সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩

ফুটবল নিয়ে বাংলা সিনেমার যত গান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ১১:৪১ পূর্বাহ্ণ
ফুটবল নিয়ে বাংলা সিনেমার যত গান

বাঙালি আর ফুটবল—এই দুইয়ের সম্পর্ক রক্তের। মাঠের সবুজ ঘাসে চামড়ার গোলকটি যখনই গড়ায়, বাঙালির বুকে তখন ঝড় ওঠে। এই ফুটবল আবেগকে শুধু গ্যালারির গণ্ডিতেই আটকে রাখা যায়নি; তা যুগে যুগে স্থান করে নিয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রে এবং তার কালজয়ী সংগীতে। সিনেমার সেলুলয়েডে ফুটবল মাঠের দৃশ্যকে জীবন্ত করতে, চরিত্রের আবেগ বা দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তুলতে কিংবা পুরো একটি দলকে অনুপ্রেরণা জোগাতে সৃষ্টি হয়েছে চমৎকার সব গান।

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ফুটবল নিয়ে গান তৈরির ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। কখনো তা সত্তর দশকের নস্টালজিয়া আর ঐতিহ্যের স্মারক, কখনো আবার একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক স্পোর্টস ড্রামার রক অ্যান্থেম। দুই বাংলার চলচ্চিত্রে ফুটবলের সেই কালজয়ী সুর ও উন্মাদনা নিয়ে নিউজপোর্টালের পাঠকদের জন্য আজকের এই বিশেষ আয়োজন। সরাসরি গানগুলো শুনতে শিরোনামগুলোর নিচে দেওয়া লিংকগুলোতে ক্লিক করুন।

সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল (চলচ্চিত্র: ধন্যি মেয়ে, ১৯৭১)
বাংলা চলচ্চিত্রে ফুটবল নিয়ে তৈরি হওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং কালজয়ী গান এটি। ১৯৭১ সালের বিখ্যাত ‘ধানী মেয়ে’ চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহার করা হয়। সুধীন দাশগুপ্তের সুর ও কথায় এই গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী মান্না দে। সিনেমার পর্দায় জয়া ভাদুড়ী ও অনুপ কুমারের ফুটবল খেলার দৃশ্যে গানটি এক অদ্ভুত দোলা দিয়েছিল, যা আজও যেকোনো ফুটবল ম্যাচের উদ্বোধনী আবহে বাঙালির প্রথম পছন্দ।

 

খেলা ফুটবল খেলা (চলচ্চিত্র: ধন্যি মেয়ে, ১৯৭১)
ফুটবল মাঠের ভেতরের উত্তেজনা, আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ, ড্রিবলিং আর গ্যালারির দর্শকদের উদ্দীপনাকে ছন্দের জাদুতে ফুটিয়ে তুলতে একই চলচ্চিত্রে (ধানী মেয়ে) মান্না দে গেয়েছিলেন আরেকটি চমৎকার গান। এই গানটি মূলত মাঠের ভেতরের গতিশীল খেলাটিকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে।

 

জাগো বাংলাদেশ (চলচ্চিত্র: জাগো, ২০১০)

বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ফুটবলকে কেন্দ্র করে নির্মিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ স্পোর্টস ড্রামা সিনেমা ‘জাগো’। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস থেকে অনুপ্রাণিত এই চলচ্চিত্রের নাম ভূমিকায় থাকা এই গানটি ছিল মূলত একটি খাঁটি স্টেডিয়াম অ্যান্থেম। গ্যালারির দর্শকদের চিৎকার, ড্রামের গর্জন এবং দলকে চিয়ার-আপ করার চমৎকার আবহ নিয়ে গানটি তৈরি করা হয়। অরূপ ও একঝাঁক তরুণ শিল্পীর কণ্ঠে গানটি সিনেমাটির প্রতিটি ফুটবল ম্যাচে ব্যাকগ্রাউন্ডে দারুণ উত্তেজনা তৈরি করেছিল।

 

দামাল – টাইটেল ট্র্যাক (চলচ্চিত্র: দামাল, ২০২২)
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ফুটবল নিয়ে নির্মিত সবচেয়ে আলোচিত সিনেমা রায়হান রাফি পরিচালিত ‘দামাল’। ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’-এর সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত এই ছবিতে দেশাত্মবোধ, মুক্তিযুদ্ধ এবং ফুটবলের এক অনন্য মেলবন্ধন দেখানো হয়েছে। প্রীতম হাসানের সুর ও সংগীতে মমতাজ বেগমের গাওয়া এই টাইটেল ট্র্যাকটি খেলোয়াড়দের মাঠের উন্মাদনা ও লড়াইয়ের মানসিকতাকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে যায়।

 

যুদ্ধং দেহি (চলচ্চিত্র: গোলন্দাজ, ২০২১)
ওপার বাংলার (কলকাতা) ব্লকবাস্টার স্পোর্টস ড্রামা চলচ্চিত্র ‘গোলন্দাজ’। ভারতীয় ফুটবলের জনক নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারীর জীবন এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ফুটবলকে হাতিয়ার করে বাঙালির লড়াইয়ের সত্য গল্প নিয়ে এটি নির্মিত হয়, যেখানে মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন অভিনেতা দেব। বিক্রম ঘোষের সংগীতে এই সিনেমার “যুদ্ধং দেহি” ট্র্যাকটি ফুটবল ম্যাচের দৃশ্যগুলোতে দর্শকদের গায়ের লোম খাড়া করে দেওয়ার মতো উদ্দীপনা তৈরি করেছিল।

 

খেলা ফুটবল খেলা (চলচ্চিত্র: সাহেব, ১৯৮১)
নস্টালজিক বাংলা সিনেমার কথা বললে তাপস পাল অভিনীত কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘সাহেব’-এর নাম আসবেই। একান্নবর্তী পরিবারের এক তরুণ ফুটবলারের সংগ্রাম ও আবেগ নিয়ে এটি নির্মিত হয়েছিল। বাপ্পি লাহিড়ীর দুর্দান্ত সংগীতে এই ছবির ফুটবলার হয়ে ওঠার পেছনের আবহ ও গানগুলো সরাসরি সাহেবের জীবনের উত্থান-পতনের সাথে জড়িয়ে ছিল।

ফুটবল ফুটবল (চলচ্চিত্র: অগ্নিপরীক্ষা)
পেছনে তাকালে দেখা যায়, পঞ্চাশের দশকের কালজয়ী চলচ্চিত্রেও ফুটবলের আবহ ছিল। মহানায়ক উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন অভিনীত বিখ্যাত ‘অগ্নিপরীক্ষা’ চলচ্চিত্রে ফুটবল ও খেলার মাঠের উল্লেখ সংবলিত গান ব্যবহার করা হয়েছিল। অনুপম ঘটকের সুরে তৈরি এই গানটি সেই সময়ে দুই বাংলার সিনেমা হলগুলোতে দারুণ সাড়া ফেলেছিল।

রূপালি পর্দার ফ্রেমে বলের গতি যেমন দর্শকদের চোখ আটকে রাখে, তেমনি চলচ্চিত্রের এই গানগুলোও প্রজন্ম ধরে বাঁচিয়ে রাখছে বাঙালির আসল ফুটবল স্পিরিটকে। মাঠ আর সিনেমা—দুই জগতের এই মেলবন্ধন বাংলা সংস্কৃতির এক অনন্য দলিল।

Ads small one

মতামত: অবৈধ পাইপে ভাঙছে ইছামতির বাঁধ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৪:১৯ অপরাহ্ণ
মতামত: অবৈধ পাইপে ভাঙছে ইছামতির বাঁধ

তরিকুল ইসলাম

সাতক্ষীরা জেলার সীমান্তঘেঁষা ইছামতি নদী শুধু একটি নদী নয়; এটি এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং পরিবেশের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বছরের পর বছর ধরে কিছু অসাধু ব্যক্তি ব্যক্তিস্বার্থে নদীর তীরবর্তী বেড়িবাঁধ কেটে কিংবা ফুটো করে অবৈধভাবে পাইপ বসিয়ে নদীর পানি ওঠানামার ব্যবস্থা করছে। সাময়িক আর্থিক লাভের আশায় তারা যে ক্ষতি করছে, তার মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে পুরো জনপদকে।

কালিগঞ্জ উপজেলার শুইলপুর থেকে দেবহাটা উপজেলার ভাতশালাসহ ইছামতি নদীর বিভিন্ন অংশে বর্তমানে এমন অসংখ্য অবৈধ পাইপের অস্তিত্ব দেখা যায়। কোথাও বাঁধ কেটে, কোথাও আবার বাঁধের নিচ দিয়ে পাইপ বসিয়ে নদীর পানি মাছের ঘেরে বা চিংড়ি চাষে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাইরে থেকে বিষয়টি সাধারণ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি একটি ভয়াবহ পরিবেশগত ও প্রকৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করছে।

একটি বেড়িবাঁধ কেবল মাটির স্তূপ নয়; এটি একটি বৈজ্ঞানিক নকশায় নির্মিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। পানি উন্নয়ন বোর্ড কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে যে বাঁধ নির্মাণ করে, তার প্রতিটি স্তর নির্দিষ্ট প্রকৌশলগত মান অনুসরণ করে তৈরি করা হয়। সেই বাঁধের কোনো অংশ কেটে বা ফুটো করে পাইপ বসানো মানে পুরো কাঠামোকেই দুর্বল করে দেওয়া। বর্ষাকাল কিংবা পূর্ণ জোয়ারের সময় পানির তীব্র চাপ সবচেয়ে আগে আঘাত হানে এই দুর্বল অংশগুলোতে। ফলাফল-একসময় হঠাৎ করেই বাঁধ ভেঙে যায়, আর মুহূর্তের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।

প্রতিবছর সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় বেড়িবাঁধ ভাঙার ঘটনা ঘটে। তখন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সরকারের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলে, দ্রুত বাঁধ নির্মাণের দাবি জানায়, মানববন্ধন করে, সংবাদ সম্মেলন করে। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই আত্মসমালোচনা হয়-এই বাঁধ দুর্বল হওয়ার পেছনে স্থানীয়ভাবেই কতটা অবহেলা বা অবৈধ কর্মকান্ড দায়ী ছিল।

বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই যেসব বাঁধ পরে ভেঙে যায়, সেগুলোর গায়ে আগেই অসংখ্য অবৈধ পাইপ বসানো হয়েছিল। ব্যক্তিগত ঘেরে পানি ওঠানোর সুবিধার জন্য বাঁধের স্থায়িত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া হয়। পরে যখন দুর্যোগ আসে, তখন ক্ষতির বোঝা বহন করে পুরো সমাজ এবং রাষ্ট্র।

এর আরেকটি ভয়াবহ প্রভাব পড়ে কৃষিতে। লবণাক্ত নদীর পানি যখন বাঁধ ভেঙে ফসলি জমিতে ঢুকে পড়ে, তখন শুধু একটি মৌসুম নয়, বহু বছর ধরে সেই জমির উৎপাদনক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। ধান, পাট, শাকসবজি কিংবা অন্যান্য ফসল চাষ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কৃষক হারান তাঁর পুঁজি, শ্রম এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

শুধু কৃষিই নয়, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হয়। অপরিকল্পিতভাবে পাইপ বসানোর ফলে জোয়ার-ভাটার প্রাকৃতিক গতিপথ পরিবর্তিত হয়। এতে নদীর তীর ক্ষয়, পলি জমার ধরন এবং জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে একটি সুস্থ নদী ধীরে ধীরে পরিবেশগত ভারসাম্য হারাতে শুরু করে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব কর্মকান্ড কোনোভাবেই বৈধ নয়। সরকারি বেড়িবাঁধ কাটা, ক্ষতিগ্রস্ত করা কিংবা অনুমতি ছাড়া নদী থেকে পানি উত্তোলনের জন্য বাঁধে পাইপ বসানো বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী দন্ডনীয় অপরাধ। তারপরও প্রকাশ্যে দিনের পর দিন এই কাজ চললেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর নজরদারি বা আইন প্রয়োগ চোখে পড়ে না। কোথাও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়া, কোথাও প্রশাসনিক উদাসীনতা-সব মিলিয়ে অবৈধ কর্মকান্ড যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। শুধু পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে হবে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, উপজেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সর্বোপরি স্থানীয় জনগণকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। কোথাও নতুন করে বাঁধ কেটে পাইপ বসানো হলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে অবৈধ পাইপ অপসারণ, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে বিকল্প ব্যবস্থার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। মাছ বা চিংড়ির ঘেরে পানি নেওয়ার প্রয়োজন থাকতেই পারে। কিন্তু তার জন্য নদীর বাঁধ ধ্বংস করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। প্রকৌশলগতভাবে অনুমোদিত স্লুইসগেট, নিয়ন্ত্রিত খাল অথবা পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। নদী রক্ষা করেও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড চালানো যায়-প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা।

স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আজ একজন ব্যক্তি নিজের সুবিধার জন্য বাঁধ কাটছেন, কিন্তু আগামীকাল সেই বাঁধ ভেঙে তাঁর নিজের ঘরবাড়ি, জমি কিংবা ব্যবসাও পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে। তাই এটি শুধু প্রশাসনের বিষয় নয়; এটি সামাজিক দায়বদ্ধতারও প্রশ্ন।

ইছামতি নদী আমাদের ঐতিহ্য, সীমান্তের নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই নদী ও এর প্রতিরক্ষা বাঁধ রক্ষা করা মানে হাজারো মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। ব্যক্তিস্বার্থের কাছে জনস্বার্থকে বিসর্জন দেওয়া কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না।

আজ যদি আমরা অবৈধভাবে বাঁধ কাটাকে ‘ছোটখাটো বিষয়’ ভেবে এড়িয়ে যাই, তাহলে আগামী দিনের ভয়াবহ বন্যা, নদীভাঙন ও কৃষি বিপর্যয়ের দায় আমাদের সবাইকেই বহন করতে হবে। তাই এখনই সময়-অবৈধ পাইপ অপসারণ, বাঁধ কাটা বন্ধ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের। কারণ, বেড়িবাঁধ ভাঙে একদিনে; কিন্তু তার ক্ষত শুকাতে লেগে যায় বহু বছর।

লেখক: তরিকুল ইসলাম, সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মী, মোবাইল: ০১৭১৫২৬১৮২৭
ইমেইল: tarikulbdnews@gmail.com

বাংলার এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের চিরপ্রস্থান/ এম.এম হায়দার আলী

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৪:০৯ অপরাহ্ণ
বাংলার এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের চিরপ্রস্থান/ এম.এম হায়দার আলী

এম.এম হায়দার আলী

বাংলা ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও মননশীল চিন্তার আকাশ থেকে আরেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র নিভে গেল। লেখক, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও প্রজ্ঞার আলোকবর্তিকা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর আমাদের মাঝে নেই। তাঁর প্রস্থান শুধু একটি মানুষের মৃত্যু নয়; এটি বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর মৃত্যুতে জাতি হারাল একজন চিন্তাশীল শিক্ষক, একজন নির্ভীক গবেষক এবং বাংলা ভাষার এক নিবেদিতপ্রাণ সাধক। গত রোববার রাজধানীর মিরপুরের একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার পাকুন্দিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া আবুল কাসেম ফজলুল হক জ্ঞানের সাধনায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। সদ্য প্রয়াত এই মনীষীর জীবনি ঘেঁটে যতটুকু জানা সম্ভব হল, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে কেবল পাঠদানই করাননি, তাঁদের মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিলেন মুক্তচিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ ও সাহিত্যবোধের দীপ্তি। বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে তিনি দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে অসামান্য অবদান রাখেন। তাঁর লেখনী ছিল সময় সচেতন, বিশ্লেষণধর্মী এবং সমাজমনস্ক।

 

মুক্তিসংগ্রাম, ‘কালের যাত্রার ধ্বনি, একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন, ‘উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণী ও বাংলা সাহিত্য, মানুষ ও তার পরিবেশ, সাহিত্যজিজ্ঞাসা, সাহিত্যসৃষ্টি ও সাহিত্যবিচার, ‘জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, বিশ্বায়ন ও ভবিষ্যৎ, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ও উত্তরকাল, আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা’,এসব গ্রন্থ আজও গবেষক, শিক্ষার্থী ও পাঠকের কাছে মূল্যবান সম্পদ।

 

দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের রাজনৈতিক আদর্শের বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে তিনি বিশ্বচিন্তার দুয়ারও বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য উন্মুক্ত করেছিলেন। সম্পাদক হিসেবেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘মোতাহের হোসেন চৌধুরীর নির্বাচিত প্রবন্ধ, ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং স্বদেশচিন্তা সহ একাধিক গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। পাশাপাশি সুন্দরম ও লোকায়ত’ সাময়িকীর মাধ্যমে তিনি নতুন চিন্তা, সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছিলেন।

তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো পুরস্কার নয়; তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ছিলেন একজন মুক্তবুদ্ধির মানুষ, যিনি সত্য, যুক্তি এবং মানব কল্যাণের পক্ষে আজীবন কলম ধরেছিলেন। একজন প্রকৃত মনীষীর মৃত্যু কখনো তাঁর চিন্তার মৃত্যু নয়। মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি, তাঁর দর্শন এবং তাঁর আলোকিত চিন্তা যুগের পর যুগ বেঁচে থাকে। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের রচনা, গবেষণা ও চিন্তার আলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পথ দেখাবে,এটাই আমাদের বিশ্বাস।

 

আজ তাঁর শূন্যতায় বাংলা সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গভীরভাবে শোকাহত। মহান আল্লাহ যেন এই প্রাজ্ঞ মনীষীকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন এবং তাঁর শোক সন্তপ্ত পরিবার, সহকর্মী, ছাত্রছাত্রী ও অসংখ্য গুণগ্রাহীকে এই শোক বহনের শক্তি দান করেন।বিদায় প্রাজ্ঞ মনীষী। আপনার কলম থেমে গেছে, কিন্তু আপনার চিন্তার আলো বাংলার আকাশে দীর্ঘদিন জ্বলে থাকবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

এজলাসে অসুস্থ শিশুকে দেখে রায়: অস্ত্রোপচারের খরচসহ ভরণপোষণ দিতে বাবাকে নির্দেশ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৩:৫৯ অপরাহ্ণ
এজলাসে অসুস্থ শিশুকে দেখে রায়: অস্ত্রোপচারের খরচসহ ভরণপোষণ দিতে বাবাকে নির্দেশ

বদিউজ্জামান: সাতক্ষীরার পারিবারিক আদালতের এজলাসে হাজির করা হয় সাত বছর বয়সী এক অসুস্থ শিশুকে। শিশুটির ডান হাতের তুলনায় বাঁ হাত অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়া ও কালচে বর্ণ ধারণ করায় বিচারক নিজেই শিশুটিকে ডায়াসে ডেকে তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। পরে রায়ে শিশুটির অস্ত্রোপচারের সম্পূর্ণ ব্যয়, বকেয়া ও নিয়মিত ভরণপোষণ এবং দেনমোহর পরিশোধের জন্য বাবাকে নির্দেশ দেন।

সাতক্ষীরা পারিবারিক আদালত-২-এর বিচারক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জ্যেষ্ঠ সিভিল জজ মো. হাসানুল বান্না সম্প্রতি এ রায় প্রদান করেন।

মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শিশুটির বাবা-মায়ের বিয়ে হয়। ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। বর্তমানে শিশুটি তার মায়ের সঙ্গে দেবহাটা উপজেলায় বসবাস করছে। শিশুটির বাবা কালীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা এবং ঢাকায় একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

চিকিৎসা নথি অনুযায়ী, শিশুটি ভাস্কুলার ম্যালফরমেশন রোগে আক্রান্ত। এ রোগের কারণে তার বাঁ হাতে স্বাভাবিক রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় হাতটি অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায় এবং কালচে বর্ণ ধারণ করে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজন প্রায় ২ লাখ ৫১ হাজার টাকা।

শিশুটির মা গত বছরের মার্চ মাসে দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং সন্তানের চিকিৎসা ব্যয় চেয়ে আদালতে মামলা করেন। মামলার শুনানিকালে বাদীপক্ষের আবেদনের পর শিশুটিকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তার শারীরিক অবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. ফেরদৌস হোসেন জানান, আদালতের কাছে আবেদন করার পর বিচারক শিশুটিকে ডায়াসে ডেকে তার অসুস্থ হাত পর্যবেক্ষণ করেন। পরবর্তীতে প্রদত্ত রায়ে শিশুটির চিকিৎসার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
রায়ে শিশুটির অস্ত্রোপচারের জন্য ২ লাখ ৫১ হাজার টাকা, ১৩ মাসের বকেয়া ভরণপোষণ বাবদ ৩৯ হাজার টাকা এবং ভবিষ্যতে শিশুর পড়াশোনা ও চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে ৮ হাজার টাকা করে ভরণপোষণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শিশুটির মায়ের ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দেনমোহর পরিশোধেরও আদেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় অন্তর্র্বতীকালীন আদেশে শিশুটির জন্য মাসিক ৩ হাজার টাকা ভরণপোষণ নির্ধারণ করেছিলেন আদালত।

এ বিষয়ে শিশুটির বাবার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে তার ছোট ভাই জানান, আদালতের রায়ের বিষয়ে তারা অবগত এবং আদালতের নির্দেশনা প্রতিপালনের বিষয়ে তাদের ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে।

আইনজীবী মহলের মতে, শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ ও পিতার আইনগত দায়িত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে।