বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতি: বিপুল সম্ভাবনা, সুন্দরবন ঘিরে উন্নয়নের অপূর্ণ অধ্যায়
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
পর্যটন এখন আর কেবল বিনোদন বা অবকাশযাপনের মাধ্যম নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বিনিয়োগ আকর্ষণে পর্যটন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অথচ বিপুল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছে না।
ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পর্যটন খাতে জিডিপিতে অবদানের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ছিল বিশ্বের শীর্ষে। দেশটির পর্যটন অর্থনীতির আকার ছিল প্রায় ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, প্রতিবেশী ভারতের পর্যটন অর্থনীতির আকার ছিল ২৫৬ বিলিয়ন ডলার। অথচ বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতির আকার মাত্র ৪৪৪ মিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ব্যবধান আমাদের পর্যটন খাতের পিছিয়ে থাকার চিত্র স্পষ্ট করে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটনের গুরুত্ব বাড়লেও বাংলাদেশ এখনো এ খাতের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ ঘটাতে পারেনি। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ভ্রমণ ও পর্যটন উন্নয়ন সূচকেও বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল। পর্যটন খাতের উন্নয়নে কিছু অগ্রগতি থাকলেও অবকাঠামো, সেবা, যোগাযোগব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করার সক্ষমতায় আমাদের অনেক ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা অত্যন্ত বিস্তৃত। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন, সিলেটের চা-বাগান, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ও হ্রদ এবং দেশের অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার যথেষ্ট উপাদান। বিশেষ করে সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের বিপুল সুযোগ রয়েছে। কিন্তু পরিকল্পিত উদ্যোগ, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, মানসম্মত আবাসন ও পর্যটকবান্ধব সেবা নিশ্চিত করতে না পারায় এই সম্ভাবনার বড় অংশই অব্যবহৃত রয়ে গেছে।
পর্যটন খাতের বিকাশে অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্বলতা অন্যতম বাধা। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে সহজ ভিসাপ্রক্রিয়া, উন্নত বিমান যোগাযোগ, নিরাপত্তা, মানসম্মত আবাসন এবং পেশাদার আতিথেয়তা জরুরি। পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নির্ভরযোগ্য পরিবহন ও তথ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও পর্যটকদের দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা কঠিন।
দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অবস্থাও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। সাতক্ষীরার সুন্দরবনসংলগ্ন অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকার পর্যটনকেন্দ্রে যোগাযোগব্যবস্থা, আবাসন ও পর্যটকসেবার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কোথাও কোথাও অতিরিক্ত ভাড়া, অনিয়ন্ত্রিত মূল্য নির্ধারণ ও পর্যাপ্ত বাজার তদারকির অভাব পর্যটকদের ভোগান্তিতে ফেলে। এসব সমস্যা দূর করতে কার্যকর নজরদারি, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
পর্যটন খাতের উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগও বাড়াতে হবে। হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন, ট্যুর পরিচালনা, স্থানীয় খাবার ও হস্তশিল্পের মতো সেবামূলক খাতে বিনিয়োগ বাড়লে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন অর্থনীতির অংশীদার করতে হবে, যাতে পর্যটনের সুফল সরাসরি তাঁদের কাছে পৌঁছায়।
সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে পর্যটন বিকাশের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। সুন্দরবন শুধু পর্যটন আকর্ষণ নয়; এটি জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আধার এবং উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। তাই পর্যটন সম্প্রসারণের নামে বনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। পরিবেশের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় রেখে পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ নৌযান চলাচল এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করা গেলে তা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি উপকূলীয় মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করবে।
এ জন্য পর্যটন খাতকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, বিনিয়োগপ্রক্রিয়া সহজ করা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের পর্যটন আকর্ষণ তুলে ধরতে কার্যকর প্রচার চালানো প্রয়োজন। পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সেবার মান নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
প্রতিবেশী ভারত তার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যময় পর্যটন আকর্ষণকে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরে পর্যটন খাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশও পরিকল্পিত উদ্যোগ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই খাতে এগিয়ে যেতে পারে। আমাদের প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, নীতিগত সংস্কার, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং বাস্তবায়নে জবাবদিহি।
বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই; প্রয়োজন সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। বিশেষ করে সুন্দরবনকে ঘিরে পরিবেশবান্ধব পর্যটন বিকাশ, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং উন্নত পর্যটকসেবা নিশ্চিত করা গেলে সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। যথাযথ পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে পর্যটন বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
লেখক: গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ, সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা, সমাজকর্মী ও উদ্যোক্তা।









