সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩
সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩

ফররুখ আহমদের কবিমানস ও বাঙালী মুসলিম নবজাগরণ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৩৬ অপরাহ্ণ
ফররুখ আহমদের কবিমানস ও বাঙালী মুসলিম নবজাগরণ

তারিক ইসলাম

‎বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪) এক অনন্য ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব। তাঁকে সচরাচর ‘মুসলিম নবজাগরণের কবি’ বা ‘রেনেসাঁর কবি’ বলা হয়ে থাকে। তবে তাঁর পরিচয় কেবল কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কবি হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তৎকালীন সামাজিক স্থবিরতা, ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে এক আলোকজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথ দেখানোর নামই ফররুখ আহমদ।

‎চল্লিশের দশকের যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও সামাজিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে ফররুখ আহমদের কাব্যযাত্রার উন্মেষ ঘটে। ১৯৪৩ সালের ভয়াল মন্বন্তর তাঁর তরুণ মননে গভীর রেখাপাত করেছিল। ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট শোষিত মানুষের দুঃখ-কষ্ট এবং একটি হতাশাগ্রস্ত সমাজের আত্মপরিচয়ের সংকট তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ হিসেবেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন আরবি-ফারসি রূপক, ইসলামী ইতিহাস ও ঐতিহ্যনির্ভর প্রতীকী রূপকল্প।

‎ফররুখ আহমদের অমর কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’ (১৯৪৪) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম যুগান্তকারী সৃষ্টি। এর নাম কবিতা এবং বিশ্বখ্যাত “পাঞ্জেরি”-তে তিনি এক রূপক যাত্রার অবতারণা করেছেন। দিকহারা জাহাজের সারেং বা নাখোদার অবয়বে ‘সিন্ধাবাদ’ এবং দিকনির্দেশক হিসেবে ‘পাঞ্জেরি’ চরিত্রটি তৎকালীন নিভু নিভু সম্ভাবনার এক সমাজকে জাগিয়ে তোলার প্রতীক হয়ে ওঠে।

“রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী?
‎এখনো তোমার আসমানী তারা নেভেনি কি সিস্-মেহেলে?
‎তুফান আন্ধার জমাট বেঁধেছে তোমার মাথার ‘পরে…”

এই যে ভোরের আলো দেখার আকুল ব্যাকুলতা, তা কেবল অতীতমুখী কাব্যস্পন্দন ছিল না; বরং তা ছিল পরাধীনতা ও সামাজিক অন্ধকারের বিরুদ্ধে এক আলোর প্রত্যাশা।

‎অনেক গবেষক ও সমালোচকের মতে, ফররুখ আহমদ ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে চেয়েছিলেন, তবে তা অন্ধ অনুকরণে নয়। তিনি কায়কোবাদ, হাতেম তাই কিংবা সিন্দবাদের মতো চরিত্রগুলোকে আধুনিক জীবনবোধের আলোকে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর ‘সিরাজাম মুনিরা’ বা ‘হাতেম তা’য়ী’ কাব্যে নৈতিকতা, পরোপকার ও মানবতার বার্তা স্পষ্ট। আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার বাংলা কাব্যে আগে জসীম উদ্দীন বা কাজী নজরুল ইসলামও করেছেন, কিন্তু ফররুখের হাতে তা এক ভিন্ন শৈল্পিক ও ছন্দময় রূপ লাভ করে।

‎সাহিত্যের নানা শাখায় ছিল তাঁর অনায়াস বিচরণ। বিশেষ করে শিশুসাহিত্যে তাঁর ‘পাখির বাসা’, ‘হরফের ছড়া’ বা ‘ছড়ার পাখি’র মতো রচনাগুলো আজ আজও সমান আকর্ষণীয়। ছন্দের নিখুঁত কারুকাজ ও সুরের মূর্ছনা তাঁর ছড়া ও কবিতাকে সাধারণ পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছে দেয়।

‎ফররুখ আহমদ কেবল একজন সার্থক কবিই ছিলেন না, ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন আপসহীন ও চরম নীতিবান। আর্থিক অনটন তাঁর জীবনের নিত্যসঙ্গী হলেও নিজের কাব্যদর্শন ও সততা থেকে তিনি কখনো সরে আসেননি। ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর ঢাকাতেই এই মহীয়সী কবির জীবনাবাসন ঘটে।

‎বর্তমান বিশ্বায়ন ও সাংস্কৃতিক দ্ব্যর্থতার যুগে নিজ শিকড় ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করা এক বড় চ্যালেঞ্জ। ফররুখ আহমদের সাহিত্য আমাদেরকে সেই আত্মপরিচয়ের মর্যাদা মনে করিয়ে দেয়। আত্মবিস্মৃত সমাজকে স্বাতন্ত্র্য ও আলোর দিশা দিতে ফররুখ আহমদের কাব্যিক দর্শন আজ আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

‎লেখক : তারিক ইসলাম, সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।

 

Ads small one

মহানবমী: দেবীবন্দনা থেকে বৈষম্যহীন সমাজের প্রত্যয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:২৯ অপরাহ্ণ
মহানবমী: দেবীবন্দনা থেকে বৈষম্যহীন সমাজের প্রত্যয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

দুর্গোৎসবের শেষ প্রহরে এসে মহানবমী আমাদের সামনে হাজির করে আনন্দ ও বিষাদের এক মিশ্র অনুভূতি। শরতের নীল আকাশ, কাশফুলের দোলা, শিউলির সুবাস আর ঢাকের শব্দে যে উৎসবের সূচনা, নবমীতে এসে তার বিদায়বেলার সুর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর মাত্র এক দিন পরেই বিজয়া দশমী। দেবী দুর্গা ফিরে যাবেন কৈলাসে, আর ভক্তরা ফিরে যাবেন দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততায়। কিন্তু মহানবমীর তাৎপর্য কি শুধু দেবীর বিদায়ঘন মুহূর্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ? নিশ্চয়ই নয়। মহানবমী শক্তির আরাধনা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং মানুষের ভেতরের শুভবোধ জাগিয়ে তোলার এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব।

 

তবে এর আবেদন পূজার ম-প কিংবা ধর্মীয় আচারের গ-িতে আটকে নেই। এই উৎসব মানুষকে কাছাকাছি আনে, আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় করে এবং সামাজিক সম্প্রীতির সুযোগ তৈরি করে। ষষ্ঠীর বোধন থেকে সপ্তমী ও অষ্টমী পেরিয়ে নবমীতে এসে উৎসবের আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয় আত্মসমীক্ষার আহ্বান। দেবীকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রশ্ন জাগেÑদেবীর আরাধনায় যে শক্তি, সাহস ও ন্যায়ের কথা বলা হয়, বাস্তব জীবনে তার কতটা প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছি আমরা? হিন্দু পুরাণে দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধের কাহিনি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। দেবতাদের সম্মিলিত শক্তিতে আবির্ভূত দেবী মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাকে পরাজিত করেন।

 

এই কাহিনির মূল শিক্ষা হলো, অন্যায় ও অত্যাচার যত শক্তিশালীই হোক, তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। রামায়ণের প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয় লাভের জন্য শ্রীরাম শরৎকালে দেবী দুর্গার অকালবোধন ও পূজা করেছিলেন। প্রচলিত বিশ্বাসে, ১০৮টি নীলপদ্ম নিবেদনের ঘটনাও এই উপাখ্যানের সঙ্গে যুক্ত। এই পূজা অকালবোধন নামে পরিচিত। তবে দুর্গাপূজার আচার ও তিথি বিভিন্ন শাস্ত্রীয় পরম্পরায় ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাই নবমীর তাৎপর্য বুঝতে হলে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি এর অন্তর্নিহিত নৈতিক শিক্ষার দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। মহানবমী দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান তিথি।

 

এদিন দেবীর বিহিত পূজা, মন্ত্রোচ্চারণ, পুষ্পাঞ্জলি ও হোম-যজ্ঞের মাধ্যমে ভক্তরা তাঁর কাছে মঙ্গল, শান্তি ও কল্যাণ কামনা করেন। অঞ্চল ও পূজাপদ্ধতি অনুযায়ী আচার-অনুষ্ঠানে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। এসব আচার ভক্তির প্রকাশ হলেও পূজার প্রকৃত শিক্ষা নিহিত রয়েছে মানুষের চিন্তা ও আচরণের পরিবর্তনে। মহানবমীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক তাৎপর্য হলো নারীশক্তির স্বীকৃতি। দেবী দুর্গাকে শক্তির প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়। তিনি অসুরবিনাশিনী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক। কিন্তু যে সমাজে দেবীকে শক্তিরূপে পূজা করা হয়, সেই সমাজেই যখন নারী নির্যাতন, যৌতুক, বাল্যবিবাহ, যৌন হয়রানি ও বৈষম্যের ঘটনা ঘটে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠেÑআমাদের আরাধনার সঙ্গে বাস্তব জীবনের এত ব্যবধান কেন? নারীকে দেবী বলে সম্বোধন করলেই তাঁর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না।

 

প্রয়োজন পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় তাঁর সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা। নারীর শিক্ষা, নিরাপত্তা, স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নারীকে কেবল পূজার প্রতীক হিসেবে দেখলে চলবে না; মানুষ হিসেবে তাঁর অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সম্মান করতে হবে।মহানবমীর শক্তির বার্তা তখনই অর্থবহ হবে, যখন নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কার্যকর ভূমিকা নেবে। ম-পে দেবীর সামনে প্রদীপ জ্বালানোর পাশাপাশি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহসও জ্বালাতে হবে। কারণ শক্তির আরাধনা আর শক্তির বাস্তব প্রয়োগ এক বিষয় নয়। মহিষাসুরকে পরাজিত করার কাহিনি কেবল পৌরাণিক যুদ্ধের বিবরণ নয়; এর একটি নৈতিক ব্যাখ্যাও রয়েছে।

 

মানুষের ভেতরে লোভ, হিংসা, অহংকার, অসহিষ্ণুতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার অশুভ প্রবণতা হিসেবে কাজ করে। সমাজে দুর্নীতি, প্রতারণা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও দুর্বলের ওপর নির্যাতনও সেই অশুভেরই প্রকাশ। দেবী দুর্গার হাতে অস্ত্র থাকার তাৎপর্য এখানেইÑঅন্যায়ের সামনে নিষ্ক্রিয় থাকা কোনো মহৎ গুণ নয়। অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলে তা আরও শক্তিশালী হয়। পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে কিংবা রাষ্ট্রীয় জীবনে অনিয়ম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত অবস্থান নিতে হবে। ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে অন্যায়কে মেনে নেওয়া এবং নিজের সুবিধার জন্য নীতির সঙ্গে আপস করা বন্ধ করতে না পারলে অসুরবধের প্রতীকী শিক্ষা পূর্ণতা পাবে না। তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম মানে প্রতিহিংসা নয়। এর অর্থ সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা।

 

মহানবমীর শিক্ষা প্রতিশোধের নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠার। বাংলাদেশের সামাজিক জীবনে দুর্গোৎসবের একটি স্বতন্ত্র স্থান রয়েছে। গ্রাম থেকে শহর, ছোট পূজাম-প থেকে বড় আয়োজনÑসর্বত্র এই উৎসবকে ঘিরে মানুষের মিলন ঘটে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, সামাজিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে উৎসবের পরিসর বিস্তৃত হয়। সম্প্রীতির প্রকৃত মূল্যায়ন কেবল উৎসবের কয়েক দিনের সৌহার্দ্য দিয়ে করা যায় না। সংখ্যালঘু মানুষের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সম্পত্তির অধিকার এবং নির্ভয়ে জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দিয়েই সম্প্রীতির বাস্তব চিত্র বোঝা যায়।

 

দুর্গাপূজার সময় শুভেচ্ছা বিনিময় যেমন প্রয়োজন, তেমনি সারা বছর প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করাও জরুরি। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কেউ যেন অবহেলা, বৈষম্য কিংবা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। একইভাবে সব ধর্মের মানুষেরও উচিত পরস্পরের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখানো এবং বিভেদ সৃষ্টিকারী অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সচেতন থাকা। ধর্মীয় উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন তার আনন্দ অন্য মানুষের জন্যও নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হয়ে ওঠে। সম্প্রীতি কোনো আনুষ্ঠানিক স্লোগান নয়; এটি ন্যায়, সমান অধিকার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার চর্চা।

 

মহানবমীর আবেগের আরেকটি দিক হলো বিদায়ের অনুভূতি। সারা বছরের অপেক্ষার পর পাঁচ দিনের উৎসব যেন মুহূর্তেই শেষ হয়ে আসে। ম-পের আলো, ঢাকের বাদ্য, ধুনুচি নাচ, অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো সময় মানুষের মনে স্মৃতি হয়ে থাকে। নবমীর সন্ধ্যায় সেই আনন্দের মধ্যেই জন্ম নেয় বিচ্ছেদের বেদনা। দেবীর বিদায় আমাদের জীবনের একটি সাধারণ সত্যও মনে করিয়ে দেয়Ñকোনো আনন্দ চিরস্থায়ী নয়, কোনো প্রাপ্তিই স্থায়ীভাবে ধরে রাখা যায় না। কিন্তু বিদায় মানেই সবকিছুর সমাপ্তি নয়। উৎসব শেষ হলেও তার শিক্ষা, স্মৃতি ও প্রেরণা মানুষের সঙ্গে থেকে যেতে পারে। তাই দেবীকে বিদায় জানানোর আগে নিজের জীবন ও সমাজের দিকে ফিরে তাকানো প্রয়োজন।

 

বুধবার বিজয়া দশমীতে দেবীর বিসর্জন হবে। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু বিসর্জনের অর্থ যদি কেবল প্রতিমাকে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে পূজার শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মানুষের ভেতরের হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার ও অন্যায় প্রবণতাকে বিসর্জন দেওয়ার সংকল্পও নিতে হবে। অন্যথায় প্রতি বছর একই আচার ফিরে আসবে, অথচ সমাজের অসংগতি থেকে যাবে আগের মতোই। আজ মহানবমী। ভক্তরা দেবীর চরণে পুষ্প নিবেদন করবেন, প্রার্থনা করবেন পরিবার ও সমাজের মঙ্গল কামনায়। সেই প্রার্থনার সঙ্গে যুক্ত হোক আরও একটি অঙ্গীকারÑঅন্যায়ের প্রতিবাদ করব, নারীকে মর্যাদা দেব, দুর্বলের পাশে দাঁড়াব এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের অধিকারকে সম্মান করব।

 

দেবী দুর্গার আরাধনার প্রকৃত সার্থকতা কেবল ম-পের আলোয় নয়, মানুষের বিবেকের জাগরণে। মহিষাসুরবধের কাহিনি তখনই জীবন্ত হয়ে উঠবে, যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হবে।মহানবমী তাই বিদায়ের বেদনার পাশাপাশি আত্মশুদ্ধি ও নতুন শপথের দিন। দেবী ফিরে যাবেন, উৎসব শেষ হবে, ঢাকের শব্দ থেমে যাবে। কিন্তু শক্তির আরাধনা যেন থেমে না যায়। কারণ যে সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখে, নারীর মর্যাদা রক্ষা করে এবং সব মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে চায়, সেই সমাজেই শুভ শক্তির প্রকৃত বিজয় সম্ভব।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

আশাশুনিতে ৪০টি পূজামন্ডপ পরিদর্শন করলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৩৪ অপরাহ্ণ
আশাশুনিতে ৪০টি পূজামন্ডপ পরিদর্শন করলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা

আশাশুনি প্রতিনিধি: আশাশুনিতে শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, নির্বিঘœ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্যাপনের লক্ষ্যে উপজেলার বিভিন্ন পূজামন্ডপ পরিদর্শন করেছেন স্বস্ত্রীক উপজেলা নির্বাহী অফিসার শ্যামানন্দ কুন্ডু। গত দুই দিনে তিনি আশাশুনি উপজেলার ১১টা ইউনিয়নে ১০৬টি পূজা মন্ডপের মধ্যে ৪০টি পূজামন্ডপ পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি পূজামন্ডপগুলোর সার্বিক পরিবেশ, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও প্রস্তুতির খোঁজখবর নেন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

 

পরিদর্শনকালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শ্যামানন্দ কুন্ডু বলেন, শারদীয় দুর্গাপূজা বাঙালির ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য উৎসব। এ উৎসবকে শান্তিপূর্ণ, নির্বিঘ্ন ও আনন্দমুখর করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি পূজামন্ডপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আনসার-ভিডিপি সদস্য এবং সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে কাজ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, “ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কোথাও যেন অপ্রীতিকর ঘটনা, বিশৃঙ্খলা কিংবা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

 

পূজামন্ডপের সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় পূজা উদ্যাপন কমিটির নেতৃবৃন্দকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। যেকোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত প্রশাসন ও পুলিশকে জানাতে হবে।” উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেন, আশাশুনিতে শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্যাপনে উপজেলা প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলেমিশে উৎসব উদ্যাপন করবেন-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

তিনি পূজামন্ডপ সংশ্লিষ্টদের সরকারি নির্দেশনা মেনে চলা, নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। দুই দিনে উপজেলার ৪০টি পূজামন্ডপ পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে পূজার সার্বিক প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়াকে প্রশাসনের নিয়মিত তদারকির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গোৎসব সম্পন্ন করতে উপজেলা প্রশাসনের এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।

 

 

আশাশুনিতে মাছের ঘেরে বিষ প্রয়োগ, ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:২৭ অপরাহ্ণ
আশাশুনিতে মাছের ঘেরে বিষ প্রয়োগ, ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ

আশাশুনি প্রতিনিধি: আশাশুনিতে জমি ও মাছের ঘের নিয়ে বিরোধের জেরে মাছের ঘেরে বিষ প্রয়োগ করে ক্ষতিসাধনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আশাশুনি থানায় লিখিত এজাহার দায়ের করেছেন বড়দল বাজার এলাকার মৃত লতিফ শেখের ছেলে রেজাউল শেখ।

এজাহার সূত্রে ও বাদীর বক্তব্য অনুযায়ী জানা গেছে, আশাশুনি থানাধীন বড়দল মৌজায় ৩০ বিঘা জমিতে একটি যৌথ মাছের ঘের করতেন এজাহারনামীয় এক নম্বর আসামির সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে মনোমালিন্য সৃষ্টি হওয়ায় বাদী ঘেরের অংশীদারত্ব থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় এক নম্বর আসামির অংশ এক লক্ষ ছাব্বিশ হাজার টাকার বিনিময় কিনে নিয়ে তিনি এককভাবে ঘেরটি পরিচালনা করে আসছিলেন বলে জানা গেছে। এক নম্বর আসামির ছেলে তাঁর বাবার ঘেরের অংশ রক্ষা করতে না পারায় বাদীর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে বিভিন্ন সময় হুমকি দেন। সুযোগ পেলে ঘেরে বিষ প্রয়োগ করে মাছের ক্ষতি করবেন বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

এছাড়া গত ১৭ অক্টোবর রাত ৮টার দিকে এক নম্বর আসামি ও তাঁর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বাদীর মাছের ঘেরে বিষ প্রয়োগ করা হয়। এ সময় ঘেরে থাকা বাগদা, গলদা, হরিণাসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাদা মাছ মরে যায়। এতে আনুমানিক ৩ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন বাদী। বাদীর দাবি, ঘটনার সময় সাক্ষী মো. সাব্বির হোসেন (২৮) বিষয়টি সরাসরি দেখেছেন। পরদিন ১৮ অক্টোবর ভোর সাড়ে ৫টার দিকে একই ঘেরে আবারও বিষ প্রয়োগ করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনাও কয়েকজন সাক্ষী সরাসরি দেখেছেন বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।

এজাহারে আরও বলা হয়, ঘটনার বিষয়টি জানার পর বাদী সাক্ষীদের নিয়ে ঘের পরিদর্শন করেন। সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মরে ভেসে থাকতে দেখে তিনি ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি নিশ্চিত হন। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য থানায় এজাহার দায়ের করেন।

এ বিষয়ে বাদী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আশাশুনি থানার অফিসার ইনচার্জের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এ ব্যাপারে আশাশুনি থানার অফিসার ইনচার্জ শাহিদুর রহমান জানান ঘেরে বিষ প্রয়োগের ব্যাপারে একটা লিখিত এজাহার পেয়েছি তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।