রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস: এক জাতির বেদনা, মানবতার পরীক্ষা ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা
সাকিবুর রহমান বাবলা
২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য শুধুমাত্র একটি স্মরণীয় তারিখ নয়; এটি তাদের অস্তিত্বের সংগ্রাম, হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের স্মৃতি, জন্মভূমি থেকে উচ্ছেদের বেদনা এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশার প্রতীক। ২০১৭ সালের এই দিনে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যে ভয়াবহ সহিংসতা শুরু হয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ মানবিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সেই ঘটনার স্মরণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা প্রতি বছর ২৫ আগস্টকে ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে। একটি দিন, একটি জাতির কান্না।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলোতেও রোহিঙ্গারা দিনটিকে শোক, স্মৃতি ও ন্যায়বিচারের দাবির দিন হিসেবে পালন করে। তাদের কাছে এটি শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বরং ভবিষ্যতের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেরও প্রতীক।
রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের শত শত বছর ধরে বসবাসকারী একটি মুসলিম জাতিগত জনগোষ্ঠী হলেও দেশটির সরকার কখনোই তাদের স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠী হিসেবে মেনে নেয়নি। পারিবারিক বন্ধন, ধর্মীয় মূল্যবোধ, অতিথিপরায়ণতা এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক সহমর্মিতা রোহিঙ্গা সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। কৃষিকাজ, মাছ ধরা, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং স্থানীয় বাণিজ্য ছিল তাদের প্রধান জীবিকা। নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রাজনৈতিক বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় বঞ্চনার শিকার হয়ে তারা আজ নিজেদের দেশেই পরবাসীতে পরিণত হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। ১৭৮৫ সালে আরাকান বার্মার শাসনের অধীনে চলে যাওয়ার পর থেকেই ওই অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর আগমন এবং পরবর্তী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কারণে রাখাইনে জাতিগত বিভাজন বৃদ্ধি পায়।
১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীনতা লাভের পর রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন পরিস্থিতিকে সবচেয়ে জটিল করে তোলে। এই আইনে রোহিঙ্গাদের স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠীর তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, ফলে তারা রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার যে অধ্যায় শুরু হয়, তা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অভিযানে শত শত গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ হাজার হাজার মানুষ নিহত হন। অসংখ্য নারী ও কিশোরী যৌন সহিংসতার শিকার হন। ঘরবাড়ি, মসজিদ, বিদ্যালয়, বাজার এবং জীবিকার উৎস ধ্বংস হয়ে যায়। প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ মানুষ জঙ্গল, পাহাড়, নদী ও সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে, যা আধুনিক বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও দ্রুততম গণপালায়নের ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
সীমিত সম্পদ ও জনসংখ্যার চাপ সত্ত্বেও বাংলাদেশ মানবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। এই জনসংখ্যার চাপ কমাতে সরকার অনেক রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর করেছে এবং ইউএনএইচসিআর, ইউনিসেফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা শরণার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা ও সেবা প্রদানে ভূমিকা রাখছে।
জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা মিয়ানমারে সংঘটিত ঘটনাকে গণহত্যার অভিযোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মামলা চলমান রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত করছে। এছাড়া জাতিসংঘের তদন্তকারী সংস্থাসমূহ প্রমাণ সংগ্রহ ও অপরাধীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের এই ন্যায়বিচার ও অধিকার আদায়ের দাবিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গাম্বিয়া, বাংলাদেশ, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক ও মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশ জোরালোভাবে সমর্থন জুগিয়ে চলেছে।
মানবাধিকারের মৌলিক নীতিমালা অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার রয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে এসব অধিকার থেকে বঞ্চিত। রাষ্ট্রহীনতার কারণে তারা আইনি সুরক্ষা পায় না, ভূমির মালিকানা দাবি করতে পারে না, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে না এবং বহু ক্ষেত্রে মৌলিক সেবাও গ্রহণ করতে পারে না। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, শরণার্থী আইন এবং মানবিক নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই রোহিঙ্গা সংকট শুধু একটি শরণার্থী সমস্যা নয়; এটি মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে মানবেতর জীবনযাপন করা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নারী ও শিশুরা সীমিত শিক্ষা, কর্মসংস্থানের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির মতো তীব্র দৈনন্দিন সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। এর পাশাপাশি, ঐতিহাসিক গণহত্যা ও নৃশংসতার কারণে সৃষ্ট সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও পারিবারিক দূর্যোগ এই পুরো প্রজন্মকে এক গভীর অনিশ্চয়তা ও হতাশার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল ত্রাণ ও মানবিক সহায়তার মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন—রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পুনর্বহাল; নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন; মানবাধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা; আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা; শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি; দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অর্থায়ন। যতদিন পর্যন্ত রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি না হবে এবং রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিশ্চিত না হবে, ততদিন তাদের প্রত্যাবর্তন টেকসই হবে না।
রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে এবং দেশটির সাথে সব ধরনের অস্ত্র বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে প্রেরণের বাধ্যবাধকতা তৈরি এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে একটি সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক সময়সীমা ও গ্যারান্টি ভিত্তিক কূটনৈতিক রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে।
২৫ আগস্ট শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি আত্মসমালোচনার দিন। এই দিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে বৈষম্য, ঘৃণা, জাতিগত বিদ্বেষ এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন কতটা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আজ যখন বিশ্ব মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং মানব মর্যাদার কথা বলে, তখন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নৈতিক দায়িত্ব। রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস তাই শুধু শোকের নয়; এটি মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোর, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ উচ্চারণের এবং একটি নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার দিন।









