বাম্পার ফলনেও হাসি নেই সাতক্ষীরার কৃষকের মুখে
এম এম জামান মনি, পাটকেলঘাটা: মাঠজুড়ে সোনালি ধানের সমারোহ। সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদে বোরোর বাম্পার ফলন দেখে প্রথম নজরে মনে হতে পারে কৃষকের সুদিন ফিরেছে। কিন্তু বাস্তবে চিত্রটি উল্টো। তীব্র তাপপ্রবাহ, শ্রমিক সংকট আর হঠাৎ বৃষ্টির আশঙ্কায় সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটাসহ বিভিন্ন এলাকার ধান চাষিদের কপালে এখন দুশ্চিন্তার ভাঁজ। শ্রমিকের মজুরি ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের কষ্টের ফসল এখন তাঁদের জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৮০ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও আবাদ হয়েছে ৮২ হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমিতে। চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন। ফলন আশাতীত ভালো হলেও তা ঘরে তোলা নিয়ে শুরু হয়েছে চরম ভোগান্তি।
বৈশাখী খরতাপ আর ভ্যাপসা গরমে কাহিল জনজীবন। এর প্রভাব পড়েছে ধান কাটার মাঠেও। সদর ও তালা উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, তীব্র রোদের কারণে শ্রমিকেরা দীর্ঘক্ষণ মাঠে কাজ করতে পারছেন না। স্থানীয় শ্রমিকের অভাবে বাইরে থেকে চড়া মূল্যে শ্রমিক আনতে হচ্ছে।
তালা উপজেলার বাইগুলি গ্রামের কৃষক সাইফুল্লাহ মামুন বলেন, “১০ বিঘা জমিতে আবাদ করেছি, ফলনও ভালো। কিন্তু শ্রমিকের অভাবে বাইরে থেকে বেশি দামে মানুষ আনতে হচ্ছে। সার ও কীটনাশকের দামের পর এখন মজুরি দিতে গিয়ে পকেট ফাঁকা হওয়ার জোগাড়।” ফটিক দাশ নামে আরেক কৃষক জানান, মজুরি দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় তিনি নিজেই কাস্তে হাতে মাঠে নেমেছেন।
কালবৈশাখী ঝড়ের আশঙ্কায় তড়িঘড়ি করে ধান কাটতে গিয়েও বিপাকে পড়ছেন চাষিরা। অনেক জায়গায় নিচু জমির ধান বাতাসে মাটিতে নুয়ে পড়েছে। হঠাৎ বৃষ্টিতে অনেক চাষির কাটা ধান ভিজে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
কৃষক কুতুব উদ্দিন মোড়ল বলেন, “আকাশের অবস্থা ভালো না। বৃষ্টি নামলেই গতবারের মতো ধান নষ্ট হবে। তাই খরচের দিকে না তাকিয়ে দ্রুত ধান বাড়ি নেওয়ার চেষ্টা করছি।”
কৃষকদের বড় অভিযোগ ধানের বাজারদর নিয়ে। তাঁরা জানান, এক মণ ধান বিক্রি করে একজন শ্রমিকের মজুরি উঠছে না। তার ওপর জ্বালানি সংকটে পরিবহনের জন্য ট্রলি বা ভ্যান পাওয়া যাচ্ছে না, পেলেও গুণতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া।
বাইরে থেকে আসা শ্রমিক রফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রতি বছর আমরা এ সময় বাড়তি আয়ের আশায় এখানে আসি। কিন্তু এবার যে রোদ আর গরম, তাতে আগের মতো কাজ করা যাচ্ছে না। মালিকের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।”
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “জেলায় ধানের খুব ভালো ফলন হয়েছে। শ্রমিকের কারণে কিছুটা দেরি হলেও ইতিমধ্যে ৪৪ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় পরিবহন সমস্যা কিছুটা আছে। আশা করছি, আগামী ১০ দিনের মধ্যে মাঠের বাকি ধান কৃষকের ঘরে উঠে যাবে।”








