বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

শিশুর রক্তে ভেসে যায় সভ্যতা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৫:০৯ অপরাহ্ণ
শিশুর রক্তে ভেসে যায় সভ্যতা

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারের হত্যাকা- শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা, মানবিকতা ও সভ্যতার মুখে এক নির্মম চপেটাঘাত। একটি শিশুÑযার পৃথিবী হওয়ার কথা ছিল স্কুল, বই, খেলাধুলা আর স্বপ্নে ভরাÑসে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর নৃশংসভাবে খুন হয়েছে। হত্যার পর আলামত গোপন করতে তার মাথা ও হাত বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এমন বর্বরতা কোনো সভ্য সমাজে কল্পনাও করা যায় না। অথচ সেই ঘটনাই ঘটেছে আমাদের রাজধানীতে, মানুষের ভিড়ে, একটি বহুতল ভবনের ভেতরে। রামিসার মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়; এটি পুরো জাতির বিবেকের পরীক্ষা।

 

প্রশ্ন হচ্ছেÑআমরা কি এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে শিশুরাও আর নিরাপদ নয়? যদি তাই হয়, তাহলে উন্নয়ন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক অগ্রগতির সব গর্ব কি শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে পড়ে না? ঘটনার বিবরণ শুনলেই শরীর শিউরে ওঠে। দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী রামিসা স্কুলে যাওয়ার প্রকাল্লে প্রতিবেশী সোহেল রানার ফাঁদে পড়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, মাদকাসক্ত সেই ব্যক্তি তাকে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায় তার স্ত্রী সহযোগতায়।

 

সেখানে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এরপর পরিচয় গোপন ও অপরাধ আড়াল করতে শিশুটির শরীর বিকৃত করা হয়। এই নির্মমতা শুধু অপরাধ নয়; এটি মানুষের ভেতরের পশুত্বের নগ্ন প্রকাশ। বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার ঘটনা নতুন নয়। প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও শিশু ধর্ষণ, হত্যা কিংবা নির্যাতনের খবর আসে। কিন্তু পল্লবীর এই ঘটনা মানুষের মনে এত গভীর নাড়া দিয়েছে, কারণ এখানে নিষ্ঠুরতার মাত্রা ভয়ংকর ভাবে সীমা অতিক্রম করেছে।

 

একটি শিশুকে হত্যা করেও অপরাধীর ভয় দূর হয়নি; বরং সে মৃতদেহ বিকৃত করে অপরাধ গোপনের চেষ্টা করেছে। এর অর্থ, অপরাধের ভয় তার ভেতরে কাজ করেনি। অর্থাৎ সমাজে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে কিছু মানুষ মনে করছে তারা যে কোনো অপরাধ করেও পার পেয়ে যেতে পারে। এখানেই আসে বিচার হীনতার প্রশ্ন। আমাদের দেশে বহু আলোচিত হত্যাকা- বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। অনেক মামলার বিচার হয় না, আবার অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সূত্রতা মানুষকে হতাশ করে। ফলে অপরাধীরা মনে সাহস পায়। তারা ভাবে, আইনের ফাঁক ফোকর কিংবা প্রভাব খাটিয়ে শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

 

তাই রামিসা হত্যার বিচার শুধু একটি মামলার বিচার নয়; এটি পুরো সমাজে একটি বার্তা দেওয়ার প্রশ্ন। রাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবেÑশিশুর বিরুদ্ধে অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই, কোনো ছাড় নেই। তবে শুধু দ্রুত বিচার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ অপরাধ একটি সামাজিক বাস্তবতার ফল। সমাজে যখন নৈতিক অবক্ষয় বাড়ে, তখন অপরাধও বাড়ে। আজ আমরা এমন এক সময় পার করছি, যখন মানুষের ভেতরের সহমর্মিতা, মমত ¡বোধ ও মানবিকতা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

 

পরিবারে একসঙ্গে বসে কথা বলার সংস্কৃতি কমে গেছে, সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়েছে, আর প্রযুক্তিনির্ভর একাকিত্ব মানুষের মনকে কঠোর করে তুলছে। শিশুরা বড় হচ্ছে মোবাইল স্ক্রিনের সামনে, কিন্তু মানবিক শিক্ষার ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। মাদকাসক্তিও এই সংকটের বড় কারণ। পল্লবীর ঘটনার মূল অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মাদকাসক্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইয়াবা, গাঁজা, ফেন্সিডিল কিংবা নতুন নতুন মাদক তরুণদের জীবন ধ্বংস করছে।

 

মাদক শুধু একজন মানুষকে অসুস্থ করে না; এটি তার বিবেক, বিচারবোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণও ধ্বংস করে দেয়। ফলে অনেকেই ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত অভিযান, এত বক্তব্যের পরও মাদকের সহজলভ্যতা কেন কমছে না? সীমান্ত, শহর ও অলিগলিতে কীভাবে মাদকের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হচ্ছে? রাষ্ট্রকে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে। শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের সামাজিক উদাসীনতাও উদ্বেগজনক। একসময় গ্রামবাংলায় বা শহরের মহল্লায় প্রতিবেশীরা একে অপরের খোঁজ রাখতেন।

 

কোনো শিশু কোথাও একা গেলে বড়রা খেয়াল করতেন। এখন সেই সামাজিক বন্ধন ভেঙে গেছে। একই ভবনে বছরের পর বছর থেকেও অনেকে একে অপরকে চেনেন না। ফলে অপরাধীরা সহজেই সুযোগ পেয়ে যায়। রামিসার ঘটনাও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিপদ অনেক সময় বাইরের অচেনা মানুষের কাছ থেকে নয়, বরং পরিচিত মানুষের কাছ থেকেও আসতে পারে। শিশু সুরক্ষায় পরিবারকে আরও সচেতন হতে হবে। শিশুদের শেখাতে হবেÑকোনো প্রলোভনে কারও সঙ্গে যাওয়া যাবে না, বিপদে কী করতে হবে, কীভাবে সাহায্য চাইতে হবে।

 

একই সঙ্গে পরিবারকে শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা ভয় বা সংকোচ ছাড়াই নিজেদের কথা বলতে পারে। কারণ অনেক শিশু নির্যাতনের ঘটনা দীর্ঘদিন চাপা থাকে শুধুমাত্র ভয়ের কারণে। বিদ্যালয়ের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা ও জীবন দক্ষতা ভিত্তিক পাঠ এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। শিশুদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার শিক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ছে। স্কুলে শিশু সুরক্ষা, আত্মরক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য ও সচেতনতা বিষয়ে কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি।

 

ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গুলোরও দায়িত্ব আছে। ধর্ম সবসময় মানুষকে সংযম, সহমর্মিতা ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। কিন্তু সমাজে যখন ধর্মের মানবিক শিক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং কেবল আনুষ্ঠানিকতা বাড়ে, তখন মানুষের ভেতরের নৈতিক শক্তিও ক্ষয় হতে থাকে। তাই মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। এখানে মিডিয়ার ভূমিকাও কম নয়। গণমাধ্যম অনেক সময় অপরাধের ভয়াবহতা এমনভাবে তুলে ধরে, যা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে। কিন্তু শুধু আতঙ্ক সৃষ্টি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।

 

গণমাধ্যমকে সচেতনতা তৈরির কাজও করতে হবে। কীভাবে শিশুদের নিরাপদ রাখা যায়, কীভাবে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়Ñএসব দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের আইনেও শিশু সুরক্ষার বিভিন্ন বিধান রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, শিশু আইনসহ নানা আইনি কাঠামো আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত দুর্বল হয়, সাক্ষ্য প্রমাণ নষ্ট হয়, কিংবা মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ফলে মানুষের আস্থা কমে যায়।

 

তাই শুধু আইন প্রণয়ন নয়, আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি। রামিসা হত্যার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা গেছে। মানুষ বিচার দাবি করছে, দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাচ্ছে। এই ক্ষোভ স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ক্ষণিকের আবেগ দিয়ে সমাজ বদলায় না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তন। পরিবার, শিক্ষা, সংস্কৃতি, আইন ও প্রশাসনÑসব জায়গায় মানবিকতা ও জবাবদিহির চর্চা বাড়াতে হবে।

 

আমরা প্রায়ই বলি, শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু বাস্তবে কি আমরা তাদের সেই গুরুত্ব দিচ্ছি? একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কখনো সুস্থ সমাজ গড়তে পারবে না। কারণ ভয় ও সহিংসতার মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুরা মানসিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা সমাজের ওপর আস্থা হারায়। ফলে দীঘর্ মেয়াদে পুরো সমাজই অসুস্থ হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন রাজধানীর মতো জায়গায় একটি শিশু এমন নির্মমতার শিকার হয়, তখন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগেÑআমরা কতটা নিরাপদ? শুধু পুলিশি টহল বা আইন কঠোর করলেই হবে না; সমাজে এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অপরাধ করার আগেই মানুষ ভয় পায়, বিবেক তাকে বাধা দেয়।

 

আর সেই বিবেক গড়ে ওঠে পরিবার, শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে। আজ আমাদের সমাজে অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রতিযোগিতা বেড়েছে, কিন্তু মানবিকতার চর্চা কমেছে। মানুষ বড় বাড়ি বানাচ্ছে, দামি গাড়ি কিনছে, কিন্তু সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ হারাচ্ছে। সামাজিক সম্পর্কগুলো ক্রমেই যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে। এই বিচ্ছিন্নতা মানুষকে মানসিক ভাবে অসুস্থ করে তুলছে। ফলে সহিংসতা ও বিকৃত মানসিকতার ঝুঁকি বাড়ছে। রামিসার মৃত্যু আমাদের সামনে এক নির্মম সত্য তুলে ধরেছেÑসভ্যতার মুখোশের আড়ালে সমাজের ভেতরে ভয়ংকর অন্ধকার জমে উঠছে। সেই অন্ধকার শুধু আইন দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়।

 

প্রয়োজন মানবিকতার পুনর্জাগরণ। প্রয়োজন এমন সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে শিশুদের দিকে কেউ কুদৃষ্টি দেওয়ার সাহস না পায়। এই ঘটনার পর রাষ্ট্রের উচিত শিশু সুরক্ষায় বিশেষ কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করা। আবাসিক ভবন গুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, সন্দেহভাজন অপরাধীদের নজরদারি, মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ এবং শিশুদের জন্য জরুরি সহায়তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে শিশু নির্যাতনের মামলা গুলোর নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যায়Ñআমাদের বিবেক কি সত্যিই জাগ্রত হবে?

 

নাকি কিছুদিন পর আরেকটি ঘটনার ভিড়ে রামিসার স্মৃতিও হারিয়ে যাবে? আমরা প্রায়ই দেখি, কোনো নির্মম ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম উত্তাল হয়, মানববন্ধন হয়, বিচার দাবি ওঠে। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু স্তব্ধ হয়ে যায়। কিন্তু পরিবর্তন আসে না। এই চক্র ভাঙতে হবে। একটি শিশুর মৃত্যু যেন কেবল সংবাদ শিরোনাম হয়ে না থাকে। রামিসার নিষ্পাপ মুখ আমাদের মনে করিয়ে দিকÑশিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। প্রতিটি শিশু নিরাপদে স্কুলে যাবে, নিরাপদে ঘরে ফিরবে, ভয়হীন শৈশব পাবেÑএটাই একটি সভ্য দেশের পরিচয়।

 

আজ রামিসার মা-বাবার কান্না শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়; এটি পুরো বাংলাদেশের বিবেকের কান্না। সেই কান্না যদি আমাদের না জাগায়, তাহলে আমরা হয়তো প্রযুক্তিতে উন্নত হব, অর্থনীতিতে এগোব, কিন্তু মানুষ হিসেবে ক্রমেই ছোট হয়ে যাব। রামিসা আর ফিরবে না। কিন্তু তার রক্ত যেন আমাদের সমাজকে প্রশ্ন করতে থাকেÑকোন পথে যাচ্ছে আমাদের সভ্যতা? আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

লেখক: সংবাদকর্মী

Ads small one

সম্পাদকীয়: প্রসঙ্গ: পণ্যের সঠিক মান ও পরিমাপ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬, ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়: প্রসঙ্গ: পণ্যের সঠিক মান ও পরিমাপ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি

পণ্যের সঠিক মান ও সঠিক ওজন বা পরিমাপ নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা অনুকম্পা নয়, এটি ভোক্তার আইনগত ও মৌলিক অধিকার। সম্প্রতি খুলনায় বিশ্ব মেট্রোলজি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ হারুন যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা দেশের বর্তমান বাজার পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি যথার্থই বলেছেন, উৎপাদন থেকে বিপণনÑপ্রতিটি ধাপে পণ্যের সঠিক মান ও ওজন নিশ্চিত করে বাজারে ভোক্তার আস্থা অর্জন করতে হবে। একই সঙ্গে মানসম্মত পণ্য বুঝে পেতে ভোক্তাদেরও সচেতন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশের বাজার ব্যবস্থায় ভোক্তার এই ‘আস্থা’র জায়গাটি বারবার ধাক্কা খাচ্ছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের একাংশের কারসাজিতে ওজন ও পরিমাপে কারচুপি এখন এক নিত্যদিনের ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। ডিজিটাল স্কেল বা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের আড়ালেও নানা কৌশলে ভোক্তাদের ঠকানোর প্রবণতা দেখা যায়। এর পাশাপাশি খাদ্যে ভেজাল ও নি¤œমানের পণ্য সরবরাহের মতো ঘটনা তো রয়েছেই। এই পরিস্থিতি শুধু সাধারণ ভোক্তার পকেটই কাটছে না, বরং পুরো বাজার ব্যবস্থার ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।
এবারের বিশ্ব মেট্রোলজি দিবসের প্রতিপাদ্য ছিলÑ‘নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় আস্থা নির্মাণে মেট্রোলজি’। এর মূল অন্তর্নিহিত অর্থই হলো সঠিক পরিমাপ বিজ্ঞান ও তার যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রে একটি স্বচ্ছতা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করা। ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখা যেকোনো সভ্য সমাজের প্রধান শর্ত। একজন ব্যবসায়ী যখন ওজনে কম দেন বা নি¤œমানের পণ্য সরবরাহ করেন, তখন তিনি কেবল আইনই লঙ্ঘন করেন না, বরং ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধকেও অবমাননা করেন।
তবে এই সংকটের সমাধান শুধু আইন প্রয়োগ বা ব্যবসায়ীদের সদিচ্ছার ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। এখানে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মতো রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর নিয়মিত ও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান ও তদারকি আরও জোরদার করতে হবে, যেন অপরাধীরা পার পেয়ে না যায়।
একই সঙ্গে ভোক্তাদেরও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। পণ্য কেনার সময় তার ওজন, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, বিএসটিআইয়ের লোগো এবং মোড়কজাতকরণের সঠিক নিয়ম দেখে নেওয়া প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। কোনো ক্ষেত্রে প্রতারিত হলে চুপ না থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানোর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
আমরা বলতে চাই, একটি টেকসই ও আধুনিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে বাজারে সুশাসন ও ভোক্তার অধিকার রক্ষা করা জরুরি। সরকারের কঠোর তদারকি, ব্যবসায়ীদের সততা এবং সাধারণ ভোক্তার সচেতনতা—এই তিনের সমন্বয়েই কেবল একটি আদর্শ ও আস্থাশীল বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও অংশীজনেরা এই বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

কুরিয়ার জট ও চড়া ভাড়ার দিন শেষ: সাতক্ষীরার আম মাত্র ৫টাকায় পৌঁছে দিচ্ছে ডাক বিভাগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬, ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ
কুরিয়ার জট ও চড়া ভাড়ার দিন শেষ: সাতক্ষীরার আম মাত্র ৫টাকায় পৌঁছে দিচ্ছে ডাক বিভাগ

আসাদুজ্জামান সরদার: চলছে মধুমাস জ্যৈষ্ঠের আমেজ। গাছপাকা সুস্বাদু গোবিন্দভোগ, হিমসাগর আর ল্যাংড়া আমের সুবাসে আমোদিত চারপাশ। দেশের গ-ি পেরিয়ে সাতক্ষীরার এই আমের সুখ্যাতি এখন বিশ্বজুড়ে। তবে প্রতি বছরই আমের এই ভরা মৌসুমে দূর-দূরান্তে থাকা প্রিয়জন কিংবা ক্রেতাদের কাছে আম পাঠাতে গিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের চড়া মাশুলের ধাক্কায় হিমশিম খেতে হতো সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের। অনেক সময় আমের দামের চেয়ে কুরিয়ার ভাড়াই হয়ে যেত দ্বিগুণ।
সাধারণ মানুষ আর আম চাষিদের সেই চিরচেনা ভোগান্তি দূর করতে এবার অবিশ্বাস্য সাশ্রয়ী মূল্যে আম পরিবহনের এক দারুণ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। তাদের প্রযুক্তি-নির্ভর ‘স্পিড পোস্ট’ সার্ভিসের মাধ্যমে এখন নামমাত্র মূল্যে সাতক্ষীরার আম পৌঁছে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ডাক বিভাগের এই আধুনিক ও গতিশীল রূপান্তর এখন আম চাষি ও ব্যবসায়ীদের মুখে চওড়া হাসি ফুটিয়েছে।

সাতক্ষীরা প্রধান ডাকঘর সূত্রে জানা গেছে, এই বিশেষ সার্ভিসে আম বুকিংয়ের ক্ষেত্রে প্রথম কেজি মাত্র ১০ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি কেজির জন্য নেওয়া হচ্ছে মাত্র ৫ টাকা। বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসগুলো যেখানে প্রতি কেজিতে ১৩ থেকে ১৫ টাকা বা তারও বেশি চার্জ নিচ্ছে, সেখানে ডাক বিভাগের এই দর আমের বাজারে এক আমূল পরিবর্তন এনেছে। হিসেব অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক ২০ কেজি আম পাঠালে ভ্যাট ও উৎস করসহ তার মোট খরচ পড়ছে মাত্র ১১৬ টাকা।
কম খরচের পাশাপাশি ডাক বিভাগের দ্রুততম ডেলিভারির বিষয়টিও নজর কেড়েছে ব্যবসায়ীদের। সকালে বুকিং করলে ওই দিন সন্ধ্যার মধ্যেই খুলনায় এবং সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা শহরের গ্রাহকের হাতে আম পৌঁছে যাচ্ছে। আর চট্টগ্রাম, সিলেট বা বরিশালের মতো দূরবর্তী জেলাগুলোতে বুকিংয়ের এক থেকে দুই দিনের মধ্যে আম অক্ষত অবস্থায় মিলছে।
সাতক্ষীরা পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার দেবাশীষ কর্মকার বলেন, “বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে আম পাঠানোর সবচেয়ে উপযুক্ত ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম এখন ডাক বিভাগের ‘স্পিড পোস্ট’। আমাদের লক্ষ্য কম খরচে গ্রাহকের দোরগোড়ায় দ্রুত ও নিরাপদ সেবা নিশ্চিত করা।”
ঢাকা শহরের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ জিপিও এবং সাব-পোস্ট অফিসের আওতায় এই আম ডেলিভারি দেওয়া হচ্ছে। গুলশান, বনানী, উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, নিউমার্কেট, তেজগাঁও, খিলগাঁও, ওয়ারী, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ও ঢাকা জিপিওসহ প্রধান প্রধান সবগুলো এলাকা রয়েছে এই সেবার আওতায়। বর্তমানে দেশের যেকোনো জেলা সদর এবং জেলা সদরের কাছাকাছি থাকা উপজেলা ডাকঘরগুলো থেকে এই সেবা মিলছে।
সাতক্ষীরা পৌরসভার আলিয়া মাদ্রাসা পাড়ার আম ব্যবসায়ী ইয়াকুব আলী বলেন, “সাতক্ষীরার আম সারদেশের মানুষের কাছে খুব প্রিয়। কিন্তু আগে ক্যারেট আর কুরিয়ার খরচ বেশি হওয়ায় ঢাকার মানুষকে অনেক বেশি দাম দিয়ে কিনে খেতে হতো। ডাক বিভাগের এই কম খরচের সেবার কথা শুনে আজ প্রথম এসেছি। আমাদের মতো ব্যবসায়ীদের জন্য এটি দারুণ এক সুযোগ।”
সাতক্ষীরা পোস্ট অফিসের হিসাবরক্ষক শ্যাম কুমার পাল জানান, আম ঠিকঠাক ও দ্রুত সময়ে পৌঁছানোর কারণে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। ডাক বিভাগের এই আধুনিক ও সাশ্রয়ী রূপান্তর মিডল-ম্যান বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাবে এবং চাষি ও ভোক্তাদের সরাসরি যুক্ত করে আমের বাজারে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শ্যামনগরে একটি পরিবারকে দেশান্তর ও প্রাণনাশের হুমকি, থমথমে পরিস্থিতি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬, ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ
শ্যামনগরে একটি পরিবারকে দেশান্তর ও প্রাণনাশের হুমকি, থমথমে পরিস্থিতি

 

শ্যামনগর প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জে একটি পরিবারের সদস্য ও সংবাদকর্মীকে দেশান্তর করার হুমকি, প্রাণনাশ এবং মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ওই যুবকের নাম পরিতোষ কুমার বৈদ্য। উপজেলার সেন্ট্রাল কালিনগর গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে মাসুমের বিরুদ্ধে গত এক সপ্তাহ ধরে মোবাইল ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারে এই অনবরত হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের আড়পাঙ্গাসিয়া গ্রামের এক প্রতিবন্ধী শিক্ষকের মেয়ের সঙ্গে ‘মাসুম কম্পিউটার অ্যান্ড ফটোস্ট্যাট’ দোকানের মালিক মাসুমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর জের ধরে কিছুদিন আগে গভীর রাতে ওই মেয়েটিকে তুলে নিয়ে আসার চেষ্টা করলে এলাকাবাসী মাসুমকে হাতেনাতে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে। পরদিন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় মুচলেকা নিয়ে মাসুমকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পরিতোষ কুমার বৈদ্য জানান, ভুক্তভোগী পরিবারটি তার আত্মীয় হওয়ায় তিনি মানবিক কারণে তাদের আইনি ও সামাজিক সহযোগিতা করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মাসুম তার কাছে ৪০ হাজার টাকা ও একটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন দাবি করে। এই অনৈতিক দাবি পূরণ করতে অস্বীকৃতি জানালে মাসুম তাকে দেশছাড়া করার হুমকি দেয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন ভাষায় বার্তা পাঠাতে শুরু করে। নিরাপত্তার স্বার্থে পরিতোষ শ্যামনগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করলেও মাসুমের হুমকি থামেনি।
অভিযুক্ত মাসুম জানায়Ñ“মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপের যেসব স্ক্রিনশট ও রেকর্ডের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো আমার আইডি নয়। আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।”
এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে অভিযুক্ত মাসুমকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ হিন্দু পরিষদ শ্যামনগর শাখার আহ্বায়ক অনাথ ম-ল। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল মাধ্যমে এভাবে হুমকি ও মানহানিকর বক্তব্য দেওয়া সাইবার নিরাপত্তা আইন ও দ-বিধির ফৌজদারি ধারা অনুযায়ী কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. খালেদুর রহমান বলেন, “সংবাদকর্মী পরিতোষ বৈদ্যের জিডির পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এরপরও যদি তাকে নতুন করে কোনো হুমকি দেওয়া হয়ে থাকে, তবে লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”