সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩

শিশুর রক্তে ভেসে যায় সভ্যতা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৫:০৯ অপরাহ্ণ
শিশুর রক্তে ভেসে যায় সভ্যতা

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারের হত্যাকা- শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা, মানবিকতা ও সভ্যতার মুখে এক নির্মম চপেটাঘাত। একটি শিশুÑযার পৃথিবী হওয়ার কথা ছিল স্কুল, বই, খেলাধুলা আর স্বপ্নে ভরাÑসে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর নৃশংসভাবে খুন হয়েছে। হত্যার পর আলামত গোপন করতে তার মাথা ও হাত বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এমন বর্বরতা কোনো সভ্য সমাজে কল্পনাও করা যায় না। অথচ সেই ঘটনাই ঘটেছে আমাদের রাজধানীতে, মানুষের ভিড়ে, একটি বহুতল ভবনের ভেতরে। রামিসার মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়; এটি পুরো জাতির বিবেকের পরীক্ষা।

 

প্রশ্ন হচ্ছেÑআমরা কি এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে শিশুরাও আর নিরাপদ নয়? যদি তাই হয়, তাহলে উন্নয়ন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক অগ্রগতির সব গর্ব কি শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে পড়ে না? ঘটনার বিবরণ শুনলেই শরীর শিউরে ওঠে। দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী রামিসা স্কুলে যাওয়ার প্রকাল্লে প্রতিবেশী সোহেল রানার ফাঁদে পড়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, মাদকাসক্ত সেই ব্যক্তি তাকে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায় তার স্ত্রী সহযোগতায়।

 

সেখানে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এরপর পরিচয় গোপন ও অপরাধ আড়াল করতে শিশুটির শরীর বিকৃত করা হয়। এই নির্মমতা শুধু অপরাধ নয়; এটি মানুষের ভেতরের পশুত্বের নগ্ন প্রকাশ। বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার ঘটনা নতুন নয়। প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও শিশু ধর্ষণ, হত্যা কিংবা নির্যাতনের খবর আসে। কিন্তু পল্লবীর এই ঘটনা মানুষের মনে এত গভীর নাড়া দিয়েছে, কারণ এখানে নিষ্ঠুরতার মাত্রা ভয়ংকর ভাবে সীমা অতিক্রম করেছে।

 

একটি শিশুকে হত্যা করেও অপরাধীর ভয় দূর হয়নি; বরং সে মৃতদেহ বিকৃত করে অপরাধ গোপনের চেষ্টা করেছে। এর অর্থ, অপরাধের ভয় তার ভেতরে কাজ করেনি। অর্থাৎ সমাজে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে কিছু মানুষ মনে করছে তারা যে কোনো অপরাধ করেও পার পেয়ে যেতে পারে। এখানেই আসে বিচার হীনতার প্রশ্ন। আমাদের দেশে বহু আলোচিত হত্যাকা- বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। অনেক মামলার বিচার হয় না, আবার অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সূত্রতা মানুষকে হতাশ করে। ফলে অপরাধীরা মনে সাহস পায়। তারা ভাবে, আইনের ফাঁক ফোকর কিংবা প্রভাব খাটিয়ে শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

 

তাই রামিসা হত্যার বিচার শুধু একটি মামলার বিচার নয়; এটি পুরো সমাজে একটি বার্তা দেওয়ার প্রশ্ন। রাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবেÑশিশুর বিরুদ্ধে অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই, কোনো ছাড় নেই। তবে শুধু দ্রুত বিচার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ অপরাধ একটি সামাজিক বাস্তবতার ফল। সমাজে যখন নৈতিক অবক্ষয় বাড়ে, তখন অপরাধও বাড়ে। আজ আমরা এমন এক সময় পার করছি, যখন মানুষের ভেতরের সহমর্মিতা, মমত ¡বোধ ও মানবিকতা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

 

পরিবারে একসঙ্গে বসে কথা বলার সংস্কৃতি কমে গেছে, সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়েছে, আর প্রযুক্তিনির্ভর একাকিত্ব মানুষের মনকে কঠোর করে তুলছে। শিশুরা বড় হচ্ছে মোবাইল স্ক্রিনের সামনে, কিন্তু মানবিক শিক্ষার ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। মাদকাসক্তিও এই সংকটের বড় কারণ। পল্লবীর ঘটনার মূল অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মাদকাসক্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইয়াবা, গাঁজা, ফেন্সিডিল কিংবা নতুন নতুন মাদক তরুণদের জীবন ধ্বংস করছে।

 

মাদক শুধু একজন মানুষকে অসুস্থ করে না; এটি তার বিবেক, বিচারবোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণও ধ্বংস করে দেয়। ফলে অনেকেই ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত অভিযান, এত বক্তব্যের পরও মাদকের সহজলভ্যতা কেন কমছে না? সীমান্ত, শহর ও অলিগলিতে কীভাবে মাদকের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হচ্ছে? রাষ্ট্রকে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে। শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের সামাজিক উদাসীনতাও উদ্বেগজনক। একসময় গ্রামবাংলায় বা শহরের মহল্লায় প্রতিবেশীরা একে অপরের খোঁজ রাখতেন।

 

কোনো শিশু কোথাও একা গেলে বড়রা খেয়াল করতেন। এখন সেই সামাজিক বন্ধন ভেঙে গেছে। একই ভবনে বছরের পর বছর থেকেও অনেকে একে অপরকে চেনেন না। ফলে অপরাধীরা সহজেই সুযোগ পেয়ে যায়। রামিসার ঘটনাও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিপদ অনেক সময় বাইরের অচেনা মানুষের কাছ থেকে নয়, বরং পরিচিত মানুষের কাছ থেকেও আসতে পারে। শিশু সুরক্ষায় পরিবারকে আরও সচেতন হতে হবে। শিশুদের শেখাতে হবেÑকোনো প্রলোভনে কারও সঙ্গে যাওয়া যাবে না, বিপদে কী করতে হবে, কীভাবে সাহায্য চাইতে হবে।

 

একই সঙ্গে পরিবারকে শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা ভয় বা সংকোচ ছাড়াই নিজেদের কথা বলতে পারে। কারণ অনেক শিশু নির্যাতনের ঘটনা দীর্ঘদিন চাপা থাকে শুধুমাত্র ভয়ের কারণে। বিদ্যালয়ের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা ও জীবন দক্ষতা ভিত্তিক পাঠ এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। শিশুদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার শিক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ছে। স্কুলে শিশু সুরক্ষা, আত্মরক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য ও সচেতনতা বিষয়ে কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি।

 

ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গুলোরও দায়িত্ব আছে। ধর্ম সবসময় মানুষকে সংযম, সহমর্মিতা ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। কিন্তু সমাজে যখন ধর্মের মানবিক শিক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং কেবল আনুষ্ঠানিকতা বাড়ে, তখন মানুষের ভেতরের নৈতিক শক্তিও ক্ষয় হতে থাকে। তাই মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। এখানে মিডিয়ার ভূমিকাও কম নয়। গণমাধ্যম অনেক সময় অপরাধের ভয়াবহতা এমনভাবে তুলে ধরে, যা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে। কিন্তু শুধু আতঙ্ক সৃষ্টি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।

 

গণমাধ্যমকে সচেতনতা তৈরির কাজও করতে হবে। কীভাবে শিশুদের নিরাপদ রাখা যায়, কীভাবে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়Ñএসব দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের আইনেও শিশু সুরক্ষার বিভিন্ন বিধান রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, শিশু আইনসহ নানা আইনি কাঠামো আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত দুর্বল হয়, সাক্ষ্য প্রমাণ নষ্ট হয়, কিংবা মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ফলে মানুষের আস্থা কমে যায়।

 

তাই শুধু আইন প্রণয়ন নয়, আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি। রামিসা হত্যার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা গেছে। মানুষ বিচার দাবি করছে, দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাচ্ছে। এই ক্ষোভ স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ক্ষণিকের আবেগ দিয়ে সমাজ বদলায় না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তন। পরিবার, শিক্ষা, সংস্কৃতি, আইন ও প্রশাসনÑসব জায়গায় মানবিকতা ও জবাবদিহির চর্চা বাড়াতে হবে।

 

আমরা প্রায়ই বলি, শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু বাস্তবে কি আমরা তাদের সেই গুরুত্ব দিচ্ছি? একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কখনো সুস্থ সমাজ গড়তে পারবে না। কারণ ভয় ও সহিংসতার মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুরা মানসিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা সমাজের ওপর আস্থা হারায়। ফলে দীঘর্ মেয়াদে পুরো সমাজই অসুস্থ হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন রাজধানীর মতো জায়গায় একটি শিশু এমন নির্মমতার শিকার হয়, তখন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগেÑআমরা কতটা নিরাপদ? শুধু পুলিশি টহল বা আইন কঠোর করলেই হবে না; সমাজে এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অপরাধ করার আগেই মানুষ ভয় পায়, বিবেক তাকে বাধা দেয়।

 

আর সেই বিবেক গড়ে ওঠে পরিবার, শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে। আজ আমাদের সমাজে অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রতিযোগিতা বেড়েছে, কিন্তু মানবিকতার চর্চা কমেছে। মানুষ বড় বাড়ি বানাচ্ছে, দামি গাড়ি কিনছে, কিন্তু সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ হারাচ্ছে। সামাজিক সম্পর্কগুলো ক্রমেই যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে। এই বিচ্ছিন্নতা মানুষকে মানসিক ভাবে অসুস্থ করে তুলছে। ফলে সহিংসতা ও বিকৃত মানসিকতার ঝুঁকি বাড়ছে। রামিসার মৃত্যু আমাদের সামনে এক নির্মম সত্য তুলে ধরেছেÑসভ্যতার মুখোশের আড়ালে সমাজের ভেতরে ভয়ংকর অন্ধকার জমে উঠছে। সেই অন্ধকার শুধু আইন দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়।

 

প্রয়োজন মানবিকতার পুনর্জাগরণ। প্রয়োজন এমন সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে শিশুদের দিকে কেউ কুদৃষ্টি দেওয়ার সাহস না পায়। এই ঘটনার পর রাষ্ট্রের উচিত শিশু সুরক্ষায় বিশেষ কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করা। আবাসিক ভবন গুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, সন্দেহভাজন অপরাধীদের নজরদারি, মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ এবং শিশুদের জন্য জরুরি সহায়তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে শিশু নির্যাতনের মামলা গুলোর নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যায়Ñআমাদের বিবেক কি সত্যিই জাগ্রত হবে?

 

নাকি কিছুদিন পর আরেকটি ঘটনার ভিড়ে রামিসার স্মৃতিও হারিয়ে যাবে? আমরা প্রায়ই দেখি, কোনো নির্মম ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম উত্তাল হয়, মানববন্ধন হয়, বিচার দাবি ওঠে। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু স্তব্ধ হয়ে যায়। কিন্তু পরিবর্তন আসে না। এই চক্র ভাঙতে হবে। একটি শিশুর মৃত্যু যেন কেবল সংবাদ শিরোনাম হয়ে না থাকে। রামিসার নিষ্পাপ মুখ আমাদের মনে করিয়ে দিকÑশিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। প্রতিটি শিশু নিরাপদে স্কুলে যাবে, নিরাপদে ঘরে ফিরবে, ভয়হীন শৈশব পাবেÑএটাই একটি সভ্য দেশের পরিচয়।

 

আজ রামিসার মা-বাবার কান্না শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়; এটি পুরো বাংলাদেশের বিবেকের কান্না। সেই কান্না যদি আমাদের না জাগায়, তাহলে আমরা হয়তো প্রযুক্তিতে উন্নত হব, অর্থনীতিতে এগোব, কিন্তু মানুষ হিসেবে ক্রমেই ছোট হয়ে যাব। রামিসা আর ফিরবে না। কিন্তু তার রক্ত যেন আমাদের সমাজকে প্রশ্ন করতে থাকেÑকোন পথে যাচ্ছে আমাদের সভ্যতা? আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

লেখক: সংবাদকর্মী

Ads small one

লাঙ্গলদাড়িয়ায় মৎস্য ঘের জবরদখলের চেষ্টার অভিযোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ১১:৪৭ অপরাহ্ণ
লাঙ্গলদাড়িয়ায় মৎস্য ঘের জবরদখলের চেষ্টার অভিযোগ

আশাশুনি প্রতিনিধি: আশাশুনির শ্রীউলা ইউনিয়নের লাঙ্গলদাড়িয়া মৌজায় ডিডকৃত (চুক্তিভিত্তিক লিজ) ও পৈতৃক সম্পত্তির একটি মৎস্য ঘের জবরদখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দায়েরের পর পুলিশ উভয় পক্ষকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ থানায় হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
ঘের ব্যবসায়ী ইউসুফ আলী জানান, তিনি লাঙ্গলদাড়িয়া মৌজায় পৈতৃক ও ডিডকৃত ২১০ বিঘা জমিতে ২০২১ সাল থেকে শান্তিপূর্ণভাবে মৎস্য চাষ করে আসছেন। ২০২৬ সালে হিসাব অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু অংশ বাদ দিয়ে ১৭৬.৫৭ বিঘা জমি তার পাওনা হয়, যার মধ্যে ১৫৯ বিঘা জমি তিনি বুঝে পেয়ে গত ৬ মাস ধরে ভোগদখল করছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে এই হিসাব চূড়ান্ত হয়েছিল। কিন্তু গত ১৪ জুন অধ্যাপক সিরাজুল কবির ঘেরের জমি নিজের দাবি করে আকস্মিক দখলের চেষ্টা চালান এবং ১৫ জুন শ্রমিক নিয়ে ঘেরে নামেন।
এই বিষয়ে শ্রীউলা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, অধ্যাপক সিরাজুল কবিরের জমি আগেই তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, ইউসুফের ঘেরে তার নতুন কোনো জমি নেই। দখলের চেষ্টা করা হয়ে থাকলে তা অন্যায় হয়েছে।
তবে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে অধ্যাপক সিরাজুল কবির জবরদখলের অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, এর আগে কোনো সালিস-মিমাংসা হয়নি বা কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি ইউসুফের ঘের দখল করতে যাননি।

কপিলমুনিতে চাচার মামলা ও হুমকিতে নিরাপত্তাহীনতায় এতিম ভাই-বোন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ১১:৪৩ অপরাহ্ণ
কপিলমুনিতে চাচার মামলা ও হুমকিতে নিরাপত্তাহীনতায় এতিম ভাই-বোন

কপিলমুনি (খুলনা) প্রতিনিধি: খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনিতে মায়ের হত্যাকারী ও আপন চাচার করা ‘মিথ্যা’ মামলা ও জীবননাশের হুমকিতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন দুই এতিম ভাই-বোন। সোমবার সকালে কাশিমনগর বাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ করেন ইটভাটার শিশু শ্রমিক মো. রিফাত গাজী।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে রিফাত গাজী বলেন, ২০২১ সালে তাদের বাবা এনামুল গাজী মারা যান। এরপর ২০১৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর তার মা রাশিদা বেগমকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় রিফাত বাদী হয়ে চাচা মহিদুল গাজীকে আসামি করে পাইকগাছা থানায় হত্যা মামলা করেন। পুলিশ সেদিনই মহিদুলকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু গত ২১ এপ্রিল জামিনে মুক্তি পেয়েই মহিদুল মামলা তুলে নেওয়ার জন্য রিফাত ও তার ছোট বোন তাসমিরা খাতুনসহ (১৪) সাক্ষীদের নানাভাবে হুমকি দিচ্ছেন। এ বিষয়ে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে গত ১১ জুন থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন রিফাত।
রিফাত আরও অভিযোগ করেন, মায়ের হত্যা মামলা থেকে বাঁচতে চাচা মহিদুল গাজী উল্টো তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। সম্প্রতি তিনি পাইকগাছা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রিফাতসহ ৭ স্বজনের নাম উল্লেখ করে একটি ‘মিথ্যা’ মামলা (সিআর-৪০৪/২৬) দায়ের করেছেন। মামলায় দাবি করা হয়েছে—তার মা আত্মহত্যা করেছেন এবং রিফাত ও অন্যরা মিলে চাচার ঘরের আসবাবপত্র, স্বর্ণালঙ্কার, পুকুরের মাছ ও কলাসহ প্রায় ৩২ লাখ টাকার মালামাল চুরি ও ক্ষতিসাধন করেছে। রিফাত এই দাবিকে সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ৩১ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের সূত্র ধরে পুলিশ জানায়, রাশিদা বেগম আত্মহত্যা করেছেন। ফলে মামলাটি হত্যা (৩০২ ধারা) থেকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার (৩০৬ ধারা) অপরাধে রূপ নেয়।
রিফাত গাজীর দাবি, তার বাবার মৃত্যুর পর থেকে চাচা মহিদুল তার মাকে নানাভাবে যৌন হয়রানি ও কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। এ নিয়ে এলাকায় একাধিকবার সালিস হলেও মহিদুল উপস্থিত হননি। ঘটনার রাতে তার মাকে বাইরে ডেকে নেওয়া হয়েছিল এবং ঘরের বাইরে থেকে শিকল আটকে দেওয়া হয়েছিল। পরদিন সকালে লিচু গাছ থেকে মায়ের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তে আত্মহত্যার কথা বলা হলেও সুরতহাল রিপোর্টে শরীরের নানা অসঙ্গতি ছিল। তাই মায়ের মৃত্যুর সঠিক রহস্য উদঘাটনে পুনরায় ময়নাতদন্তের দাবি জানিয়ে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এই এতিম তরুণ।

 

 

সম্পাদকীয়:প্রসঙ্গ: নাগরিক দুর্ভোগের অবসান হবে কবে?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ১১:৪৩ অপরাহ্ণ
সম্পাদকীয়:প্রসঙ্গ: নাগরিক দুর্ভোগের অবসান হবে কবে?

oppo_0

একটি আধুনিক ও প্রথম শ্রেণীর পৌরসভায় নাগরিকরা নিয়মিত কর পরিশোধ করবেন, আর বিনিময়ে পাবেন ন্যূনতম নাগরিক সুবিধাÑএটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু সাতক্ষীরা পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের মধ্যকাটিয়া এলাকার চিত্র দেখলে মনে হয়, সেখানকার বাসিন্দারা যেন কোনো পরিত্যক্ত জনপদে বসবাস করছেন। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মধ্যকাটিয়ার একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাব এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশার কারণে কার্যত একটি উন্মুক্ত নর্দমায় পরিণত হয়েছে। কাদা, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং ড্রেনের উপচে পড়া কালো, দুর্গন্ধযুক্ত পানি মাড়িয়ে প্রতিদিন চলাচল করতে হচ্ছে হাজার হাজার মানুষকে। একই চিত্র সাতক্ষীরা তুফান কোম্পানীর মোড় থেকে পিএন স্কুল মোড় পর্যন্ত সড়টির। এ সড়কটির কোথাও আস্ত নেই।
একটি সভ্য সমাজে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম সড়ক যদি এমন নরককু-ে পরিণত হয়, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাজনক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ড্রেনগুলো দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় পানি নিষ্কাশন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা ও বিষাক্ত পানি উপচে রাস্তায় জমে থাকছে। রাস্তার বড় বড় গর্তগুলো এই নোংরা পানির নিচে লুকিয়ে থাকায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বৃদ্ধ ও নারীদের প্রতিদিন যে অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
ভোগান্তির এখানেই শেষ নয়; এই জমে থাকা নোংরা পানি ও আবর্জনার কারণে এলাকায় মশা-মাছির উপদ্রব মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে ডেঙ্গু, ডায়রিয়া ও চর্মরোগসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা। এলাকার মানুষ ঘরের দরজা-জানালা পর্যন্ত খুলতে পারছেন না দুর্গন্ধের কারণে। অথচ নাগরিকরা নিয়মিত পৌরকর পরিশোধ করে যাচ্ছেন। ট্যাক্স দিয়েও কেন মানুষকে এমন আদিম ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যে বাস করতে হবেÑএই প্রশ্ন এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, স্থানীয় বাসিন্দারা বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই সমস্যার কথা জানালেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বর্ষা মৌসুম দরজায় কড়া নাড়ছে, এই অবস্থায় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি যে আরও কতটা ভয়াবহ ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে, তা সহজেই অনুমেয়।
পৌরসভার পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই “বিষয়টি অবগত আছি এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে” ধরনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা মনে করি, শুধু মুখের আশ্বাস বা আশ্বাসের চাদরে দুর্ভোগ ঢেকে রাখার সময় আর নেই। মধ্যকাটিয়াবাসীর এই দুর্ভোগ লাঘবে এখন প্রয়োজন তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী সমাধান।
আমরা সাতক্ষীরা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই—অবিলম্বে মধ্যকাটিয়া এলাকার ড্রেনগুলো পরিষ্কার করে পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা করা হোক এবং ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাটি জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হোক। নাগরিকদের সুস্থ ও নিরাপদভাবে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা পৌরসভার আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। আশা করি, কর্তৃপক্ষ আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত মাঠে নামবেন এবং মধ্যকাটিয়াবাসীকে এই দুঃসহ নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবেন।