প্রসঙ্গ: আন্তর্জাতিক জরুরি কিট দিবস
সাকিবুর রহমান বাবলা
ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প বা অগ্নিকা-ের মতো দুর্যোগ মুহূর্তেই জনজীবন বিপর্যস্ত করে দেয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দুর্যোগের সময় পূর্বপ্রস্তুতিই হলো সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ৯ জুলাই পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক জরুরি কিট দিবস’। দিবসটির লক্ষ্য হলো ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে দুর্যোগের আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা।
জরুরি প্রস্তুতির ধারণাটি আধুনিক নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও শীতল যুদ্ধের সময় পারমাণবিক হামলার আশঙ্কায় পরিবারগুলো জরুরি সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা শুরু করে, যা আজ আধুনিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই দিবসের অনুপ্রেরণায় রয়েছেন আমেরিকান রেড ক্রসের প্রতিষ্ঠাতা ক্লারা বার্টন, ১৮২১ সালে জন্মগ্রহণকারী এই অগ্রগামী মার্কিন নার্স মার্কিন গৃহযুদ্ধের সময় আহত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তাঁর কর্ম ও দর্শন আধুনিক জরুরি সাড়া প্রদান ব্যবস্থার ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ধরনের দুর্যোগের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টা সবচেয়ে সংকটপূর্ণ। এ সময় বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। তাই প্রতিটি পরিবারের অন্তত তিন দিন স্বনির্ভর থাকার মতো একটি ‘জরুরি কিট’ থাকা অপরিহার্য। একটি মৌলিক কিটে পর্যাপ্ত পানি (প্রতিজনে প্রতিদিন অন্তত এক গ্যালন), শুকনো খাবার, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, ওষুধ, টর্চ, রেডিও, পাওয়ার ব্যাংক, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের কপি, নগদ অর্থ, বাঁশি ও স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী, অফলাইন ম্যাপ বা দুর্যোগকালীন জরুরি অ্যাপ থাকা প্রয়োজন।
বিশ্বের অনেক দেশে দুর্যোগ প্রস্তুতি এখন সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। জাপানে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের ভূমিকম্প মোকাবিলার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং ইউরোপের অনেক দেশ পরিবারভিত্তিক ৭২ ঘণ্টার জরুরি প্রস্তুতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। স্কুল, কর্মক্ষেত্র ও কমিউনিটি পর্যায়ে নিয়মিত মহড়া পরিচালনার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও সক্ষমতা গড়ে তোলা হচ্ছে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দুর্যোগের প্রস্তুতি ও জীবন রক্ষা একটি পবিত্র দায়িত্ব। ইসলামসহ সব ধর্মই সতর্কতা, দূরদর্শিতা ও পরিকল্পনার শিক্ষা দেয়। আল-কোরআনের আলোকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মূল শিক্ষা হলো—আগাম প্রস্তুতি, জীবন রক্ষা, ধৈর্য, মহান আল্লাহর ওপর ভরসা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা। অর্থাৎ দুর্যোগের সময় আল্লাহর উপর ভরসা ও দোয়ার মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ, ঝুঁকি হ্রাস এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোও ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ভৌগোলিক অবস্থান ও অধিক ঘনবসতির কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখানে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, বজ্রপাত ও অগ্নিকা-ের মতো দুর্যোগের ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে। উপকূলীয় ও নদীবিধৌত অঞ্চলের মানুষের জন্য পরিবারভিত্তিক জীবনরক্ষাকারী প্রস্তুতি তাই অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশে দুর্যোগ মোকাবিলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, আবহাওয়া অধিদপ্তর, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি এবং রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিসহ অনেক স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি, জরুরি প্রস্তুতি সামগ্রী এবং আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিশ্বব্যাপী গবেষণাপ্রতিষ্ঠানসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এখন আর শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়; এটি নাগরিক, প্রতিষ্ঠান ও সম্প্রদায়ভিত্তিক অংশীদারত্বের একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া।
আমাদের করণীয় অত্যন্ত স্পষ্ট: প্রতিটি পরিবারে জরুরি কিট রাখা, বছরে অন্তত দুইবার তা পরীক্ষা ও নবায়ন করা, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের বিশেষ চাহিদা বিবেচনায় রাখা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ ও মহড়ার ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, বিকল্প পথ এবং জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা সম্পর্কে আগাম ধারণা রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, দুর্যোগকে পুরোপুরি ঠেকানো না গেলেও সচেতনতা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। আজকের সিদ্ধান্ত হোকÑপ্রতিটি ঘরে একটি জরুরি কিট এবং প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে দুর্যোগ-সচেতন মানসিকতা গড়ে তোলা।









