যুগেও ‘মহররম’কে কেন্দ্র করে মর্সিয়া সাহিত্য রচিত হতে থাকে সমান তালে। আবুল আলী মোহাম্মদ হামিদ আলীর কাসেম বধ কাব্য (১৯০৬) ও জয়নাল উদ্ধার (১৯০৯), মোহাম্মদ উদ্দীন আহমদের মোহররম কাব্য (১৯১২), মোহাম্মদ আব্দুল বারীর কারবালা (১৯১৩), কাজী আমিনুলের জঙ্গে কারবালা (১৯৪৫) ও মোহাম্মদ বরকতুল্লাহর কারবালার যুদ্ধ ও নবী বংশের ইতিবৃত্ত (১৯৫৭) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব রচনায় কবিদের মুনশিয়ানার পরিচয় মেলে। ঊনবিংশ শতকে এসে মহররম বিষয়ক সাহিত্য নতুন মোড় নেয় । এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি বিষাদ সিন্ধু, যার রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৮-১৯১২)। এই গ্রন্থে কারবালার ঘটনাকে গদ্যের শিল্পরীতিতে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বাংলা সাহিত্যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এর ভাষা, বর্ণনা, চরিত্র নির্মাণ- সবই এক ধ্রুপদী সৌন্দর্যে ভরপুর। তবে এই গ্রন্থের ঐতিহাসিক নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫১)। তিনি ‘মহরম শরীফ’ রচনা করে কারবালার ঘটনাকে আরও ইতিহাসসম্মতভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন। তাঁর কাব্যে আমরা দেখি ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা ও সাহিত্যিক সংবেদনশীলতার এক সমন্বয়। কারবালাকে উপজীব্য করে অনল প্রবাহের কবি ইসমাইল হোসেন সিরাজী (১৮৮০- ১৯৩১) রচনা করেন ‘মহাশিক্ষা’ কাব্য। মহররমকে কেন্দ্র করে কবিতা লিখেছিলেন কবি শাহাদাৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩) এবং পল্লীকবি জসীমউদ্দীনও (১৯০৩-১৯৭৬)। বিশ শতকে এসে মহররম বিষয়ক সাহিত্য এক নতুন চেতনার জন্ম দেয়, যার প্রধান রূপকার কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি মহররমকে ঘিরে কবিতা ও গান রচনা করেছেন প্রচুর। তাঁর বিখ্যাত ‘মহররম’ কবিতা বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন। কবিতার শুরুতে কবি লিখেন, নীল সিয়া আসমান, লালে লাল দুনিয়া ‘আম্মা! লা’ল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া!” কাঁদে কোন্ ক্রন্দসী কারবালা ফোরাতে সে কাঁদনে আসু আনে সীমারেরও ছোরাতে। তিনি কারবালার ঘটনাকে শুধু শোকের দৃষ্টিতে দেখেননি; বরং এটিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি জ্বালাময়ী আখরে লিখেন, ফিরে এল আজ সেই মহররম মাহিনা,- ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না। উষ্ণীষ কোরানের, হাতে তেগ আরবীর দুনিয়াতে নত নয় মুসলিম কারো শির,- তবে শোন ঐ শোন বাজে কোথা দামামা। শমসের হাতে নাও, বাঁধো শিরে আমামা! এভাবে আগুরা ও মুহররমের প্রেক্ষাপটে অনেকেই লিখেছেন। এখনো তা চলমান আছে। বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে। বিশ শতকের পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর, আশি ও নব্বই দশকের কবিরা অনেকেই আশুরা ও মুহররম নিয়ে কবিতা ও গান লিখেছেন। মর্সিয়া লিখেছেন ও লিখছেন অথবা আওরা, মোহররম, ইমাম হোসাইন, ফোরাত, কারবালা প্রান্তর, কে হোসাইন-কে ইয়াযীদ, ঘৃণিত সীমার ইত্যাদি মুহররম সম্পর্কিত শব্দাবলীকে উপমা-উৎপ্রেক্ষাতে হলেও বিভিন্ন কবিতার বিভিন্ন লাইন প্রসঙ্গে টেনে এনেছেন। কারবালা সংক্রান্ত স্বতন্ত্র কবিতার রচনা অথবা উপমা-উৎপ্রেক্ষায় মুহররমকেন্দ্রিক শব্দাবলিকে টেনে আনা এই সব কবির তালিকায় রয়েছেন ইসলামি রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, আবদুস সাত্তার, মতিউর রহমান মল্লিক, আবদুল হাই শিকদার, গোলাম মোহাম্মদ, আসাদ বিন হাফিজ, আল মুজাহিদী, আসাদ চৌধুরী, মোশাররফ হোসেন খান, শাহাদাত হোসাইন, মাওলানা রুহুল আমিন খান, ফজল শাহাবুদ্দিন, মোহাম্মদ নূরুল হুদা, আ স ম বাবর আলী, মসউদ উশ শহীদ, জহুরুশ শহীদ, আবু নসরত রহমত উল্লাহ, ফারুক মাহমুদ, হোসেন মাহমুদ, মোহসিন হোসাইন, বুলবুল সরওয়ার, সৈয়দ মুসা রেজা, অধ্যাপক সিরাজুল হক, সোলায়মান আহসান, মুকুল চৌধুরী, আবদুল মুকিত চৌধুরী, মহিউদ্দিন আকবর, আমিন আল আসাদ, চৌধুরী গোলাম রব্বানী, আতিক হেলাল, মানসুর মুজাম্মিল, মোহাম্মদ আলী আকবর, এম. মনিরুল হক প্রমুখ।
বাংলা সাহিত্যে মহররম নিয়ে সপ্তদশ শতক থেকে শুরু করে বর্তমানকাল পর্যন্ত যত লেখা রচিত হয়েছে দ্বিতীয় এমন কোনো বিষয় নিয়ে এত লেখা ছাপা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। মধ্যযুগের পুঁথি থেকে আধুনিক কবিতা পর্যন্ত এই ধারার বিস্তার প্রমাণ করে, কারবালা কেবল অতীতের ঘটনা নয়; এটি বর্তমানের চেতনা এবং ভবিষ্যতের প্রেরণা। মহররম আমাদের শেখায় সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে, এবং মানবতার পথে অটল থাকতে। এই শিক্ষা যতদিন মানবসমাজে প্রাসঙ্গিক থাকবে, ততদিন বাংলা সাহিত্যে মহররমের এই প্রবাহও অবিরাম বহমান থাকবে।

Ads small one

ইইউতে বাংলাদেশের পোশাকে বড় ধাক্কা, রফতানি কমলো ১৪%

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৭ অপরাহ্ণ
ইইউতে বাংলাদেশের পোশাকে বড় ধাক্কা, রফতানি কমলো ১৪%

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাক আমদানির বাজারে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সামগ্রিকভাবে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাইয়ের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানি মূল্য কমেছে ৫ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে এই পতনের চেয়েও বড় ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ। একই সময়ে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ইইউতে কমেছে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

অর্থাৎ ইইউর বাজারে চাহিদা কমার প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়লেও বাংলাদেশ শুধু বাজার সংকোচনের কারণে কমেনি; বরং সামগ্রিক বাজারের তুলনায় আরও বেশি হারে বাজার হারিয়েছে।

ইইউর আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৫৪ হাজার ৩৮৮ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ইউরোর পোশাক আমদানি করেছিল ইইউ। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা নেমে এসেছে ৫১ হাজার ৬১৩ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ইউরোতে। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি কমেছে প্রায় ২ হাজার ৭৭৫ মিলিয়ন ইউরো।

শুধু মূল্য নয়, আমদানির পরিমাণও কমেছে। গত বছরের প্রথম সাত মাসে ইইউ ২ হাজার ৬৮৮ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন কেজি পোশাক আমদানি করেছিল। এ বছর তা কমে হয়েছে ২ হাজার ৬০১ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন কেজি—পতন ৩ দশমিক ২৩ শতাংশ।

সুগন্ধি চাল নিয়ে কী ঘটেছিল? দাম চড়তেই অর্ধেক হলো রফতানি কোটা
অর্থাৎ ইইউর পোশাক বাজারে ক্রেতারা এ বছর আগের তুলনায় কম পোশাক কিনছেন। একই সঙ্গে প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্যও কমেছে। সব উৎস মিলিয়ে গড় ইউনিট মূল্য ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ কমে কেজিপ্রতি ১৯ দশমিক ৮৪ ইউরো হয়েছে।

বাংলাদেশের পতন বাজারের চেয়েও বেশি

এই সামগ্রিক বাজার সংকোচনের মধ্যেই বাংলাদেশের চিত্র আরও চ্যালেঞ্জিং। জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি মূল্য কমেছে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। একই সময়ে রফতানির পরিমাণ কমেছে ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

অর্থাৎ পরিমাণের তুলনায় মূল্যের পতন অনেক বেশি। এর অন্যতম কারণ বাংলাদেশের পোশাকের গড় রফতানি মূল্য কমে যাওয়া।

তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে কেজিপ্রতি ১৩ দশমিক ৮০ ইউরো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট তুলনায় এটি ইইউর প্রধান পোশাক সরবরাহকারীদের মধ্যে সর্বনিম্ন গড় মূল্য।

ফলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই সঙ্গে দুটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—রফতানির পরিমাণ কমছে এবং প্রতি কেজি পোশাকের দামও কমছে। এর ফলে মোট রফতানি আয়ের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

অপরদিকে, ইইউর বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগীদের কয়েকজন ভিন্ন চিত্র দেখিয়েছে।

চীনের পোশাক আমদানি মূল্য ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ যখন ইইউর মোট পোশাক আমদানি মূল্য ৫ শতাংশের বেশি কমেছে, তখন এই দুই দেশ বাজারে তাদের সরবরাহ বাড়াতে পেরেছে।

এখানে ভিয়েতনামের গড় ইউনিট মূল্যও বেড়েছে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। কম্বোডিয়ার গড় মূল্য বেড়েছে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অর্থাৎ এসব দেশের ক্ষেত্রে বাজারের অংশ ধরে রাখার সঙ্গে সঙ্গে তুলনামূলক বেশি দামে পোশাক বিক্রির প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি এর বিপরীত। বাংলাদেশ কম দামে পোশাক সরবরাহ করেও বাজারের অংশ ধরে রাখতে পারেনি। ফলে ইইউর বাজারে প্রতিযোগিতার ধরন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

তবে জুন-জুলাইয়ে পরিবর্তনের ইঙ্গিত

সামগ্রিক জানুয়ারি-জুলাই হিসাব এখনো বাংলাদেশের জন্য নেতিবাচক। কিন্তু মাসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

চলতি বছরের জুন ও জুলাই—টানা দুই মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় বেড়েছে।

জুনে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ২০২৫ সালের ১ হাজার ৩৫৫ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন ইউরো থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ১ হাজার ৩৬৭ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন ইউরো হয়েছে। প্রবৃদ্ধি ০ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি আরও কিছুটা বেড়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে রফতানি ছিল ১ হাজার ৬৬৭ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন ইউরো। চলতি বছরের জুলাইয়ে তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৭২৯ দশমিক ৭২ মিলিয়ন ইউরো—প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭২ শতাংশ।

জুন থেকে জুলাইয়ের ব্যবধানও উল্লেখযোগ্য। এক মাসে বাংলাদেশের রফতানি মূল্য বেড়েছে ৩৬২ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন ইউরো, যা ২৬ দশমিক ৫০ শতাংশের মাসিক বৃদ্ধি।

এই দুই মাসের প্রবৃদ্ধির কারণে জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের পোশাক রফতানির যে ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ পতন ছিল, জানুয়ারি-জুলাই শেষে তা কমে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ ক্রমপুঞ্জীভূত পতন ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে।

এখনই পুনরুদ্ধার বলা যাচ্ছে না

তবে এই পরিবর্তনকে এখনই বাজার পুনরুদ্ধার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ সাত মাসের হিসাবে বাংলাদেশের রফতানি এখনো দ্বিগুণ অঙ্কে কম। একই সময়ে ইইউর সামগ্রিক পোশাক আমদানিও কমেছে।

বরং জুন ও জুলাইয়ের তথ্যকে আপাতত পতনের গতি কমে আসার প্রাথমিক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে। বছরের প্রথম পাঁচ মাসে যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী দুই মাসে তার কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আগামী মাসগুলোতে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে কি না। যদি জুন-জুলাইয়ের মতো প্রবৃদ্ধি পরবর্তী মাসগুলোতেও ধরে রাখা যায়, তাহলে বছরের শুরুতে তৈরি হওয়া বড় ঘাটতি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু আবার প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হলে সাত মাসের এই সাময়িক উন্নতির প্রভাবও দ্রুত ম্লান হয়ে যেতে পারে।

কম দাম কি বাংলাদেশের জন্য সুবিধা, নাকি চাপ?

বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পোশাকের ইউনিট মূল্য। ইইউর বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের গড় দাম কেজিপ্রতি ১৩ দশমিক ৮০ ইউরো, যা তুলনামূলকভাবে সর্বনিম্ন। অথচ এই কম দাম বাংলাদেশের বাজার অংশ ধরে রাখার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি।

এতে বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য একটি বড় বাস্তবতা সামনে আসে—শুধু কম দামে পোশাক সরবরাহ করে ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একই সময়ে প্রতিযোগী কিছু দেশ তুলনামূলক বেশি দামে পণ্য বিক্রি করেও বাজার বাড়াতে পারছে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, সামগ্রিক বাজার সংকোচনের মধ্যেও বাংলাদেশের জন্য সাম্প্রতিক মাসগুলোর প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, জানুয়ারি-জুলাইয়ের সামগ্রিক চিত্র এখন নেতিবাচক হলেও জুন ও জুলাইয়ে টানা প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এর ফলে জানুয়ারি-জুনের ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ পতন সাত মাসে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে এটিকে এখনই পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার বলা ঠিক হবে না; বরং পতনের গতি কমে আসার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যায়।

ইইউ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোর একটি। তাই এই বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমে যাওয়া, প্রতিযোগী দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের ইউনিট মূল্য কমে যাওয়ার প্রবণতা—তিনটি বিষয়ই বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে

জুন-জুলাইয়ের ইতিবাচক প্রবণতা ধরে রাখা গেলে পরিস্থিতির উন্নতির সুযোগ রয়েছে। তবে একই সঙ্গে বেশি মূল্য সংযোজনের পোশাক, পণ্যের বৈচিত্র্য, মান, সরবরাহ সক্ষমতা এবং ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

কারণ সাত মাসের তথ্য আপাতত একটি দ্বিমুখী বার্তা দিচ্ছে—ইইউর বাজার সংকুচিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই সংকোচনের মধ্যে সব সরবরাহকারী সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বাংলাদেশ যেখানে কম দামে পোশাক বিক্রি করেও বাজার হারিয়েছে, সেখানে চীন ও ভিয়েতনাম বাজার বাড়িয়েছে। আবার জুন ও জুলাইয়ের টানা প্রবৃদ্ধি বলছে, বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি পুরোপুরি একমুখী নেতিবাচকও নয়।

স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মালয়েশিয়া যাচ্ছেন মির্জা আব্বাস

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২৭ অপরাহ্ণ
স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মালয়েশিয়া যাচ্ছেন মির্জা আব্বাস

নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য আবারও মালয়েশিয়া যাচ্ছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর পৌনে ১২টায় বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন তিনি।

বিষয়টি নিশ্চিত করে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মির্জা আব্বাস মালয়েশিয়া যাচ্ছেন।

এর আগে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা শেষে গত ২ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরেন মির্জা আব্বাস। প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস পর তিনি দেশে ফিরেছিলেন।

ঘরেই উৎপাদন করা যাবে বিদ্যুৎ, বিক্রি করতে পারবেন সরকারের কাছে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:১৯ অপরাহ্ণ
ঘরেই উৎপাদন করা যাবে বিদ্যুৎ, বিক্রি করতে পারবেন সরকারের কাছে

অনলাইন ডেস্ক: ঘরে ঘরে সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহী করছে বাংলাদেশ সরকার। নিজের ঘরে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে অতিরিক্ত থাকলে তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে টাকাও আয় করা যাবে। জাতীয় গ্রিডে দেওয়া প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য সরকার ১০.৫০ টাকা করে দেবে। এতে শুধু নিজের বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, অর্থ উপার্জনের পথও খুলছে।

এ বিষয়ে সরকারি এক বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সোলার দিয়ে নিজের বিদ্যুৎ নিজেই উৎপাদন করুন। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে আয় করুন। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য সরকার ১০ টাকা ৫০ পয়সা করে দেবে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ এর মধ্যে সোলার সিস্টেম চালু করে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে এই পরিমাণ প্রণোদনা পাওয়ার সুযোগ থাকবে।

সোলার বাছাইয়ের বিষয়ে সরকারি এই বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আগে দেখুন আপনার ছাদে কতটা সোলার বসানো যাবে। সোলার ক্যালকুটের ব্যবহার করে সহজেই হিসাব করুন। তালিকাভুক্ত সোলার কোম্পানি বেছে নিন। সোলার ও ব্যাটারি বসানো ও রক্ষণাবেক্ষণে সহায়তা করবে। সময়ের মধ্যে সোলার চালু করুন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ এর মধ্যে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করুন।